রংপুর মেডিকেলে ২০ দিন ডায়ালাইসিস বন্ধ, ১৯ জনের মৃত্যু
jugantor
রংপুর মেডিকেলে ২০ দিন ডায়ালাইসিস বন্ধ, ১৯ জনের মৃত্যু

  মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো  

২৮ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৫:০১  |  অনলাইন সংস্করণ

দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট নষ্ট হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস বিভাগটি ২০ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে কিডনি জটিলতার রোগে আক্রান্ত শত শত রোগীরা ডায়ালাইসিস করতে পারছেন না।

এ পরিস্থিতিরমুখে কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গত ২০ দিনে ১৯ জন কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস করতে না পেরে বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ দিনে ডায়ালাইসিস না করতে পারায় ১৯ জন রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। শুধুমাত্র ডায়ালাইসিস মেশিন নষ্ট হওয়ায় এসব রোগী বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।

দায়িত্বরত নার্স, আয়া আর টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডায়ালাইসিসের পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট এবং বেশ কয়েকটি ডায়ালাইসিস মেশিন বিকল হওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ছয় লাখ টাকা খরচ করলে দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট বসানো সম্ভব। কিন্তু সেটাই কেনা হচ্ছে না। অথচ ডায়ালাইসিস বিভাগ থেকে প্রতি মাসে আয় হয় তিন লাখ টাকারও বেশি।

বুধবার দুপুরে সরেজমিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেফ্রোলজি (কিডনি) বিভাগের ডায়ালাইসিস বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, সব বেড রোগীশূন্য। চার-পাঁচ জন দায়িত্বরত নার্স, আয়া ও টেকনিশিয়ান অলস সময় পার করছেন। অন্য সময় ৪০ থেকে ৫০ জন কিডনি রোগী ও তাদের স্বজনদের উপস্থিতি থাকতো। এখন সেখানে সুনসান নীরবতা।

কর্তব্যরত ডায়ালাইসিস ইউনিটের টেকনিশিয়ান মাসুদ জানান, চলতি মাসের ৮ এপ্রিল থেকে ডায়ালাইসিস ইউনিটটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, ডায়ালাইসিসের প্রধান উপাদান পিউরিফাইড পানি, যা মেশিনের সাহায্যে পরিশোধন করা হয়। সেই মেশিন দুটি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে। এর আগেও কয়েকবার মেশিন দুটি বিকল হয়েছিল, পরে কোনো রকমে মেরামত করা হয়। এবার ঢাকা থেকে আসা টেকনিশিয়ানরা জানিয়ে দিয়েছেন, এই মেশিন আর সচল করা সম্ভব নয়। নতুন মেশিন স্থাপন করতে হবে।

তিনি আরও জানান, একজন কিডনি রোগীকে চার ঘণ্টাব্যাপী ডায়ালাইসিস করতে হয়। এজন্য একেক রোগীর জন্য ১৮০ লিটার পিউরিফাইড পানির প্রয়োজন হয়। এটা ছাড়া ডায়ালাইসিস করা যাবে না। সেই মেশিন যদি নষ্ট থাকে তাহলে কোনোভাবেই ডায়ালাইসিস করা যাবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্তব্যরত একজন নার্স জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করতে ছয় মাসের প্যাকেজে মাত্র ২০ হাজার টাকা লাগে। প্রতিবার ডায়ালাইসিস করতে খরচ পড়ে ৪শ’ টাকা। আর বাইরে করলে প্রতিবার তিন হাজার টাকা লাগে। তাই দরিদ্র মানুষরা বাইরে ডায়ালাইসিস করতে পারেন না। ফলে গত ২০ দিনে ১৯ জন রোগী মারা গেছেন। তারা সবাই এখানকার তালিকাভুক্ত রোগী। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও অনেকেই মারা যাবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ডায়ালাইসিস ইউনিট ইনচার্জ মোখলেসুর রহমান জানান, ডায়ালাইসিস মেশিন আগে ছিল ৩০টি, এখন ১৮টিতে দাঁড়িয়েছে। বাকিগুলো বিকল হয়ে পড়ে আছে। সেগুলোও মেরামত বা নতুন স্থাপন করা হচ্ছে না। তার পরেও রোগীদের সেবা দেওয়া চলছিল দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট থেকে পাওয়া পানি দিয়ে। কিন্তু দুটো পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ডায়ালাইসিস পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে হাসপাতালের পরিচালককে জানানো হয়েছে। এ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। ফলে এই দুরবস্থা।

এদিকে নেফ্রোলজি ওয়ার্ডে গিয়ে মাত্র একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীর দেখা পাওয়া গেল। পুরো ওয়ার্ডে ফাঁকা পড়ে আছে অর্ধশতাধিক বেড।

কুড়িগ্রাম থেকে আসা কিডনি রোগে আক্রান্ত ১৬ বছরের কিশোর সালাম জানালো, হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি তিন-চারটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করা যায়। প্রথমে দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা, এরপর প্রতিবারের জন্য দিতে হয় তিন হাজার টাকা।

সালামের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। প্রতিবার তিন হাজার টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করতে লাগে মাত্র ৪শ’ টাকা। ২০ দিন যাবত মেশিন নষ্ট অথচ কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

তিনি জানান, বাইরে থেকে ডায়ালাইসিস করিয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি করে অন্যান্য চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

এদিকে নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আনিসুজ্জামান জানান, দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ডায়ালাইসিস করা যাচ্ছে না। রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. রেয়াজুল করিমের চেম্বারে গেলে এক কর্মচারী জানান, স্যার এখন ব্যস্ত আছেন কারও সঙ্গে কথা বলবেন না।

পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

রংপুর মেডিকেলে ২০ দিন ডায়ালাইসিস বন্ধ, ১৯ জনের মৃত্যু

 মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো 
২৮ এপ্রিল ২০২১, ১০:২৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট নষ্ট হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস বিভাগটি ২০ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে কিডনি জটিলতার রোগে আক্রান্ত শত শত রোগীরা ডায়ালাইসিস করতে পারছেন না।

এ পরিস্থিতিরমুখে কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গত ২০ দিনে ১৯ জন কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস করতে না পেরে বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন বলে জানা গেছে। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ দিনে ডায়ালাইসিস না করতে পারায় ১৯ জন রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। শুধুমাত্র ডায়ালাইসিস মেশিন নষ্ট হওয়ায় এসব রোগী বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।

দায়িত্বরত নার্স, আয়া আর টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডায়ালাইসিসের পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট এবং বেশ কয়েকটি ডায়ালাইসিস মেশিন বিকল হওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ছয় লাখ টাকা খরচ করলে দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট বসানো সম্ভব। কিন্তু সেটাই কেনা হচ্ছে না। অথচ ডায়ালাইসিস বিভাগ থেকে প্রতি মাসে আয় হয় তিন লাখ টাকারও বেশি।

বুধবার দুপুরে সরেজমিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেফ্রোলজি (কিডনি) বিভাগের ডায়ালাইসিস বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, সব বেড রোগীশূন্য। চার-পাঁচ জন দায়িত্বরত নার্স, আয়া ও টেকনিশিয়ান অলস সময় পার করছেন। অন্য সময় ৪০ থেকে ৫০ জন কিডনি রোগী ও তাদের স্বজনদের উপস্থিতি থাকতো। এখন সেখানে সুনসান নীরবতা।

কর্তব্যরত ডায়ালাইসিস ইউনিটের টেকনিশিয়ান মাসুদ জানান, চলতি মাসের ৮ এপ্রিল থেকে ডায়ালাইসিস ইউনিটটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, ডায়ালাইসিসের প্রধান উপাদান পিউরিফাইড পানি, যা মেশিনের সাহায্যে পরিশোধন করা হয়। সেই মেশিন দুটি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে। এর আগেও কয়েকবার মেশিন দুটি বিকল হয়েছিল, পরে কোনো রকমে মেরামত করা হয়। এবার ঢাকা থেকে আসা টেকনিশিয়ানরা জানিয়ে দিয়েছেন, এই মেশিন আর সচল করা সম্ভব নয়। নতুন মেশিন স্থাপন করতে হবে।

তিনি আরও জানান, একজন কিডনি রোগীকে চার ঘণ্টাব্যাপী ডায়ালাইসিস করতে হয়। এজন্য একেক রোগীর জন্য ১৮০ লিটার পিউরিফাইড পানির প্রয়োজন হয়। এটা ছাড়া ডায়ালাইসিস করা যাবে না। সেই মেশিন যদি নষ্ট থাকে তাহলে কোনোভাবেই ডায়ালাইসিস করা যাবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্তব্যরত একজন নার্স জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করতে ছয় মাসের প্যাকেজে মাত্র ২০ হাজার টাকা লাগে। প্রতিবার ডায়ালাইসিস করতে খরচ পড়ে ৪শ’ টাকা। আর বাইরে করলে প্রতিবার তিন হাজার টাকা লাগে। তাই দরিদ্র মানুষরা বাইরে ডায়ালাইসিস করতে পারেন না। ফলে গত ২০ দিনে ১৯ জন রোগী মারা গেছেন। তারা সবাই এখানকার তালিকাভুক্ত রোগী। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও অনেকেই মারা যাবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ডায়ালাইসিস ইউনিট ইনচার্জ মোখলেসুর রহমান জানান, ডায়ালাইসিস মেশিন আগে ছিল ৩০টি, এখন ১৮টিতে দাঁড়িয়েছে। বাকিগুলো বিকল হয়ে পড়ে আছে। সেগুলোও মেরামত বা নতুন স্থাপন করা হচ্ছে না। তার পরেও রোগীদের সেবা দেওয়া চলছিল দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট থেকে পাওয়া পানি দিয়ে। কিন্তু দুটো পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ডায়ালাইসিস পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে হাসপাতালের পরিচালককে জানানো হয়েছে। এ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। ফলে এই দুরবস্থা।

এদিকে নেফ্রোলজি ওয়ার্ডে গিয়ে মাত্র একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীর দেখা পাওয়া গেল। পুরো ওয়ার্ডে ফাঁকা পড়ে আছে অর্ধশতাধিক বেড।

কুড়িগ্রাম থেকে আসা কিডনি রোগে আক্রান্ত ১৬ বছরের কিশোর সালাম জানালো, হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি তিন-চারটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করা যায়। প্রথমে দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা, এরপর প্রতিবারের জন্য দিতে হয় তিন হাজার টাকা।

সালামের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। প্রতিবার তিন হাজার টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করতে লাগে মাত্র ৪শ’ টাকা। ২০ দিন যাবত মেশিন নষ্ট অথচ কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

তিনি জানান, বাইরে থেকে ডায়ালাইসিস করিয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি করে অন্যান্য চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

এদিকে নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আনিসুজ্জামান জানান, দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ডায়ালাইসিস করা যাচ্ছে না। রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. রেয়াজুল করিমের চেম্বারে গেলে এক কর্মচারী জানান, স্যার এখন ব্যস্ত আছেন কারও সঙ্গে কথা বলবেন না।

পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন