বাবুলের ৩ আবেগঘন স্ট্যাটাস, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল সবাইকে!
jugantor
বাবুলের ৩ আবেগঘন স্ট্যাটাস, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল সবাইকে!

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৩ মে ২০২১, ০৬:৪৯:৪৯  |  অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ড হঠাৎ নতুন মোড় নিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে ফেঁসে গেছেন মিতুর স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আকতার।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে খুন হন মিতু। ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন বাবুল। স্ত্রী হত্যার খবরে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে স্ত্রীর মরদেহের সামনে হাউমাউ করে কাঁদেন তিনি।

স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে থানায় মামলা করেন।

জানাজার সময়ও কাঁদতে কাঁদতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তার সেই কান্নার ছবি সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

কিন্তু ঘটনার ৫ বছর পর পুরো চিত্রটাই উল্টে গেল। পুলিশ বলছে, তার সব কান্নাই ছিল বাস্তবধর্মী অভিনয়। যা যে কোনো অস্কারজয়ী অভিনেতাকে হার মানাবে।

পুলিশেরই তদন্তে বাবুলই এখন স্ত্রী হত্যা মামলার প্রধান আসামি। শ্বশুর পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফের করা মামলায় বাবুল এখন রিমান্ডে।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় নেওয়ায় ২০১৬ সালের দিকে বাবুলের ৩টি আলোচিত ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। সেসব স্ট্যাটাস দিয়ে পুলিশ ও দেশবাসীর অনেকের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছিলেন বাবুল।

মিতু হত্যাকাণ্ডের ৬ দিন আগে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের সময় কারও ‘বিরাগভাজন’ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বাবুল।

পদোন্নতি নিয়ে কর্মস্থল ছাড়লেও আবারও চট্টগ্রামে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

৩০ মে রাত ১১টা ৯ মিনিটে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন বাবুল আকতার।

এতে তিনি লেখেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলেই চাকরি করাকালীন সময়ে আমার দুটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। এখানে থেকেই পদোন্নতি পেয়েছি। কাজ করতে গিয়ে সহযোগিতা পেয়েছি সহকর্মী, জনপ্রতিনিধি, সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষের। তাদের সকলের কাছেই কৃতজ্ঞ। চেষ্টা করেছি সর্বদা সততা ও ন্যায়ের সাথে কাজ করতে, সত্যের পক্ষে থাকতে। তবে পুলিশের চাকরিতে সকলকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। হয় অভিযোগপত্র না হয় চূড়ান্ত রিপোর্ট। এর মাঝামাঝি কোনে অবস্থানের সুযোগ নেই। সে কারণে অনেকের বিরাগভাজন হয়ে থাকতে পারি।’

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর বাবুলের সেই স্ট্যাটাস আলোচনায় আসে। অনেকেই মনে করেন, ‘বিরাগভাজন’ হওয়ার যে আশঙ্কা প্রকাশে করেছিলেন বাবুল আকতার ছয় দিনের মাথায় সেটি ‘সত্যে’ পরিণত হল!

এরপর মিতু হত্যাকাণ্ডে ‘জঙ্গি সম্পৃক্ততার’ কথা ওঠে। এরইমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের একজনকে বাবুলের ‘সোর্স’ কামরুল ইসলাম শিকদার মুছা বলে চিহ্নিত করে তদন্তকারী পুলিশ।

তবে বাবুল সেই ব্যক্তিকে চিনতে অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় হয়। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়।

এ সময় বাবুলকে নিজের বাড়িতে রাখেন শ্বশুর মোশারফ। তিনি জামাতাকে ‘মহান’ বলে আখ্যা দেন।

২০১৬ সালের ২৪ জুন রাতে ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আলোচনা নতুন দিকে মোড় নেয়।

এর দুদিন পরই গ্রেফতার হন ওয়াসিম ও আনোয়ার নামে দুই ব্যক্তি। যারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, বাবুলের সোর্স মুছার ‘পরিকল্পনাতেই’ এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

এরপর মুছাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। ৪ জুলাই মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ২২ জুন নগরীর বন্দর থানা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে পুলিশ মুছাকে ধরে নিয়ে যায়।

এসব নানা ঘটনার পর ১৩ আগস্ট ফেসবুকে ফের আবেগঘন এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন বাবুল। যেখানে প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন তিনি।

তিনি লিখেছিলেন, ‘যখন মা হারানো মেয়েটার অযথা গড়াগড়ি দিয়ে কান্নার শব্দ কেবল আমিই শুনি, তখন অনেকেই নতুন নতুন গল্প বানাতে ব্যস্ত। আমি তো বর্ম পরে নেই, কিন্তু কোলে আছে মা হারা দুই শিশু। আঘাত সইতেও পারি না, রুখতেও পারি না।’

বাবুল আরো লিখেছিলেন, ‘এক সুন্দর দিনে সাধারণ এক কিশোরী বউ হয়ে আমার জীবনে এসেছিল। ঘর-সংসার কী অত বুঝত সে তখন? তাকে বুঝে উঠার সবটুকু সাধ্য হয়নি কখনও। কারণ সদাহাস্য চেহারা যার, তার অন্যান্য অনুভূতি ধরতে পারাটা কঠিন। তারপর যুগের শুরু। এক কিশোরীর নারী হয়ে উঠার সাক্ষী আমি। ছোট ছোট আবদার আর কথাগুলো ক্রমেই দিক পাল্টালো। হাতের নখের আকার পাল্টে গেল আমার খাবারটুকু স্বাস্থ্যকর রাখার জন্য। ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে মিশে গেল তার চব্বিশঘণ্টা, মাস, বছর এবং যুগ। রাতের পর রাত কাজ থেকে ফিরে দেখতাম, মেয়েটি ক্রমেই রূপ হারাচ্ছে রাত জেগে আমার অপেক্ষায় থেকে থেকে। হয়ত ভালোবাসার চেয়ে স্নেহই ছিল বেশি।’

তারপর মিতুর দুই সন্তানের মা হওয়ার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব পালনের কথাও লিখেছিলেন বাবুল।

‘আমার সামান্যতম ক্ষতির আশঙ্কায় তার কেঁদে অস্থির হওয়ার সাক্ষী আমি। মেয়েটি কী আসলেই সংসার বুঝেছিল ততদিনে? কারণ আমি জানি, আমি সংসার তখনও বুঝিনি। এরপর অনেকগুলো দিন কেটে গেল আমার, আমাদের জীবনে। নেহায়েত সাধারণ কিশোরীটি তখন নারী। ততদিনে সাধারণ মানুষটির ছোঁয়ায় আমার জীবন অসাধারণ। তখন সে সংসার বোঝে। কিন্তু আমি বুঝি না, এতেই কী এত ক্ষোভ ছিল তার? এত বেশি ক্ষোভ যে ছেড়েই চলে গেল? গোলকধাঁধার মারপ্যাঁচ বুঝার বয়স কী হয়েছে মায়ের মৃত্যুর সাক্ষী ছেলেটার? তার প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ দুষ্প্রাপ্য।’

পরদিন ১৪ অগাস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। ৬ সেপ্টেম্বর তা গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাবুলকে নিয়ে সন্দেহের কথা বলেন তার শ্বশুর মোশাররফ।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাবুল তার বাসায় থেকে অভিনয় করেছে এবং সে পরকীয়ায় আসক্ত বলে অভিযোগ করেন মোশাররফ।

শ্বশুরের এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাবুল ফের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। লিখেছিলেন, ‘সবাই বিচারক, আর আমি তথ্য প্রমাণ ছাড়াই খুনি’।

