রোহিঙ্গার আশ্রয়ে বহুমাত্রিক সমস্যা, হুমকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
jugantor
রোহিঙ্গার আশ্রয়ে বহুমাত্রিক সমস্যা, হুমকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

  শফিক আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি  

২৫ আগস্ট ২০২১, ০৯:০১:১৯  |  অনলাইন সংস্করণ

রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গা সংকটের চার বছর পার হলো আজ বুধবার। মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর এ দেশে রোহিঙ্গার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রীর মানবিকতার এসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নেন উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে। সেখানে গড়ে তোলেন বসতি। এর পর থেকে উজাড় হতে থাকে বনসম্পদ। বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী ও পাহাড়। দখল হয়ে গেছে শ্রমবাজার, হুমকির মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বর্তমানে বহুমাত্রিক সমস্যায় স্থানীয়রা।

সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চার বছর পূর্ণ হলো। গত চার বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে নানান সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা। তারা চান রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত যান।

বালুখালী এলাকার মৌলভী গফুর উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক চিন্তা করে নিজের জমিতে আশ্রয় দিয়েছিলাম। বর্তমানে জমির মালিক বলে দাবি করতে পারছি না। রোহিঙ্গাদের কথায় ক্যাম্প প্রশাসন আমাদের ২০ একর জমি দখল করে এনজিওদের ভাড়া দিয়েছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সব দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে তিনি জানান।

কুতুপালং এলাকার রহিম উদ্দিন নামে এক কৃষক বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে ধান চাষ বন্ধ রয়েছে। অথচ এ জমি আমাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু গেল চার বছরে ধান চাষ বন্ধ থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।

ক্যাম্প লাগোয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার কৃষক জমির আহমেদ বলেন, ক্যাম্পের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, পচনশীল ময়লা, মানব বর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে অতিষ্ঠ আমরা। কোনোভাবেই এ বর্জ্য ফেলানো ঠেকানো যাচ্ছে না। ১৫০ একর ধানি জমি চার বছর ধরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে গেছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

রাজাপালং ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, একটি ড্রেন নির্মাণ করে পানি নিষ্কাশনের জন্য নানা জায়গায় আবেদন করেও সাড়া দেয়নি কেউ। দফায় দফায় কৃষকদের নিয়ে প্রশাসন, এনজিও কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়েও কোনো কাজ হয়নি। এর পরও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করা হয়েছে।

বিলুপ্তির পথে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য
এ সময়ে বন্যপ্রাণীর অভ্যয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা, টিভি রিলে কেন্দ্র, তাজনির মারখোলা, শফিউল্লাহ কাটায় রোহিঙ্গা বসতির কারণে এ অঞ্চলে বসবাসরত এশিয়া প্রজাতির বন্যহাতি বিলুপ্তপ্রায়। একসময় ওই অঞ্চলে আড়াইশর বেশি বন্যহাতির অবস্থান থাকলেও ইতোমধ্যে তারা নিরাপদ বাসস্থান হারিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমিয়েছে। একসময় চট্টগামের দোহাজারি ও চুনতি রেঞ্জে উখিয়ার পাহাড়ি বনভূমিতে ঘুরে বেড়াত এশিয়া প্রজাতির ইন্ডিয়া উপপ্রজাতির হাতিগুলো।

আইইউর তথ্যমতে, কক্সবাজারের উত্তর-দক্ষিণ বনভূমিতে ৪৬-৭৮টি বন্যহাতির বিচরণ ছিল। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। বর্তমানে উজাড় হওয়া বন ও পাহাড়ে গড়ে উঠেছে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসতি। এতে বিলুপ্তির পথে বসেছে বন্যহাতিসহ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।

টিভি রিলে কেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির ভুট্টো বলেন, আজ থেকে তিন বছর আগে বন্যহাতির ভয়ে এই এলাকায় কোনো সাধারণ মানুষ রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারত না। সড়কের ওপর বন্যহাতির দল দাঁড়িয়ে থাকার কারণে রাতে যানবাহন চলাচলে সৃষ্টি হতো বাধাগ্রস্ত। কিন্তু তা এখন আর চোখে পড়ে না। রোহিঙ্গা বসতির কারণে বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে।

উখিয়ার রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী শফিউল আলম জানান, মূলত এ এলাকাটি বন্যহাতির মূল বিচরণের ক্ষেত্র ছিল। বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গা বসতি গড়ে ওঠার কারণে বন্যহাতির দল আবাসস্থল হারিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির অষ্টম সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন নিবন্ধিত রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমিতে বসতি স্থাপন করেছে। পুরনো দুটি নিবন্ধিত ক্যাম্প এবং নতুন অনিবন্ধিত ৩২টি ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গাদের মোট ক্যাম্প ৩৪টি।

ছয় হাজার ১৬৪ দশমিক দুই একর বনভূমি দখল করে এসব ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। এতে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, ভূমিরূপ পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বনজ সম্পদের ক্ষতি টাকার অঙ্কে প্রায় ৪৫৭ কোটি টাকা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রায় এক হাজার ৪০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। মোট ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

এতে আরও বলা হয়, ৫৮০ একর সৃজিত বন এবং এক হাজার ২৫৭ একর প্রাকৃতিক বনসহ ক্যাম্প এলাকার বাইরে জ্বালানি সংগ্রহে রোহিঙ্গারা বনাঞ্চল উজাড় করেছে এক হাজার ৮৩৫ একর। সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণে মোট ধ্বংসপ্রাপ্ত বনের পরিমাণ ৮০০১ দশমিক ০২ একর এবং সর্বমোট বনজদ্রব্য ও জীববৈচিত্র্যসহ ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৪২০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত ৪ বছরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন রোহিঙ্গারা। দিন দিন জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ কর্মকাণ্ডে। ইয়াবা, মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্র চোরাচালান তাদের একমাত্র ব্যবসা। যার কারণে হুমকিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক দায়িত্বরত এপিবিএন ৮-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন জানান, চলতি বছর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩৬ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে ১০৯ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়।

অতিরিক্ত শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. শামসুদ্দোজ্জা বলেন, সাড়ে ছয় হাজার একর বনভূমিতে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। প্রথম দিকে রোহিঙ্গা আশ্রয় ফলে বনজ সম্পদের কিছুটা ক্ষতি হলেও পরে বনায়নের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে বনায়ন করা হয়েছে৷ তবে এ মুহূর্তে কী পরিমাণ বনায়ন সৃজন করা হয়েছে তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গার আশ্রয়ে বহুমাত্রিক সমস্যা, হুমকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

 শফিক আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি 
২৫ আগস্ট ২০২১, ০৯:০১ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
রোহিঙ্গা
ছবি: যুগান্তর

রোহিঙ্গা সংকটের চার বছর পার হলো আজ বুধবার। মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর এ দেশে রোহিঙ্গার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রীর মানবিকতার এসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নেন উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে। সেখানে গড়ে তোলেন বসতি। এর পর থেকে উজাড় হতে থাকে বনসম্পদ। বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী ও পাহাড়। দখল হয়ে গেছে শ্রমবাজার, হুমকির মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বর্তমানে বহুমাত্রিক সমস্যায় স্থানীয়রা।

সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চার বছর পূর্ণ হলো। গত চার বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে নানান সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা। তারা চান রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত যান।

বালুখালী এলাকার মৌলভী গফুর উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক চিন্তা করে নিজের জমিতে আশ্রয় দিয়েছিলাম। বর্তমানে জমির মালিক বলে দাবি করতে পারছি না। রোহিঙ্গাদের কথায় ক্যাম্প প্রশাসন আমাদের ২০ একর জমি দখল করে এনজিওদের ভাড়া দিয়েছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সব দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে তিনি জানান।