সিনেমায় অভিনয় করা সেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথের দিন কাটছে কষ্টে
jugantor
সিনেমায় অভিনয় করা সেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথের দিন কাটছে কষ্টে

  আসাদুল ইসলাম বাবুল, ভুঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি  

১৫ মার্চ ২০২১, ১৩:৫৬:৫৩  |  অনলাইন সংস্করণ

সিনেমায় অভিনয় করা সেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথের দিন কাটছে কষ্টে

জন্ম থেকে দুই হাত নেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথ শীলের। তবু অন্যের কাছে কখনও সাহায্য চাননি। শিশুদের পড়িয়ে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় তার রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কয়েড়া গ্রামের বৃদ্ধ জগন্নাথ শীল (৭০)।

জানা যায়, জন্ম থেকেই তার দুই হাত নেই। অভাব-অনটনের মধ্যে ১৯৬৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি; কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে বাবা ৬৫ টাকা ফি দিতে পারেননি। পরে ঢাকা গিয়ে ‘মলুয়া’ ছবিতে অভিনয় করেন। অভিনয়ের টাকা পেয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। কিন্তু কারও কাছে হাত পাতেননি।

সোমবার সরেজমিন জগন্নাথ শীলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট্ট একটি ভাঙা টিনের ঘরে স্ত্রী মিলন রানীকে নিয়ে থাকেন তিনি। পাশের আরেকটি টিনের ঘরে ছেলে থাকেন। কিন্তু ঘরের দরজা-জানালা নেই। এক ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছেন। এক ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে জগন্নাথের সংসার।

হাটবাজার থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজ বিশেষ কৌশলে করেন তিনি। পা দিয়েই লেখাপড়াসহ অধিকাংশ কাজ করেন। সহানুভূতি আর সরকারের সার্বিক সহায়তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান তিনি।

জানা গেছে, ম্যাট্রিক পাস করা জগন্নাথের কপালে জুটেনি চাকরি। তবু হাল ছাড়েননি। স্থানীয় ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু করোনার কারণে সেটিও হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে তিনি বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

এর মধ্যে জগন্নাথের পৈতৃক সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। উপজেলার কয়েড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও ছোলায়মান নামের দুই ব্যক্তি জোরপূর্বক তার পৈতৃক ৭২ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন। এ জন্য তিনি আদালতের দারস্থ হলে পরবর্তী সময় আদালত তার নামে জমির ডিক্রি জারি করেন। পরে আদালত জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পর দখলদাররা পুনরায় ডিক্রি জারি বাতিলের জন্য মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ খুবই কষ্টে দিন পার করছেন। কিন্তু কারোর কাছে হাত পাতেননি। তার দুই ছেলের একজন বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। ছোট ছেলেটাও বেকার করোনার কারণে। এতে চরম কষ্টে আছেন পরিবার নিয়ে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ শীল বলেন, ১৯৬৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করি। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে বাবা ৬৫ টাকা ফি দিতে পারেননি। সেই সময় ঢাকা গিয়ে ‘মলুয়া’ ছবিতে অভিনয় করি। অভিনয় করে যে টাকা পেয়েছিলাম, সেই টাকা দিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। কিন্তু কারও কাছে হাত পাতিনি। এর পর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছি। তাদের বিভিন্ন খবর দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপজেলার নিকরাইল বাজারে বই বিক্রির ব্যবসা শুরু করি। তখন টেক্সবুক বোর্ডের লাইসেন্স পেয়েছিলাম। ভালোই চলছিল ব্যবসা। পরে জিয়া সরকার ক্ষমতায় এসে লাইসেন্স বাতিল করে। এতে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সারা দেশে সরকার বই বিতরণ শুরু করে। ২০ বছর ব্যবসার পর বই বিক্রি ছেড়ে দিই।
এ ছাড়া বাপ-দাদার জমিও অন্যরা জবরদখল করে আছে। পৈতৃক ভিটা রক্ষার জন্য আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান বলেন, জগন্নাথ শীলকে সব ধরনের সরকারি সহায়তা করা হয়। তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। বিভিন্ন সময় তাকে সহায়তা করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত জাহান বলেন, ওই প্রতিবন্ধীর যে সম্পত্তি বেদখল রয়েছে, সেটির জন্য তিনি অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া তার বাড়ি সরেজমিন পরিদর্শন করে তার থাকার ঘর বরাদ্দের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আতাউল গনি বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী অসহায় জগন্নাথ শীলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘর করে দেওয়ার পাশাপাশি সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

সিনেমায় অভিনয় করা সেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথের দিন কাটছে কষ্টে

 আসাদুল ইসলাম বাবুল, ভুঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি 
১৫ মার্চ ২০২১, ০১:৫৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সিনেমায় অভিনয় করা সেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথের দিন কাটছে কষ্টে
ছবি: যুগান্তর

জন্ম থেকে দুই হাত নেই প্রতিবন্ধী জগন্নাথ শীলের। তবু অন্যের কাছে কখনও সাহায্য চাননি। শিশুদের পড়িয়ে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় তার রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কয়েড়া গ্রামের বৃদ্ধ জগন্নাথ শীল (৭০)।

জানা যায়, জন্ম থেকেই তার দুই হাত নেই। অভাব-অনটনের মধ্যে ১৯৬৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি; কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে বাবা ৬৫ টাকা ফি দিতে পারেননি। পরে ঢাকা গিয়ে ‘মলুয়া’ ছবিতে অভিনয় করেন। অভিনয়ের টাকা পেয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। কিন্তু কারও কাছে হাত পাতেননি।

সোমবার সরেজমিন জগন্নাথ শীলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট্ট একটি ভাঙা টিনের ঘরে স্ত্রী মিলন রানীকে নিয়ে থাকেন তিনি। পাশের আরেকটি টিনের ঘরে ছেলে থাকেন। কিন্তু ঘরের দরজা-জানালা নেই। এক ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছেন। এক ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে জগন্নাথের সংসার।

হাটবাজার থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজ বিশেষ কৌশলে করেন তিনি। পা দিয়েই লেখাপড়াসহ অধিকাংশ কাজ করেন। সহানুভূতি আর সরকারের সার্বিক সহায়তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান তিনি।

জানা গেছে, ম্যাট্রিক পাস করা জগন্নাথের কপালে জুটেনি চাকরি। তবু হাল ছাড়েননি। স্থানীয় ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু করোনার কারণে সেটিও হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে তিনি বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

এর মধ্যে জগন্নাথের পৈতৃক সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। উপজেলার কয়েড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও ছোলায়মান নামের দুই ব্যক্তি জোরপূর্বক তার পৈতৃক ৭২ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন। এ জন্য তিনি আদালতের দারস্থ হলে পরবর্তী সময় আদালত তার নামে জমির ডিক্রি জারি করেন। পরে আদালত জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পর দখলদাররা পুনরায় ডিক্রি জারি বাতিলের জন্য মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ খুবই কষ্টে দিন পার করছেন। কিন্তু কারোর কাছে হাত পাতেননি। তার দুই ছেলের একজন বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। ছোট ছেলেটাও বেকার করোনার কারণে। এতে চরম কষ্টে আছেন পরিবার নিয়ে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ শীল বলেন, ১৯৬৯ সালে  ম্যাট্রিক পাস করি। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে বাবা ৬৫ টাকা ফি দিতে পারেননি। সেই সময় ঢাকা গিয়ে ‘মলুয়া’ ছবিতে অভিনয় করি। অভিনয় করে যে টাকা পেয়েছিলাম, সেই টাকা দিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। কিন্তু কারও কাছে হাত পাতিনি। এর পর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছি। তাদের বিভিন্ন খবর দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপজেলার নিকরাইল বাজারে বই বিক্রির ব্যবসা শুরু করি। তখন টেক্সবুক বোর্ডের লাইসেন্স পেয়েছিলাম। ভালোই চলছিল ব্যবসা। পরে জিয়া সরকার ক্ষমতায় এসে লাইসেন্স বাতিল করে। এতে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সারা দেশে সরকার বই বিতরণ শুরু করে। ২০ বছর ব্যবসার পর বই বিক্রি ছেড়ে দিই।
এ ছাড়া বাপ-দাদার জমিও অন্যরা জবরদখল করে আছে। পৈতৃক ভিটা রক্ষার জন্য আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান বলেন, জগন্নাথ শীলকে সব ধরনের সরকারি সহায়তা করা হয়। তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। বিভিন্ন সময় তাকে সহায়তা করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত জাহান বলেন, ওই প্রতিবন্ধীর যে সম্পত্তি বেদখল রয়েছে, সেটির জন্য তিনি অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া তার বাড়ি সরেজমিন পরিদর্শন করে তার থাকার ঘর বরাদ্দের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আতাউল গনি বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী অসহায় জগন্নাথ শীলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘর করে দেওয়ার পাশাপাশি সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর
 
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন