পুলিশের অবহেলাকে দুষছেন ভুক্তভোগী-জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান
jugantor
চৌমুহনী মন্দিরে হামলা
পুলিশের অবহেলাকে দুষছেন ভুক্তভোগী-জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান

  মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নোয়াখালী  

২১ অক্টোবর ২০২১, ১৮:৪৪:৫৩  |  অনলাইন সংস্করণ

পুলিশের অবহেলাকে দুষছেন ভুক্তভোগী-জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান

নোয়াখালীর সবচেয়ে বড় ব্যবসা কেন্দ্র চৌমুহনীতে অবস্থিত শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউর মন্দির। শুক্রবার দুপুরের পর শত শত মানুষ মন্দিরের ফটক ভেঙে ঢুকে নির্বিচারে ভাংচুর চালায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে দুষছেন ভুক্তভোগীসহ আওয়ামী লীগের নেতা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

এ বিভীষিকাময় ঘটনার সাক্ষী মন্দিরের ব্যবস্থাপক সত্তরোর্ধ্ব অনন্ত কুমার ভৌমিক। ঘটনার চার দিন পরও তার চোখমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তিনি জানান, আক্রমণকারীরা ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাটও চালায়। তারা মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার তো নিয়েছেই, পানি তোলার মোটর পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে।

ওই দিন রাধামাধব জিউর মন্দিরসহ চৌমুহনীতে ১২টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন দোকানপাট ও বাসাবাড়িতেও। মারা গেছেন দুজন। বেগমগঞ্জ থানার ওসি, চার পুলিশ সদস্যসহ আহত হন অর্ধশতাধিক।

পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে দুষছেন এখানকার ভুক্তভোগী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা বলছেন, কুমিল্লার ঘটনার জেরে চাঁদপুরে চারজন নিহত হলো।

স্বাভাবিকভাবেই শুক্রবার দুর্গাপূজার শেষ দিন বা বিসর্জনের দিন সর্বত্র বাড়তি প্রস্তুতি রাখার কথা। কিন্তু নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে সেটা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা হলেও মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে পুলিশ আসে অনেক পরে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে কেবল দুজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। দুপুর ১২টার মধ্যেই বেশির ভাগ মণ্ডপের বিসর্জন শেষ হওয়ার পরপরই অনেক মণ্ডপ ও মন্দির থেকে পুলিশ সদস্যরা না বলেই চলে যান।

পাশের জেলা কুমিল্লার একটি হিন্দু মন্দিরে পূজার সময় মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের অবমাননা করা হয়েছে—এমন অভিযোগের জেরে এ হামলা হয়। টানা তিন-চার ঘণ্টা হামলা চলে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, এ বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়ে আগের দিন চৌমুহনী চৌরাস্তার দক্ষিণে এখলাসপুরে মাইকিং করা হয়েছিল। চৌরাস্তার পশ্চিমে বাংলাবাজারে পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল। জুমার নামাজ শেষে এসব এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন মসজিদ থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে চৌরাস্তায় জড়ো হয়। সেটি চৌমুহনীর দিকে এগোয়। অন্যদিকে চৌমুহনীর আশ পাশ থেকেও খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়।

পুলিশের মূল নজর ছিল প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র চৌমুহনীর ডিবি রোডের দিকে। এখানে বিক্ষোভকারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে ডিবি রোডের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের বিভিন্ন গলি-সড়কে ছড়িয়ে গিয়ে নির্বিচার হামলা চালায় মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে। হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিল কিশোর ও যুবক।

রাধামাধব জিউর মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাচের টুকরা। পড়ে আছে ভাঙা প্রণামির বাক্স, বিগ্রহের মূর্তি, কোনো জানালার কাচ অক্ষত নেই। এই মন্দিরটি ডিবি রোড থেকে দক্ষিণে মাত্র ৩০০ গজের মধ্যে।

হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে মন্দিরের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) অনন্ত কুমার ভৌমিক বলেন, এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তিনি আগে কখনো দেখেননি। হামলা হয় বিকালে, আর পুলিশ আসে রাতে। কিছু বললে পুলিশ বলে প্রতি মন্দিরে কী থানা বসাবে নাকি?

এ মন্দিরের পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্মল দাস বলেন, হামলার সময় তারা পুলিশের বিভিন্ন স্তরে ফোন করেছেন। কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কেউ আসেনি। তারা এসেছে ধ্বংসযজ্ঞ শেষে।

রাধামাধব জিউর মন্দির থেকে কিছু দূর এগোলে রামচন্দ্র দেবের সমাধিক্ষেত্র (আশ্রম)। দুপুর ১২টায় এখানে বিসর্জন শেষ হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এখানকার একজন সেবক বলেন, বিসর্জন শেষেই পুলিশ চলে যায়। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, ‘আপনারা সেইফে থাকেন, আমরা চলে যাচ্ছি।’

আশ্রমটিতে দুটি গাড়ি ও সামনের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়েছে হামলাকারীরা। এই আশ্রমের ব্যবস্থাপকদের একজন মানিক লাল চক্রবর্তী বলেন, আক্রমণকারীরা ছিল কয়েকশ। তারা প্রথমে সিসিটিভির ক্যামেরা ভাঙচুর করে। এ সময় তিনি (মানিক লাল) ও অন্য একজন বাথরুমে লুকিয়ে ছিলেন। ঘটনাটি বিকালে ঘটে। আর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে হামলার অনেক পর, রাত ৮টার দিকে।

এখানকার পুরোহিত বিপ্লব চক্রবর্তীও হামলায় আহত হন। তিনি বলেন, হামলার সময় কমিটির সদস্যরা পুলিশকে ফোন দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি। ওসি বা ডিউটি অফিসার ফোন ধরেননি।

গণিপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে দুর্গাপূজা করা হচ্ছে বহু বছর ধরে। এখানে কখনো হামলা হবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। এই বিদ্যালয়ের দেয়ালে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে। এখানেও হামলাকারীরা প্রথমে সিসিটিভির ক্যামেরা ভাঙচুর করে।

এখানকার ইসকন মন্দিরে হামলা হয় দুই দফায়। মন্দিরের অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাস অধিকারী বলেন, বেলা ৩টার দিকে এখানে প্রথম হামলা হয়। তখন তার কক্ষে একজন সাংবাদিক ছিলেন। ওই সাংবাদিক পুলিশের অনেক কর্মকর্তা, হটলাইনে ফোন দেন। সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ এসে দু-চার মিনিট থেকে চলে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তখনো পুলিশ আসেনি।

এখন অবশ্য সব মন্দিরের সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা রয়েছে। হামলার দিন পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার যে অভিযোগ, তা নিয়ে লোকনাথ মন্দিরে নোয়াখালীর জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলামের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, অভিযোগ ঠিক নয়। যখনই যেখান থেকে খবর পেয়েছে, পুলিশ ছুটে গেছে। হয়তো সংখ্যায় কম ছিল। পুলিশের মূল নজর ছিল প্রধান সড়কে, যেখানে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

তিনি দাবি করেন, মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দুজন করে পুলিশ ছিল।

পুলিশ সুপার যখন এ কথা বলছিলেন, তখন পাশ থেকেই লোকনাথ মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক কুলভূষণ বলে ওঠেন, ‘আমাদের এখান থেকে তো বিসর্জনের পরপরই পুলিশ চলে গেছে। পুলিশ ছিল না। পুলিশ, প্রশাসন হেল্প করেনি।’

এরপর পুলিশ সুপার বলেন, মণ্ডপে ৫টা পর্যন্ত থাকার লিখিত নির্দেশনা দেওয়া ছিল। কেন এ রকম হলো, সেটা তদন্ত করে দেখবেন।

‘তৌহিদী জনতার ব্যানারে’ বিক্ষোভ হবে বলে আগের দিন মাইকিং করা হয়েছিল। এরপর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল কিনা, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, এখলাসপুরে মাইকিং ও বাংলাবাজারে লিফলেট বিতরণের বিষয়টি বেগমগঞ্জ থানার ওসি তাকে জানিয়েছিলেন। ওই দুটি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ফলে সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে কারা মাইকিং করেছিল এবং লিফলেট বিতরণ করেছিল, তা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি।

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. খোরশেদ আলম খানও বলেন, প্রশাসন সার্বক্ষণিক মাঠে ছিল। পুলিশের পাশাপাশি প্রথমে এক প্লাটুন বিজিবি ও তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। পরে অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট এবং আরও তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাফিলতির অভিযোগ নাকচ করা হলেও বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম জাফরুল্যাহ বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে যে অভিযোগ করছেন, তা সত্য। আমি নিজেও এর প্রত্যক্ষদর্শী।

তিনি বলেন, তার সামনেই কাছারিবাজার মসজিদ থেকে ২৫-৩০ জন যুবক মিছিল বের করে। এ সময় চারজন পুলিশ থাকলেও মিছিলকারীদের নিবৃত্ত করার কোনো চেষ্টা করেনি। একইভাবে চৌমুহনী বাজার জামে মসজিদ থেকেও মিছিল বের করলে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এদিকে হামলার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত কমিটি গতকাল কাজ শুরু করেছে। এ প্রতিনিধি ইসকন মন্দির পরিদর্শন শেষে তদন্ত কমিটির প্রধান, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত, আড়ালে কারা, তা খুঁজে বের করা হবে। পুলিশের অবহেলা ছিল কিনা, সেটাও তারা খতিয়ে দেখবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা জামে মসজিদের এক মুসল্লি জানান, ঘটনা ঘটল চৌমুহনী আর ওই শুক্রবার এসপি জেলা জামে মসজিদে বক্তৃতা দিতে এসে মুসল্লিদের তোপের মুখে নাজেহাল হন।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের এ ব্যাপারে কোনো প্রজ্ঞা আছে বলে মনে হয় না। যদি তাই থাকত চৌমুহনীর মসজিদগুলোতে নজর রাখলে এত বড় কাণ্ড ঘটতে পারত না।

চৌমুহনী মন্দিরে হামলা

পুলিশের অবহেলাকে দুষছেন ভুক্তভোগী-জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান

 মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নোয়াখালী 
২১ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৪৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
পুলিশের অবহেলাকে দুষছেন ভুক্তভোগী-জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান
ফাইল ছবি

নোয়াখালীর সবচেয়ে বড় ব্যবসা কেন্দ্র চৌমুহনীতে অবস্থিত শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউর মন্দির। শুক্রবার দুপুরের পর শত শত মানুষ মন্দিরের ফটক ভেঙে ঢুকে নির্বিচারে ভাংচুর চালায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে দুষছেন ভুক্তভোগীসহ আওয়ামী লীগের নেতা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

এ বিভীষিকাময় ঘটনার সাক্ষী মন্দিরের ব্যবস্থাপক সত্তরোর্ধ্ব অনন্ত কুমার ভৌমিক। ঘটনার চার দিন পরও তার চোখমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তিনি জানান, আক্রমণকারীরা ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাটও চালায়। তারা মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার তো নিয়েছেই, পানি তোলার মোটর পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে।

ওই দিন রাধামাধব জিউর মন্দিরসহ চৌমুহনীতে ১২টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন দোকানপাট ও বাসাবাড়িতেও। মারা গেছেন দুজন। বেগমগঞ্জ থানার ওসি, চার পুলিশ সদস্যসহ আহত হন অর্ধশতাধিক।

পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে দুষছেন এখানকার ভুক্তভোগী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা বলছেন, কুমিল্লার ঘটনার জেরে চাঁদপুরে চারজন নিহত হলো।

স্বাভাবিকভাবেই শুক্রবার দুর্গাপূজার শেষ দিন বা বিসর্জনের দিন সর্বত্র বাড়তি প্রস্তুতি রাখার কথা। কিন্তু নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে সেটা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা হলেও মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে পুলিশ আসে অনেক পরে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে কেবল দুজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। দুপুর ১২টার মধ্যেই বেশির ভাগ মণ্ডপের বিসর্জন শেষ হওয়ার পরপরই অনেক মণ্ডপ ও মন্দির থেকে পুলিশ সদস্যরা না বলেই চলে যান।

পাশের জেলা কুমিল্লার একটি হিন্দু মন্দিরে পূজার সময় মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের অবমাননা করা হয়েছে—এমন অভিযোগের জেরে এ হামলা হয়। টানা তিন-চার ঘণ্টা হামলা চলে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, এ বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়ে আগের দিন চৌমুহনী চৌরাস্তার দক্ষিণে এখলাসপুরে মাইকিং করা হয়েছিল। চৌরাস্তার পশ্চিমে বাংলাবাজারে পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল। জুমার নামাজ শেষে এসব এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন মসজিদ থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে চৌরাস্তায় জড়ো হয়। সেটি চৌমুহনীর দিকে এগোয়। অন্যদিকে চৌমুহনীর আশ পাশ থেকেও খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়।

পুলিশের মূল নজর ছিল প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র চৌমুহনীর ডিবি রোডের দিকে। এখানে বিক্ষোভকারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে ডিবি রোডের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের বিভিন্ন গলি-সড়কে ছড়িয়ে গিয়ে নির্বিচার হামলা চালায় মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে। হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিল কিশোর ও যুবক।

রাধামাধব জিউর মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাচের টুকরা। পড়ে আছে ভাঙা প্রণামির বাক্স, বিগ্রহের মূর্তি, কোনো জানালার কাচ অক্ষত নেই। এই মন্দিরটি ডিবি রোড থেকে দক্ষিণে মাত্র ৩০০ গজের মধ্যে।

হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে মন্দিরের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) অনন্ত কুমার ভৌমিক বলেন, এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তিনি আগে কখনো দেখেননি। হামলা হয় বিকালে, আর পুলিশ আসে রাতে। কিছু বললে পুলিশ বলে প্রতি মন্দিরে কী থানা বসাবে নাকি?

এ মন্দিরের পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্মল দাস বলেন, হামলার সময় তারা পুলিশের বিভিন্ন স্তরে ফোন করেছেন। কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কেউ আসেনি। তারা এসেছে ধ্বংসযজ্ঞ শেষে।

রাধামাধব জিউর মন্দির থেকে কিছু দূর এগোলে রামচন্দ্র দেবের সমাধিক্ষেত্র (আশ্রম)। দুপুর ১২টায় এখানে বিসর্জন শেষ হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এখানকার একজন সেবক বলেন, বিসর্জন শেষেই পুলিশ চলে যায়। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, ‘আপনারা সেইফে থাকেন, আমরা চলে যাচ্ছি।’

আশ্রমটিতে দুটি গাড়ি ও সামনের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়েছে হামলাকারীরা। এই আশ্রমের ব্যবস্থাপকদের একজন মানিক লাল চক্রবর্তী বলেন, আক্রমণকারীরা ছিল কয়েকশ। তারা প্রথমে সিসিটিভির ক্যামেরা ভাঙচুর করে। এ সময় তিনি (মানিক লাল) ও অন্য একজন বাথরুমে লুকিয়ে ছিলেন। ঘটনাটি বিকালে ঘটে। আর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে হামলার অনেক পর, রাত ৮টার দিকে।

এখানকার পুরোহিত বিপ্লব চক্রবর্তীও হামলায় আহত হন। তিনি বলেন, হামলার সময় কমিটির সদস্যরা পুলিশকে ফোন দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি। ওসি বা ডিউটি অফিসার ফোন ধরেননি।

গণিপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে দুর্গাপূজা করা হচ্ছে বহু বছর ধরে। এখানে কখনো হামলা হবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। এই বিদ্যালয়ের দেয়ালে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে। এখানেও হামলাকারীরা প্রথমে সিসিটিভির ক্যামেরা ভাঙচুর করে।

এখানকার ইসকন মন্দিরে হামলা হয় দুই দফায়। মন্দিরের অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাস অধিকারী বলেন, বেলা ৩টার দিকে এখানে প্রথম হামলা হয়। তখন তার কক্ষে একজন সাংবাদিক ছিলেন। ওই সাংবাদিক পুলিশের অনেক কর্মকর্তা, হটলাইনে ফোন দেন। সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ এসে দু-চার মিনিট থেকে চলে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তখনো পুলিশ আসেনি।

এখন অবশ্য সব মন্দিরের সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা রয়েছে। হামলার দিন পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার যে অভিযোগ, তা নিয়ে লোকনাথ মন্দিরে নোয়াখালীর জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলামের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, অভিযোগ ঠিক নয়। যখনই যেখান থেকে খবর পেয়েছে, পুলিশ ছুটে গেছে। হয়তো সংখ্যায় কম ছিল। পুলিশের মূল নজর ছিল প্রধান সড়কে, যেখানে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

তিনি দাবি করেন, মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দুজন করে পুলিশ ছিল।

পুলিশ সুপার যখন এ কথা বলছিলেন, তখন পাশ থেকেই লোকনাথ মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক কুলভূষণ বলে ওঠেন, ‘আমাদের এখান থেকে তো বিসর্জনের পরপরই পুলিশ চলে গেছে। পুলিশ ছিল না। পুলিশ, প্রশাসন হেল্প করেনি।’

এরপর পুলিশ সুপার বলেন, মণ্ডপে ৫টা পর্যন্ত থাকার লিখিত নির্দেশনা দেওয়া ছিল। কেন এ রকম হলো, সেটা তদন্ত করে দেখবেন।

‘তৌহিদী জনতার ব্যানারে’ বিক্ষোভ হবে বলে আগের দিন মাইকিং করা হয়েছিল। এরপর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল কিনা, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, এখলাসপুরে মাইকিং ও বাংলাবাজারে লিফলেট বিতরণের বিষয়টি বেগমগঞ্জ থানার ওসি তাকে জানিয়েছিলেন। ওই দুটি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ফলে সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে কারা মাইকিং করেছিল এবং লিফলেট বিতরণ করেছিল, তা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি।

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. খোরশেদ আলম খানও বলেন, প্রশাসন সার্বক্ষণিক মাঠে ছিল। পুলিশের পাশাপাশি প্রথমে এক প্লাটুন বিজিবি ও তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। পরে অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট এবং আরও তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাফিলতির অভিযোগ নাকচ করা হলেও বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম জাফরুল্যাহ বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে যে অভিযোগ করছেন, তা সত্য। আমি নিজেও এর প্রত্যক্ষদর্শী।

তিনি বলেন, তার সামনেই কাছারিবাজার মসজিদ থেকে ২৫-৩০ জন যুবক মিছিল বের করে। এ সময় চারজন পুলিশ থাকলেও মিছিলকারীদের নিবৃত্ত করার কোনো চেষ্টা করেনি। একইভাবে চৌমুহনী বাজার জামে মসজিদ থেকেও মিছিল বের করলে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এদিকে হামলার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত কমিটি গতকাল কাজ শুরু করেছে। এ প্রতিনিধি ইসকন মন্দির পরিদর্শন শেষে তদন্ত কমিটির প্রধান, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত, আড়ালে কারা, তা খুঁজে বের করা হবে। পুলিশের অবহেলা ছিল কিনা, সেটাও তারা খতিয়ে দেখবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা জামে মসজিদের এক মুসল্লি জানান, ঘটনা ঘটল চৌমুহনী আর ওই শুক্রবার এসপি জেলা জামে মসজিদে বক্তৃতা দিতে এসে মুসল্লিদের তোপের মুখে নাজেহাল হন।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের এ ব্যাপারে কোনো প্রজ্ঞা আছে বলে মনে হয় না। যদি তাই থাকত চৌমুহনীর মসজিদগুলোতে নজর রাখলে এত বড় কাণ্ড ঘটতে পারত না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন