২ ভাইয়ের রাজত্ব: বসে থাকেন নেতা, চলে চাঁদাবাজি
jugantor
২ ভাইয়ের রাজত্ব: বসে থাকেন নেতা, চলে চাঁদাবাজি

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ  

২৪ জানুয়ারি ২০২২, ২২:৩৬:৪৮  |  অনলাইন সংস্করণ

ব্যাটারিচালিত নিষিদ্ধ অটোরিকশার (ইজিবাইক) অবৈধ স্ট্যান্ড বানিয়ে হাজার হাজার যাত্রীকে জিম্মি করে চাঁদা তুলছেন নারায়ণগঞ্জ শহরের দক্ষিণাংশের ত্রাস হিসেবে খ্যাত বিএনপির ২ সহোদর সন্ত্রাসী। জিমখানার ওই অবৈধ স্ট্যান্ড থেকে ফতুল্লার কাশীপুর খিলমার্কেট, দেওয়ানবাড়ী, ভোলাইল, চরনরসিংপুর, হাটখোলা ও মুক্তারপুর ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত চলাচলকারী কমপক্ষে ২ হাজার ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন নেওয়া হচ্ছে ট্রিপপ্রতি ১০ টাকা করে।

ভুক্তভোগী ইজিবাইক চালক ও মালিকরা প্রকাশ্যে ওই ২ সন্ত্রাসী সহোদরের নাম মুখে নিতেও ভয় পান। তবে যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই অবৈধ স্ট্যান্ডের মূল হোতা বিএনপি নেতা ও সন্ত্রাসী এম এ মজিদ সেই স্ট্যান্ডের সামনেই চেয়ার নিয়ে বসে থাকেন তদারকিতে। আর এই চাঁদাবাজ চক্রের পেটোয়া বাহিনীর সবাই তার আপন ছোট ভাই পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসান আহম্মেদ এর বাহিনীর লোকজন।

পুলিশের ভাষ্যমতে, নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মামলার অন্যতম নির্দেশদাতা ছিলেন এই মজিদ আর তার ভাই হাসানও এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, শহরের মণ্ডলপাড়া জিমখানা স্ট্যান্ডটি মূলত কাগজে কলমে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড হলেও এখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছাড়া অন্য কোনো গাড়ির দেখা মিলে না। অবৈধ ইজিবাইক স্ট্যান্ডের মূলহোতা ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের ইজারাদার বিএনপি নেতা এমএ মজিদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন চালক ও মালিকরা জানিয়েছেন, ইজিবাইক থেকে ট্রিপ প্রতি ১০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা চাঁদা নিচ্ছে মুরগি রাসেলসহ নিয়োজিত কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীরা। দিনে দশবার ট্রিপ হলে ১০ টাকা করে মোট ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। অনেক সময় দুই একজন যাত্রী কম হলেও চাঁদা কমে না।

কয়েকজন ইজিবাইক মালিক জানিয়েছেন, এসব লাইনে নতুন ইজিবাইক নামাতে হলেও মজিদ ও হাসান বাহিনীকে গাড়িপ্রতি কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা সেলামি দিতে হয়।

সরেজমিন বাবুরাইল লেকপাড়ের ফুটপাতে চায়ের দোকানের সামনে দেখা মিলল সেই এমএ মজিদের। গাঁয়ে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, মুখে মাস্ক পরিহিত মজিদ বসে আছেন চেয়ার নিয়ে আর চাঁদা আদায়কারীদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি চলছে বিষয়টি অস্বীকার করে এমএ মজিদ বলেন, আমি এই স্ট্যান্ড ইজারা নিয়েছি। আমার লোকজন ইজারার টাকা (টোল) উঠাচ্ছে।

একটু আগেও সন্ত্রাসী মুরগি রাসেল একজন ইজিবাইক চালকের কাছ থেকে ১০০ টাকা চাঁদা নিয়েছে জানালে এমএ মজিদ বলেন, এমন কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। সবাই জানে আমি ইজারাদার। তবে আগে কিছু অনিয়ম হয়েছে। ওই রানারা বেশি টাকা নিত। তাই ওদেরকে বাদ দিয়ে আমি নতুন লোক দিয়েছি। আমি নিজে স্ট্যান্ডের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিব। চাঁদাবাজির অভিযোগ মিথ্যা। তাছাড়া আমার ভাই হাসান আহমেদ সন্ত্রাসী নয়।

