বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে সফল কৃষক বানিয়ে দিল করোনা
jugantor
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে সফল কৃষক বানিয়ে দিল করোনা

  একরাম তালুকদার, দিনাজপুর  

২৭ জানুয়ারি ২০২১, ২০:৫১:০৩  |  অনলাইন সংস্করণ

বাবার সঙ্গে নিজের ক্ষেতে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র মিঠুন রায়

বৈশ্বিক করোনা মহামারি পরিস্থিতি প্রায় গোটা পৃথিবীতে একপ্রকার বিপর্যয় ডেকে নিয়ে এলেও কাউকে দেখিয়েছে নতুনভাবে বাঁচার পথ, দেখিয়েছে নিজের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন। এতে সফলও হয়েছেন অনেকে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারির এ পরিস্থিতিতে এমনই এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী মিঠুন রায় (১৯)। পড়ালেখা একপ্রকার বন্ধ থাকায় এখন তিনি পরিণত হয়েছেন একজন সফল কৃষকে।

করোনা মহামারী পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, বন্ধ আবাসিক হলও। এ অবস্থায় দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম মানিকবাটিতে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিষয়ে অধ্যয়নরত দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মিঠুন রায়।

প্রথমে বাড়িতে এসে সময় কাটছিল না তার। অলস সময় পার করতেও পারছিলেন না তিনি। ফলে সে প্রথমে বাড়ির পরিত্যক্ত জমিতে শুরু করে শিম চাষ। আস্তে আস্তে গাছ বেড়ে উঠতে দেখে তার চোখে ভেসে আসতে শুরু করে নতুন স্বপ্ন। শিম বিক্রি করে বেশ টাকা পেয়ে উৎসাহিত হন তিনি।

এরপর সে ইন্টারনেটের সাহায্যে ইউটিউব দেখে এবং স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খাদেমুল ইসলামের পরামর্শে বাড়ির আশপাশের জমিতে ক্রমান্বয়ে শুরু করেন গানিব্যাগে টমেটো, বেগুন, আদা, বাঁধা কপি এবং জমিতে বিষমুক্ত লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, শসা, সিম, মটরশুঁটি ও ব্রোকলিসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চাষ।

ইতোমধ্যেই এসব সবজি বিক্রি করে বেশ কিছু অর্থও তিনি পরিবারকে দিতে শুরু করেছেন। প্রথম অবস্থায় বাড়ি থেকে তাকে এসব ফসল আবাদের জন্য জমি দিতে না চাইলেও তার সফলতা দেখে এখন দেড় থেকে দুই বিঘা জমি তাকে ছেড়ে দিয়েছে।

এরই মধ্যে গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তার বাবা জয়হরি রায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের স্টোরেজ মোটিভেটর পদে চাকরি শেষে অবসরে আসেন। ছেলের সফলতা দেখে বাবাও ছেলের সঙ্গে শুরু করেন এসব চাষাবাদ।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র মিঠুন রায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, বাবা কষ্ট করে লেখাপড়া করার খরচ চালাচ্ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বাড়িতে এসে বসে না থেকে এসব কাজ শুরু করি। কীভাবে ভালো আবাদ করা যায়, তার জন্য ইউটিউবের বিভিন্ন সাইট ঘাটাঘাটি করেছি এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়েছি। এখন দেখছি, চাষাবাদ করেও ভালো ফল পাওয়া যায়।


মিঠুন রায় জানান, দেশের উৎপাদন বাড়াতে আমাদের শিক্ষিত কৃষক দরকার। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহার করেই আমি এসব ফসল উৎপাদনের ধারণা নিয়েছি এবং প্র্যাকটিক্যালি আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা।

বাবা জয়হরি রায় জানান, নিজের ৫-৬ বিঘা জমি আছে। কিন্তু এই জমি থেকে কখনই নিজের বাড়ির খাবার ছাড়া কোনো টাকা পাননি তিনি। আমার ছেলেই প্রমাণ করেছে, জমিতে ফসল আবাদ করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। এজন্য অবসরে যাওয়ার পর ছেলের সঙ্গে তিনি নিজেও জমিতে কাজ শুরু করেছেন।

চিরিরবন্দরের ওই এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খাদেমুল ইসলাম জানান, শিক্ষিত ব্যক্তি যে বোঝা নয়, মিঠুন রায় তার প্রমাণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে হবে কী, বাসায় এসে কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি সফলতা পেয়েছেন। তিনি একজন সফল কৃষক এবং তিনি তার নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে ইঁদুর নিধনেও সফল।

তিনি জানান, সব কৃষকই যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মতে মিঠুন রায়ের মতো ফসল আবাদ করে, তাহলে দেশে ফসল উৎপাদনও অনেক বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে সফল কৃষক বানিয়ে দিল করোনা

 একরাম তালুকদার, দিনাজপুর 
২৭ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:৫১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বাবার সঙ্গে নিজের ক্ষেতে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র মিঠুন রায়
বাবার সঙ্গে নিজের ক্ষেতে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র মিঠুন রায়

বৈশ্বিক করোনা মহামারি পরিস্থিতি প্রায় গোটা পৃথিবীতে একপ্রকার বিপর্যয় ডেকে নিয়ে এলেও কাউকে দেখিয়েছে নতুনভাবে বাঁচার পথ, দেখিয়েছে নিজের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন। এতে সফলও হয়েছেন অনেকে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারির এ পরিস্থিতিতে এমনই এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী মিঠুন রায় (১৯)। পড়ালেখা একপ্রকার বন্ধ থাকায় এখন তিনি পরিণত হয়েছেন একজন সফল কৃষকে।

করোনা মহামারী পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, বন্ধ আবাসিক হলও। এ অবস্থায় দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম মানিকবাটিতে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিষয়ে অধ্যয়নরত দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মিঠুন রায়।

প্রথমে বাড়িতে এসে সময় কাটছিল না তার। অলস সময় পার করতেও পারছিলেন না তিনি। ফলে সে প্রথমে বাড়ির পরিত্যক্ত জমিতে শুরু করে শিম চাষ। আস্তে আস্তে গাছ বেড়ে উঠতে দেখে তার চোখে ভেসে আসতে শুরু করে নতুন স্বপ্ন। শিম বিক্রি করে বেশ টাকা পেয়ে উৎসাহিত হন তিনি।

এরপর সে ইন্টারনেটের সাহায্যে ইউটিউব দেখে এবং স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খাদেমুল ইসলামের পরামর্শে বাড়ির আশপাশের জমিতে ক্রমান্বয়ে শুরু করেন গানিব্যাগে টমেটো, বেগুন, আদা, বাঁধা কপি এবং জমিতে বিষমুক্ত লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, শসা, সিম, মটরশুঁটি ও ব্রোকলিসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চাষ।

ইতোমধ্যেই এসব সবজি বিক্রি করে বেশ কিছু অর্থও তিনি পরিবারকে দিতে শুরু করেছেন। প্রথম অবস্থায় বাড়ি থেকে তাকে এসব ফসল আবাদের জন্য জমি দিতে না চাইলেও তার সফলতা দেখে এখন দেড় থেকে দুই বিঘা জমি তাকে ছেড়ে দিয়েছে।

এরই মধ্যে গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তার বাবা জয়হরি রায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের স্টোরেজ মোটিভেটর পদে চাকরি শেষে অবসরে আসেন। ছেলের সফলতা দেখে বাবাও ছেলের সঙ্গে শুরু করেন এসব চাষাবাদ।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র মিঠুন রায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, বাবা কষ্ট করে লেখাপড়া করার খরচ চালাচ্ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বাড়িতে এসে বসে না থেকে এসব কাজ শুরু করি। কীভাবে ভালো আবাদ করা যায়, তার জন্য ইউটিউবের বিভিন্ন সাইট ঘাটাঘাটি করেছি এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়েছি। এখন দেখছি, চাষাবাদ করেও ভালো ফল পাওয়া যায়।


মিঠুন রায় জানান, দেশের উৎপাদন বাড়াতে আমাদের শিক্ষিত কৃষক দরকার। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহার করেই আমি এসব ফসল উৎপাদনের ধারণা নিয়েছি এবং প্র্যাকটিক্যালি আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা।

বাবা জয়হরি রায় জানান, নিজের ৫-৬ বিঘা জমি আছে। কিন্তু এই জমি থেকে কখনই নিজের বাড়ির খাবার ছাড়া কোনো টাকা পাননি তিনি। আমার ছেলেই প্রমাণ করেছে, জমিতে ফসল আবাদ করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। এজন্য অবসরে যাওয়ার পর ছেলের সঙ্গে তিনি নিজেও জমিতে কাজ শুরু করেছেন।

চিরিরবন্দরের ওই এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খাদেমুল ইসলাম জানান, শিক্ষিত ব্যক্তি যে বোঝা নয়, মিঠুন রায় তার প্রমাণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে হবে কী, বাসায় এসে কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি সফলতা পেয়েছেন। তিনি একজন সফল কৃষক এবং তিনি তার নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে ইঁদুর নিধনেও সফল।

তিনি জানান, সব কৃষকই যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মতে মিঠুন রায়ের মতো ফসল আবাদ করে, তাহলে দেশে ফসল উৎপাদনও অনেক বৃদ্ধি পাবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন