হাঁটতে না পারা সেউতির সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন
jugantor
হাঁটতে না পারা সেউতির সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন

  সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা  

১৯ মার্চ ২০২১, ১৮:৪৯:৫২  |  অনলাইন সংস্করণ

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে নিজের স্বপ্নপূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ছোট বয়সে যখন দেখতেন তারই বয়সের ছেলেমেয়েরা কেমন হেসে খেলে বেড়াচ্ছে ও লেখাপড়া করছে, অথচ তিনি নিজে হাঁটতে পারতেন না। মনের এই কষ্টকে কষ্ট না ভেবে শক্তি মনে করে তিনি তার স্বপ্নের পথ ধরেছেন।

আর এই স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তিনি অর্জন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি। ইতিহাস বিষয়ে এমএতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী সাতক্ষীরার শাহিমা সুলতানা সেউতি প্রমাণ করেছেন ধৈর্য ও সাহসিকতাই একটি বড় শক্তি।

শাহিমা সুলতানা সেউতি এখন মাস্টার্স পাস করে তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নের ঘোনা গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে বসে রয়েছেন। নিজের শক্তিতে তার চলাফেরার ক্ষমতা নেই। হুইলচেয়ারে করে চলতে পারেন।

তার দুই পা পুরোপুরি শক্তিহীন এবং কোমরে কোনো ধরনের শক্তি নেই। যে কারণে তিনি নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে হাঁটতে কোনটিই পারেন না।

শাহিমা সুলতানা সেউতি বলেছেন, মানুষের স্বপ্ন থাকে। আমারও স্বপ্ন আছে। আমি সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এতদূর অগ্রসর হয়েছি। এখন একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে আমার স্বপ্ন পূরণ হবে। আমাকে যাতে প্রতিবন্ধী হিসেবে সমাজে অবহেলিত হয়ে না থাকতে হয় সেটাই আমার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণে সরকার একটু সহায়তা করলে আমার জীবন চলৎশক্তি ফিরে পাবে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। এখন দরকার একটি চাকরি। তার আগে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ।

সেউতির বাবা মো. আব্দুর রকিব বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসার চেষ্টা করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি। বিদেশে নিতে হলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। সে টাকা না থাকায় মেয়েটির চিকিৎসা করাতে পারিনি।

তিনি বলেন, সেউতি ২০০৯ সালে এসএসসি, ২০১১ সালে এইচএসসি এবং ২০১৬ সালে অনার্স পাস করার পর এমএ করেছেন ২০১৮ সালে। ঘোনা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রথম শিক্ষা নিয়েছেন। এরপর ঘোনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সীমান্ত আদর্শ কলেজ এবং সর্বশেষ সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে তার লেখাপড়া শেষ করেছেন।

সেউতির মা জাহানারা খাতুন বলেন, আমরা চিরদিন বেঁচে থাকবো না। ওকে দেখার জন্য একজন লোক দরকার। আমরা অসহায় পরিবার। আমার মেয়ে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সেজন্য তার একটি চাকরি দরকার।

প্রতিবেশীরা বলেন, আমরা মেয়েটিকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করতে দেখেছি। তার বাবা ও ভাই তাকে রোজই ঠেলাগাড়ি অথবা হুইলচেয়ারে করে স্কুল-কলেজে নিয়ে যেতেন। কলেজের চারতলায় পরীক্ষার হলে সেউতির বাবা আব্দুর রকিব তাকে ঘাড়ে করে নিয়ে উঠতেন।

সেউতির ছোটভাই হৃদয়সহ বাবা ও মা তার দেখাশোনা করেন। হৃদয় তার বোনের শারীরিক পরিচর্যা করে দেন।

সেউতি তার গ্রামের ছেলেমেয়েদের টিউশন করাতেন। কিন্তু করোনাকালে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছেলেমেয়েরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন টিউশন বন্ধ। গ্রামবাসীও সেউতির প্রতি সহানুভূতিশীল। তারাও চান মেয়েটির একটি চাকরি হোক। এমনকি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও চান সেউতি প্রতিবন্ধী হিসেবে যেন অবহেলিত হয়ে না থাকে।

ঘোনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান বলেন, সেউতি মেয়েটি খুব প্রতিভাবান ও প্রতিবাদী মেয়ে। তার শারীরিক অক্ষমতার কারণে তার চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক তাকে একটি ঘর দিয়েছেন। এখন তার দরকার একটি চাকরি। আমরা সবাই সেই চেষ্টা করছি।

শাহিমা সুলতানা সেউতি আরও বলেন, আমি নিজে আমার পৈতৃক পরিবারের গলগ্রহ হয়ে আছি। একটি কর্মসংস্থান হলে আমি তাদের কষ্ট লাঘব করতে পারতাম।

হাঁটতে না পারা সেউতির সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন

 সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা 
১৯ মার্চ ২০২১, ০৬:৪৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে নিজের স্বপ্নপূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ছোট বয়সে যখন দেখতেন তারই বয়সের ছেলেমেয়েরা কেমন হেসে খেলে বেড়াচ্ছে ও লেখাপড়া করছে, অথচ তিনি নিজে হাঁটতে পারতেন না। মনের এই কষ্টকে কষ্ট না ভেবে শক্তি মনে করে তিনি তার স্বপ্নের পথ ধরেছেন।

আর এই স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তিনি অর্জন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি। ইতিহাস বিষয়ে এমএতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী সাতক্ষীরার শাহিমা সুলতানা সেউতি প্রমাণ করেছেন ধৈর্য ও সাহসিকতাই একটি বড় শক্তি।

শাহিমা সুলতানা সেউতি এখন মাস্টার্স পাস করে তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নের ঘোনা গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে বসে রয়েছেন। নিজের শক্তিতে তার চলাফেরার ক্ষমতা নেই। হুইলচেয়ারে করে চলতে পারেন।

তার দুই পা পুরোপুরি শক্তিহীন এবং কোমরে কোনো ধরনের শক্তি নেই। যে কারণে তিনি নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে হাঁটতে কোনটিই পারেন না।

শাহিমা সুলতানা সেউতি বলেছেন, মানুষের স্বপ্ন থাকে। আমারও স্বপ্ন আছে। আমি সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এতদূর অগ্রসর হয়েছি। এখন একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে আমার স্বপ্ন পূরণ হবে। আমাকে যাতে প্রতিবন্ধী হিসেবে সমাজে অবহেলিত হয়ে না থাকতে হয় সেটাই আমার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণে সরকার একটু সহায়তা করলে আমার জীবন চলৎশক্তি ফিরে পাবে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। এখন দরকার একটি চাকরি। তার আগে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ।

সেউতির বাবা মো. আব্দুর রকিব বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসার চেষ্টা করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি। বিদেশে নিতে হলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। সে টাকা না থাকায় মেয়েটির চিকিৎসা করাতে পারিনি।

তিনি বলেন, সেউতি ২০০৯ সালে এসএসসি, ২০১১ সালে এইচএসসি এবং ২০১৬ সালে অনার্স পাস করার পর এমএ করেছেন ২০১৮ সালে। ঘোনা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রথম শিক্ষা নিয়েছেন। এরপর ঘোনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সীমান্ত আদর্শ কলেজ এবং সর্বশেষ সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে তার লেখাপড়া শেষ করেছেন।

সেউতির মা জাহানারা খাতুন বলেন, আমরা চিরদিন বেঁচে থাকবো না। ওকে দেখার জন্য একজন লোক দরকার। আমরা অসহায় পরিবার। আমার মেয়ে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সেজন্য তার একটি চাকরি দরকার।

প্রতিবেশীরা বলেন, আমরা মেয়েটিকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করতে দেখেছি। তার বাবা ও ভাই তাকে রোজই ঠেলাগাড়ি অথবা হুইলচেয়ারে করে স্কুল-কলেজে নিয়ে যেতেন। কলেজের চারতলায় পরীক্ষার হলে সেউতির বাবা আব্দুর রকিব তাকে ঘাড়ে করে নিয়ে উঠতেন।

সেউতির ছোটভাই হৃদয়সহ বাবা ও মা তার দেখাশোনা করেন। হৃদয় তার বোনের শারীরিক পরিচর্যা করে দেন।

সেউতি তার গ্রামের ছেলেমেয়েদের টিউশন করাতেন। কিন্তু করোনাকালে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছেলেমেয়েরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন টিউশন বন্ধ। গ্রামবাসীও সেউতির প্রতি সহানুভূতিশীল। তারাও চান মেয়েটির একটি চাকরি হোক। এমনকি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও চান সেউতি প্রতিবন্ধী হিসেবে যেন অবহেলিত হয়ে না থাকে।

ঘোনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান বলেন, সেউতি মেয়েটি খুব প্রতিভাবান ও প্রতিবাদী মেয়ে। তার শারীরিক অক্ষমতার কারণে তার চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক তাকে একটি ঘর দিয়েছেন। এখন তার দরকার একটি চাকরি। আমরা সবাই সেই চেষ্টা করছি।

শাহিমা সুলতানা সেউতি আরও বলেন, আমি নিজে আমার পৈতৃক পরিবারের গলগ্রহ হয়ে আছি। একটি কর্মসংস্থান হলে আমি তাদের কষ্ট লাঘব করতে পারতাম।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন