স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অবহেলিত রৌমারীর যোগাযোগ ব্যবস্থা
jugantor
স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অবহেলিত রৌমারীর যোগাযোগ ব্যবস্থা

  কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি  

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:০১:২৪  |  অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত উপজেলা রৌমারীতে। রাস্তা, সেতু, কালভার্ট না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে উত্তরের সীমান্তবর্তী উপজেলার মানুষদের।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশের একমাত্র মুক্ত অঞ্চলখ্যাত উত্তরের সর্বশেষ উপজেলা রৌমারী। কুড়িগ্রাম সদরের সাথে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই উপজেলার রয়েছে ব্রহ্মপূত্র,জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, কালো, ধরণী, সোনাভরি ও জালছিড়াসহ ৬টি নদী। এখানে রয়েছে অসংখ্য জলাশয়,খাল-বিল। এসব খাল-বিলের উপর নির্মিত প্রায় ৪৭টি বাঁশ ও কাঠের তৈরি সাঁকো।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অন্যান্য জেলায় আমূল পরিবর্তন হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেনি রৌমারী উপজেলায়। ফলে এই জনপদের মানুষেরদুর্ভোগ নিত্য সঙ্গী।

সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে বাঁশ ও কাঠের তৈরি সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত মানুষ। প্রায় সময় গর্ভবতী ও অসুস্থ্ রোগীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ভারী যানবাহন চলাচল না করায় পরিবহণে চরম ভোগান্তি পড়তে হয় এই অঞ্চলে বসবাসকারীদের।

যোগাযোগ অনুন্নত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ভারীযানবাহন চলাচল করতে না পারায় ধান, চাল, পাট, ভুট্টাসহ শাক সবজির ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। ফলে অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে উত্তরের সর্বশেষ এই উপজেলার মানুষ।

সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, উপজেলার যাদুর চর ইউনিয়নের কর্তিমারী জিসি টু বড়াইবাড়ি বিওপি সড়কের কাশিয়াবাড়িয়া কুড়ায় একটি সেতু না থাকায় ১০ গ্রামের মানুষসহ তিনটি হাট-বাজারের ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে তাদের। পণ্য আনা-নেওয়ায় কৃষকদের খরচ বেশি পড়ছে।

ভাওয়াল গ্রামের বাসিন্দা ওবায়দুর রহমান (৭০) বলেন, দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পার হইল, কিন্তু হামরা একটা সেতু পাইলং না। অন্য অন্য জায়গায় উন্নয়ন হইলেও হামরা কোনোউন্নয়ন হয় না। আমরা যে জন্মের পর থেকে দ্যাখতাছি মানুষ এমন কষ্ট করি যাইতাছে। শুনি কার্তি মাস,আগুন মাসে সেতু হবে। কিন্তু সেতু আর হয় না। আমার বয়সে এখানে সেতু দ্যাখপার পামো কি না জানি না।

একই এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক (৪৫) বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণেএলাকারবিবাহ উপযুক্ত মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। ছেলে পক্ষ মেয়ে পছন্দ করলেও রাস্তার দুর্দশা দেখে আর এগোয় না। আমরা চাই সরকার প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তা-ঘাট ঠিক করে দিক।

পথচারি আছিরন বেগম (৫০) বলেন, বাবারে সেতু নাই, রাস্তা নাই, কি যে কষ্টে হামার দিন যায় ভাষায় বলা যাবে না।

রৌমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী নাজমা আকতার বলেন, দীর্ঘ করোনার ছুটি কাটিয়ে সবাই আনন্দ নিয়ে স্কুলে যায়। আর আমাদের একটি সেতুর অভাবে ৪-৫ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে পায়ে হেঁটে স্কুল যেতে হচ্ছে। এতে করে সময় নষ্ট হচ্ছে।

রৌমারী টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির বলেন, শৌলমারী কড়াকান্দা এলাকায় একটি সেতুর অভাবে প্রায় ১৫গ্রামের মানুষ, ৫টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগে রয়েছে। সেতু না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

রৌমারী এলজিইডি’র উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, বন্যা প্রবণ এলাকা হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ৩৭টি ছোট-বড় সেতুর প্রয়োজন। এরমধ্যে রংপুর বিভাগের অধীনে ৫৭ মিটার এবং ৪২ মিটার সেতুর টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। অনুর্ধ্ব ১০০ মিটার প্রকল্পের আওতায় ৯৬ মিটার একটি সেতুর টেন্ডার হয়েছে। এছাড়াও জিওপি মেইনটেন্যান্সহতে ৬টি সেতুর টপোগ্রাফি ও সয়েল সার্ভে শেষ হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি এগুলো টেন্ডার হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল ইমরান অনুন্নতযোগাযোগ ব্যবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, উপজেলাতে ৭৬টি ছোট-বড় কাঠ ও বাঁশের সাঁকো রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য এলজিইডি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিভাগ মিলে সমন্বয় করে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের জন্য পরিকল্পনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অবহেলিত রৌমারীর যোগাযোগ ব্যবস্থা

 কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:০১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও  উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত উপজেলা রৌমারীতে। রাস্তা, সেতু, কালভার্ট না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে উত্তরের সীমান্তবর্তী উপজেলার মানুষদের।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশের একমাত্র মুক্ত অঞ্চলখ্যাত উত্তরের সর্বশেষ উপজেলা রৌমারী। কুড়িগ্রাম সদরের সাথে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই উপজেলার রয়েছে ব্রহ্মপূত্র,জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, কালো, ধরণী, সোনাভরি ও জালছিড়াসহ ৬টি নদী। এখানে রয়েছে অসংখ্য জলাশয়,খাল-বিল। এসব খাল-বিলের উপর নির্মিত প্রায় ৪৭টি বাঁশ ও কাঠের তৈরি সাঁকো। 

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অন্যান্য জেলায় আমূল পরিবর্তন হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেনি রৌমারী উপজেলায়। ফলে এই জনপদের মানুষের দুর্ভোগ নিত্য সঙ্গী। 

সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে বাঁশ ও কাঠের তৈরি সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত মানুষ। প্রায় সময় গর্ভবতী ও অসুস্থ্ রোগীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ভারী যানবাহন চলাচল না করায় পরিবহণে চরম ভোগান্তি পড়তে হয় এই অঞ্চলে বসবাসকারীদের। 

যোগাযোগ অনুন্নত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারায় ধান, চাল, পাট, ভুট্টাসহ শাক সবজির ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। ফলে অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে উত্তরের সর্বশেষ এই উপজেলার মানুষ। 

সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, উপজেলার যাদুর চর ইউনিয়নের কর্তিমারী জিসি টু বড়াইবাড়ি বিওপি সড়কের কাশিয়াবাড়িয়া কুড়ায় একটি সেতু না থাকায় ১০ গ্রামের মানুষসহ তিনটি হাট-বাজারের ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে তাদের। পণ্য আনা-নেওয়ায় কৃষকদের খরচ বেশি পড়ছে। 

ভাওয়াল গ্রামের বাসিন্দা ওবায়দুর রহমান (৭০) বলেন, দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পার হইল, কিন্তু হামরা একটা সেতু পাইলং না। অন্য অন্য জায়গায় উন্নয়ন হইলেও হামরা কোনো উন্নয়ন হয় না। আমরা যে জন্মের পর থেকে দ্যাখতাছি মানুষ এমন কষ্ট করি যাইতাছে। শুনি কার্তি মাস,আগুন মাসে সেতু হবে। কিন্তু সেতু আর হয় না। আমার বয়সে এখানে সেতু দ্যাখপার পামো কি না জানি না।

একই এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক (৪৫) বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণে এলাকার বিবাহ উপযুক্ত মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। ছেলে পক্ষ মেয়ে পছন্দ করলেও রাস্তার দুর্দশা দেখে আর  এগোয় না। আমরা চাই সরকার প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তা-ঘাট ঠিক করে দিক। 

পথচারি আছিরন বেগম (৫০) বলেন, বাবারে সেতু নাই, রাস্তা নাই, কি যে কষ্টে হামার দিন যায় ভাষায় বলা যাবে না। 

রৌমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী নাজমা আকতার বলেন, দীর্ঘ করোনার ছুটি কাটিয়ে সবাই  আনন্দ নিয়ে স্কুলে যায়।  আর আমাদের একটি সেতুর অভাবে ৪-৫ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে পায়ে হেঁটে স্কুল যেতে হচ্ছে। এতে করে সময় নষ্ট হচ্ছে। 

রৌমারী টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির বলেন, শৌলমারী কড়াকান্দা এলাকায় একটি সেতুর অভাবে প্রায় ১৫গ্রামের মানুষ, ৫টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগে রয়েছে। সেতু না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

রৌমারী এলজিইডি’র উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, বন্যা প্রবণ এলাকা হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ৩৭টি ছোট-বড় সেতুর প্রয়োজন। এরমধ্যে রংপুর বিভাগের অধীনে ৫৭ মিটার এবং ৪২ মিটার সেতুর টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। অনুর্ধ্ব ১০০ মিটার প্রকল্পের আওতায় ৯৬ মিটার একটি সেতুর টেন্ডার হয়েছে। এছাড়াও জিওপি মেইনটেন্যান্স হতে ৬টি সেতুর টপোগ্রাফি ও সয়েল সার্ভে শেষ হয়েছে।  খুব তাড়াতাড়ি এগুলো টেন্ডার হয়ে যাবে বলে জানান তিনি। 

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল ইমরান অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার  কথা স্বীকার করে বলেন, উপজেলাতে ৭৬টি ছোট-বড় কাঠ ও বাঁশের সাঁকো রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য এলজিইডি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিভাগ মিলে সমন্বয় করে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের জন্য পরিকল্পনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন