কানের দুলে ধরা পড়ল খুনি!
jugantor
কানের দুলে ধরা পড়ল খুনি!

  চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি  

২৬ আগস্ট ২০২১, ১৮:৫৬:২৮  |  অনলাইন সংস্করণ

ইমন হোসেন

দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র ইমন হোসেন (১৬)। করোনাকালীন স্কুল বন্ধ থাকায় এবং বাবা জাকিরুল ইসলাম অসুস্থ হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে বই-খাতা ছেড়ে হয়েছিল সিএনজিচালক। টেনেটুনে কোনোমতে চলছিল সংসার। ইচ্ছা ছিল এবার এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে।

কিন্তু বিধিবাম, গত ১৮ আগস্ট বুধবার রাতে সিএনজি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রীবেশে একই এলাকার সমবয়সী কয়েকজন বখাটে ইমনকে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেয়। শুধু তাই নয়, হত্যার পর খুনিরা সবাই নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিল এবং লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে ইমনের লাশ দেখেও আসে। নির্মম এ ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার চাটমোহর উপজেলায়। গত ২০ আগস্ট চাটমোহর-হান্ডিয়াল সড়কের ভাঙ্গাব্রিজ এলাকা থেকে স্কুলছাত্র ইমনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে চাটমোহর থানায় ইমনের বাবা-মাকে সঙ্গে করে পাবনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান (বিপিএম বার) ইমন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করেন। এদিকে পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে পার পায়নি ঘাতকরা। ইমনের লাশ উদ্ধারের পর একে একে পুলিশের হাতে আটক হয় ৫ ঘাতক। পরে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে পাবনা আদালতে হাজির করা হলে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ঘাতকরা। অন্যদিকে ছেলের এমন নির্মম মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।

গ্রেফতারকৃতরা হলো- নিমাইচড়া ইউনিয়নের চিনাভাতকুর গ্রামের শামসুল মণ্ডলের ছেলে নুরুজ্জামান মণ্ডল (৩৪), রবিউল ইসলামের ছেলে হৃদয় হোসেন (১৯), রুস্তম আলীর ছেলে সেলিম হোসেন ওরফে জেলিম (১৯), মির্জাপুর গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে হুমায়ন কবির ওরফে টুটুল (১৬) এবং রওশন প্রামাণিকের ছেলে রাকিবুল ইসলাম (১৯)।

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২০ আগস্ট সকালে পুলিশ যখন স্কুলছাত্র ইমনের লাশ উদ্ধার নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন যেখান থেকে খুনিরা ইমনের সিএনজি ভাড়া করেছিল (মান্নাননগর) সেখানে ছুটে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম (অপরাধ), স্নিগ্ধ আখতার (বিশেষ শাখা) ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (চাটমোহর সার্কেল) সজীব শাহরীন।

সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন এবং ওই চারজনের শারীরিক গঠনের বর্ণনা শোনেন ওই তিন কর্মকর্তা।

এর মধ্যে স্থানীয় এক ব্যক্তি তথ্য দেন, ইমনের সিএনজি ভাড়া করা ওই চারজনের মুখেই ছিল মাস্ক। তবে একজনের কান ফুটো করা ছিল এবং সেই ফুটোতে গহনা জাতীয় (কানের দুল) কিছু একটা লাগানো ছিল। মূলত শারীরিক গঠন এবং কানের দুলের সূত্র ধরেই পুলিশের ওই কর্মকর্তারা প্রথমে চিনাভাতকুর এলাকায় এসে স্থানীয় লোকজনকে খুনিদের শারীরিক গঠন এবং কানের দুল পরিহিত এলাকায় কেউ আছে কিনা জানতে চান।

এরপরই ইমন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নিজ বাড়ি থেকে প্রথমে নুরুজ্জামান নামে একজনকে আটক করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার কথা স্বীকার করে। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয় মূল পরিকল্পনাকারী রাকিবুলসহ ৪ জনকে। এদের মধ্যে রাকিবুলের কানে দুল ছিল। উদ্ধার করা হয় ছিনতাই হওয়া সিএনজিও।

পুলিশ সুপার বলেন, ইমন উপজেলার সমাজ আশরাফ জিন্দানি স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ও নিমাইচড়া ইউনিয়নের মাঝগ্রামের জাকিরুল ইসলামের ছেলে। করোনা মহামারিতে স্কুল বন্ধ থাকায় সিএনজি চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করতো।

গত ১৮ আগস্ট বুধবার রাতে পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগর এলাকা থেকে যাত্রীবেশে ৪ জন সিএনজি ভাড়া করে চাটমোহরে আসতে চায়। পরে ইমন সিএনজি নিয়ে চাটমোহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে পথিমধ্যে চাটমোহর-হান্ডিয়াল সড়কের ভাঙ্গাব্রিজ এলাকায় আসার পর পেছন থেকে হাত-পা বেঁধে ইমনকে হত্যা করে রাস্তার পাশে তার লাশ ফেলে রেখে যায় আসামিরা।

এর দুই দিন পর স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ওই এলাকা থেকে ইমনের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে ছিনতাই হওয়া সিএনজি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে নুরুজ্জামানকে আটক করা হয় শারীরিক বর্ণনার মাধ্যমে। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও চারজনকে আটক করা হয়।

এ ঘটনায় স্কুলছাত্র ইমনের বাবা বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করার পর আটককৃতদের গ্রেফতার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে ঘাতকরা সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

খুনিদের মধ্যে রাকিবুল মূল পরিকল্পনাকারী। তার নামে থানায় পূর্বে একটি ছিনতাইয়ের মামলা ছিল। বাকিরা সবাই এলাকায় ছোটখাটো অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মূলত হত্যা করে সিএনজি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল আসামিদের-এমনটাই জানান পুলিশ সুপার।

কানের দুলে ধরা পড়ল খুনি!

 চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি 
২৬ আগস্ট ২০২১, ০৬:৫৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ইমন হোসেন
নিহত ইমন হোসেন

দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র ইমন হোসেন (১৬)। করোনাকালীন স্কুল বন্ধ থাকায় এবং বাবা জাকিরুল ইসলাম অসুস্থ হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে বই-খাতা ছেড়ে হয়েছিল সিএনজিচালক। টেনেটুনে কোনোমতে চলছিল সংসার। ইচ্ছা ছিল এবার এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে। 

কিন্তু বিধিবাম, গত ১৮ আগস্ট বুধবার রাতে সিএনজি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রীবেশে একই এলাকার সমবয়সী কয়েকজন বখাটে ইমনকে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেয়। শুধু তাই নয়, হত্যার পর খুনিরা সবাই নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিল এবং লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে ইমনের লাশ দেখেও আসে। নির্মম এ ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার চাটমোহর উপজেলায়। গত ২০ আগস্ট চাটমোহর-হান্ডিয়াল সড়কের ভাঙ্গাব্রিজ এলাকা থেকে স্কুলছাত্র ইমনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 

বৃহস্পতিবার সকালে চাটমোহর থানায় ইমনের বাবা-মাকে সঙ্গে করে পাবনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান (বিপিএম বার) ইমন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করেন। এদিকে পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে পার পায়নি ঘাতকরা। ইমনের লাশ উদ্ধারের পর একে একে পুলিশের হাতে আটক হয় ৫ ঘাতক। পরে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে পাবনা আদালতে হাজির করা হলে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ঘাতকরা। অন্যদিকে ছেলের এমন নির্মম মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। 

গ্রেফতারকৃতরা হলো- নিমাইচড়া ইউনিয়নের চিনাভাতকুর গ্রামের শামসুল মণ্ডলের ছেলে নুরুজ্জামান মণ্ডল (৩৪), রবিউল ইসলামের ছেলে হৃদয় হোসেন (১৯), রুস্তম আলীর ছেলে সেলিম হোসেন ওরফে জেলিম (১৯), মির্জাপুর গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে হুমায়ন কবির ওরফে টুটুল (১৬) এবং রওশন প্রামাণিকের ছেলে রাকিবুল ইসলাম (১৯)।

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২০ আগস্ট সকালে পুলিশ যখন স্কুলছাত্র ইমনের লাশ উদ্ধার নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন যেখান থেকে খুনিরা ইমনের সিএনজি ভাড়া করেছিল (মান্নাননগর) সেখানে ছুটে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম (অপরাধ), স্নিগ্ধ আখতার (বিশেষ শাখা) ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (চাটমোহর সার্কেল) সজীব শাহরীন। 

সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন এবং ওই চারজনের শারীরিক গঠনের বর্ণনা শোনেন ওই তিন কর্মকর্তা।

এর মধ্যে স্থানীয় এক ব্যক্তি তথ্য দেন, ইমনের সিএনজি ভাড়া করা ওই চারজনের মুখেই ছিল মাস্ক। তবে একজনের কান ফুটো করা ছিল এবং সেই ফুটোতে গহনা জাতীয় (কানের দুল) কিছু একটা লাগানো ছিল। মূলত শারীরিক গঠন এবং কানের দুলের সূত্র ধরেই পুলিশের ওই কর্মকর্তারা প্রথমে চিনাভাতকুর এলাকায় এসে স্থানীয় লোকজনকে খুনিদের শারীরিক গঠন এবং কানের দুল পরিহিত এলাকায় কেউ আছে কিনা জানতে চান।

এরপরই ইমন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নিজ বাড়ি থেকে প্রথমে নুরুজ্জামান নামে একজনকে আটক করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার কথা স্বীকার করে। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয় মূল পরিকল্পনাকারী রাকিবুলসহ ৪ জনকে। এদের মধ্যে রাকিবুলের কানে দুল ছিল। উদ্ধার করা হয় ছিনতাই হওয়া সিএনজিও। 

পুলিশ সুপার বলেন, ইমন উপজেলার সমাজ আশরাফ জিন্দানি স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ও নিমাইচড়া ইউনিয়নের মাঝগ্রামের জাকিরুল ইসলামের ছেলে। করোনা মহামারিতে স্কুল বন্ধ থাকায় সিএনজি চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করতো। 

গত ১৮ আগস্ট বুধবার রাতে পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগর এলাকা থেকে যাত্রীবেশে ৪ জন সিএনজি ভাড়া করে চাটমোহরে আসতে চায়। পরে ইমন সিএনজি নিয়ে চাটমোহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে পথিমধ্যে চাটমোহর-হান্ডিয়াল সড়কের ভাঙ্গাব্রিজ এলাকায় আসার পর পেছন থেকে হাত-পা বেঁধে ইমনকে হত্যা করে রাস্তার পাশে তার লাশ ফেলে রেখে যায় আসামিরা। 

এর দুই দিন পর স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ওই এলাকা থেকে ইমনের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে ছিনতাই হওয়া সিএনজি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে নুরুজ্জামানকে আটক করা হয় শারীরিক বর্ণনার মাধ্যমে। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও চারজনকে আটক করা হয়।

এ ঘটনায় স্কুলছাত্র ইমনের বাবা বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করার পর আটককৃতদের গ্রেফতার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে ঘাতকরা সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। 

খুনিদের মধ্যে রাকিবুল মূল পরিকল্পনাকারী। তার নামে থানায় পূর্বে একটি ছিনতাইয়ের মামলা ছিল। বাকিরা সবাই এলাকায় ছোটখাটো অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মূলত হত্যা করে সিএনজি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল আসামিদের-এমনটাই জানান পুলিশ সুপার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন