নাড়ির টানে ঘরে ফেরা, পদ্মায় ঝরল ৩১ তাজা প্রাণ
jugantor
নাড়ির টানে ঘরে ফেরা, পদ্মায় ঝরল ৩১ তাজা প্রাণ

  খোন্দকার রুহুল আমিন, টেকেরহাট (মাদারীপুর)  

১৬ মে ২০২১, ১৯:৫৫:৪৮  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথে ঈদে নাড়ির টানে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় ঘরে ফিরতে গিয়ে দুটি ঘটনায় ঝরে গেছে ৩১টি তাজা প্রাণ। তাদের পরিবারে ঈদ আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে জনস্বার্থে সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখা হয় গণপরিবহন, লঞ্চ, স্পিডবোট, ফেরিসহ সব যানবাহন। লকডাউন চলাকালীন শুধু জরুরি সেবা দিতে সীমিত আকারে ২-৩টি ফেরি চালু রাখা হয়।

প্রধানমন্ত্রী ঈদের কিছুদিন আগে ঘোষণা দেন কর্মস্থল ত্যাগ না করে নিজ নিজ স্থানে থেকে ঈদ পালন করার। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে করোনার মহামারি অবহেলা করে ঈদের ১০-১২ দিন বাকি থাকতেই লাখ-লাখ মানুষ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আইন অমান্য করে সড়ক-মহাসড়ক ও নৌপথের উদ্দেশে ছুটতে থাকে।

অন্যান্য স্থানের মতো মানুষের ঢল নামে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া এবং মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাটে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত ফেরিতে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে বিআইডাব্লিউটিসি দিনের বেলা ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। রাতের জরুরি সেবায় নিয়োজিত ফেরিতেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনাকে অবহেলা ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে দক্ষিণাঞ্চলমুখী যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মানুষের চাপে ব্যাহত হয় জরুরি সেবা।

এ অবস্থায় বিআইডাব্লিউটিসি দিনের বেলা সব ফেরি চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু হয় ঘরমুখো মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোত। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয় শিমুলিয়া ঘাটে।

শিবচর বাংলাবাজার ঘাটেও নৌপুলিশের সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এতেও জনজোয়ার ঠেকানো যায়নি। ফলশ্রুতিতে ১০ দিনের ব্যবধানে দুটি নৌ দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ৩১টি তাজা প্রাণ।

বুধবার দুপুরে রো-রো ফেরি এনায়েতপুরী ও শাহ পরাণ নামে দুই ফেরিতে প্রচণ্ড দাবদাহ, মানুষের গাদাগাদি, মাঝপদ্মায় খাবার পানি সংকট ও বাংলাবাজার ঘাটে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ১ শিশু, ২ নারীসহ ৫ জন মারা যায়। অসুস্থ হয় শতাধিক।

এ সময় জেলা ও শিবচর উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং পুলিশের সমন্বয়ে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে অস্থায়ী ক্যাম্প করে অনেকের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জনকে শিবচর ও পাচ্চর রয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিহত ৫ জনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে প্রশাসন ও পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার আরামকাঠি এলাকার আবদুল জব্বারের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭) এবং বুধবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পদ্মবিলা এলাকার মজিবর রহমানের স্ত্রী শিল্পী বেগম (৩৮), মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বালিগ্রামের আলামিন বেপারীর স্ত্রী নীপা আক্তার (৩৫), বরিশালের মুলাদী উপজেলার চরকালিখান এলাকার এছহাক আকনের ছেলে নূরুদ্দিন আঁকন (৪৫) এবং শরীয়তপুর জেলার নড়িয়ার কালিকা প্রসাদ গ্রামের গিয়াসউদ্দিন মাদবরের ছেলে আনছার মাদবরের (১২) লাশ হস্তান্তর করা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করেন জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন।

অন্যদিকে এ ঘটনার ১০ দিন আগে ৩ মে সোমবার সকালে শিমুলিয়া থেকে ৩১ যাত্রী নিয়ে ছেড়ে আসা একটি স্পিডবোট বাংলাবাজার পুরনো ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে নোঙর করে রাখা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে শিশুসহ ২৬ জনের মৃত্যু হয়। মারাত্মক আহতাবস্থায় চালকসহ ৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিস।

এ দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ জনের পরিবারের কাছে ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় স্পিডবোটের ২ মালিক, চালক ও ইজারাদারসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে শিবচর থানায় মামলা দায়ের করেছে নৌপুলিশ। ৩ মে রাতে চরজানাজত নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই লোকমান হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামি করা হয় শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার শাহ আলম খান, স্পিডবোটের মালিক কান্দু মোল্লা ও রেজাউল হক এবং চালক শাহ আলমকে।

এছাড়া অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে ঈদপরবর্তী কর্মস্থলে ফেরার পথে আবারো মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোতের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঈদপরবর্তী কর্মস্থলমুখী জনস্রোতের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

নাড়ির টানে ঘরে ফেরা, পদ্মায় ঝরল ৩১ তাজা প্রাণ

 খোন্দকার রুহুল আমিন, টেকেরহাট (মাদারীপুর) 
১৬ মে ২০২১, ০৭:৫৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথে ঈদে নাড়ির টানে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় ঘরে ফিরতে গিয়ে দুটি ঘটনায় ঝরে গেছে ৩১টি তাজা প্রাণ। তাদের পরিবারে ঈদ আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে জনস্বার্থে সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখা হয় গণপরিবহন, লঞ্চ, স্পিডবোট, ফেরিসহ সব যানবাহন। লকডাউন চলাকালীন শুধু জরুরি সেবা দিতে সীমিত আকারে ২-৩টি ফেরি চালু রাখা হয়।

প্রধানমন্ত্রী ঈদের কিছুদিন আগে ঘোষণা দেন কর্মস্থল ত্যাগ না করে নিজ নিজ স্থানে থেকে ঈদ পালন করার। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে করোনার মহামারি অবহেলা করে ঈদের ১০-১২ দিন বাকি থাকতেই লাখ-লাখ মানুষ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আইন অমান্য করে সড়ক-মহাসড়ক ও নৌপথের উদ্দেশে ছুটতে থাকে।

অন্যান্য স্থানের মতো মানুষের ঢল নামে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া এবং মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাটে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত ফেরিতে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে বিআইডাব্লিউটিসি দিনের বেলা ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। রাতের জরুরি সেবায় নিয়োজিত ফেরিতেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনাকে অবহেলা ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে দক্ষিণাঞ্চলমুখী যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মানুষের চাপে ব্যাহত হয় জরুরি সেবা।

এ অবস্থায় বিআইডাব্লিউটিসি দিনের বেলা সব ফেরি চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু হয় ঘরমুখো মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোত। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয় শিমুলিয়া ঘাটে।

শিবচর বাংলাবাজার ঘাটেও নৌপুলিশের সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এতেও জনজোয়ার ঠেকানো যায়নি। ফলশ্রুতিতে ১০ দিনের ব্যবধানে দুটি নৌ দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ৩১টি তাজা প্রাণ।

বুধবার দুপুরে রো-রো ফেরি এনায়েতপুরী ও শাহ পরাণ নামে দুই ফেরিতে প্রচণ্ড দাবদাহ, মানুষের গাদাগাদি, মাঝপদ্মায় খাবার পানি সংকট ও বাংলাবাজার ঘাটে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ১ শিশু, ২ নারীসহ ৫ জন মারা যায়। অসুস্থ হয় শতাধিক।

এ সময় জেলা ও শিবচর উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং পুলিশের সমন্বয়ে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে অস্থায়ী ক্যাম্প করে অনেকের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জনকে শিবচর ও পাচ্চর রয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিহত ৫ জনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে প্রশাসন ও পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার আরামকাঠি এলাকার আবদুল জব্বারের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭) এবং বুধবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পদ্মবিলা এলাকার মজিবর রহমানের স্ত্রী শিল্পী বেগম (৩৮), মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বালিগ্রামের আলামিন বেপারীর স্ত্রী নীপা আক্তার (৩৫), বরিশালের মুলাদী উপজেলার চরকালিখান এলাকার এছহাক আকনের ছেলে নূরুদ্দিন আঁকন (৪৫) এবং শরীয়তপুর জেলার নড়িয়ার কালিকা প্রসাদ গ্রামের গিয়াসউদ্দিন মাদবরের ছেলে আনছার মাদবরের (১২) লাশ হস্তান্তর করা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করেন জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন।

অন্যদিকে এ ঘটনার ১০ দিন আগে ৩ মে সোমবার সকালে শিমুলিয়া থেকে ৩১ যাত্রী নিয়ে ছেড়ে আসা একটি স্পিডবোট বাংলাবাজার পুরনো ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে নোঙর করে রাখা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে শিশুসহ ২৬ জনের মৃত্যু হয়। মারাত্মক আহতাবস্থায় চালকসহ ৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিস।

এ দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ জনের পরিবারের কাছে ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় স্পিডবোটের ২ মালিক, চালক ও ইজারাদারসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে শিবচর থানায় মামলা দায়ের করেছে নৌপুলিশ। ৩ মে রাতে চরজানাজত নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই লোকমান হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামি করা হয় শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার শাহ আলম খান, স্পিডবোটের মালিক কান্দু মোল্লা ও রেজাউল হক এবং চালক শাহ আলমকে।

এছাড়া অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে ঈদপরবর্তী কর্মস্থলে ফেরার পথে আবারো মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোতের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঈদপরবর্তী কর্মস্থলমুখী জনস্রোতের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন