‘ভৌতিক সাপের দংশন’- কী বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ-ইসলামিক ফাউন্ডেশন
jugantor
‘ভৌতিক সাপের দংশন’- কী বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ-ইসলামিক ফাউন্ডেশন

  মেহেরপুর প্রতিনিধি  

২৮ মে ২০২২, ০১:৪১:১০  |  অনলাইন সংস্করণ

মেহেরপুর সদর উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামে সাপের কামড়ে মারা যায় মুরশেলিন হোসেন নামের ১০ বছরের এক শিশু। এরপর আরও কয়েকজনকে সাপে কামড় দেয়। তারা সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

এদিকে মুরশেলিন হোসেনের মৃত্যুর পর শুরু হয় স্থানীয় ওঝাঁ বা কবিরাজের কারসাজি। তারা এটাকে ‘ভৌতিক সাপের দংশন’ উল্লেখ করে আতঙ্ক ছড়াতে থাকে।

আর এতেই মেহেরপুর সদর উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামের মানুষকে ভৌতিক সাপের দংশন আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। এই আতঙ্ক দূর করতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন গ্রামবাসীকে সচেতন করতে মাঠে নেমেছেন।

শুক্রবার বাদ জুমা গ্রামের সব মসজিদে ভৌতিক সাপ বলে কিছু নেই- একশ্রেণির মানুষ ফায়দা লুটতে এ আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য কর্মীদের দিয়ে ভৌতিক সাপ বলে কিছু নেই- যদি সাপে কাটে তাহলে তাৎক্ষণিক জেলা সদর হাসপাতালে তাকে নেওয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।

জানা গেছে, গত ১৭ দিনের ব্যবধানে পাশাপাশি উজ্জ্বলপুর- মনোহরপুর গ্রামের অন্তত ৩৫ জনকে সাপে কেটেছে। এর মধ্যে সাপের কামড়ে ১০ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি গ্রামবাসীর। ওই দুই গ্রামে প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের মন থেকে ভৌতিক সাপ আতঙ্ক দূর হচ্ছে।

ঘটনার শুরু গত ১২ মে উজ্জ্বলপুর গ্রামের মুরশেলিন হোসেন নামের ১০ বছরের এক শিশুর সাপের কামড়ে মৃত্যু হওয়ার পর।

স্থানীয়রা জানান, গত ১২ মে শেষরাত্রে কামাল হোসেনের শিশুপুত্র মুরসেলিনকে সাপে কামড়ায়। তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর একদিন পর মাঠে কাজ করার সময় হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে সাপে কাটে। তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হন।

পরদিন সকাল উজ্জ্বলপুর গ্রামের কুঠিপাড়ার চাঁদনী বেগমের হাতে সাপে কামড় দেয়। বিকালের দিকে তার জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এরপর পার্শ্ববর্তী শোলমারি গ্রামের হাসেম আলী ও রতন ওঝাঁর ঝাড়ফুঁকে সে ভালো হয় বলে তার দাবি।

এভাবে সুলতানা, টিপু, মনিসহ প্রায় ৩০-৩৫ জনকে সাপে কেটেছে বলে গ্রামবাসীর দাবি। তবে সাপের কামড় খাওয়া বেশির ভাগ মানুষই সাপকে দেখেননি বলে জানান।

গ্রামের অনেকেই মনে করছেন, স্থানীয় ওঝাঁর কারসাজিতে এ ধরনের সাপ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। শুধুমাত্র কামাল হোসেনের পুত্র সাপের কামড়ে মারা গেছে। বাকিগুলো সবই গুজব। ওঝাঁরা টাকা উপার্জনের জন্য এই সাপ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

উজ্জ্বলপুর গ্রামের নুর আলী বুকে সাপে কাটার দাগ দেখিয়ে বলেন- ওঝাঁ হাসেম আলীর ঝাড়ফুঁকের পর সুস্থ হয়েছি। সন্তান পরিবার নিয়ে নিরাপদে থাকতে ওঝাঁর কাছ থেকে তাবিজ পড়া নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, সাপের কামড়ে যদি বিষ থাকে তাহলে ওঝাঁকে ৫শ টাকা; আর বিষ না থাকলে ৩শ টাকা দিতে হচ্ছে।

শরিফ হোসেন নামের আরও একজন জানান, গত সোমবার তার স্ত্রীকে কোনো কিছুতে কামড়েছিল। কবিরাজের ঝাড়ফুঁকে ভালো হয়েছে।

কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম রোজা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সাপে কামড়ানোর গুজবের বিরুদ্ধে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছি। গ্রামবাসীকে সচেতন করে তুলতে চেষ্টা করছি।

কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী মাস্টার জানান, ওঝাঁরা পরিকল্পিতভাবে সাপে কাটা গুজব ছড়িয়ে আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গ্রামের মসজিদে, শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সচেতনতায় কাজ করা হচ্ছে। শুক্রবার বাদ জুমা গ্রামের সব মসজিদের ইমাম ভৌতিক সাপ আতঙ্ক দূর করতে একশ্রেণির (ওঝাঁ কবিরাজ) থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মেহেরপুরের সিভিল সার্জেন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অলোক কুমার দাস বলেন, ইতোমধ্যে আমিসহ উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের একটি দল গ্রামটি পরিদর্শন করেছি। শোলমারি গ্রামের হাসেম আলী ও রতনসহ বেশ কয়েক জনের একটি চক্র গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে ফায়দা লুটছে। আমরা তাদের প্রাথমিকভাবে সতর্ক করেছি। এ কাজ বন্ধ না করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের আটক করা হবে। এছাড়া একটি মেডিকেল টিমও গ্রামের মানুষের মনোবল ধরে রাখতে সর্বক্ষণিক অবস্থান করছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জামিল মোহাম্মদ হাসিবুস সাত্তার জানান, ভৌতিক সাপ নিয়ে গল্প সিনেমায় চলে। বাস্তবে এসব ভৌতিক- সাপে কাটলে জেলা সদর হাসপাতালে আনতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে আতঙ্কিত গ্রামবাসীদের। বর্তমানে হাসপাতালে অতি উন্নতমানের এন্টিভেনম আছে।

‘ভৌতিক সাপের দংশন’- কী বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ-ইসলামিক ফাউন্ডেশন

 মেহেরপুর প্রতিনিধি 
২৮ মে ২০২২, ০১:৪১ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মেহেরপুর সদর উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামে সাপের কামড়ে মারা যায় মুরশেলিন হোসেন নামের ১০ বছরের এক শিশু। এরপর আরও কয়েকজনকে সাপে কামড় দেয়। তারা সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

এদিকে মুরশেলিন হোসেনের মৃত্যুর পর শুরু হয় স্থানীয় ওঝাঁ বা কবিরাজের কারসাজি। তারা এটাকে ‘ভৌতিক সাপের দংশন’ উল্লেখ করে আতঙ্ক ছড়াতে থাকে।

আর এতেই মেহেরপুর সদর উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামের মানুষকে ভৌতিক সাপের দংশন আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। এই আতঙ্ক দূর করতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন গ্রামবাসীকে সচেতন করতে মাঠে নেমেছেন।

শুক্রবার বাদ জুমা গ্রামের সব মসজিদে ভৌতিক সাপ বলে কিছু নেই- একশ্রেণির মানুষ ফায়দা লুটতে এ আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য কর্মীদের দিয়ে ভৌতিক সাপ বলে কিছু নেই- যদি সাপে কাটে তাহলে তাৎক্ষণিক জেলা সদর হাসপাতালে তাকে নেওয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।
 
জানা গেছে, গত ১৭ দিনের ব্যবধানে পাশাপাশি উজ্জ্বলপুর- মনোহরপুর গ্রামের অন্তত ৩৫ জনকে সাপে কেটেছে। এর মধ্যে সাপের কামড়ে ১০ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি গ্রামবাসীর। ওই দুই গ্রামে প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের মন থেকে ভৌতিক সাপ আতঙ্ক দূর হচ্ছে।

ঘটনার শুরু গত ১২ মে উজ্জ্বলপুর গ্রামের মুরশেলিন হোসেন নামের ১০ বছরের এক শিশুর সাপের কামড়ে মৃত্যু হওয়ার পর।

স্থানীয়রা জানান, গত ১২ মে শেষরাত্রে  কামাল হোসেনের শিশুপুত্র মুরসেলিনকে সাপে কামড়ায়। তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর একদিন পর মাঠে কাজ করার সময় হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে সাপে কাটে। তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হন।

পরদিন সকাল উজ্জ্বলপুর গ্রামের  কুঠিপাড়ার চাঁদনী বেগমের  হাতে সাপে কামড় দেয়। বিকালের দিকে তার  জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এরপর পার্শ্ববর্তী শোলমারি গ্রামের হাসেম আলী ও রতন ওঝাঁর ঝাড়ফুঁকে সে ভালো হয় বলে তার দাবি।

এভাবে সুলতানা, টিপু, মনিসহ প্রায় ৩০-৩৫ জনকে সাপে কেটেছে বলে গ্রামবাসীর দাবি। তবে সাপের কামড় খাওয়া বেশির ভাগ মানুষই সাপকে দেখেননি বলে জানান।
 
গ্রামের অনেকেই মনে করছেন, স্থানীয় ওঝাঁর কারসাজিতে এ ধরনের সাপ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। শুধুমাত্র কামাল হোসেনের পুত্র সাপের কামড়ে মারা গেছে। বাকিগুলো সবই গুজব। ওঝাঁরা টাকা উপার্জনের জন্য এই সাপ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

উজ্জ্বলপুর গ্রামের নুর আলী বুকে সাপে কাটার দাগ দেখিয়ে বলেন- ওঝাঁ  হাসেম আলীর ঝাড়ফুঁকের পর সুস্থ হয়েছি। সন্তান পরিবার নিয়ে নিরাপদে থাকতে ওঝাঁর কাছ থেকে তাবিজ পড়া নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, সাপের কামড়ে যদি বিষ থাকে তাহলে ওঝাঁকে ৫শ টাকা; আর বিষ না থাকলে ৩শ টাকা দিতে হচ্ছে।

শরিফ হোসেন নামের আরও একজন জানান, গত সোমবার তার স্ত্রীকে কোনো কিছুতে কামড়েছিল। কবিরাজের ঝাড়ফুঁকে ভালো হয়েছে।

কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম রোজা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সাপে কামড়ানোর গুজবের বিরুদ্ধে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছি। গ্রামবাসীকে সচেতন করে তুলতে চেষ্টা করছি।

কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী মাস্টার জানান, ওঝাঁরা পরিকল্পিতভাবে সাপে কাটা গুজব ছড়িয়ে আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গ্রামের মসজিদে, শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সচেতনতায় কাজ করা হচ্ছে। শুক্রবার বাদ জুমা গ্রামের সব মসজিদের ইমাম ভৌতিক সাপ আতঙ্ক দূর করতে একশ্রেণির (ওঝাঁ কবিরাজ) থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মেহেরপুরের সিভিল সার্জেন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অলোক কুমার দাস বলেন, ইতোমধ্যে আমিসহ উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের একটি দল গ্রামটি পরিদর্শন করেছি। শোলমারি গ্রামের হাসেম আলী ও রতনসহ বেশ কয়েক জনের একটি চক্র গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে ফায়দা লুটছে। আমরা তাদের প্রাথমিকভাবে সতর্ক করেছি। এ কাজ বন্ধ না করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের আটক করা হবে। এছাড়া একটি মেডিকেল টিমও গ্রামের মানুষের মনোবল ধরে রাখতে সর্বক্ষণিক অবস্থান করছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জামিল মোহাম্মদ হাসিবুস সাত্তার জানান, ভৌতিক সাপ নিয়ে গল্প সিনেমায় চলে। বাস্তবে এসব ভৌতিক- সাপে কাটলে জেলা সদর হাসপাতালে আনতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে আতঙ্কিত গ্রামবাসীদের। বর্তমানে হাসপাতালে অতি উন্নতমানের এন্টিভেনম আছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন