সরকারি চাকুরে ছেলের পাকা ঘরে ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধা মা-প্রতিবন্ধী বোনের
jugantor
সরকারি চাকুরে ছেলের পাকা ঘরে ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধা মা-প্রতিবন্ধী বোনের

  চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি  

২৬ জুলাই ২০২১, ১৮:১১:৩৬  |  অনলাইন সংস্করণ

খইরন খাতুন। শতবছর ছুঁই ছুঁই এই বৃদ্ধা চোখে দেখেন না। কানেও শোনেন না। বয়সের ভারে অনেকটাই ন্যুব্জ। ভাঙ্গাচোরা টিনের একটি ছাপড়া ঘরে বসবাস করেন। সেই ঘরের অর্ধেকটাজুড়ে রাখা আছে কাঠের খড়ি।

আর বাকি অংশে একটি ভাঙা খাটে মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে লিলি খাতুনকে নিয়ে কোনোমতে বসবাস করেন। নিজের রান্নাটাও নিজেকেই করে খেতে হয়। রাতবিরাতে বৃষ্টি এলে পানি গড়িয়ে পড়লেও ভিজেই রাত পার করতে হয় অসহায় এই মা-মেয়ের।

সেই ঘরের পাশেই সরকারি চাকরিজীবি একমাত্র ছেলের বিল্ডিং বাড়িতে রয়েছে ৩-৪টি কক্ষ। সেই কক্ষগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ মা এবং মানসিক ভারসাম্যহীন বোনের জায়গা হয়নি সেই বাড়িতে। এ নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কোনো কথা শোনেননি ছেলে খলিলুর রহমান।

শেষ বয়সে এসে ছেলের চরম অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার বোঁথর উত্তরপাড়া গ্রামের মৃত মোকসেদ খলিফার স্ত্রী খইরন খাতুন। তবে যুগান্তর প্রতিনিধি যাওয়ায় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। খবর শুনেই তড়িঘড়ি সোমবার দুপুরে স্বজনদের দিয়ে মা খইরন খাতুন ও বোনকে নিজ ঘরে তুলে নেন খলিলুর।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে পাবনা সেটেলমেন্ট অফিসের হিসাব সহকারী খলিলুর রহমানের টিনশেড পাকা ভবন। ভবনের বাইরের গ্রিলে এবং ঘরের সব দরজা তালাবদ্ধ। বাড়ির প্রবেশ মুখেও তালা দেয়া। নির্জন ওই বাড়ির ভেতরে মুরগি পালনের জন্য দুটি পরিত্যক্ত শেড রয়েছে। বাড়িতে লোকজন না থাকায় চারিদিক জঙ্গলে পরিপূর্ণ।

সেই ভবনের পাশেই ভাঙ্গাচোরা একটি টিনের ছাপড়া ঘরে দীর্ঘদিন ধরে মেয়ে লিলি খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করেন খলিলুরের মা খইরন খাতুন। ঘরের চারিদিকে উৎকট গন্ধ। যে বয়সে তার আরাম আয়েশে করার কথা, নাতি-নাতনিদের নিয়ে খুঁনসুটিতে ব্যস্ত থাকার কথা সেই বয়সে এসে ছেলের চরম অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন খইরন খাতুন।

জানা গেছে, একমাত্র ছেলে খলিল চাকরির সুবাদে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন পাবনা শহরে। মাঝে-মধ্যে এসে নামমাত্র বাজার করে দিয়ে গেলেও মা এবং মানসিক ভারসাম্যহীন বোনের কোনো খোঁজ নেন না। উল্টো বসতবাড়ির আঙিনায় করা শেডে কিছুদিন আগে ব্রয়লার মুরগির কিছু বাচ্চা তুলে দিয়ে গেছেন।

সেই মুরগির বাচ্চা দেখভাল করা এবং নিজের রান্না নিজেকে করে খেতে হয় খইরন খাতুনকে। অথচ একমাত্র ছেলেকে মানুষ করা এবং পড়াশোনা শেখাতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে ওই স্বামী পরিত্যক্তা ওই বৃদ্ধাকে। অথচ একমাত্র ছেলের চরম অবহেলার শিকার বৃদ্ধা খইরন খাতুনের ঠাঁই হয়নি ছেলের পাকা ভবনে।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, অনেক আগে তার স্বামী খইরন খাতুনকে ছেড়ে দেয়। খলিলসহ তিন সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করেছেন এই বৃদ্ধা। চরম অবহেলার শিকার হয়েও শেষ সম্বল তার সাড়ে ৪ বিঘা জমি পর্যন্ত ছেলের নামে লিখে দিয়েছেন। প্রতিটি মানুষই শেষ বয়সে এসে সুখের খোঁজ করে। কিন্তু মা-বোনের প্রতি এমন অবহেলা মেনে নেয়া যায় না। মাঝে মধ্যে এসে বাজার করে দিলেই কী সন্তানের দায়িত্ব পালন করা হয়? বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক। এর প্রতিকার হলে ভবিষ্যতে আর কোনো সন্তানই সাহস পাবে না এমন অমানবিক আচরণ করতে।

খইরন খাতুনকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করার পরেও ছেলের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায়নি। তবে বলেছেন, আমার কেউ নাই। ব্যাটার বউও নাই। বয়স হলে কী মানুষের মূল্য থাকে? এর বাইরে তিনি কোনো কথা বলতে পারেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খলিলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এলাকাবাসী শত্রুতা করে আপনাকে হয়তো ডেকে নিয়ে গেছেন। বিষয়টি সঠিক না। আমি একমাত্র ছেলে। চাকরির কারণে আমাকে বাইরে থাকতে হয়। প্রতি সপ্তাহে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি। ঈদের আগের দিনও গিয়েছিলাম। এই মাসেই আমার চাকরি শেষ। তখন গ্রামের বাড়িতে মায়ের সাথেই থাকবো। ঘরের চাবিও মায়ের কাছেই দেয়া ছিল। কিন্তু তারা থাকেনি। তবে আমাদের বাড়িতে আপনি গেয়েছিলেন শুনেছি। তারপরেই লোকজন দিয়ে আজকে (সোমবার) মা ও বোনকে আমার ঘরে তুলে দিয়েছি।

সরকারি চাকুরে ছেলের পাকা ঘরে ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধা মা-প্রতিবন্ধী বোনের

 চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি 
২৬ জুলাই ২০২১, ০৬:১১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

খইরন খাতুন। শতবছর ছুঁই ছুঁই এই বৃদ্ধা চোখে দেখেন না। কানেও শোনেন না। বয়সের ভারে অনেকটাই ন্যুব্জ। ভাঙ্গাচোরা টিনের একটি ছাপড়া ঘরে বসবাস করেন। সেই ঘরের অর্ধেকটাজুড়ে রাখা আছে কাঠের খড়ি। 

আর বাকি অংশে একটি ভাঙা খাটে মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে লিলি খাতুনকে নিয়ে কোনোমতে বসবাস করেন। নিজের রান্নাটাও নিজেকেই করে খেতে হয়। রাতবিরাতে বৃষ্টি এলে পানি গড়িয়ে পড়লেও ভিজেই রাত পার করতে হয় অসহায় এই মা-মেয়ের। 

সেই ঘরের পাশেই সরকারি চাকরিজীবি একমাত্র ছেলের বিল্ডিং বাড়িতে রয়েছে ৩-৪টি কক্ষ। সেই কক্ষগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ মা এবং মানসিক ভারসাম্যহীন বোনের জায়গা হয়নি সেই বাড়িতে। এ নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কোনো কথা শোনেননি ছেলে খলিলুর রহমান। 

শেষ বয়সে এসে ছেলের চরম অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার বোঁথর উত্তরপাড়া গ্রামের মৃত মোকসেদ খলিফার স্ত্রী খইরন খাতুন। তবে যুগান্তর প্রতিনিধি যাওয়ায় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। খবর শুনেই তড়িঘড়ি সোমবার দুপুরে স্বজনদের দিয়ে মা খইরন খাতুন ও বোনকে নিজ ঘরে তুলে নেন খলিলুর। 

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে পাবনা সেটেলমেন্ট অফিসের হিসাব সহকারী খলিলুর রহমানের টিনশেড পাকা ভবন। ভবনের বাইরের গ্রিলে এবং ঘরের সব দরজা তালাবদ্ধ। বাড়ির প্রবেশ মুখেও তালা দেয়া। নির্জন ওই বাড়ির ভেতরে মুরগি পালনের জন্য দুটি পরিত্যক্ত শেড রয়েছে। বাড়িতে লোকজন না থাকায় চারিদিক জঙ্গলে পরিপূর্ণ। 

সেই ভবনের পাশেই ভাঙ্গাচোরা একটি টিনের ছাপড়া ঘরে দীর্ঘদিন ধরে মেয়ে লিলি খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করেন খলিলুরের মা খইরন খাতুন। ঘরের চারিদিকে উৎকট গন্ধ। যে বয়সে তার আরাম আয়েশে করার কথা, নাতি-নাতনিদের নিয়ে খুঁনসুটিতে ব্যস্ত থাকার কথা সেই বয়সে এসে ছেলের চরম অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন খইরন খাতুন। 

জানা গেছে, একমাত্র ছেলে খলিল চাকরির সুবাদে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন পাবনা শহরে। মাঝে-মধ্যে এসে নামমাত্র বাজার করে দিয়ে গেলেও মা এবং মানসিক ভারসাম্যহীন বোনের কোনো খোঁজ নেন না। উল্টো বসতবাড়ির আঙিনায় করা শেডে কিছুদিন আগে ব্রয়লার মুরগির কিছু বাচ্চা তুলে দিয়ে গেছেন। 

সেই মুরগির বাচ্চা দেখভাল করা এবং নিজের রান্না নিজেকে করে খেতে হয় খইরন খাতুনকে। অথচ একমাত্র ছেলেকে মানুষ করা এবং পড়াশোনা শেখাতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে ওই স্বামী পরিত্যক্তা ওই বৃদ্ধাকে। অথচ একমাত্র ছেলের চরম অবহেলার শিকার বৃদ্ধা খইরন খাতুনের ঠাঁই হয়নি ছেলের পাকা ভবনে।