তবে স্থানীয় সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। সূত্রমতে, জিমখানা কাশিপুর ইউনিয়নের দেওয়ানবাড়ি সড়ক এবং জিমখানা টু কাশিপুর খিল মার্কেট-বাংলাবাজার সড়কে প্রতিদিন অবৈধ ইজি বাইক (অটোরিকশার) চাঁদাবাজদের অবৈধ চাঁদাবাজি যেন কিছুতেই থামছে না। এসব ইজিবাইক চাঁদাবাজরা বীরদর্পে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদসহ সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

চালক ও মালিকরা জানালেন, প্রতিদিন এই জিমখানা স্ট্যান্ডে আমাদের গাড়ি প্রতি দিতে হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে। বৃষ্টি, বাদল, ঝড় তুফান যাই হোক না কেন স্ট্যান্ডের টাকা তাদের দিতেই হবে।

অপরদিকে কাশিপুর দেওয়ানবাড়ি ও খিল মার্কেট স্ট্যান্ড থেকে আলাদা করে চাঁদা নেয়া হচ্ছে ৪০ টাকা করে। এই স্ট্যান্ড এর নিয়ন্ত্রকও তারা ২ ভাই। এই চাঁদার টাকার কারণে গাড়ি চালকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছে। এতে করে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিদিনই ঝগড়া বিবাদ হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এই ইজিবাইকের চাঁদাকে কেন্দ্র করেই ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর সদর উপজেলার ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের হোসানী নগর এলাকায় রাত ৮টায় একটি রিকশা গ্যারেজের ভেতরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মিল্টন হাওলাদার (৪০) ও পারভেজ আহমেদ (৩০) নামের দুই ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছিল। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারগুলো এতটাই ভীত ছিল যে তারা মামলা করতেও সাহস পায়নি।

পরে ফতুল্লা থানার এসআই মাজারুল ২২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১২৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। শহরের ১নং বাবুরাইল এলাকার বিএনপি নেতা মজিদ ও তার আপন ছোটভাই হাসান এ হত্যা মামলার হুকুমদাতা বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। মূলত এই দুইজনের শেল্টারেই চলছে শহরের জিমখানা এলাকার অবৈধ ইজিবাইক স্ট্যান্ডটি। কয়েক বছর ধরেই শহরের জিমখানা এলাকায় ওই অবৈধ স্ট্যান্ডটি চললেও রহস্যজনক কারণে তা উচ্ছেদ করেনি নাসিক কর্তৃপক্ষ।

২ ভাইয়ের রাজত্ব: বসে থাকেন নেতা, চলে চাঁদাবাজি

 রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 
২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০:৩৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ব্যাটারিচালিত নিষিদ্ধ অটোরিকশার (ইজিবাইক) অবৈধ স্ট্যান্ড বানিয়ে হাজার হাজার যাত্রীকে জিম্মি করে চাঁদা তুলছেন নারায়ণগঞ্জ শহরের দক্ষিণাংশের ত্রাস হিসেবে খ্যাত বিএনপির ২ সহোদর সন্ত্রাসী। জিমখানার ওই অবৈধ স্ট্যান্ড থেকে ফতুল্লার কাশীপুর খিলমার্কেট, দেওয়ানবাড়ী, ভোলাইল, চরনরসিংপুর, হাটখোলা ও মুক্তারপুর ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত চলাচলকারী কমপক্ষে ২ হাজার ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন নেওয়া হচ্ছে ট্রিপপ্রতি ১০ টাকা করে।

ভুক্তভোগী ইজিবাইক চালক ও মালিকরা প্রকাশ্যে ওই ২ সন্ত্রাসী সহোদরের নাম মুখে নিতেও ভয় পান। তবে যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই অবৈধ স্ট্যান্ডের মূল হোতা বিএনপি নেতা ও সন্ত্রাসী এম এ মজিদ সেই স্ট্যান্ডের  সামনেই চেয়ার নিয়ে বসে থাকেন তদারকিতে। আর এই চাঁদাবাজ চক্রের পেটোয়া বাহিনীর সবাই তার আপন ছোট ভাই পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসান আহম্মেদ এর বাহিনীর লোকজন।

পুলিশের ভাষ্যমতে, নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মামলার অন্যতম নির্দেশদাতা ছিলেন এই মজিদ আর তার ভাই হাসানও এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, শহরের মণ্ডলপাড়া জিমখানা স্ট্যান্ডটি মূলত কাগজে কলমে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড হলেও এখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছাড়া অন্য কোনো গাড়ির দেখা মিলে না। অবৈধ ইজিবাইক স্ট্যান্ডের মূলহোতা ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের ইজারাদার বিএনপি নেতা এমএ মজিদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন চালক ও মালিকরা জানিয়েছেন, ইজিবাইক থেকে ট্রিপ প্রতি ১০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা চাঁদা নিচ্ছে মুরগি রাসেলসহ নিয়োজিত কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীরা। দিনে দশবার ট্রিপ হলে ১০ টাকা করে মোট ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। অনেক সময় দুই একজন যাত্রী কম হলেও চাঁদা কমে না।