‘অনেকের অনেক জানতে চাওয়া আমার কাছে। আমি কথা বলার জন্য মানসিকভাবে কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে কারও বিকার নেই। তবে আমার নিরুত্তর থাকার সুযোগটুকু কাজে লাগিয়ে মনের মতো কাহিনী ফাঁদতে ফাঁদতে পরকীয়া থেকে খুন পর্যন্ত গল্প লেখা শেষ করে ফেলেছেন অনেকে। আমার কোনো মাথাব্যথা নেই এসব নিয়ে, আমি আমার মাহারা সন্তান দুটোকে নিয়েই ব্যস্ত এখন। তাছাড়া প্রমাণের দায়িত্ব যারা অভিযোগ করেন তাদের। তবে আমার পরিবার পরিজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কথা ভেবে কিছু কথা না বললেই নয়।’

স্ট্যাটাসে বাবুল অভিযোগ করেছিলেন, তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি প্রয়াত স্ত্রী মিতুর স্কুলপড়ুয়া এক খালাত বোনের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে রাজি না হয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসায় তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন তারা।

লিখেছিলেন,‘আমার শ্বশুর বললেন, হয় আমাকে আমার বাবা-মা ছাড়তে হবে, না হয় শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ছাড়তে হবে। তাদের একটাই কথা, শ্বশুরের বাড়িতেই নতুন ঘর বাঁধতে হবে এবং সেখানেই থাকতে হবে। আমার শ্বশুর পক্ষকে জানিয়েই বাসা নিয়েছি এবং এতে তারা ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণও হয়েছিলেন। বলেছিলেন, এর পরিণাম হবে খারাপ এবং আমাকে পচিয়ে ছাড়বেন তারা। আমি বুঝলাম না কোন মা-বাবা তাদের মেয়ের স্বামীর পরকীয়ার সম্পর্ক আছে জেনেও কীভাবে মেয়েকে ঐ স্বামীর সংসারে রেখে দেয়!’

এসব স্ট্যাটাস এখন মানুষকে আবেগী করে নিজের পক্ষে সহানুভূতি যোগাড়ে বাবুলের অপচেষ্টা বলেই ধারণা হচ্ছে এখন।

মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আকতারের জড়িত থাকার ‘তথ্য প্রমাণ’ পাওয়ার কথা জানিয়ে পিবিআই বুধবার তার মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

বাবুলের ৩ আবেগঘন স্ট্যাটাস, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল সবাইকে!

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৩ মে ২০২১, ০৬:৪৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ড হঠাৎ নতুন মোড় নিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে ফেঁসে গেছেন মিতুর স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আকতার।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে খুন হন মিতু। ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন বাবুল। স্ত্রী হত্যার খবরে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে স্ত্রীর মরদেহের সামনে হাউমাউ করে কাঁদেন তিনি।

স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে থানায় মামলা করেন।

জানাজার সময়ও কাঁদতে কাঁদতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তার সেই কান্নার ছবি সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। 

কিন্তু ঘটনার ৫ বছর পর পুরো চিত্রটাই উল্টে গেল। পুলিশ বলছে, তার সব কান্নাই ছিল বাস্তবধর্মী অভিনয়। যা যে কোনো অস্কারজয়ী অভিনেতাকে হার মানাবে।

পুলিশেরই তদন্তে বাবুলই এখন স্ত্রী হত্যা মামলার প্রধান আসামি। শ্বশুর পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফের করা মামলায় বাবুল এখন রিমান্ডে। 

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় নেওয়ায় ২০১৬ সালের দিকে বাবুলের ৩টি আলোচিত ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। সেসব স্ট্যাটাস দিয়ে পুলিশ ও দেশবাসীর অনেকের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছিলেন বাবুল।

মিতু হত্যাকাণ্ডের ৬ দিন আগে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের সময় কারও ‘বিরাগভাজন’ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বাবুল।

পদোন্নতি নিয়ে কর্মস্থল ছাড়লেও আবারও চট্টগ্রামে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

৩০ মে রাত ১১টা ৯ মিনিটে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন বাবুল আকতার।

এতে তিনি লেখেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলেই চাকরি করাকালীন সময়ে আমার দুটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। এখানে থেকেই পদোন্নতি পেয়েছি। কাজ করতে গিয়ে সহযোগিতা পেয়েছি সহকর্মী, জনপ্রতিনিধি, সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষের। তাদের সকলের কাছেই কৃতজ্ঞ। চেষ্টা করেছি সর্বদা সততা ও ন্যায়ের সাথে কাজ করতে, সত্যের পক্ষে থাকতে। তবে পুলিশের চাকরিতে সকলকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। হয় অভিযোগপত্র না হয় চূড়ান্ত রিপোর্ট। এর মাঝামাঝি কোনে অবস্থানের সুযোগ নেই। সে কারণে অনেকের বিরাগভাজন হয়ে থাকতে পারি।’

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর বাবুলের সেই স্ট্যাটাস আলোচনায় আসে। অনেকেই মনে করেন, ‘বিরাগভাজন’ হওয়ার যে আশঙ্কা প্রকাশে করেছিলেন বাবুল আকতার ছয় দিনের মাথায় সেটি ‘সত্যে’ পরিণত হল!

এরপর মিতু হত্যাকাণ্ডে ‘জঙ্গি সম্পৃক্ততার’ কথা ওঠে। এরইমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের একজনকে বাবুলের ‘সোর্স’ কামরুল ইসলাম শিকদার মুছা বলে চিহ্নিত করে তদন্তকারী পুলিশ।

তবে বাবুল সেই ব্যক্তিকে চিনতে অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় হয়। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। 

এ সময় বাবুলকে নিজের বাড়িতে রাখেন শ্বশুর মোশারফ। তিনি জামাতাকে ‘মহান’ বলে আখ্যা দেন।

২০১৬ সালের ২৪ জুন রাতে ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আলোচনা নতুন দিকে মোড় নেয়।

এর দুদিন পরই গ্রেফতার হন ওয়াসিম ও আনোয়ার নামে দুই ব্যক্তি। যারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, বাবুলের সোর্স মুছার ‘পরিকল্পনাতেই’ এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। 

এরপর মুছাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। ৪ জুলাই মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ২২ জুন নগরীর বন্দর থানা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে পুলিশ মুছাকে ধরে নিয়ে যায়। 

এসব নানা ঘটনার পর ১৩ আগস্ট ফেসবুকে ফের আবেগঘন এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন বাবুল। যেখানে প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন তিনি। 

তিনি লিখেছিলেন, ‘যখন মা হারানো মেয়েটার অযথা গড়াগড়ি দিয়ে কান্নার শব্দ কেবল আমিই শুনি, তখন অনেকেই নতুন নতুন গল্প বানাতে ব্যস্ত। আমি তো বর্ম পরে নেই, কিন্তু কোলে আছে মা হারা দুই শিশু। আঘাত সইতেও পারি না, রুখতেও পারি না।’

বাবুল আরো লিখেছিলেন, ‘এক সুন্দর দিনে সাধারণ এক কিশোরী বউ হয়ে আমার জীবনে এসেছিল। ঘর-সংসার কী অত বুঝত সে তখন? তাকে বুঝে উঠার সবটুকু সাধ্য হয়নি কখনও। কারণ সদাহাস্য চেহারা যার, তার অন্যান্য অনুভূতি ধরতে পারাটা কঠিন। তারপর যুগের শুরু। এক কিশোরীর নারী হয়ে উঠার সাক্ষী আমি। ছোট ছোট আবদার আর কথাগুলো ক্রমেই দিক পাল্টালো। হাতের নখের আকার পাল্টে গেল আমার খাবারটুকু স্বাস্থ্যকর রাখার জন্য। ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে মিশে গেল তার চব্বিশঘণ্টা, মাস, বছর এবং যুগ। রাতের পর রাত কাজ থেকে ফিরে দেখতাম, মেয়েটি ক্রমেই রূপ হারাচ্ছে রাত জেগে আমার অপেক্ষায় থেকে থেকে। হয়ত ভালোবাসার চেয়ে স্নেহই ছিল বেশি।’

তারপর মিতুর দুই সন্তানের মা হওয়ার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব পালনের কথাও লিখেছিলেন বাবুল।

‘আমার সামান্যতম ক্ষতির আশঙ্কায় তার কেঁদে অস্থির হওয়ার সাক্ষী আমি। মেয়েটি কী আসলেই সংসার বুঝেছিল ততদিনে? কারণ আমি জানি, আমি সংসার তখনও বুঝিনি। এরপর অনেকগুলো দিন কেটে গেল আমার, আমাদের জীবনে। নেহায়েত সাধারণ কিশোরীটি তখন নারী। ততদিনে সাধারণ মানুষটির ছোঁয়ায় আমার জীবন অসাধারণ। তখন সে সংসার বোঝে। কিন্তু আমি বুঝি না, এতেই কী এত ক্ষোভ ছিল তার? এত বেশি ক্ষোভ যে ছেড়েই চলে গেল? গোলকধাঁধার মারপ্যাঁচ বুঝার বয়স কী হয়েছে মায়ের মৃত্যুর সাক্ষী ছেলেটার? তার প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ দুষ্প্রাপ্য।’

পরদিন ১৪ অগাস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। ৬ সেপ্টেম্বর তা গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাবুলকে নিয়ে সন্দেহের কথা বলেন তার শ্বশুর মোশাররফ।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাবুল তার বাসায় থেকে অভিনয় করেছে এবং সে পরকীয়ায় আসক্ত বলে অভিযোগ করেন মোশাররফ।

শ্বশুরের এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাবুল ফের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। লিখেছিলেন, ‘সবাই বিচারক, আর আমি তথ্য প্রমাণ ছাড়াই খুনি’। 

‘অনেকের অনেক জানতে চাওয়া আমার কাছে। আমি কথা বলার জন্য মানসিকভাবে কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে কারও বিকার নেই। তবে আমার নিরুত্তর থাকার সুযোগটুকু কাজে লাগিয়ে মনের মতো কাহিনী ফাঁদতে ফাঁদতে পরকীয়া থেকে খুন পর্যন্ত গল্প লেখা শেষ করে ফেলেছেন অনেকে। আমার কোনো মাথাব্যথা নেই এসব নিয়ে, আমি আমার মাহারা সন্তান দুটোকে নিয়েই ব্যস্ত এখন। তাছাড়া প্রমাণের দায়িত্ব যারা অভিযোগ করেন তাদের। তবে আমার পরিবার পরিজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কথা ভেবে কিছু কথা না বললেই নয়।’

স্ট্যাটাসে বাবুল অভিযোগ করেছিলেন, তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি প্রয়াত স্ত্রী মিতুর স্কুলপড়ুয়া এক খালাত বোনের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে রাজি না হয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসায় তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন তারা।

লিখেছিলেন, ‘আমার শ্বশুর বললেন, হয় আমাকে আমার বাবা-মা ছাড়তে হবে, না হয় শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ছাড়তে হবে। তাদের একটাই কথা, শ্বশুরের বাড়িতেই নতুন ঘর বাঁধতে হবে এবং সেখানেই থাকতে হবে। আমার শ্বশুর পক্ষকে জানিয়েই বাসা নিয়েছি এবং এতে তারা ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণও হয়েছিলেন। বলেছিলেন, এর পরিণাম হবে খারাপ এবং আমাকে পচিয়ে ছাড়বেন তারা। আমি বুঝলাম না কোন মা-বাবা তাদের মেয়ের স্বামীর পরকীয়ার সম্পর্ক আছে জেনেও কীভাবে মেয়েকে ঐ স্বামীর সংসারে রেখে দেয়!’

এসব স্ট্যাটাস এখন মানুষকে আবেগী করে নিজের পক্ষে সহানুভূতি যোগাড়ে বাবুলের অপচেষ্টা বলেই ধারণা হচ্ছে এখন।

মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আকতারের জড়িত থাকার ‘তথ্য প্রমাণ’ পাওয়ার কথা জানিয়ে পিবিআই বুধবার তার মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : মিতু হত্যার নতুন মোড়

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন