‘শেখের বেটি ভিখারিরে রাজা বানাইছে’
jugantor
‘শেখের বেটি ভিখারিরে রাজা বানাইছে’

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ  

২০ জুন ২০২১, ২২:৫৩:১৫  |  অনলাইন সংস্করণ

পিয়ারা খাতুন-মজিবর

বর্ষাকালেই মাঝে মধ্যে কাজ পান বৃদ্ধ মজিবর। ভাঙা কিংবা নষ্ট ছাতা মেরামত করেন তিনি। ছেলে লোড-আনলোডের শ্রমিকের কাজ করেন। বন্দর এলাকার বাসিন্দা মজিবরের পূর্বপুরুষ সবাই থাকতেন নৌকায়। নিজের বাড়ি হবে- এমনটা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।

একই উপজেলার বৃদ্ধা পিয়ারা খাতুন। স্বামীহারা এই বৃদ্ধা এক সময় ভিক্ষা করতেন। চেয়ে-চিন্তে দিন কাটনো পিয়ারা খাতুনের। এখন এক টুকরো জমি আছে, সেই জমির উপর বাড়ি। এমন মজিবর, পিয়ারা খাতুনদের মতো অনেকের চোখেই ছিল আনন্দের অশ্রু। অনেকে মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে শুধুই কেঁদেছেন, অনেকে বাড়ির চাবি আর জমির দলিল পেয়েও বারবার দেখছিলেন সেটা।

যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রোববার নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দুই শতাংশ জমির উপর নতুন ঘরের কাগজপত্র ও প্রতীকী চাবি তুলে দেওয়ার পর এমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেকের চোখেই ছিল বিস্ময় আর খুশির কান্না।

গণভবন থেকে সকালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ঘরগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ে হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বন্দর উপজেলায় দুই কক্ষবিশিষ্ট এমন ১৫টি ঘরের কাগজপত্র ও চাবি উপকারভোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। রোববার দ্বিতীয় পর্যায়ে পুরো জেলায় ১৮২ জন গৃহহীনদের মাঝে ঘরের চাবি ও জমির কাগজ হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে প্রথমপর্যায়ে ৩৪৬টি পরিবারের মাঝে নতুন ঘর হস্তান্তর করা হয়।

এ সময় কথা হয় ঘর পাওয়া কয়েকজনের সঙ্গে। কাগজ ও চাবি হাতে বসে থাকা বৃদ্ধ জাহানার জানালেন, স্বামী জব্বার মিয়া দুর্ঘটনায় পা ভেঙে ৫ বছর যাবৎ বিছানায়। একটি ঝুটের কারখানায় কাপড় বেছে দিয়ে সপ্তাহে এক হাজার টাকা উপার্জন জাহানারা আক্তারের। পরের জমিতে ছাপড়া ঘর তুলে দশ বছর বয়সী মেয়ে ও পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে থাকতেন। এখন নিজের দুই শতাংশ জমি হয়েছে জাহানারার। পেয়েছেন নতুন ঘরও।

সবকিছুই অবিশ্বাস্য ঠেকছে তার। জানতে চাইলে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, আমি দুঃখিনী মানুষ। দুই মেয়েরে কোনোমতে বিয়া দিছি। স্বামী কাম করতে পারে না। ছোট মেয়েটারে নিয়া ছাপড়া ঘরে থাকতাম। ঝুট মিলে ত্যানা (কাপড়) বাইছা কিছু ট্যাকা পাই সেই ট্যাকায় দিন চলতো। নিজের জায়গায় নতুন ঘরে উঠমু, এমন কপাল যে হইবো তা কখনও ভাবি নাই।

নতুন ঘর ও জমির কাগজপত্র পাওয়া বৃদ্ধ মজিবর রহমান এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভাঙা ছাতা মেরামত করে বেড়ান। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে ট্রাকে নির্মাণসামগ্রী লোড-আনলোডের কাজ করেন। কখনও নিজের বাড়ি হবে তা কল্পনাতেও ছিল না মজিবরের। বন্দরের লাঙ্গলবন্দ এলাকায় মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়ায় টিনশেডের ঘরে থাকতেন।

মজিবর বলেন, এলাকায় এলাকায় ঘুইরা ছাতা ঠিক করি। বাপ-দাদারাও এই লাঙ্গলবন্দে থাকতো। তাগো লগে এক সময় গাঙের উপর নৌকায় থাকছি। তহোন থাকার কোনো জায়গা ছিল না। এহোন নিজের ঘর পাইছি। এই আনন্দ কইয়া বুঝাইতে পারমু না। শেখ সাবের বেটিরে ধন্যবাদ।

এক সময় ভিক্ষা করে জীবন চালানো পিয়ারা খাতুন অনুভূতি জানাতে গিয়ে কথাই বলতে পারছিলেন না। শুধু বললেন, শেখের বেটি ভিখারিরে রাজা বানাইছে, খোদা তারে আজীবন এ দেশের রাজা বানাইয়া রাখুক।

এ সময় জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, এই মানুষগুলোর আবেগ দেখে আমি নিজেও আবেগাপ্লুত। এভাবে গৃহহীনদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার ইতিহাস সম্ভবত দুনিয়াতে বিরল। যারা ঘর পাচ্ছেন, এই ঘরটি পুরোপুরি তাদের। দুই শতাংশ জায়গাসহ বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, এই ঘরের ইট, কাঠ, মাটি সব তাদের। উনারা এখানে গাছ লাগাতে পারবেন, পশু পালন করতে পারবেন, এখানে ব্যবসা করতে পারবেন। এই জায়গাটি দেখে রাখার দায়িত্ব তাদের।

জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের সমাজে কিছু ভূমিদস্যুও আছে। যারা বিভিন্ন লোভ-লালসা দেখায়। বন্দরের জমির অনেক দাম এসব কথা বলে তাদের খপ্পরে ফেলবে। এমনটা যাতে না হয় সেজন্য ইউএনও, ওসিকে নজরদারি রাখার অনুরোধ করেছি।

‘শেখের বেটি ভিখারিরে রাজা বানাইছে’

 রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 
২০ জুন ২০২১, ১০:৫৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
পিয়ারা খাতুন-মজিবর
পিয়ারা খাতুন-মজিবর

বর্ষাকালেই মাঝে মধ্যে কাজ পান বৃদ্ধ মজিবর। ভাঙা কিংবা নষ্ট ছাতা মেরামত করেন তিনি। ছেলে লোড-আনলোডের শ্রমিকের কাজ করেন। বন্দর এলাকার বাসিন্দা মজিবরের পূর্বপুরুষ সবাই থাকতেন নৌকায়। নিজের বাড়ি হবে- এমনটা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি। 

একই উপজেলার বৃদ্ধা পিয়ারা খাতুন। স্বামীহারা এই বৃদ্ধা এক সময় ভিক্ষা করতেন। চেয়ে-চিন্তে দিন কাটনো পিয়ারা খাতুনের। এখন এক টুকরো জমি আছে, সেই জমির উপর বাড়ি। এমন মজিবর, পিয়ারা খাতুনদের মতো অনেকের চোখেই ছিল আনন্দের অশ্রু। অনেকে মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে শুধুই কেঁদেছেন, অনেকে বাড়ির চাবি আর জমির দলিল পেয়েও বারবার দেখছিলেন সেটা। 

যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রোববার নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দুই শতাংশ জমির উপর নতুন ঘরের কাগজপত্র ও প্রতীকী চাবি তুলে দেওয়ার পর এমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেকের চোখেই ছিল বিস্ময় আর খুশির কান্না। 

গণভবন থেকে সকালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ঘরগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ে হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বন্দর উপজেলায় দুই কক্ষবিশিষ্ট এমন ১৫টি ঘরের কাগজপত্র ও চাবি উপকারভোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। রোববার দ্বিতীয় পর্যায়ে পুরো জেলায় ১৮২ জন গৃহহীনদের মাঝে ঘরের চাবি ও জমির কাগজ হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে প্রথমপর্যায়ে ৩৪৬টি পরিবারের মাঝে নতুন ঘর হস্তান্তর করা হয়।

এ সময় কথা হয় ঘর পাওয়া কয়েকজনের সঙ্গে। কাগজ ও চাবি হাতে বসে থাকা বৃদ্ধ জাহানার জানালেন, স্বামী জব্বার মিয়া দুর্ঘটনায় পা ভেঙে ৫ বছর যাবৎ বিছানায়। একটি ঝুটের কারখানায় কাপড় বেছে দিয়ে সপ্তাহে এক হাজার টাকা উপার্জন জাহানারা আক্তারের। পরের জমিতে ছাপড়া ঘর তুলে দশ বছর বয়সী মেয়ে ও পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে থাকতেন। এখন নিজের দুই শতাংশ জমি হয়েছে জাহানারার। পেয়েছেন নতুন ঘরও।  

সবকিছুই অবিশ্বাস্য ঠেকছে তার। জানতে চাইলে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, আমি দুঃখিনী মানুষ। দুই মেয়েরে কোনোমতে বিয়া দিছি। স্বামী কাম করতে পারে না। ছোট মেয়েটারে নিয়া ছাপড়া ঘরে থাকতাম। ঝুট মিলে ত্যানা (কাপড়) বাইছা কিছু ট্যাকা পাই সেই ট্যাকায় দিন চলতো। নিজের জায়গায় নতুন ঘরে উঠমু, এমন কপাল যে হইবো তা কখনও ভাবি নাই।

নতুন ঘর ও জমির কাগজপত্র পাওয়া বৃদ্ধ মজিবর রহমান এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভাঙা ছাতা মেরামত করে বেড়ান। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে ট্রাকে নির্মাণসামগ্রী লোড-আনলোডের কাজ করেন। কখনও নিজের বাড়ি হবে তা কল্পনাতেও ছিল না মজিবরের। বন্দরের লাঙ্গলবন্দ এলাকায় মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়ায় টিনশেডের ঘরে থাকতেন। 

মজিবর বলেন, এলাকায় এলাকায় ঘুইরা ছাতা ঠিক করি। বাপ-দাদারাও এই লাঙ্গলবন্দে থাকতো। তাগো লগে এক সময় গাঙের উপর নৌকায় থাকছি। তহোন থাকার কোনো জায়গা ছিল না। এহোন নিজের ঘর পাইছি। এই আনন্দ কইয়া বুঝাইতে পারমু না। শেখ সাবের বেটিরে ধন্যবাদ।

এক সময় ভিক্ষা করে জীবন চালানো পিয়ারা খাতুন অনুভূতি জানাতে গিয়ে কথাই বলতে পারছিলেন না। শুধু বললেন, শেখের বেটি ভিখারিরে রাজা বানাইছে, খোদা তারে আজীবন এ দেশের রাজা বানাইয়া রাখুক। 

এ সময় জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, এই মানুষগুলোর আবেগ দেখে আমি নিজেও আবেগাপ্লুত। এভাবে গৃহহীনদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার ইতিহাস সম্ভবত দুনিয়াতে বিরল। যারা ঘর পাচ্ছেন, এই ঘরটি পুরোপুরি তাদের। দুই শতাংশ জায়গাসহ বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, এই ঘরের ইট, কাঠ, মাটি সব তাদের। উনারা এখানে গাছ লাগাতে পারবেন, পশু পালন করতে পারবেন, এখানে ব্যবসা করতে পারবেন। এই জায়গাটি দেখে রাখার দায়িত্ব তাদের। 

জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের সমাজে কিছু ভূমিদস্যুও আছে। যারা বিভিন্ন লোভ-লালসা দেখায়। বন্দরের জমির অনেক দাম এসব কথা বলে তাদের খপ্পরে ফেলবে। এমনটা যাতে না হয় সেজন্য ইউএনও, ওসিকে নজরদারি রাখার অনুরোধ করেছি। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন