এনজিওর প্রতারণা, আদালত পক্ষে রায় দিলেও শাহানারা বেঁচে নেই!
jugantor
এনজিওর প্রতারণা, আদালত পক্ষে রায় দিলেও শাহানারা বেঁচে নেই!

  মাগুরা প্রতিনিধি  

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:২৮:৪৫  |  অনলাইন সংস্করণ

মেয়ের বিয়ের জন্য শাহানারার দরকার টাকা। তাই দ্বারস্থ হয়েছিলেন জাগরণী চক্র নামে একটি এনজিওর কাছে। কিন্তু ঋণ নিতে এনজিওকে দিতে হবে খালি চেক। আর এই চেকটি দিয়েই বিপদে পড়ে যান শাহানারা।

ঋণ তো পাননি, উপরন্তু এনজিও সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীর প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পেতে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় তাকেই।

রোববার মাগুরা জেলা জজ আদালতে দায়েরকৃত আত্মহত্যায় প্ররোচনার এ মামলাটির রায়ে প্রতারক চক্রের চারজনকে ঠিকই সাজা দিয়েছেন আদালত; কিন্তু শাহানারা আজ বেঁচে নেই।

বেঁচে থাকতে মেয়েটিকে তুলে দিতে পারেননি শ্বশুরবাড়িতে। শুধু তাই নয়, ওই প্রতারক গোষ্ঠী জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়িটিও দখল করে নেয়ায় তার স্বামী-সন্তানদের ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে পথে পথে।

আত্মহননের শিকার শাহানারা খাতুন (৪০) মাগুরা সদর উপজেলার কাশিনাথপুর গ্রামের আবদুস ছালামের স্ত্রী। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর রাত ১টার দিকে শাহানা খাতুন বসত ঘরের মধ্যে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনায় পরদিন তার বড়ভাই হাফিজুর রহমান মিন্টু মাগুরায় জাগরণী চক্র এনজিওর এক কর্মকর্তা এবং এনজিওটির আঞ্চলিক সমিতির লিডার মরজিনা বেগম মধু, তার বাবা মকছেদ শেখ, মা মিলিনা ও স্বামী খোকন শেখকে আসামি করে মাগুরা জেলা জজ আদালতে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটি দায়ের করেন।

দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছর মামলা চলার পর অবশেষে রোববার মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জিয়াউর রহমান জাগরণী চক্রের আঞ্চলিক সমিতির নেত্রী মরজিনা বেগম মধুকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি এই অপরাধকর্মে সহযোগিতা করার দায়ে মরজিনার বাবা মকছেদ শেখ, মা মিলিনা এবং স্বামী খোকন শেখকে ১ বছর করে কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূ শাহানারা খাতুন মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাড় করতে ঋণের জন্য মাগুরায় জাগরণী চক্র এনজিওর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা এনজিওটির আঞ্চলিক সমিতি প্রধান মরজিনা বেগম মধুর কাছে সাদা চেকে স্বাক্ষর করে ঋণের জন্য আবেদন করতে বলেন। সেই অনুযায়ী শাহানারা প্রাইম ব্যাংকে থাকা তার হিসাব নম্বরের একটি চেকের সাদা পাতায় স্বাক্ষর করে জমা দেন। কিন্তু প্রতারক মরজিনা বেগম তাকে ঋণের টাকা দেয়নি।

উপরন্তু ওই চেকের পাতায় চার লাখ ৫০ হাজার ও নিজের নাম লিখে নিজ অ্যাকাউন্টে জমা দেয়। কিন্তু শাহানারা খাতুনের অ্যাকাউন্টে ওই পরিমাণ টাকা না থাকায় চেকটি বারবার ডিজঅনার হয়। এ বিষয়টিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মরজিনা বেগম। সে তার স্বামী এবং বাবা-মাসহ স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে বারবার শাহানারাকে তার ১৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একতলা বাড়িটি লিখে দিতে চাপ প্রয়োগ করে।

এমনকি স্থানীয় মাতবরদের মাধ্যমেও তারা নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। এ অবস্থায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শাহানারা খাতুন শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেয়।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী শাখারুল ইসলাম শাকিল জানান, আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্যে মাগুরা সদর থানাকে নির্দেশ দিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলাম আসামিদের পক্ষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ ঘটনায় মামলাটির বাদী নিহত শাহানার ভাই হাফিজুর রহমান মিন্টু আদালতে নারাজি দিলে বিষয়টি তদন্তের জন্য নতুন করে দায়িত্ব দেয়া হয় পিবিআইকে।

তিনি জানান, পিবিআই বিষয়টির সত্যতা খুঁজে পায় এবং ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে মামলার যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণাদি শেষে রোববার বিচারক চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিয়েছেন।

মামলার বাদী হাফিজুর রহমান মিন্টু বলেন, আদালতের রায়ে আমরা খুশি। কিন্তু আমার বোনকে হারিয়েছি। বোনের তিনটি সন্তান মা হারা হয়েছে। প্রতারক চক্রটি এতটাই শক্তিশালী, আমার বোনের মৃত্যুর পর তারা জোরপূর্বক তার বাড়িটি দখল করে নিয়েছে। প্রতারক চক্রের কবল থেকে বাড়িটি উদ্ধার হলে নিহত বোনের সন্তানেরা সেখানে বসবাস করার সুযোগ পেতে পারে। এ অবস্থায় আদালত এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করছি।

এনজিওর প্রতারণা, আদালত পক্ষে রায় দিলেও শাহানারা বেঁচে নেই!

 মাগুরা প্রতিনিধি 
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৭:২৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মেয়ের বিয়ের জন্য শাহানারার দরকার টাকা। তাই দ্বারস্থ হয়েছিলেন জাগরণী চক্র নামে একটি এনজিওর কাছে। কিন্তু ঋণ নিতে এনজিওকে দিতে হবে খালি চেক। আর এই চেকটি দিয়েই বিপদে পড়ে যান শাহানারা।

ঋণ তো পাননি, উপরন্তু এনজিও সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীর প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পেতে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় তাকেই।

রোববার মাগুরা জেলা জজ আদালতে দায়েরকৃত আত্মহত্যায় প্ররোচনার এ মামলাটির রায়ে প্রতারক চক্রের চারজনকে ঠিকই সাজা দিয়েছেন আদালত; কিন্তু শাহানারা আজ  বেঁচে নেই।

বেঁচে থাকতে মেয়েটিকে তুলে দিতে পারেননি শ্বশুরবাড়িতে। শুধু তাই নয়, ওই প্রতারক গোষ্ঠী জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়িটিও দখল করে নেয়ায় তার স্বামী-সন্তানদের ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে পথে পথে।

আত্মহননের শিকার শাহানারা খাতুন (৪০) মাগুরা সদর উপজেলার কাশিনাথপুর গ্রামের আবদুস ছালামের স্ত্রী। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর রাত ১টার দিকে শাহানা খাতুন বসত ঘরের মধ্যে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনায় পরদিন তার বড়ভাই হাফিজুর রহমান মিন্টু মাগুরায় জাগরণী চক্র এনজিওর এক কর্মকর্তা এবং এনজিওটির আঞ্চলিক সমিতির লিডার মরজিনা বেগম মধু, তার বাবা মকছেদ শেখ, মা মিলিনা ও স্বামী খোকন শেখকে আসামি করে মাগুরা জেলা জজ আদালতে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটি দায়ের করেন।

দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছর মামলা চলার পর অবশেষে রোববার মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জিয়াউর রহমান জাগরণী চক্রের আঞ্চলিক সমিতির নেত্রী মরজিনা বেগম মধুকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি এই অপরাধকর্মে সহযোগিতা করার দায়ে মরজিনার বাবা মকছেদ শেখ, মা মিলিনা এবং স্বামী খোকন শেখকে ১ বছর করে কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূ শাহানারা খাতুন মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাড় করতে ঋণের জন্য মাগুরায় জাগরণী চক্র এনজিওর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা এনজিওটির আঞ্চলিক সমিতি প্রধান মরজিনা বেগম মধুর কাছে সাদা চেকে স্বাক্ষর করে ঋণের জন্য আবেদন করতে বলেন। সেই অনুযায়ী শাহানারা প্রাইম ব্যাংকে থাকা তার হিসাব নম্বরের একটি চেকের সাদা পাতায় স্বাক্ষর করে জমা দেন। কিন্তু প্রতারক মরজিনা বেগম তাকে ঋণের টাকা দেয়নি।

উপরন্তু ওই চেকের পাতায় চার লাখ ৫০ হাজার ও নিজের নাম লিখে নিজ অ্যাকাউন্টে জমা দেয়। কিন্তু শাহানারা খাতুনের অ্যাকাউন্টে ওই পরিমাণ টাকা না থাকায় চেকটি বারবার ডিজঅনার হয়। এ বিষয়টিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মরজিনা বেগম। সে তার স্বামী এবং বাবা-মাসহ স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে বারবার শাহানারাকে তার ১৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একতলা বাড়িটি লিখে দিতে চাপ প্রয়োগ করে।

এমনকি স্থানীয় মাতবরদের মাধ্যমেও তারা নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। এ অবস্থায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শাহানারা খাতুন শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেয়।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী শাখারুল ইসলাম শাকিল জানান, আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্যে মাগুরা সদর থানাকে নির্দেশ দিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা এসআই  রফিকুল ইসলাম আসামিদের পক্ষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ ঘটনায় মামলাটির বাদী নিহত শাহানার ভাই হাফিজুর রহমান মিন্টু আদালতে নারাজি দিলে বিষয়টি তদন্তের জন্য নতুন করে দায়িত্ব দেয়া হয় পিবিআইকে।

তিনি জানান, পিবিআই বিষয়টির সত্যতা খুঁজে পায় এবং ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে মামলার যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণাদি শেষে রোববার বিচারক চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিয়েছেন।

মামলার বাদী হাফিজুর রহমান মিন্টু বলেন, আদালতের রায়ে আমরা খুশি। কিন্তু আমার বোনকে হারিয়েছি। বোনের তিনটি সন্তান মা হারা হয়েছে। প্রতারক চক্রটি এতটাই শক্তিশালী, আমার বোনের মৃত্যুর পর তারা জোরপূর্বক তার বাড়িটি দখল করে নিয়েছে। প্রতারক চক্রের কবল থেকে বাড়িটি উদ্ধার হলে নিহত বোনের সন্তানেরা সেখানে বসবাস করার সুযোগ পেতে পারে। এ অবস্থায় আদালত এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করছি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন