ধর্ষকের সম্পত্তি না থাকলে ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রের
jugantor
ধর্ষকের সম্পত্তি না থাকলে ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রের

  রংপুর ব্যুরো  

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:৫৬:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

রংপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় ১৩ বছর ধরে বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালতের বিচারক এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। রায়ে বলা হয়, ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর পিতৃপরিচয় হবে ধর্ষকের। ওই সন্তানের ভরণপোষণ প্রদানসহ ধর্ষকের ওয়ারিশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

শুধু তাই নয়, রায়ে ধর্ষকের যদি কোনো সম্পত্তি না থাকে তাহলে ওই শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রকে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সোমবার দুপুরে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-২ এর বিচারক মো. রোকনুজ্জামান এ রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

ভুক্তভোগী, মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর গ্রামের দিনমজুর দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী রেখে অন্যত্র চলে যান। পরে তিনি অন্যত্র দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘরসংসার বাঁধেন। সেই থেকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ওই উপজেলার সাতদরগাহ হরিচরণ গ্রামে মায়ের বাড়িতে বসবাস করে আসছেন ওই দিনমজুরের স্ত্রী।

ওই দিনমজুরের বড় মেয়েকে (তৎকালীন ১৪ বছর বয়স) প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন প্রতিবেশী মৃত মজিবর রহমানের ছেলে পান ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম (তৎকালীন ২২ বছর বয়স)। ২০০৭ সালের ২৬ অক্টোবর বিকালে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন শফিকুল। পরে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়।

২০০৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ওই বাড়িতে গিয়ে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন শফিকুল ও তার স্বজনরা। পরবর্তীতে ধর্ষণের ঘটনা এবং সন্তানের স্বীকৃতি অস্বীকার করলে প্রায় চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পীরগাছা থানায় মামলা করতে গেলে থানা থেকে তাদের আদালতে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেয়া হয়।

পরে মেয়েটি নিজে বাদী হয়ে ২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে শফিকুলসহ তার বাবা মজিবর, চাচা মমতাজ উদ্দিন ও ফুফু নজিরনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলা চলাকালীন অবস্থায় আসামি মজিবর মারা যান। এরপর ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন ধর্ষণের শিকার ওই কিশোরী।

এদিকে শফিকুলও অন্যত্র বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। প্রথম স্ত্রীর সন্তানসহ পরিবারের কারও খোঁজ খবর নিতেন না। এ অবস্থায় দায়েরকৃত মামলায় আদালতের নির্দেশে ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর এবং ধর্ষকের ডিএনএ পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন আদালত। পরে চিকিৎসাবিজ্ঞান পরীক্ষায় ডিএনএ টেস্টে শিশুটির পিতৃপরিচয় হিসেবে শফিকুল ইসলামের পরিচয় পাওয়া যায়।

ডিএনএ টেস্ট ও দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ছয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সোমবার এ রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে অপর দুই আসামিকে খালাস দিয়েছেন বিচারক।

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছাড়াও এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং ধর্ষকের ওয়ারিশ হিসেবে সম্পত্তির অংশীদারিত্বের রায় দিয়েছেন বিচারক। যদি ধর্ষকের কোনো সম্পত্তি না থাকে তাহলে ওই শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রকে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ রায় সম্পর্কে রংপুর পেশাজীবী ফোরামের সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট শামীমা আকতার শিরিন এবং নারী উন্নয়ন নেত্রী শামসেআরা বিলকিস বলেন, আদালত এক যুগান্তকারী রায় দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ ধরনের রায় ধর্ষকদের কাছে আইনের সতর্ক বার্তা পৌঁছে দেবে, যা সমাজে নারীদের নিরাপত্তায় সাহসী উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে।

ধর্ষকের সম্পত্তি না থাকলে ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রের

 রংপুর ব্যুরো 
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৮:৫৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

রংপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় ১৩ বছর ধরে বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালতের বিচারক এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। রায়ে বলা হয়, ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর পিতৃপরিচয় হবে ধর্ষকের। ওই সন্তানের ভরণপোষণ প্রদানসহ ধর্ষকের ওয়ারিশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

শুধু তাই নয়, রায়ে ধর্ষকের যদি কোনো সম্পত্তি না থাকে তাহলে ওই শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রকে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সোমবার দুপুরে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-২ এর বিচারক মো. রোকনুজ্জামান এ রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

ভুক্তভোগী, মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর গ্রামের দিনমজুর দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী রেখে অন্যত্র চলে যান। পরে তিনি অন্যত্র দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘরসংসার বাঁধেন। সেই থেকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ওই উপজেলার সাতদরগাহ হরিচরণ গ্রামে মায়ের বাড়িতে বসবাস করে আসছেন ওই দিনমজুরের স্ত্রী।

ওই দিনমজুরের বড় মেয়েকে (তৎকালীন ১৪ বছর বয়স) প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন প্রতিবেশী মৃত মজিবর রহমানের ছেলে পান ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম (তৎকালীন ২২ বছর বয়স)। ২০০৭ সালের ২৬ অক্টোবর বিকালে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন শফিকুল। পরে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়।

২০০৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ওই বাড়িতে গিয়ে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন শফিকুল ও তার স্বজনরা। পরবর্তীতে ধর্ষণের ঘটনা এবং সন্তানের স্বীকৃতি অস্বীকার করলে প্রায় চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পীরগাছা থানায় মামলা করতে গেলে থানা থেকে তাদের আদালতে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেয়া হয়।

পরে মেয়েটি নিজে বাদী হয়ে ২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে শফিকুলসহ তার বাবা মজিবর, চাচা মমতাজ উদ্দিন ও ফুফু নজিরনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলা চলাকালীন অবস্থায় আসামি মজিবর মারা যান। এরপর ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন ধর্ষণের শিকার ওই কিশোরী।

এদিকে শফিকুলও অন্যত্র বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। প্রথম স্ত্রীর সন্তানসহ পরিবারের কারও খোঁজ খবর নিতেন না। এ অবস্থায় দায়েরকৃত মামলায় আদালতের নির্দেশে ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর এবং ধর্ষকের ডিএনএ পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন আদালত। পরে চিকিৎসাবিজ্ঞান পরীক্ষায় ডিএনএ টেস্টে শিশুটির পিতৃপরিচয় হিসেবে শফিকুল ইসলামের পরিচয় পাওয়া যায়।

ডিএনএ টেস্ট ও দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ছয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সোমবার এ রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে অপর দুই আসামিকে খালাস দিয়েছেন বিচারক।

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছাড়াও এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং ধর্ষকের ওয়ারিশ হিসেবে সম্পত্তির অংশীদারিত্বের রায় দিয়েছেন বিচারক। যদি ধর্ষকের কোনো সম্পত্তি না থাকে তাহলে ওই শিশুর ব্যয়ভার রাষ্ট্রকে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ রায় সম্পর্কে রংপুর পেশাজীবী ফোরামের সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট শামীমা আকতার শিরিন এবং নারী উন্নয়ন নেত্রী শামসেআরা বিলকিস বলেন, আদালত এক যুগান্তকারী রায় দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ ধরনের রায় ধর্ষকদের কাছে আইনের সতর্ক বার্তা পৌঁছে দেবে, যা সমাজে নারীদের নিরাপত্তায় সাহসী উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন