দিনে রিকশা উল্টে রাখা পুলিশ রাতে নিজেরাই উল্টে যান
jugantor
দিনে রিকশা উল্টে রাখা পুলিশ রাতে নিজেরাই উল্টে যান

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ  

২৯ জুলাই ২০২১, ০০:১৪:৪৬  |  অনলাইন সংস্করণ

দিনের আলো নিভতে না নিভতেই নারায়ণগঞ্জে লকডাউন আর কঠোর থাকছে না। বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে আনসার, র‌্যাবও জেলা পুলিশের সদস্যরা ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি লকডাউন মানাতে ছুটে বেড়ালেও সেই পরিশ্রমকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছেন কতিপয় পুলিশ সদস্যরাই।

এমনকি সন্ধ্যার পর রাত ১১টা অবধি বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নারায়ণগঞ্জের প্রাণ কেন্দ্র চাষাঢ়া এলাকায় সদর থানা পুলিশকে টাকা দিয়ে বসে পরোটা মাংসের ভ্রাম্যমাণ দোকান।

সদর থানা এলাকার মাত্র কয়েকশ গজের মধ্যে একাধিক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড থাকলেও নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামান ‘কিছুই জানেন না’ বলে রীতিমতো অবাক হয়েছেন।

যদিও চাষাঢ়া এলাকার এসব ভ্রাম্যমাণ পরোটা মাংসের দোকানিরা অকপটে স্বীকার করেছেন, লকডাউনের আগে দিতেন ১০০ টাকা কিন্তু লকডাউনের কারণে দিতে হচ্ছে ২০০ টাকা।

তারা আরও জানালেন, রাতে ডিউটি করা পুলিশ সদস্যরাই এখানে বসে ‘খানাপিনা’ করেন। কারণ সারা রাত ডিউটি করলে তাদের ঘন ঘন ক্ষুধা পায়।

এদিকে চাষাঢ়া এলাকায় থাকা কয়েকজন রিকশাচালক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘পুলিশ রিকশা আটকাইয়া দিবে জেনেও পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বের হই। সকালে বা দুপুরে রিকশা ধইরা উলটাইয়া রাখে পুলিশ। আবার রাতে সেই পুলিশই দেখি নিজেরাই উলটাইয়া যায়। অটো থেইকা টাকা নেয়, বইসা আড্ডা দেয়, ফ্রি পরোটা মাংস খায়। এক দেশে ২ রকম বিচার কেমনে?'

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা গত ২ সপ্তাহ ধরেই ‘ডাবল সেঞ্চুরি’র ঘরে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও রয়েছে গড়ে ৪ থেকে ৫ জন। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি জেলা প্রশাসনের মোট ২৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পুরো জেলায় কাজ করছেন। সঙ্গে থাকছেন সেনাবাহিনী, ব্যাটালিয়ন আনসার ও র্যাব।

এছাড়াও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ২২টি চেকপোস্ট বসিয়ে লকডাউন বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে কঠোরতার সঙ্গেই। কিন্তু এসব পরিশ্রমকে ম্লান করে দিচ্ছে সদর থানা পুলিশের উদাসীনতা।

চলমান কঠোর লকডাউনের আগের লকডাউনগুলোতেও নগরীর প্রাণ কেন্দ্র চাষাঢ়া এলাকাতে রাত ৯টা থেকে ভোর পর্যন্ত দেখা গেছে প্রায় ১ ডজন ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। খোদ পুলিশ চেকপোস্টের সামনেই এসব দোকান এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাইভেটকার নিয়ে লোকজন আসতেন বসে খাবার খেতে।

এমনকি সদর থানা পুলিশের টহল দলের জন্য এসব খাবার দোকান ছিল ফ্রি, যা দোকানিরা নাম দিয়েছিলেন ‘ফি সাবিলিল্লাহ’। এসব নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুবার সচিত্র প্রতিবেদন আসলেও ভ্রূক্ষেপ ছিল না সদর থানা পুলিশের।

চলমান কঠোর লকডাউনে শুধু শহরের প্রাণ কেন্দ্র চাষাঢ়াই নয়, নগরীর কালীরবাজার এলাকা, ২নং রেলগেট এলাকা, জিমখানা এলাকায় এখনো বলবত রয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা দিন-রাত লকডাউন বাস্তবায়নে কাজ করছি। সদর ইউএনও আরিফা জোহরা অফিস শেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন লকডাউন বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু রাতের বেলায় যখন দেখি শহরের প্রাণকেন্দ্রে পুলিশের সামনে লকডাউনের বালাই নেই, তখন খুব কষ্ট হয় আমাদের।

অপরদিকে বিষয়টি নিয়ে সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামানকে প্রশ্ন করলে তিনি এমন ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বা অটোস্ট্যান্ড আছে বলে জানেনই না বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

উল্টো তিনি প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, আমি খোঁজ নিয়ে সেগুলো বন্ধ করব।

উল্লেখ্য, চলতি বছর সদর মডেল থানার মাত্র দেড়শ গজ দূরে একটি ব্যবসায়িক সংগঠনের ক্লাবে র্যাবের অভিযানে জুয়ার আসরে অভিযানের পরও ওসি শাহ জামান বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন তিনি কিছুই জানতেন না।

দিনে রিকশা উল্টে রাখা পুলিশ রাতে নিজেরাই উল্টে যান

 রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 
২৯ জুলাই ২০২১, ১২:১৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

দিনের আলো নিভতে না নিভতেই নারায়ণগঞ্জে লকডাউন আর কঠোর থাকছে না। বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে আনসার, র‌্যাব ও জেলা পুলিশের সদস্যরা ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি লকডাউন মানাতে ছুটে বেড়ালেও সেই পরিশ্রমকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছেন কতিপয় পুলিশ সদস্যরাই।

এমনকি সন্ধ্যার পর রাত ১১টা অবধি বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নারায়ণগঞ্জের প্রাণ কেন্দ্র চাষাঢ়া এলাকায় সদর থানা পুলিশকে টাকা দিয়ে বসে পরোটা মাংসের ভ্রাম্যমাণ দোকান।

সদর থানা এলাকার মাত্র কয়েকশ গজের মধ্যে একাধিক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড থাকলেও নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামান ‘কিছুই জানেন না’ বলে রীতিমতো অবাক হয়েছেন।

যদিও চাষাঢ়া এলাকার এসব ভ্রাম্যমাণ পরোটা মাংসের দোকানিরা অকপটে স্বীকার করেছেন, লকডাউনের আগে দিতেন ১০০ টাকা কিন্তু লকডাউনের কারণে দিতে হচ্ছে ২০০ টাকা।

তারা আরও জানালেন, রাতে ডিউটি করা পুলিশ সদস্যরাই এখানে বসে ‘খানাপিনা’ করেন। কারণ সারা রাত ডিউটি করলে তাদের ঘন ঘন ক্ষুধা পায়।

এদিকে চাষাঢ়া এলাকায় থাকা কয়েকজন রিকশাচালক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘পুলিশ রিকশা আটকাইয়া দিবে জেনেও পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বের হই। সকালে বা দুপুরে রিকশা ধইরা উলটাইয়া রাখে পুলিশ। আবার রাতে সেই পুলিশই দেখি নিজেরাই উলটাইয়া যায়। অটো থেইকা টাকা নেয়, বইসা আড্ডা দেয়, ফ্রি পরোটা মাংস খায়। এক দেশে ২ রকম বিচার কেমনে?'

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা গত ২ সপ্তাহ ধরেই ‘ডাবল সেঞ্চুরি’র ঘরে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও রয়েছে গড়ে ৪ থেকে ৫ জন। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি জেলা প্রশাসনের মোট ২৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পুরো জেলায় কাজ করছেন। সঙ্গে থাকছেন সেনাবাহিনী, ব্যাটালিয়ন আনসার ও র্যাব।

এছাড়াও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ২২টি চেকপোস্ট বসিয়ে লকডাউন বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে কঠোরতার সঙ্গেই। কিন্তু এসব পরিশ্রমকে ম্লান করে দিচ্ছে সদর থানা পুলিশের উদাসীনতা।

চলমান কঠোর লকডাউনের আগের লকডাউনগুলোতেও নগরীর প্রাণ কেন্দ্র চাষাঢ়া এলাকাতে রাত ৯টা থেকে ভোর পর্যন্ত দেখা গেছে প্রায় ১ ডজন ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। খোদ পুলিশ চেকপোস্টের সামনেই এসব দোকান এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাইভেটকার নিয়ে লোকজন আসতেন বসে খাবার খেতে।

এমনকি সদর থানা পুলিশের টহল দলের জন্য এসব খাবার দোকান ছিল ফ্রি, যা দোকানিরা নাম দিয়েছিলেন ‘ফি সাবিলিল্লাহ’। এসব নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুবার সচিত্র প্রতিবেদন আসলেও ভ্রূক্ষেপ ছিল না সদর থানা পুলিশের।

চলমান কঠোর লকডাউনে শুধু শহরের প্রাণ কেন্দ্র চাষাঢ়াই নয়, নগরীর কালীরবাজার এলাকা, ২নং রেলগেট এলাকা, জিমখানা এলাকায় এখনো বলবত রয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা দিন-রাত লকডাউন বাস্তবায়নে কাজ করছি। সদর ইউএনও আরিফা জোহরা অফিস শেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন লকডাউন বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু রাতের বেলায় যখন দেখি শহরের প্রাণকেন্দ্রে পুলিশের সামনে লকডাউনের বালাই নেই, তখন খুব কষ্ট হয় আমাদের।

অপরদিকে বিষয়টি নিয়ে সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামানকে প্রশ্ন করলে তিনি এমন ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বা অটোস্ট্যান্ড আছে বলে জানেনই না বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

উল্টো তিনি প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, আমি খোঁজ নিয়ে সেগুলো বন্ধ করব।

উল্লেখ্য, চলতি বছর সদর মডেল থানার মাত্র দেড়শ গজ দূরে একটি ব্যবসায়িক সংগঠনের ক্লাবে র্যাবের অভিযানে জুয়ার আসরে অভিযানের পরও ওসি শাহ জামান বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন তিনি কিছুই জানতেন না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন