যে কারণে মেয়েকে গলা কেটে হত্যার পর নিজের গলায় ছুরিকাঘাত
jugantor
যে কারণে মেয়েকে গলা কেটে হত্যার পর নিজের গলায় ছুরিকাঘাত

  কুমিল্লা ব্যুরো ও  চান্দিনা প্রতিনিধি  

০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৯:০৭:৫৭  |  অনলাইন সংস্করণ

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে সম্পত্তির লোভে ভাতিজাদের ফাঁসাতে নিজের ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাপড়ুয়া মেয়ে সালমাকে গলা কেটে হত্যা করে পিতা। পরে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ ও সন্দেহের তীর প্রতিপক্ষের দিকে ঘুরাতে নিজের গলায় ছুরিকাঘাত করেন মো. সোলেমান।

সোলেমান বসন্তপুর গ্রামের মৃত আদম আলীর ছেলে। বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশি নজরদারিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

সালমা হত্যাকাণ্ডে সোলেমানের সাথে তার দুই ভাইসহ মোট ৭ জন অংশ নেয়। এদের মধ্যে বসন্তপুর গ্রামের মৃত শরবত আলীর ছেলে আবদুর রহমান (৬০) ও মৃত অলি মিয়ার ছেলে মো. খলিলকে (৪২) গ্রেফতার করে চান্দিনা থানা পুলিশ।

বুধবার বসন্তপুর গ্রাম থেকেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। ওই রাতেই কুমিল্লার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় গ্রেফতার হওয়া আবদুর রহমান ও খলিল।

হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন করে এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত ওই ৭ জনকে আটক করে পুলিশ। রহস্য উন্মোচন করে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় কুমিল্লা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এম তানভীর।

এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হওয়ার পর স্তম্ভিত হয়ে পড়ে চান্দিনার গল্লাই ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামসহ গোটা উপজেলাবাসী।

জানা যায়, বসন্তপুর গ্রামের মো. সোলেমানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল তার আপন ভাতিজা শাহজালাল ও শাহ কামালের সঙ্গে। তাদের ওই সম্পত্তি একাধিকবার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন সোলেমান। ওই ঘটনায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এতে সোলেমানের স্ত্রী সামান্য আহত হওয়ায় থানায় মামলা করেন সোলেমান। কিন্তু ওই মামলায় হত্যাচেষ্টার ধারা-৩২৬ যুক্ত না হওয়ার ভাতিজাদের ফাঁসাতে হত্যা মামলার পরিকল্পনা করেন।

সোলেমানকে সহযোগিতা করেন তার আপন দুই ভাই মো. আব্দুল বাতেন ও লোকমান, সোলেমান ব্যাপারীর উকিল শ্বশুর একই গ্রামের আব্দুর রহমান, তার এক বন্ধু মো. খলিলসহ আরও ২ জন। ওই সাতজনের পরিকল্পনায় গত ১ অক্টোবর বিকালে সোলেমান তার স্ত্রী ও বড় মেয়েকে হাসপাতাল থেকে শ্বশুরবাড়ি চান্দিনার রাণীচরা গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসেন। দুই ছেলে ঢাকার একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার সুবাদে সেই রাতে বাড়িতে ছিলেন সোলেমান ও তার ছোট মেয়ে সালমা আক্তার (১৪)।

১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর পিতা সোলেমান ও তার মেয়ে সালমা রাতের খাবার শেষে মেয়েকে ঘরে রেখে বাহির হয়ে যান সোলেমান। ওই রাতে উকিল শ্বশুর আব্দুর রহমানের ঘরে হত্যার পরিকল্পনা করে। গভীর রাতে মেয়েকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গলা কেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।

পরে লাশ পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেয়। ওই ঘটনায় পরদিন ভাতিজাসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন সোলেমান ব্যাপারী। ওই মামলার পর থেকে এলাকা ছাড়া মামলার আসামিরা।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পুলিশ। পুলিশি তদন্তের তীর যখন পিতা সোলেমানের দিকে যায়, তখন বিষয়টি আঁচ করতে পারেন তিনি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুজন দত্ত গত ৪ অক্টোবর (সোমবার) স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ইসমাইল হোসেনকে ফোন করে মামলার বাদী সোলেমানকে নিয়ে সন্ধ্যায় থানায় আসার জন্য বললে ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে নিখোঁজ হন সোলেমান। সোলেমানের পরিবারও থানায় ফোন করে নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সোলেমান নিখোঁজের ঘটনায় পুলিশও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে।

পরদিন মঙ্গলবার ভোরে বাড়ির পাশের একটি বাগানে গলায় ও দুই পায়ে ছুরিকাঘাত অবস্থায় পাওয়া যায় সোলেমানকে।

জিজ্ঞাসাবাদে আহত সোলেমান পুলিশকে জানান, তার ভাতিজারাসহ অন্য আসামিরা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওই ঘটনায় পুলিশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে চলে তদন্ত। একপর্যায়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়ে বুধবার আব্দুর রহমান ও খলিলকে আটক করে পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে কিশোরী সালমা হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশের সন্দেহ এড়াতে সোলেমানের গলায় ছুরিকাঘাত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তারা। পরে রাতেই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় আটক আব্দুর রহমান ও খলিল মিয়া।

চান্দিনা থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, সোলেমান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। তবে আমাদের পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।

মামলার বিষয়টি জানতে চাইলে ওসি আরও বলেন, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা গ্রহণ করা হবে। নিহত সালমা আক্তারের পিতা সোলেমান বাদী হয়ে যে হত্যা মামলা করেছেন সেই মামলায় প্রতিপক্ষ কাউকে হয়রানি করা হবে না এবং ওই মামলার বিষয়ে সিনিয়র অফিসার ও আদালতের পরামর্শক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আফজাল হোসেন ও চান্দিনা থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান।

যে কারণে মেয়েকে গলা কেটে হত্যার পর নিজের গলায় ছুরিকাঘাত

 কুমিল্লা ব্যুরো ও  চান্দিনা প্রতিনিধি 
০৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:০৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে সম্পত্তির লোভে ভাতিজাদের ফাঁসাতে নিজের ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাপড়ুয়া মেয়ে সালমাকে গলা কেটে হত্যা করে পিতা। পরে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ ও সন্দেহের তীর প্রতিপক্ষের দিকে ঘুরাতে নিজের গলায় ছুরিকাঘাত করেন মো. সোলেমান।

সোলেমান বসন্তপুর গ্রামের মৃত আদম আলীর ছেলে। বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশি নজরদারিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

সালমা হত্যাকাণ্ডে সোলেমানের সাথে তার দুই ভাইসহ মোট ৭ জন অংশ নেয়। এদের মধ্যে বসন্তপুর গ্রামের মৃত শরবত আলীর ছেলে আবদুর রহমান (৬০) ও মৃত অলি মিয়ার ছেলে মো. খলিলকে (৪২) গ্রেফতার করে চান্দিনা থানা পুলিশ।

বুধবার বসন্তপুর গ্রাম থেকেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। ওই রাতেই কুমিল্লার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় গ্রেফতার হওয়া আবদুর রহমান ও খলিল।

হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন করে এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত ওই ৭ জনকে আটক করে পুলিশ। রহস্য উন্মোচন করে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় কুমিল্লা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এম তানভীর। 

এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হওয়ার পর স্তম্ভিত হয়ে পড়ে চান্দিনার গল্লাই ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামসহ গোটা উপজেলাবাসী। 

জানা যায়, বসন্তপুর গ্রামের মো. সোলেমানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল তার আপন ভাতিজা শাহজালাল ও শাহ কামালের সঙ্গে। তাদের ওই সম্পত্তি একাধিকবার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন সোলেমান। ওই ঘটনায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এতে সোলেমানের স্ত্রী সামান্য আহত হওয়ায় থানায় মামলা করেন সোলেমান। কিন্তু ওই মামলায় হত্যাচেষ্টার ধারা-৩২৬ যুক্ত না হওয়ার ভাতিজাদের ফাঁসাতে হত্যা মামলার পরিকল্পনা করেন।

সোলেমানকে সহযোগিতা করেন তার আপন দুই ভাই মো. আব্দুল বাতেন ও লোকমান, সোলেমান ব্যাপারীর উকিল শ্বশুর একই গ্রামের আব্দুর রহমান, তার এক বন্ধু মো. খলিলসহ আরও ২ জন। ওই সাতজনের পরিকল্পনায় গত ১ অক্টোবর বিকালে সোলেমান তার স্ত্রী ও বড় মেয়েকে হাসপাতাল থেকে শ্বশুরবাড়ি চান্দিনার রাণীচরা গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসেন। দুই ছেলে ঢাকার একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার সুবাদে সেই রাতে বাড়িতে ছিলেন সোলেমান ও তার ছোট মেয়ে সালমা আক্তার (১৪)। 

১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর পিতা সোলেমান ও তার মেয়ে সালমা রাতের খাবার শেষে মেয়েকে ঘরে রেখে বাহির হয়ে যান সোলেমান। ওই রাতে উকিল শ্বশুর আব্দুর রহমানের ঘরে হত্যার পরিকল্পনা করে। গভীর রাতে মেয়েকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গলা কেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।

পরে লাশ পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেয়। ওই ঘটনায় পরদিন ভাতিজাসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন সোলেমান ব্যাপারী। ওই মামলার পর থেকে এলাকা ছাড়া মামলার আসামিরা। 

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পুলিশ। পুলিশি তদন্তের তীর যখন পিতা সোলেমানের দিকে যায়, তখন বিষয়টি আঁচ করতে পারেন তিনি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুজন দত্ত গত ৪ অক্টোবর (সোমবার) স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ইসমাইল হোসেনকে ফোন করে মামলার বাদী সোলেমানকে নিয়ে সন্ধ্যায় থানায় আসার জন্য বললে ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে নিখোঁজ হন সোলেমান। সোলেমানের পরিবারও থানায় ফোন করে নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সোলেমান নিখোঁজের ঘটনায় পুলিশও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। 

পরদিন মঙ্গলবার ভোরে বাড়ির পাশের একটি বাগানে গলায় ও দুই পায়ে ছুরিকাঘাত অবস্থায় পাওয়া যায় সোলেমানকে।

জিজ্ঞাসাবাদে আহত সোলেমান পুলিশকে জানান, তার ভাতিজারাসহ অন্য আসামিরা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওই ঘটনায় পুলিশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে চলে তদন্ত। একপর্যায়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়ে বুধবার আব্দুর রহমান ও খলিলকে আটক করে পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে কিশোরী সালমা হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশের সন্দেহ এড়াতে সোলেমানের গলায় ছুরিকাঘাত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তারা। পরে রাতেই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় আটক আব্দুর রহমান ও খলিল মিয়া। 

চান্দিনা থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, সোলেমান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। তবে আমাদের পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। 

মামলার বিষয়টি জানতে চাইলে ওসি আরও বলেন, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা গ্রহণ করা হবে। নিহত সালমা আক্তারের পিতা সোলেমান বাদী হয়ে যে হত্যা মামলা করেছেন সেই মামলায় প্রতিপক্ষ কাউকে হয়রানি করা হবে না এবং ওই মামলার বিষয়ে সিনিয়র অফিসার ও আদালতের পরামর্শক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আফজাল হোসেন ও চান্দিনা থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন