‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না’
jugantor
‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না’

  গোলাম কবির বিলু, রংপুরের গঙ্গাচড়া মহিপুর থেকে ফিরে  

১৪ নভেম্বর ২০২১, ১৩:১৩:৪৬  |  অনলাইন সংস্করণ

‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না’

‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না। কারণ তিস্তা হইল পাগলা নদী। জিদিক-সিদিক যায়। পানি হইলে ঘর ভাঙে। বাড়িঘর সারেনি যাই। এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ বার বাড়িঘর সারাচি।’

রোববার কথাগুলো হতাশার কণ্ঠে বললেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের মহিপুর সেতুর তিস্তার বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মুনসুর আলীর ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী জোহরা বেগম।

ওই ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। ওই নদীর গর্ভে জোহরাদের মতো হাজারও মানুষের বসতভিটে, জমি-জিরেত চলে গেছে। গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। তার পরও নদীপাড়ের বাসিন্দারা নদীর পাড় ছাড়েন না। কারণ যদি তাদের জীবদ্দশায় ভেঙে যাওয়া জমিতে চর জাগার আশায় বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে বসবাস করেন। তারা বোঝে না নদী সিকস্তি ও নদী পয়স্তি আইন। তারা বুঝতে চায়, কখন নদীতে তাদের বাপ-দাদার জমি ভেসে উঠবে।

জোহরা বেগমের দুই ছেলেমেয়ে। ছেলে জাহিদুল ইসলাম (৪৫) এবং মেয়ে মনজিলা বেগম। তাদের বিয়ে হয়েছে। ছেলের সংসারে থাকেন বাবা মুনসুর আলী ও মা জোহরা বেগম। মুনসুর আলী লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের জয়রাম মাজার গ্রামের বাসিন্দা। জয়রাম মাজার গ্রামের বাড়িটি অনেক আগেই তিস্তার পেটে গেছে। সঙ্গে সাড়ে তিন দোন জমিও গেছে। ৩০ শতকে এক দোন। এ হিসাবে ১০৫ শতক জমি তিস্তা গিলে ফেলেছে। এখন তারা ভূমিহীন।

মুনসুর আলীও বয়োবৃদ্ধ ও বেকার। জয়রাম মাজারের বাড়ি ভেঙে গেলে পার্শ্ববর্তী বিজয় বাঁধ গ্রাম, শংকরদহ, মহিপুরসহ কয়েকটি স্থানে ঘরবসতি করেন। কিন্তু তিস্তার থাবায় সেগুলোও বিলীন হয়ে যায়। এভাবেই প্রায় শতবার বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন বলে জোহরা এবং তার ছেলে জাহিদুল ইসলাম জানান।

১৩ বছর আগে বিয়ে করেছেন জাহিদুল ইসলাম। জাহিদুলের স্ত্রী সুমি বেগম। তাদের সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। জাহিদুল বলেন, এখন হামরা ভূমিহীন। মহিপুর শেখ হাসিনা সেতুর বাঁধের পাশে অন্যের জমিতে বসবাস করতিছি। জমির মালিক ঘর সরাতে বললে খাসজমি বা অন্যের জমিতে ঘর করা নাগবি। হামার সংসারোত আটজন মানুষ খানেওয়ালা।

জাহিদুল আরও বলেন, প্রতিদিন মহিপুরের সেতু দেকতে মানুষ আইসে। আর মুই এ্যাকনা দোকান দিয়া ফুচক্যা ব্যাচো। ৭-৮ শত ট্যাকা ব্যাচা হয়। যে লাব হয়। সেইটা দি সংসার চলাও। এ ছাড়া নদীর পাড়োত আয়ের পথ নাই!

জাহিদুলের স্ত্রী সুমি বেগম বলেন, একসময় আমার শ্বশুরের বাড়িঘর, জমি সগি আছিলো। এখন হামরা পতের ফকির। অন্যের জমিত থাকি।

জাহিদুলের মা জোহরা বলেন, নদীর বাতা (ধার) ছাড়ি যাই ক্যাংকরি। যদি ট্যাকা থাকিল হায়, তাহলি কি এটি থাকি ? কোনোমতে কষ্ট করি এ্যাঁটে কোনা দিন কাটাই হামরা। তিস্তার মহিপুর সেতুর বাঁধের পাশোত একন হামরা মানসের জমিত ঘর করি আছি। জমি এ্যালা যদি কয় তোরা জমি ছাড়ো, তাইলে হামার মরণ, যাওয়ার জাগা শ্যাষ। সরকার হামাক একনা ঘর বানে দিলে বাকি জেবনটা থাকনো হায়।

‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না’

 গোলাম কবির বিলু, রংপুরের গঙ্গাচড়া মহিপুর থেকে ফিরে 
১৪ নভেম্বর ২০২১, ০১:১৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না’
ছবি: যুগান্তর

‘ককন কুদি নদী আইসে, কওয়া যায় না। কারণ তিস্তা হইল পাগলা নদী। জিদিক-সিদিক যায়। পানি হইলে ঘর ভাঙে। বাড়িঘর সারেনি যাই। এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ বার বাড়িঘর সারাচি।’ 

রোববার কথাগুলো হতাশার কণ্ঠে বললেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের মহিপুর সেতুর তিস্তার বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মুনসুর আলীর ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী জোহরা বেগম। 

ওই ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদী। ওই নদীর গর্ভে জোহরাদের মতো হাজারও মানুষের বসতভিটে, জমি-জিরেত চলে গেছে। গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। তার পরও নদীপাড়ের বাসিন্দারা নদীর পাড় ছাড়েন না। কারণ যদি তাদের জীবদ্দশায় ভেঙে যাওয়া জমিতে চর জাগার আশায় বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে বসবাস করেন। তারা বোঝে না নদী সিকস্তি ও নদী পয়স্তি আইন। তারা বুঝতে চায়, কখন নদীতে তাদের বাপ-দাদার জমি ভেসে উঠবে।

জোহরা বেগমের দুই ছেলেমেয়ে। ছেলে জাহিদুল ইসলাম (৪৫) এবং মেয়ে মনজিলা বেগম। তাদের বিয়ে হয়েছে। ছেলের সংসারে থাকেন বাবা মুনসুর আলী ও মা জোহরা বেগম। মুনসুর আলী লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের জয়রাম মাজার গ্রামের বাসিন্দা। জয়রাম মাজার গ্রামের বাড়িটি অনেক আগেই তিস্তার পেটে গেছে। সঙ্গে সাড়ে তিন দোন জমিও গেছে। ৩০ শতকে এক দোন। এ হিসাবে ১০৫ শতক জমি তিস্তা গিলে ফেলেছে। এখন তারা ভূমিহীন। 

মুনসুর আলীও বয়োবৃদ্ধ ও বেকার। জয়রাম মাজারের বাড়ি ভেঙে গেলে পার্শ্ববর্তী বিজয় বাঁধ গ্রাম, শংকরদহ, মহিপুরসহ কয়েকটি স্থানে ঘরবসতি করেন। কিন্তু তিস্তার থাবায় সেগুলোও বিলীন হয়ে যায়। এভাবেই প্রায় শতবার বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন বলে জোহরা এবং তার ছেলে জাহিদুল ইসলাম জানান।

১৩ বছর আগে বিয়ে করেছেন জাহিদুল ইসলাম। জাহিদুলের স্ত্রী সুমি বেগম। তাদের সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। জাহিদুল বলেন, এখন হামরা ভূমিহীন। মহিপুর শেখ হাসিনা সেতুর বাঁধের পাশে অন্যের জমিতে বসবাস করতিছি। জমির মালিক ঘর সরাতে বললে খাসজমি বা অন্যের জমিতে ঘর করা নাগবি। হামার সংসারোত আটজন মানুষ খানেওয়ালা। 

জাহিদুল আরও বলেন, প্রতিদিন মহিপুরের সেতু দেকতে মানুষ আইসে। আর মুই এ্যাকনা দোকান দিয়া ফুচক্যা ব্যাচো। ৭-৮ শত ট্যাকা ব্যাচা হয়। যে লাব হয়। সেইটা দি সংসার চলাও। এ ছাড়া নদীর পাড়োত আয়ের পথ নাই!

জাহিদুলের স্ত্রী সুমি বেগম বলেন, একসময় আমার শ্বশুরের বাড়িঘর, জমি সগি আছিলো। এখন হামরা পতের ফকির। অন্যের জমিত থাকি। 

জাহিদুলের মা জোহরা বলেন, নদীর বাতা (ধার) ছাড়ি যাই ক্যাংকরি। যদি ট্যাকা থাকিল হায়, তাহলি কি এটি থাকি ? কোনোমতে কষ্ট করি এ্যাঁটে কোনা দিন কাটাই হামরা। তিস্তার মহিপুর সেতুর বাঁধের পাশোত একন হামরা মানসের জমিত ঘর করি আছি। জমি এ্যালা যদি কয় তোরা জমি ছাড়ো, তাইলে হামার মরণ, যাওয়ার জাগা শ্যাষ। সরকার হামাক একনা ঘর বানে দিলে বাকি জেবনটা থাকনো হায়। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন