সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক
jugantor
সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক

  শফিউল্লাহ শফি, সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে  

২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:২৩:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা নিষিদ্ধ থাকলেও মানা হচ্ছে না আইন। সরকারি কাজ ছাড়া সেখানে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড নেওয়ার অনুমতি নেই। তার পরও সেখানে যাচ্ছে নির্মাণসামগ্রী। রিসোর্টের নামে গড়ে উঠছে একের পর এক নতুন স্থাপনা।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দ্বীপের চারপাশে নামতে থাকে ইট, বালু, সিমেন্ট, কংকিটসহ স্থাপনা তৈরির মালামাল।

সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপসহ আশপাশের এক হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া (এমপিএ) ঘোষণা করে সরকার। এ ঘোষণার পর থেকে দ্বীপটিতে স্থাপনা তৈরির হিড়িক পড়েছে। বর্তমানে এই দ্বীপে অন্তত ২০টির মতো স্থাপনা নির্মাণকাজের গতি বেড়ে গেছে। নিয়মানুযায়ী দ্বীপে কোনো নির্মাণসামগ্রী টেকনাফ কিংবা কক্সবাজার জেলা শহর থেকে নিতে গেলে অনুমতির দরকার হয়।

আরও জানা যায়, গাছ-বাঁশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়ে থাকেন সেন্টমার্টিন দ্বীপের ইউপি চেয়ারম্যান। রড, সিমেন্ট ও ইট-কংক্রিটের অনুমতি নিতে হয় টেকনাফ ইউএনওর কার্যালয় থেকে। তবে যেভাবে ভবন তৈরির কাজ চলছে, তাতে মনে হয় অনুমতির তোয়াক্কাই করেন না তারা। যে যার মতো প্রভাব বিস্তার করে স্থাপনা তৈরির মালামাল নিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপে ছোটবড় ২০টির মতো স্থাপনার কাজ চলছে। এর মধ্যে সাতটিই ভবন। ৫টি সেমিপাকা ভবন ও বাকি সব কাঠ-বাঁশের স্থাপনা। ভবন নির্মাণে স্থানীয়রা তেমন জড়িত নেই বললেই চলে। তবে কেউ কেউ তদারকির দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দ্বীপে যেসব ভবন নির্মাণ চলছে, তার সবকটির মালিক দেশের অন্যান্য জেলার মানুষ।

সূত্র আরও জানায়, ১৯৮৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা ঘোষণার পর থেকে সেখানে ভবনসহ স্থাপনা নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) কয়েক মাস আগের তথ্যমতে, দ্বীপে ছোটবড় ১৮৮টি রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ আছে।

বর্তমানে চলছে ২০টি রিসোর্টের কাজ। চলমান ভবন নির্মাণের মধ্যে একটি হচ্ছে ড্রিমার্স প্যারাডাইস বিচ রিসোর্ট। এই রিসোর্টের মালিক রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রশিদ। ওই রিসোর্টের তিন তলার আংশিক ঢালাইয়ের কাজ চলছে।

এই রিসোর্টের দায়িত্বরত ম্যানেজারের কাছ থেকে মালিকের মুঠোফোন নম্বর চাইলে তিনি বলেন, তার কাছে নম্বর নেই। তবে তৃতীয় তলার ভবন নির্মাণের অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে তা মালিকপক্ষ জানেন বলেই এড়িয়ে যান।

একইভাবে সমুদ্রঘেঁষে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে আটলান্টিক নামের একটি রিসোর্টের। এই রিসোর্টের মালিক ভোলার নজরুল ইসলাম চৌধুরী। দ্বীপের পশ্চিম সৈকত এলাকায় তার রিসোর্টের একটি দোতলা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। এসবের পাশাপাশি সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়নের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দিয়ার মাথা ও গলাচিপা এলাকায় চারটি পাকা, তিনটি সেমিপাকা ও চারটি কাঠ-বাঁশের স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ চলছে পশ্চিম বিচ ও দক্ষিণ বিচ এলাকায়ও। এভাবে দ্বীপের চারপাশে ভবন নির্মাণের হিড়িক চলছে।

দ্বীপের সার্বিক বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ নুর আহমদ বলেন, মাত্র আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটিতে ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবমতে, ১৮৮টি হোটেল-মোটেল ও কটেজ আছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের শুমারি অনুযায়ী দ্বীপের জনসংখ্যা ১০ হাজার ২৬ জন। দ্বীপে পরিবারের অর্থাৎ বসতঘরের সংখ্যা এক হাজার ৪৫৪টি। গত এক বছরে বেড়েছে আরও শতাধিক ঘর। বহিরাগত লোকজনের বসতঘর রয়েছে পাঁচ শতাধিক। মূলত বহিরাগতদের কুদৃষ্টির কারণে বর্তমানে দ্বীপটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, দ্বীপের কোনো বাসিন্দার ঘর নির্মাণ অথবা মেরামত কাজের জন্য টেকনাফ থেকে গাছ-বাঁশ পরিবহণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু আবার অনেকেই অনুমতি ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করে নিয়ে আসে। তাতে সহযোগিতা করে প্রশাসনের গুটিকয়েক অসাধু কর্মকর্তা।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী জানান, দ্বীপের সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য নির্মাণসামগ্রী পরিবহণের অনুমতি দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত কাজে নির্মাণসামগ্রী পরিবহণের অনুমতি দেওয়া হয় না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সেন্টমার্টিন দ্বীপের অফিসে কর্মরত সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বীপে নতুন স্থাপনা গড়ে তোলার কাজ বন্ধে গত নভেম্বর থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। এ জন্য জরিমানাসহ দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। তার পরও বন্ধ করা মুশকিল হয়ে পড়েছে স্থাপনা নির্মাণের কাজ। বিনা অনুমতিতে স্থাপনা করায় এ পর্যন্ত ২০টি নিয়মিত মামলা এবং আরও ৫০টি এনফোর্সমেন্ট মামলা করা হয়েছে।

সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক

 শফিউল্লাহ শফি, সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে 
২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:২৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক
ছবি: যুগান্তর

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা নিষিদ্ধ থাকলেও মানা হচ্ছে না আইন। সরকারি কাজ ছাড়া সেখানে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড নেওয়ার অনুমতি নেই। তার পরও সেখানে যাচ্ছে নির্মাণসামগ্রী। রিসোর্টের নামে গড়ে উঠছে একের পর এক নতুন স্থাপনা। 

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দ্বীপের চারপাশে নামতে থাকে ইট, বালু, সিমেন্ট, কংকিটসহ স্থাপনা তৈরির মালামাল। 

সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপসহ আশপাশের এক হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া (এমপিএ) ঘোষণা করে সরকার। এ ঘোষণার পর থেকে দ্বীপটিতে স্থাপনা তৈরির হিড়িক পড়েছে। বর্তমানে এই দ্বীপে অন্তত ২০টির মতো স্থাপনা নির্মাণকাজের গতি বেড়ে গেছে। নিয়মানুযায়ী দ্বীপে কোনো নির্মাণসামগ্রী টেকনাফ কিংবা কক্সবাজার জেলা শহর থেকে নিতে গেলে অনুমতির দরকার হয়। 

আরও জানা যায়, গাছ-বাঁশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়ে থাকেন সেন্টমার্টিন দ্বীপের ইউপি চেয়ারম্যান। রড, সিমেন্ট ও ইট-কংক্রিটের অনুমতি নিতে হয় টেকনাফ ইউএনওর কার্যালয় থেকে। তবে যেভাবে ভবন তৈরির কাজ চলছে, তাতে মনে হয় অনুমতির তোয়াক্কাই করেন না তারা। যে যার মতো প্রভাব বিস্তার করে স্থাপনা তৈরির মালামাল নিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপে ছোটবড় ২০টির মতো স্থাপনার কাজ চলছে। এর মধ্যে সাতটিই ভবন। ৫টি সেমিপাকা ভবন ও বাকি সব কাঠ-বাঁশের স্থাপনা। ভবন নির্মাণে স্থানীয়রা তেমন জড়িত নেই বললেই চলে। তবে কেউ কেউ তদারকির দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দ্বীপে যেসব ভবন নির্মাণ চলছে, তার সবকটির মালিক দেশের অন্যান্য জেলার মানুষ।  

সূত্র আরও জানায়, ১৯৮৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা ঘোষণার পর থেকে সেখানে ভবনসহ স্থাপনা নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) কয়েক মাস আগের তথ্যমতে, দ্বীপে ছোটবড় ১৮৮টি রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ আছে। 

বর্তমানে চলছে ২০টি রিসোর্টের কাজ। চলমান ভবন নির্মাণের মধ্যে একটি হচ্ছে ড্রিমার্স প্যারাডাইস বিচ রিসোর্ট। এই রিসোর্টের  মালিক রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রশিদ। ওই রিসোর্টের তিন তলার আংশিক ঢালাইয়ের কাজ চলছে। 

এই রিসোর্টের দায়িত্বরত ম্যানেজারের কাছ থেকে মালিকের মুঠোফোন নম্বর চাইলে তিনি বলেন, তার কাছে নম্বর নেই। তবে তৃতীয় তলার ভবন নির্মাণের অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে তা মালিকপক্ষ জানেন বলেই এড়িয়ে যান।

একইভাবে সমুদ্রঘেঁষে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে আটলান্টিক নামের একটি রিসোর্টের। এই রিসোর্টের মালিক ভোলার নজরুল ইসলাম চৌধুরী। দ্বীপের পশ্চিম সৈকত এলাকায় তার রিসোর্টের একটি দোতলা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। এসবের পাশাপাশি সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়নের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দিয়ার মাথা ও গলাচিপা এলাকায় চারটি পাকা, তিনটি সেমিপাকা ও চারটি কাঠ-বাঁশের স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ চলছে পশ্চিম বিচ ও দক্ষিণ বিচ এলাকায়ও। এভাবে দ্বীপের চারপাশে ভবন নির্মাণের হিড়িক চলছে। 

দ্বীপের সার্বিক বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ নুর আহমদ বলেন, মাত্র আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটিতে ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবমতে, ১৮৮টি হোটেল-মোটেল ও কটেজ আছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের শুমারি অনুযায়ী দ্বীপের জনসংখ্যা ১০ হাজার ২৬ জন। দ্বীপে পরিবারের অর্থাৎ বসতঘরের সংখ্যা এক হাজার ৪৫৪টি। গত এক বছরে বেড়েছে আরও শতাধিক ঘর। বহিরাগত লোকজনের বসতঘর রয়েছে পাঁচ শতাধিক। মূলত বহিরাগতদের কুদৃষ্টির কারণে বর্তমানে দ্বীপটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। 

বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, দ্বীপের কোনো বাসিন্দার ঘর নির্মাণ অথবা মেরামত কাজের জন্য টেকনাফ থেকে গাছ-বাঁশ পরিবহণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু আবার অনেকেই অনুমতি ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করে নিয়ে আসে। তাতে সহযোগিতা করে প্রশাসনের গুটিকয়েক অসাধু কর্মকর্তা। 

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী জানান, দ্বীপের সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য নির্মাণসামগ্রী পরিবহণের অনুমতি দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত কাজে নির্মাণসামগ্রী পরিবহণের অনুমতি দেওয়া হয় না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সেন্টমার্টিন দ্বীপের অফিসে কর্মরত সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বীপে নতুন স্থাপনা গড়ে তোলার কাজ বন্ধে গত নভেম্বর থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। এ জন্য জরিমানাসহ দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। তার পরও বন্ধ করা মুশকিল হয়ে পড়েছে স্থাপনা নির্মাণের কাজ। বিনা অনুমতিতে স্থাপনা করায় এ পর্যন্ত ২০টি নিয়মিত মামলা এবং আরও ৫০টি এনফোর্সমেন্ট মামলা করা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন