ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদঘাটন পিবিআইয়ের
jugantor
ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদঘাটন পিবিআইয়ের

  সিরাজগঞ্জ ও চৌহালী প্রতিনিধি  

১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৪১:০৫  |  অনলাইন সংস্করণ

সিরাজগঞ্জে মহাসড়কের পাশে পড়েছিল ব্যবসায়ীর লাশ। ৯৯৯ নাম্বারে ফোন পেয়ে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কারা কীভাবে তাকে খুন করে ফেলে রেখে যায়- কোনো সূত্রই ছিল না পুলিশের হাতে। ঠিক এমনই একটি ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যরা।

শুধু তাই নয়, এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে মিলেছে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সন্ধান। যারা দীর্ঘদিন ধরে পাবনা, নাটোর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে মহাসড়কে ডাকাতি-ছিনতাই করে আসছে।

সোমবার দুপুর ১২টার দিকে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম।

তিনি বলেন, ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন পেয়ে হাটিকুমরুল নগরবাড়ি মহাসড়কের পাটধারী এলাকা থেকে দুজন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে নূর মোহাম্মদ (৩৮) নামে একজনকে মৃত ও শামসুল হক (৪০) নামে অপরজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

নূর মোহাম্মদ নাটোর জেলার নলডাঙ্গা থানার ঠাকুর লক্ষীকোল গ্রামের মো. তমিজ মণ্ডলের ছেলে এবং শামসুল হক একই গ্রামের হাফিজ আলী সরদারের ছেলে। এ ঘটনায় নিহত নূর মোহাম্মদের ছোট ভগিনীপতি জাকির হোসেন বাদী হয়ে সলঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিমের সঙ্গে থাকা অপর ব্যবসায়ী শামসুল হককে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেন।

১০ দিন পর পিবিআই মামলাটি গ্রহণ করার পর সন্দেহভাজন আসামি শামছুল হককে তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কোনো তথ্যই উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় ৬-৭ মাস মামলাটির তদন্ত কাজ স্থগিত করে মামলার ঘটনার আগে ও পরে আশপাশের এলাকায় ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে পিবিআই।

একপর্যায়ে ঘটনার আগে ও পরের একই ধরনের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। ওই সব ঘটনায় পাট, মহিষ, পেঁয়াজ, রসুন, নগদ টাকা, মোবাইল ছিনতাই এবং ডাকাতির মত তথ্য পাওয়া যায়। আর অপরাধীরা ছিনতাই করা মোবাইলের সিম ব্যবহার করে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছে বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। এ অবস্থায় পিবিআই টিম আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার করে একপর্যায়ে অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করে।

পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার সময় নিহত নূর মোহাম্মদ যে স্থানে পেঁয়াজ লোড করেছিলেন সেখানেই ইছার উদ্দিন ওরফে ইছার (৪৮) নামে একজন দুর্ধর্ষ ডাকাতের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপরই তাকে গ্রেফতারের জন্য সন্ধান চালায় পিবিআই।

পরবর্তীকালে জানা যায় ইছার উদ্দিন ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার একটি ডাকাতি মামলায় কারাগারে আটক আছেন। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে কুমিল্লা কারাগার থেকে এনে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ইছার উদ্দিন নূর মোহাম্মদ খুনের ঘটনার কথা স্বীকার করে এবং এর আগে আরও পাঁচজন জড়িত আছে বলে জানায়। ইছার উদ্দিন দেশের বিভিন্ন জেলায় মহাসড়কে ডাকাতি করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় খুন ও ডাকাতিসহ অন্তত ১৫-১৬টি মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।

ইছার উদ্দিন ওরফে এছারের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর তার দুই সহযোগীর ফোন পেয়ে ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে এই কাজটি করার জন্য অপর এক সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে নাটোরে আসেন। ট্রাক চালকসহ তিন সহযোগীকে নিয়ে বগুড়া রোডের দিকে যেতে থাকেন তারা।

এদিকে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ ও শামছুল হক নাটোর জেলা দিঘাপাতিয়া নামক স্থানে পেঁয়াজ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের ওপর নজর রাখছিল ডাকাত দলের আরেক সদস্য। ট্রাকটি তাদের কাছে পৌঁছে থামিয়ে দিলে ব্যবসায়ীরা ৩৬ বস্তা পেঁয়াজ বগুড়া নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাড়া করেন। ট্রাক লোড শেষে তারা বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দিলে রাস্তায় আরও দুজন ওঠে।

পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম গিয়ে চালক ট্রাকটি থামিয়ে চা-সিগারেট খায়। এ সময়ে ডাকাত দলের তিন সদস্য পেঁয়াজের বস্তাগুলোকে চারপাশে সাজিয়ে মাঝখানে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে ঠাণ্ডা বাতাস থেকে বাঁচার জন্য তারা এটি করেছে বলে জানায়। তারপর আবার ট্রাকটি বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়।

শাকপালা নামক জায়গা পার হলে ডাকাত দলের সদস্যরা একসঙ্গে এসে দুই পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে বেদম মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে ডাকাতদের কোমরে থাকা রশি দিয়ে দুই ব্যবসায়ীর হাত-বা বেঁধে ফেলে এবং মুখে টেপ মেরে দেয়। তাদের কাছে থাকা মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ অবস্থায় ট্রাকটি হাটিকুমরুল-পাবনা রোডে এনে পাটধারী এলাকায় দুজনকে ফেলে রেখে পেঁয়াজসহ ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যায়।

পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ইছার উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদঘাটন পিবিআইয়ের

 সিরাজগঞ্জ ও চৌহালী প্রতিনিধি 
১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৪১ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

সিরাজগঞ্জে মহাসড়কের পাশে পড়েছিল ব্যবসায়ীর লাশ। ৯৯৯ নাম্বারে ফোন পেয়ে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কারা কীভাবে তাকে খুন করে ফেলে রেখে যায়- কোনো সূত্রই ছিল না পুলিশের হাতে। ঠিক এমনই একটি ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যরা।

শুধু তাই নয়, এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে মিলেছে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সন্ধান। যারা দীর্ঘদিন ধরে পাবনা, নাটোর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে মহাসড়কে ডাকাতি-ছিনতাই করে আসছে।

সোমবার দুপুর ১২টার দিকে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম।

তিনি বলেন, ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন পেয়ে হাটিকুমরুল নগরবাড়ি মহাসড়কের পাটধারী এলাকা থেকে দুজন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে নূর মোহাম্মদ (৩৮) নামে একজনকে মৃত ও শামসুল হক (৪০) নামে অপরজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

নূর মোহাম্মদ নাটোর জেলার নলডাঙ্গা থানার ঠাকুর লক্ষীকোল গ্রামের মো. তমিজ মণ্ডলের ছেলে এবং শামসুল হক একই গ্রামের হাফিজ আলী সরদারের ছেলে। এ ঘটনায় নিহত নূর মোহাম্মদের ছোট ভগিনীপতি জাকির হোসেন বাদী হয়ে সলঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিমের সঙ্গে থাকা অপর ব্যবসায়ী শামসুল হককে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেন।

১০ দিন পর পিবিআই মামলাটি গ্রহণ করার পর সন্দেহভাজন আসামি শামছুল হককে তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কোনো তথ্যই উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় ৬-৭ মাস মামলাটির তদন্ত কাজ স্থগিত করে মামলার ঘটনার আগে ও পরে আশপাশের এলাকায় ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে পিবিআই।

একপর্যায়ে ঘটনার আগে ও পরের একই ধরনের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। ওই সব ঘটনায় পাট, মহিষ, পেঁয়াজ, রসুন, নগদ টাকা, মোবাইল ছিনতাই এবং ডাকাতির মত তথ্য পাওয়া যায়। আর অপরাধীরা ছিনতাই করা মোবাইলের সিম ব্যবহার করে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছে বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। এ অবস্থায় পিবিআই টিম আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার করে একপর্যায়ে অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করে।  

পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার সময় নিহত নূর মোহাম্মদ যে স্থানে পেঁয়াজ লোড করেছিলেন সেখানেই ইছার উদ্দিন ওরফে ইছার (৪৮) নামে একজন দুর্ধর্ষ ডাকাতের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপরই তাকে গ্রেফতারের জন্য সন্ধান চালায় পিবিআই।

পরবর্তীকালে জানা যায় ইছার উদ্দিন ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার একটি ডাকাতি মামলায় কারাগারে আটক আছেন। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে কুমিল্লা কারাগার থেকে এনে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ইছার উদ্দিন নূর মোহাম্মদ খুনের ঘটনার কথা স্বীকার করে এবং এর আগে আরও পাঁচজন জড়িত আছে বলে জানায়। ইছার উদ্দিন দেশের বিভিন্ন জেলায় মহাসড়কে ডাকাতি করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় খুন ও ডাকাতিসহ অন্তত ১৫-১৬টি মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।  

ইছার উদ্দিন ওরফে এছারের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর তার দুই সহযোগীর ফোন পেয়ে ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে এই কাজটি করার জন্য অপর এক সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে নাটোরে আসেন। ট্রাক চালকসহ তিন সহযোগীকে নিয়ে বগুড়া রোডের দিকে যেতে থাকেন তারা।

এদিকে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ ও শামছুল হক নাটোর জেলা দিঘাপাতিয়া নামক স্থানে পেঁয়াজ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের ওপর নজর রাখছিল ডাকাত দলের আরেক সদস্য। ট্রাকটি তাদের কাছে পৌঁছে থামিয়ে দিলে ব্যবসায়ীরা ৩৬ বস্তা পেঁয়াজ বগুড়া নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাড়া করেন। ট্রাক লোড শেষে তারা বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দিলে রাস্তায় আরও দুজন ওঠে।  

পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম গিয়ে চালক ট্রাকটি থামিয়ে চা-সিগারেট খায়। এ সময়ে ডাকাত দলের তিন সদস্য পেঁয়াজের বস্তাগুলোকে চারপাশে সাজিয়ে মাঝখানে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে ঠাণ্ডা বাতাস থেকে বাঁচার জন্য তারা এটি করেছে বলে জানায়। তারপর আবার ট্রাকটি বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়।

শাকপালা নামক জায়গা পার হলে ডাকাত দলের সদস্যরা একসঙ্গে এসে দুই পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে বেদম মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে ডাকাতদের কোমরে থাকা রশি দিয়ে দুই ব্যবসায়ীর হাত-বা বেঁধে ফেলে এবং মুখে টেপ মেরে দেয়। তাদের কাছে থাকা মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ অবস্থায় ট্রাকটি হাটিকুমরুল-পাবনা রোডে এনে পাটধারী এলাকায় দুজনকে ফেলে রেখে পেঁয়াজসহ ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যায়।  

পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ইছার উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন