হাফেজ ছেলেকে ঘরবন্দি করে ভিক্ষা করেন দম্পতি!
jugantor
হাফেজ ছেলেকে ঘরবন্দি করে ভিক্ষা করেন দম্পতি!

  পবিত্র তালুকদার, চাটমোহর (পাবনা)  

০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২০:২৭:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

খোলা আকাশের নিচে বসে মরিয়ম খাতুন চুলায় যখন রান্না করেন, ঠিক তখন পেছনে বসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করেন বৃদ্ধ স্বামী ময়ছের প্রামাণিক (৮৫) ও মানসিক ভারসাম্য হারানো ছেলে হাফেজ আবদুর রহমান।

প্রতিদিন সকালে এই বৃদ্ধ দম্পতি বের হন ভিক্ষা করতে, ফেরেন বিকালে। আর ঠিক তখনই চুলা জ্বালিয়ে করেন রান্না। কেউ ভিক্ষা দেন আবার কেউবা দূর ছাই করে তাড়িয়ে দেন এই বৃদ্ধ দম্পতিকে। রাতের বেলায় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে জরাজীর্ণ টিনের ছাপরা ঘরে রাতযাপন- এভাবেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর।

এদিকে আবদুর রহমান হাফেজ হওয়ার পর মসজিদে ইমামতি করতেন। ইমামতি করে সংসারে কিছুটা সচ্ছলতা ফেরালেও বিধিবাম, হটাৎ করেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন আবদুর রহমান। হাফেজ ছেলেকে এখন ঘর বন্দি রেখে ভিক্ষা করতে বের হন বৃদ্ধ মা-বাবা!

বৃষ্টি এলে শোবার একমাত্র টিনের ছাপরা ঘর দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ে। রাত জেগে থাকতে হয় পাবনার চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়নের সবুজপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ভিক্ষা করে পাওয়া চালে ভাত রান্না করেছেন। খোলা আকাশের নিচে বসে শাক ভাজি করছেন মরিয়ম খাতুন। পেছনে বসে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর ময়ছের প্রামাণিক ও তাদের মেজ ছেলে হাফেজ আবদুর রহমান অপেক্ষা করছেন খাবারের জন্য। কখন হবে রান্না আর কখনই বা খাবেন খাবার? বার বার খেতে চাইছেন কিন্তু রান্না শেষ হয়নি তখনো। কখনো শাক ভাজি আবার কখনো বা পান্তা ভাত-এমন খাবারই নিত্যদিনের সঙ্গী তাদের।

বৃদ্ধ এই দম্পতির তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। দুই ছেলে পৃথক থাকেন। তাদের সাংসারিক অবস্থাও শোচনীয়! নিজেদের তিন কাঠা জায়গার ওপর ভাঙ্গাচোরা টিনের ছাপরা ঘরে হাফেজ ছেলেকে বসবাস করেন তারা।

অনেক কষ্টে মেজ ছেলে আবদুর রহমানকে ছাইকোলা দারসুল হাফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে হাফেজ বানিয়েছিলেন। হাফেজ হওয়ার পর তিনি (আবদুর রহমান) মসজিদের ইমামতি করতেন। করেছিলেন বিয়েও। কিন্তু মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় ছেড়ে চলে গেছেন স্ত্রী। ধারদেনা করে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পর পর দুই বার আবদুর রহমানের চিকিৎসা করালেও সুস্থ হননি তিনি। এলাকার লোকজনকে মারপিট করাসহ নানা অভিযোগ শুনতে শুনতে ক্লান্ত বাবা-মা।

এদিকে প্রতি তিন মাস পর বৃদ্ধ ময়ছের প্রামাণিক বয়স্ক ভাতার দেড় হাজার টাকা পেলেও তা দিয়ে চলে না সংসার। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভিক্ষা করা মহাপাপ জেনেও অনেকটা বাধ্য হয়ে রোজ সকালে ভিক্ষা করতে বের হন এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভারে ভিক্ষা করতে কষ্ট হলেও কোনো উপায় নেই তাদের কাছে!

আর রাত বিরাতে ঝড়-বৃষ্টি যেন তাদের কাছে অভিশাপ হয়ে আছড়ে পড়ে। টিনের ফুটো দিয়ে পড়ে পানি। রাত জেগে বসে থাকতে হয় তাদের। অভাবের কারণে মানসিক ভারসাম্য হারানো ছেলে হাফেজ আবদুর রহমানের চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একটি ঘরের আবদার জানিয়ে বেশ কয়েকবার গেছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলেনি! এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

কান্না জড়িত কণ্ঠে মরিয়ম খাতুন এই প্রতিবেদককে বলেন, অভাবের কারণে অন্য দুই ছেলেকে পড়াশোনা শেখাতে পারিনি। মেজ ছেলে আল্লাহর পথে চলুক এই ভেবে অনেক কষ্টে হাফেজ বানিয়েছিলাম। কিন্তু সেই ইচ্ছাও পূরণ হলো না! আমাদের বয়স হয়েছে, কীভাবে চলবো? হাঁটতে পারি না। খুব কষ্ট হয়। মানুষ ভিক্ষা দিলে তবেই চুলা জ্বলে। কীভাবে যে পাগল ছেলেকে নিয়ে ভাঙ্গা ঘরে একসঙ্গে থাকি সেটা না দেখলে কেউ বুঝবে না! ছেলের চিকিৎসা এবং একটি ঘরের জন্য সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা কামনা করেন তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ছাইকোলা ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান নুরু যুগান্তরকে বলেন, পরিবারটি খুবই অসহায়। তাদের কষ্টের সীমা নেই। ছেলেটার জন্য সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে। কারণ কিছুদিন আগেও সে মসজিদে ইমামতি করতো। কিন্তু মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এখন তাকে ঘরবন্দি থাকতে হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

হাফেজ ছেলেকে ঘরবন্দি করে ভিক্ষা করেন দম্পতি!

 পবিত্র তালুকদার, চাটমোহর (পাবনা) 
০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:২৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

খোলা আকাশের নিচে বসে মরিয়ম খাতুন চুলায় যখন রান্না করেন, ঠিক তখন পেছনে বসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করেন বৃদ্ধ স্বামী ময়ছের প্রামাণিক (৮৫) ও মানসিক ভারসাম্য হারানো ছেলে হাফেজ আবদুর রহমান।

প্রতিদিন সকালে এই বৃদ্ধ দম্পতি বের হন ভিক্ষা করতে, ফেরেন বিকালে। আর ঠিক তখনই চুলা জ্বালিয়ে করেন রান্না। কেউ ভিক্ষা দেন আবার কেউবা দূর ছাই করে তাড়িয়ে দেন এই বৃদ্ধ দম্পতিকে। রাতের বেলায় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে জরাজীর্ণ টিনের ছাপরা ঘরে রাতযাপন- এভাবেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর। 

এদিকে আবদুর রহমান হাফেজ হওয়ার পর মসজিদে ইমামতি করতেন। ইমামতি করে সংসারে কিছুটা সচ্ছলতা ফেরালেও বিধিবাম, হটাৎ করেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন আবদুর রহমান। হাফেজ ছেলেকে এখন ঘর বন্দি রেখে ভিক্ষা করতে বের হন বৃদ্ধ মা-বাবা!

বৃষ্টি এলে শোবার একমাত্র টিনের ছাপরা ঘর দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ে। রাত জেগে থাকতে হয় পাবনার চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা ইউনিয়নের সবুজপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ভিক্ষা করে পাওয়া চালে ভাত রান্না করেছেন। খোলা আকাশের নিচে বসে শাক ভাজি করছেন মরিয়ম খাতুন। পেছনে বসে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর ময়ছের প্রামাণিক ও তাদের মেজ ছেলে হাফেজ আবদুর রহমান অপেক্ষা করছেন খাবারের জন্য। কখন হবে রান্না আর কখনই বা খাবেন খাবার? বার বার খেতে চাইছেন কিন্তু রান্না শেষ হয়নি তখনো। কখনো শাক ভাজি আবার কখনো বা পান্তা ভাত-এমন খাবারই নিত্যদিনের সঙ্গী তাদের।

বৃদ্ধ এই দম্পতির তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। দুই ছেলে পৃথক থাকেন। তাদের সাংসারিক অবস্থাও শোচনীয়! নিজেদের তিন কাঠা জায়গার ওপর ভাঙ্গাচোরা টিনের ছাপরা ঘরে হাফেজ ছেলেকে বসবাস করেন তারা। 

অনেক কষ্টে মেজ ছেলে আবদুর রহমানকে ছাইকোলা দারসুল হাফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে হাফেজ বানিয়েছিলেন। হাফেজ হওয়ার পর তিনি (আবদুর রহমান) মসজিদের ইমামতি করতেন। করেছিলেন বিয়েও। কিন্তু মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় ছেড়ে চলে গেছেন স্ত্রী। ধারদেনা করে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পর পর দুই বার আবদুর রহমানের চিকিৎসা করালেও সুস্থ হননি তিনি। এলাকার লোকজনকে মারপিট করাসহ নানা অভিযোগ শুনতে শুনতে ক্লান্ত বাবা-মা। 

এদিকে প্রতি তিন মাস পর বৃদ্ধ ময়ছের প্রামাণিক বয়স্ক ভাতার দেড় হাজার টাকা পেলেও তা দিয়ে চলে না সংসার। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভিক্ষা করা মহাপাপ জেনেও অনেকটা বাধ্য হয়ে রোজ সকালে ভিক্ষা করতে বের হন এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভারে ভিক্ষা করতে কষ্ট হলেও কোনো উপায় নেই তাদের কাছে!

আর রাত বিরাতে ঝড়-বৃষ্টি যেন তাদের কাছে অভিশাপ হয়ে আছড়ে পড়ে। টিনের ফুটো দিয়ে পড়ে পানি। রাত জেগে বসে থাকতে হয় তাদের। অভাবের কারণে মানসিক ভারসাম্য হারানো ছেলে হাফেজ আবদুর রহমানের চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একটি ঘরের আবদার জানিয়ে বেশ কয়েকবার গেছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলেনি! এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

কান্না জড়িত কণ্ঠে মরিয়ম খাতুন এই প্রতিবেদককে বলেন, অভাবের কারণে অন্য দুই ছেলেকে পড়াশোনা শেখাতে পারিনি। মেজ ছেলে আল্লাহর পথে চলুক এই ভেবে অনেক কষ্টে হাফেজ বানিয়েছিলাম। কিন্তু সেই ইচ্ছাও পূরণ হলো না! আমাদের বয়স হয়েছে, কীভাবে চলবো? হাঁটতে পারি না। খুব কষ্ট হয়। মানুষ ভিক্ষা দিলে তবেই চুলা জ্বলে। কীভাবে যে পাগল ছেলেকে নিয়ে ভাঙ্গা ঘরে একসঙ্গে থাকি সেটা না দেখলে কেউ বুঝবে না! ছেলের চিকিৎসা এবং একটি ঘরের জন্য সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা কামনা করেন তিনি। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ছাইকোলা ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান নুরু যুগান্তরকে বলেন, পরিবারটি খুবই অসহায়। তাদের কষ্টের সীমা নেই। ছেলেটার জন্য সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে। কারণ কিছুদিন আগেও সে মসজিদে ইমামতি করতো। কিন্তু মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এখন তাকে ঘরবন্দি থাকতে হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন