নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও অধিকার নেই তাদের
jugantor
নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও অধিকার নেই তাদের

  সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি  

০৮ মার্চ ২০২১, ১৪:৪০:২৮  |  অনলাইন সংস্করণ

নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও অধিকার নেই তাদের

আর্ন্তজাতিক নারী দিবস আজ সোমবার। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন পাহাড়ি নারীরা। গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, উদ্যোক্তা ও কর্মক্ষেত্রে সফল পাহাড়ের নারীরা। অর্থনীতিতে সমান অবদান থাকলেও পাহাড়ের নারীরা সম্পত্তির মালিকানা পান না।

নিজের অর্জিত সম্পত্তির মালিকানা পান না নারীরা। মূলত প্রথাগত আইনে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় নারী সব ধরনের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

জানা যায়, দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া জনপথ হওয়ায় পাহাড়ে নারীদের নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়। ভূপ্রাকৃতিক গঠনের কারণে পাহাড়ের নারীদের কঠোর জীবন সংগ্রাম করতে হয়। গৃহস্থালি কাজ, জুমচাষ, উৎপাদিত ফসল বিকিকিনি, ক্ষুদ্র ব্যবসা নানা কাজে সম্পৃক্ত হন একজন পাহাড়ি নারীরা।

কর্মজীবী নারীরা তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া অনেক নারী নিজে ব্যবসা করেও সফল হয়েছেন। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা মা-বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পান না। বৈষম্য ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন তারা। এমনকি নিজের অর্জিত সম্পত্তির ওপর নারীদের অধিকার নেই।

খাগড়াছড়ির নারী অধিকার কর্মী ও উদ্যোক্তা শাপলা ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ের নারী অনেক পরিশ্রমী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারীরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। পুরুষের পাশাপাশি তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সমান অবদান রেখে যাচ্ছেন।

অর্থনীতিতে অবদান থাকলেও নারীরা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। কারণ বংশপরম্পরায় আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, যেখানে বাবার সম্পত্তি সব সন্তান সমানভাবে পাবে। ফলে বাবার সম্পত্তি ছেলেরা বংশপরম্পরায় ভোগ করে আসছেন; কিন্তু মেয়েরা সেই সুযোগ পাচ্ছেন না।

এ ছাড়া সংসারে স্বামী স্ত্রী দুজন আয় করে সম্পত্তি অর্জন করে পারিবারিক সচ্ছলতা অর্জন করলেও একসময় কোনো কারণে যদি আলাদা হতে হয় বা স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় সে ক্ষেত্রে নারীরা নিজের অর্জিত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন।

এমনকি বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর অর্জিত সম্পত্তির ওপর নারীর কোনো অধিকার থাকে না।

বীনা ত্রিপুরা নামে বিবাহবিচ্ছেদের শিকার হওয়া এক নারীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচ্ছেদের পর বীনা কোনো সহায়তা পাননি। কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি। আমি সে কারণে সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রথাগত নেতাদের কাছে অনুরোধ করব, যাতে ছেলেমেয়েরা সমানভাবে সম্পত্তির অধিকার পান। কারণ নারীদের পিছিয়ে রেখে সমাজ এগোতে পারবে না।

কর্মজীবী নারী স্কুলশিক্ষিকা প্রতিভা ত্রিপুরা জানান, এখানে নারীরা অনেক পরিশ্রমী। কর্মজীবী নারীরা সম্পত্তির অর্জন করলেও সেটির মালিকানা তারা পান না। কেবল ছেলেদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়।

এ ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হয়। ছেলেমেয়েদের মধ্যে যাতে সমানভাবে সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সেভাবে আইন প্রণয়ন করা উচিত।

এ ছাড়া নারীরা কেবল প্রথাগত সংস্কারের ওপর নির্ভর করে নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রচলিত আইনে রেজিস্ট্রি না হওয়ায় বিবাহবিচ্ছেদ হলে নারীরা ন্যায়বিচার পান না। প্রথাগত সামাজিক রীতিনীতি বিবাহের পাশাপাশি প্রচলিত আইনে নিবন্ধন করে বিবাহ সম্পন্ন হলে কোনো কারণে বিচ্ছেদ হলে নারীরা আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী শেফালিক ত্রিপুরা বলেন, উত্তাধিকার সূত্রে নারীরা কোনো সম্পত্তির মালিকানা পান না। তারা নিজের পরিবারে বঞ্চিত, স্বামীর পরিবারেও বঞ্চিত। নারীরা সম্পত্তির সমান দূরে থাক আংশিকও পান না। সম্পত্তির ওপর নারী অধিকার নিশ্চিত করতে প্রথাগত আইন সংস্কার করে নারী নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

খাগড়াছড়ি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, উত্তরাধিকার বা নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও পাহাড়ি নারীদের অধিকার নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পাহাড়ি সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্যের নিরসন এখন সময়ের দাবি।

নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও অধিকার নেই তাদের

 সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি 
০৮ মার্চ ২০২১, ০২:৪০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও অধিকার নেই তাদের
ছবি: যুগান্তর

আর্ন্তজাতিক নারী দিবস আজ সোমবার। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন পাহাড়ি নারীরা। গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, উদ্যোক্তা ও কর্মক্ষেত্রে সফল পাহাড়ের নারীরা। অর্থনীতিতে সমান অবদান থাকলেও পাহাড়ের নারীরা সম্পত্তির মালিকানা পান না।

নিজের অর্জিত সম্পত্তির মালিকানা পান না নারীরা। মূলত প্রথাগত আইনে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় নারী সব ধরনের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

জানা যায়, দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া জনপথ হওয়ায় পাহাড়ে নারীদের নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়। ভূপ্রাকৃতিক গঠনের কারণে পাহাড়ের নারীদের কঠোর জীবন সংগ্রাম করতে হয়। গৃহস্থালি কাজ, জুমচাষ, উৎপাদিত ফসল বিকিকিনি, ক্ষুদ্র ব্যবসা নানা কাজে সম্পৃক্ত হন একজন পাহাড়ি নারীরা।

কর্মজীবী নারীরা তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া অনেক নারী নিজে ব্যবসা করেও সফল হয়েছেন। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা মা-বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পান না। বৈষম্য ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন তারা। এমনকি নিজের অর্জিত সম্পত্তির ওপর নারীদের অধিকার নেই।

খাগড়াছড়ির নারী অধিকার কর্মী ও উদ্যোক্তা শাপলা ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ের নারী অনেক পরিশ্রমী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারীরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। পুরুষের পাশাপাশি তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সমান অবদান রেখে যাচ্ছেন।

অর্থনীতিতে অবদান থাকলেও নারীরা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। কারণ বংশপরম্পরায় আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, যেখানে বাবার সম্পত্তি সব সন্তান সমানভাবে পাবে। ফলে বাবার সম্পত্তি ছেলেরা বংশপরম্পরায় ভোগ করে আসছেন; কিন্তু মেয়েরা সেই সুযোগ পাচ্ছেন না।

এ ছাড়া সংসারে স্বামী স্ত্রী দুজন আয় করে সম্পত্তি অর্জন করে পারিবারিক সচ্ছলতা অর্জন করলেও একসময় কোনো কারণে যদি আলাদা হতে হয় বা স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় সে ক্ষেত্রে নারীরা নিজের অর্জিত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন।

এমনকি বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর অর্জিত সম্পত্তির ওপর নারীর কোনো অধিকার থাকে না।

বীনা ত্রিপুরা নামে বিবাহবিচ্ছেদের শিকার হওয়া এক নারীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচ্ছেদের পর বীনা কোনো সহায়তা পাননি। কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি। আমি সে কারণে সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রথাগত নেতাদের কাছে অনুরোধ করব, যাতে ছেলেমেয়েরা সমানভাবে সম্পত্তির অধিকার পান। কারণ নারীদের পিছিয়ে রেখে সমাজ এগোতে পারবে না।

কর্মজীবী নারী স্কুলশিক্ষিকা প্রতিভা ত্রিপুরা জানান, এখানে নারীরা অনেক পরিশ্রমী। কর্মজীবী নারীরা সম্পত্তির অর্জন করলেও সেটির মালিকানা তারা পান না। কেবল ছেলেদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়।

এ ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হয়। ছেলেমেয়েদের মধ্যে যাতে সমানভাবে সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সেভাবে আইন প্রণয়ন করা উচিত।

এ ছাড়া নারীরা কেবল প্রথাগত সংস্কারের ওপর নির্ভর করে নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রচলিত আইনে রেজিস্ট্রি না হওয়ায় বিবাহবিচ্ছেদ হলে নারীরা ন্যায়বিচার পান না। প্রথাগত সামাজিক রীতিনীতি বিবাহের পাশাপাশি প্রচলিত আইনে নিবন্ধন করে বিবাহ সম্পন্ন হলে কোনো কারণে বিচ্ছেদ হলে নারীরা আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী শেফালিক ত্রিপুরা বলেন, উত্তাধিকার সূত্রে নারীরা কোনো সম্পত্তির মালিকানা পান না। তারা নিজের পরিবারে বঞ্চিত, স্বামীর পরিবারেও বঞ্চিত। নারীরা সম্পত্তির সমান দূরে থাক আংশিকও পান না। সম্পত্তির ওপর নারী অধিকার নিশ্চিত করতে প্রথাগত আইন সংস্কার করে নারী নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

খাগড়াছড়ি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, উত্তরাধিকার বা নিজের অর্জিত সম্পত্তিতেও পাহাড়ি নারীদের অধিকার নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পাহাড়ি সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্যের নিরসন এখন সময়ের দাবি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন