মামুনুলকে জড়িয়ে জবানবন্দি, নজরদারিতে ১১ মাদ্রাসা
jugantor
মামুনুলকে জড়িয়ে জবানবন্দি, নজরদারিতে ১১ মাদ্রাসা

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ  

০৫ মে ২০২১, ২৩:০২:২৯  |  অনলাইন সংস্করণ

হেফাজতের ডাকা হরতালের মূল উদ্দেশ্যই ছিল তাণ্ডব চালিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ আর ভাংচুর চালাতে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দিয়েছিলেন বিলুপ্ত হেফাজতের সাবেক নেতা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা। এমনকি তাণ্ডবে অংশ নিতে বিএনপি-জামায়াতের একটি অংশকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছিল এ পরিকল্পনায়।

গত এক দশকে নারায়ণগঞ্জে নিজেদের শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করতেও সক্ষম হয়েছে হেফাজত। আর এক্ষেত্রে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে হেফাজতপন্থি ইমামদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি।

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি তারা হেফাজতের পক্ষে সমর্থন ও ফান্ড আদায়ের জন্য কাজ করতেন। পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত হেফাজতের নেতারা রিমান্ডে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।

এদিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জের হাতে গ্রেফতার হওয়া এক হেফাজত নেতা প্রথমবারের মতো আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ওই জবানবন্দিতে হেফাজত নেতা ইমাম আবু বক্কর সিদ্দিক গত ২৮ মার্চ হরতালে তাণ্ডবের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীর কমিটির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান পাটোয়ারি হরতাল সফল করার উদ্দেশ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে জ্বালাও-পোড়াওসহ গাড়ি ভাংচুরের দায়িত্ব দেন তাকে। গত ৪ মে বিকালে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ হুমায়ুন কবীরের আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ইমাম আবু বক্কর সিদ্দিক এসব তথ্য দিয়েছেন।

অপরদিকে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের ৭ নেতা ও ১১টি মাদ্রাসাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইউনিটের কাছে সম্প্রতি গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকা মাদ্রাসাগুলোর অর্থ লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, হেফাজতের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক মনির হোসাইন কাশেমীসহ ৭ জন সন্দেহভাজন নেতাকেও কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

এদিকে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ ইউনিটের (জেলা) পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, হরতালের সহিংসতায় আসামি আবু বকর সিদ্দিক মসজিদে ইমামতির আড়ালে হেফাজতের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। হরতালের দিন তাণ্ডবের ঘটনায় সরাসরি লিপ্ত ও মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মহাসড়কে কর্মী সমর্থকদের জড়ো করেন। ওই দিনের সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, আদালতে স্বীকারোক্তি ছাড়াও গ্রেফতারকৃত আবু বক্কর আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এছাড়া পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া হেফাজত নেতাদের অনেককে শ্যোন অ্যারেস্ট করে আমরা রিমান্ডে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করছি।

এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শুধুমাত্র কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর ভিত্তি করে নারায়ণগঞ্জে গত এক দশকে হেফাজতে ইসলাম শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করেছে। বিশেষ করে জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লার বক্তাবলী, আলীরটেক, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জে হেফাজতের শক্তি সবচেয়ে বেশি।

জেলা পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাণ্ডব নিয়ে হেফাজতের মধ্যে ২টি গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছিল। শহরকেন্দ্রিক নেতারা তাণ্ডবের বিপক্ষে থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতা মনির কাশেমীর নেতৃত্বেই নারায়ণগঞ্জে বেশিরভাগ তাণ্ডব সংঘটিত হয়। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন এবং হরতালের আগে বিএনপির সাবেক এমপির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এই কেন্দ্রীয় নেতা ২০১৯ ও ২০২০ সালে দেশের বাইরে বিএনপির খালেদা বিরোধী ও কিংস পার্টির সমন্বয়ে গঠিত একটি অংশের ডাকা বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলেও আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যেই যে ১১টি মাদ্রাসাকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে সেগুলো হলো- সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের জামিয়াতুল আবরার হাফিজিয়া মাদ্রাসা, নয়া আঁটি কিসমত মার্কেটে অবস্থিত আশরাফিয়া মহিলা মাদ্রাসা, সানারপাড় আব্দুল আলী দারুস সালাম হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা, মাদানীনগরের মাওলানা শাইখ ইদরীম আল ইসলামী, মাদানীনগরের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, নিমাই কাশারীর আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া নুরুল কোরআন মাদ্রাসা, মুক্তিনগর নয়াআঁটি ইফয়জুল উলুম মুহিউছউন্নহ আরবিয়্যাহ মাদ্রাসা, ভুইয়াপাড়া জামিয়া মোহাম্মদীয়া মাদ্রাসা, সাইনবোর্ড জামিয়াতুল ইব্রাহিম মাদ্রাসা, মারকুজুল তাহরিকে খাতমি নবুয়াত কারামাতিয়া উলুম মাদ্রাসা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ সুমিলপাড়া নূরে মদিনা দাখিল মাদ্রাসা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানিয়েছেন, যারা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতিষ্ঠান বা তাদের ক্ষেত্রে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছি। এগুলো অব্যাহত থাকবে।

মামুনুলকে জড়িয়ে জবানবন্দি, নজরদারিতে ১১ মাদ্রাসা

 রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 
০৫ মে ২০২১, ১১:০২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

হেফাজতের ডাকা হরতালের মূল উদ্দেশ্যই ছিল তাণ্ডব চালিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ আর ভাংচুর চালাতে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দিয়েছিলেন বিলুপ্ত হেফাজতের সাবেক নেতা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা। এমনকি তাণ্ডবে অংশ নিতে বিএনপি-জামায়াতের একটি অংশকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছিল এ পরিকল্পনায়।

গত এক দশকে নারায়ণগঞ্জে নিজেদের শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করতেও সক্ষম হয়েছে হেফাজত। আর এক্ষেত্রে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে হেফাজতপন্থি ইমামদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি।

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি তারা হেফাজতের পক্ষে সমর্থন ও ফান্ড আদায়ের জন্য কাজ করতেন। পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত হেফাজতের নেতারা রিমান্ডে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।

এদিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জের হাতে গ্রেফতার হওয়া এক হেফাজত নেতা প্রথমবারের মতো আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ওই জবানবন্দিতে হেফাজত নেতা ইমাম আবু বক্কর সিদ্দিক গত ২৮ মার্চ হরতালে তাণ্ডবের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীর কমিটির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান পাটোয়ারি হরতাল সফল করার উদ্দেশ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে জ্বালাও-পোড়াওসহ গাড়ি ভাংচুরের দায়িত্ব দেন তাকে। গত ৪ মে বিকালে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ হুমায়ুন কবীরের আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ইমাম আবু বক্কর সিদ্দিক এসব তথ্য দিয়েছেন।

অপরদিকে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের ৭ নেতা ও ১১টি মাদ্রাসাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইউনিটের কাছে সম্প্রতি গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকা মাদ্রাসাগুলোর অর্থ লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, হেফাজতের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক মনির হোসাইন কাশেমীসহ ৭ জন সন্দেহভাজন নেতাকেও কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

এদিকে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ ইউনিটের (জেলা) পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, হরতালের সহিংসতায় আসামি আবু বকর সিদ্দিক মসজিদে ইমামতির আড়ালে হেফাজতের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। হরতালের দিন তাণ্ডবের ঘটনায় সরাসরি লিপ্ত ও মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মহাসড়কে কর্মী সমর্থকদের জড়ো করেন। ওই দিনের সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, আদালতে স্বীকারোক্তি ছাড়াও গ্রেফতারকৃত আবু বক্কর আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এছাড়া পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া হেফাজত নেতাদের অনেককে শ্যোন অ্যারেস্ট করে আমরা রিমান্ডে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করছি।

এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শুধুমাত্র কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর ভিত্তি করে নারায়ণগঞ্জে গত এক দশকে হেফাজতে ইসলাম শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করেছে। বিশেষ করে জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লার বক্তাবলী, আলীরটেক, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জে হেফাজতের শক্তি সবচেয়ে বেশি।

জেলা পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাণ্ডব নিয়ে হেফাজতের মধ্যে ২টি গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছিল। শহরকেন্দ্রিক নেতারা তাণ্ডবের বিপক্ষে থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতা মনির কাশেমীর নেতৃত্বেই নারায়ণগঞ্জে বেশিরভাগ তাণ্ডব সংঘটিত হয়। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন এবং হরতালের আগে বিএনপির সাবেক এমপির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এই কেন্দ্রীয় নেতা ২০১৯ ও ২০২০ সালে দেশের বাইরে বিএনপির খালেদা বিরোধী ও কিংস পার্টির সমন্বয়ে গঠিত একটি অংশের ডাকা বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলেও আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যেই যে ১১টি মাদ্রাসাকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে সেগুলো হলো- সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের জামিয়াতুল আবরার হাফিজিয়া মাদ্রাসা, নয়া আঁটি কিসমত মার্কেটে অবস্থিত আশরাফিয়া মহিলা মাদ্রাসা, সানারপাড় আব্দুল আলী দারুস সালাম হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা, মাদানীনগরের মাওলানা শাইখ ইদরীম আল ইসলামী, মাদানীনগরের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, নিমাই কাশারীর আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া নুরুল কোরআন মাদ্রাসা, মুক্তিনগর নয়াআঁটি ইফয়জুল উলুম মুহিউছউন্নহ আরবিয়্যাহ মাদ্রাসা, ভুইয়াপাড়া জামিয়া মোহাম্মদীয়া মাদ্রাসা, সাইনবোর্ড জামিয়াতুল ইব্রাহিম মাদ্রাসা, মারকুজুল তাহরিকে খাতমি নবুয়াত কারামাতিয়া উলুম মাদ্রাসা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ সুমিলপাড়া নূরে মদিনা দাখিল মাদ্রাসা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানিয়েছেন, যারা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতিষ্ঠান বা তাদের ক্ষেত্রে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছি। এগুলো অব্যাহত থাকবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন