খুন হওয়া সেই জালাল এখন বাড়িতে!

  হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি ০৪ মে ২০১৮, ২২:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের উত্তর লাকুহাটি গ্রামের জালাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে খুন করা হয়েছে এমন অভিযোগে ২০১০ সালের ৩১ মার্চ পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছিল হোসেনপুর থানায়। এ অভিযোগে আসামিরা জেলহাজত খাটাসহ নানা হয়রানির শিকার হন।

খুন হওয়া সেই জালাল এখন নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন। তাকে কেউ অপহরণ করেনি। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ৯ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার খাড়েরা গ্রামে পালিয়ে ছিলেন তিনি। সে উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের লাকুহাটি গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে।

এ দীর্ঘ সময় সেখানে তিনি কাঠ ও লাকড়ির ব্যবসা করতেন। জালাল ওই গ্রামের হাজি হেলো মিয়ার বাসায় ভাড়া থাকতেন। খাড়েরা বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম ও সেক্রেটারি মো. জহিরুল হক এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জালালকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগে করা মামলাটি আদালতের আদেশে আবার তদন্ত করছে পুলিশ। জানতে চাইলে হোসেনপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আরাফাতুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে জালালকে কেউ অপহরণ করেনি। তিনি নিজেই কসবার একটি গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন। সেখানে তিনি কাঠের ব্যবসা করতেন। এ তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই চলছে, সত্য হলে মামলার বাদী ও জালালের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করা হবে।

সম্প্রতি জালালের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলতে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। কথা বলতেও রাজি হয়নি তার পরিবারের লোকজন।

জালালের দুই রকম জবানবন্দি

গত ১৫ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে হঠাৎ হাজির হন এবং আইনজীবীর মাধ্যমে জালাল জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য আসামিদের তিনি ২৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। পরে আসামি আজহারুল ইসলাম, রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু মিয়া ও হিরা মিয়া তাকে নিয়ে ঢাকায় যান। ঢাকার চিটাগাং রোডে গিয়ে অন্য আসামি শঙ্কর বাবু ও আসাদ মল্লিকের কাছে তাকে রেখে যান তারা।

পরে তাকে বিদেশ না পাঠিয়ে বিভিন্ন কৌশলে আটকে রাখেন এবং চেতনানাশক প্রয়োগ করে অচেতন করে রাখেন। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তিনি নিজেকে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে আবিষ্কার করেন। তখন স্ত্রী, সন্তান ও বাড়ির কথা মনে হলে অনেক কষ্টে বাড়ি ফেরেন তিনি।

জজ আদালতের নির্দেশে বর্তমানে মামলাটি আবার তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শুরু হওয়ার পর জালাল আবার নিম্ন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ জবানবন্দিতে তিনি আর ২৫ লাখ টাকার কথা বলেননি। বলেছেন, বিদেশে যেতে তিনি আড়াই লাখ টাকা দিয়েছেন এবং ৮৫ দিন তাকে নানা অজুহাতে আটকে রাখেন আদম ব্যবসায়ী শঙ্কর। পরে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।

এরপর আবার দু-একদিন পর তিন আসামি আজহার, হিরা ও রঙ্গু মিয়া তাকে শঙ্করের কাছে নিয়ে যান। এর পরের ঘটনা তার আর মনে নেই। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি বিক্রমপুর থেকে বাড়িতে আসেন।

খাড়েরা বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম যুগান্তরকে বলেন, আমার একটি দোকান ভাড়া নিয়ে জালাল দীর্ঘদিন ধরে কাঠের ব্যবসা করে আসছিল। তার চলে যাওয়ায় তিন মাস ধরে দোকানটি বন্ধ রয়েছে। সে যে এলাকার লোকজনকে ফাঁসিয়ে খাড়েরা বাজারে আস্তানা গেড়েছে, এটা আমাদের জানা ছিল না। আমরা তাকে সুস্থ শরীরে খাড়েরা বাজারে ব্যবসা করতে দেখেছি। তার আচরণেও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখতে পাইনি।

খাড়েরা গ্রামের বাসিন্দা মো. শিপন মিয়া বলেন, জালালের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে চার-পাঁচ মাস আগে আমার কাছে তার পালিয়ে থাকা ও মামলা-মোকদ্দমাসহ সব কিছু খুলে বলে। শেষের দিকে সে খুব কান্নাকাটি করেছে। আমি তাকে বাড়িতে ফিরে গিয়ে সব কিছুর সমাধান করতে পরামর্শ দিই।

জানা গেছে, জালাল এলাকায় ভাঙ্গারি ব্যবসা করতেন। বিদেশে যাওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা এক আদম ব্যবসায়ীকে দিয়েছিলেন জালাল। পরে বাকি টাকা পরিশোধ হয়নি বলে তার বিদেশ যাওয়া হয়নি। এ সমস্যা থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।

লাকুহাটি গ্রামের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়েই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে জালালের স্ত্রী ললিতা বেগম তার স্বামীকে অজ্ঞাত স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে ‘অপহরণ ও হত্যা’ মামলাটি করেন।

২০০৯ সালের ১০ জুলাই অপহরণের পর খুনসহ লাশ গুমের অভিযোগে তার স্ত্রী ললিতা বেগম ২০১০ সালের ৩১ মার্চ হোসেনপুর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে মামলাটি করেন।

মামলার আসামিরা হলেন- পাশের গাঙ্গাটিয়া গ্রামের শঙ্কর সূত্রধর, সৈয়দপুর গ্রামের রহমত উল্লাহ মল্লিকের ছেলে মো. আসাদ মল্লিক, একই গ্রামের আবদুল ব্যাপারীর ছেলে আজহারুল ইসলাম, গাঙ্গাটিয়া গ্রামের মুর্শেদ আলীর ছেলে রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু ও হরিচন্দ্র পট্টির হিরা মিয়া।

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা হোসেনপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খুর্শেদ আলম বলেন, তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এখন শুধু যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এগুলো শেষ করেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

 

 

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.