কয়েকজন ইজিবাইক মালিক জানিয়েছেন, এসব লাইনে নতুন ইজিবাইক নামাতে হলেও মজিদ ও হাসান বাহিনীকে গাড়িপ্রতি কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা সেলামি দিতে হয়।

সরেজমিন বাবুরাইল লেকপাড়ের ফুটপাতে চায়ের দোকানের সামনে দেখা মিলল সেই এমএ মজিদের। গাঁয়ে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, মুখে মাস্ক পরিহিত মজিদ বসে আছেন চেয়ার নিয়ে আর চাঁদা আদায়কারীদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি চলছে বিষয়টি অস্বীকার করে এমএ মজিদ বলেন, আমি এই স্ট্যান্ড ইজারা নিয়েছি। আমার লোকজন ইজারার টাকা (টোল) উঠাচ্ছে।

একটু আগেও সন্ত্রাসী মুরগি রাসেল একজন ইজিবাইক চালকের কাছ থেকে ১০০ টাকা চাঁদা নিয়েছে জানালে এমএ মজিদ বলেন, এমন কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। সবাই জানে আমি ইজারাদার। তবে আগে কিছু অনিয়ম হয়েছে। ওই রানারা বেশি টাকা নিত। তাই ওদেরকে বাদ দিয়ে আমি নতুন লোক দিয়েছি। আমি নিজে স্ট্যান্ডের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিব। চাঁদাবাজির অভিযোগ মিথ্যা। তাছাড়া আমার ভাই হাসান আহমেদ সন্ত্রাসী নয়।

তবে স্থানীয় সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। সূত্রমতে, জিমখানা কাশিপুর ইউনিয়নের দেওয়ানবাড়ি সড়ক এবং জিমখানা টু কাশিপুর খিল মার্কেট-বাংলাবাজার সড়কে প্রতিদিন অবৈধ ইজি বাইক (অটোরিকশার) চাঁদাবাজদের অবৈধ চাঁদাবাজি যেন কিছুতেই থামছে না। এসব ইজিবাইক চাঁদাবাজরা বীরদর্পে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদসহ সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

চালক ও মালিকরা জানালেন, প্রতিদিন এই জিমখানা স্ট্যান্ডে আমাদের গাড়ি প্রতি দিতে হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে। বৃষ্টি, বাদল, ঝড় তুফান যাই হোক না কেন স্ট্যান্ডের টাকা তাদের দিতেই হবে।

অপরদিকে কাশিপুর দেওয়ানবাড়ি ও খিল মার্কেট স্ট্যান্ড থেকে আলাদা করে চাঁদা নেয়া হচ্ছে ৪০ টাকা করে। এই স্ট্যান্ড এর নিয়ন্ত্রকও তারা ২ ভাই। এই চাঁদার টাকার কারণে গাড়ি চালকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছে। এতে করে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিদিনই ঝগড়া বিবাদ হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এই ইজিবাইকের চাঁদাকে কেন্দ্র করেই ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর সদর উপজেলার ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের হোসানী নগর এলাকায় রাত ৮টায় একটি রিকশা গ্যারেজের ভেতরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মিল্টন হাওলাদার (৪০) ও পারভেজ আহমেদ (৩০) নামের দুই ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছিল। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারগুলো এতটাই ভীত ছিল যে তারা মামলা করতেও সাহস পায়নি।

পরে ফতুল্লা থানার এসআই মাজারুল ২২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১২৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। শহরের ১নং বাবুরাইল এলাকার বিএনপি নেতা মজিদ ও তার আপন ছোটভাই হাসান এ হত্যা মামলার হুকুমদাতা বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়।  মূলত এই দুইজনের শেল্টারেই চলছে শহরের জিমখানা এলাকার অবৈধ ইজিবাইক স্ট্যান্ডটি। কয়েক বছর ধরেই শহরের জিমখানা এলাকায় ওই অবৈধ স্ট্যান্ডটি চললেও রহস্যজনক কারণে তা উচ্ছেদ করেনি নাসিক কর্তৃপক্ষ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন