‘আল্লাহ সাহায্য না করলে আমরা আর কী বা করতে পারি’

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৩ জুন ২০১৮, ১০:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

রোহিঙ্গা শিবির

বৃষ্টি, ভূমিধস আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা এখন আদিম মানুষের মতোই অসহায়৷ শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা নির্ভর করছেন কেবল ভাগ্যের ওপর৷

এ সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরের পাশেই পাহাড়৷ বিষণ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিলেন শরণার্থী ওয়াসিউর রহমান মাটির পাহাড়ের একটি জায়গা৷ সেখানে কিছু দিন আগে ভারী বৃষ্টিতে ভূমিধসে মারা গেছেন এক রোহিঙ্গা নারী৷ তিনি হয়তো ভাবছিলেন, নিজের এবং তার পরিবারের বেঁচে যাওয়ার সৌভাগ্যের কথা৷ ৫৩ বছর বয়স্ক ওয়াসিউর বলেন, ‘আমার পরিবারও মারা যেতে পারত৷ চারপাশে প্রচুর শিশু রয়েছে৷ আমরা সবসময়ই আতঙ্কে থাকি কখন বৃষ্টির কারণে ভূমিধস হয়!’

পরিবারের ৯ সদস্য নিয়ে ওয়াসিউর মিয়ানমার থেকে জাতিগত নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসার পর পাহাড়ের ঠিক পাশেই বাঁশের মাচা ঘর তৈরি করে থাকছেন৷

গত আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংস নিপীড়নে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে৷ কিন্তু এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগ থেকেই শুরু হয়েছিল শঙ্কা৷ আগের শরণার্থী এবং নতুন করে আসা শরণার্থী মিলিয়ে মোট ১০ লাখ শরণার্থী কক্সবাজারের পাহাড়ি ঢালে প্লাস্টিকের বস্তা বা বাঁশের চাটাই দিয়ে ডেরা তৈরি করে থাকছেন৷ শরণার্থীদের ভূমিধস থেকে প্রাণে বাঁচানোর তাগিদেই সরকার বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে৷ বুলডোজার দিয়ে সমান করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থান, শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করছে৷ তার পরও কিছু দিন আগের ভূমিধসে রোহিঙ্গা মেয়েটির মৃত্যু শঙ্কা তৈরি করেছে নতুন করে৷

পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে প্রাণহানির ঝুঁকিতে থাকা দুই লাখ রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নেওয়ার মতো জায়গার অভাব রয়েছে বাংলাদেশে৷ এখন পর্যন্ত মাত্র ২১ হাজার শরণার্থীকে কিছুটা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে৷

কক্সবাজারে জাতিসংঘ শরণার্থী শিবিরের প্রধান কেভিন জে অ্যালেন বলেন, ভূমিধস বা পাহাড়ি ঢলে সত্যিকার অর্থেই ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে৷ সেক্ষেত্রে এসব শরণার্থী আরেকটি বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বেন এবং এবার প্রকৃতির দ্বারা৷

ক্যাম্পের অস্থায়ী ঘরগুলোকে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত আড়াই মিটারের বেশি (আট ফুট) বৃষ্টিপাত সহ্য করতে হবে৷ মোটামুটি এক বছর ব্রিটেনে, যা বৃষ্টিপাত হয় তার তিনগুণ!

এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে৷ এ কারণে প্রচুর পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার৷ বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের প্রতিকূল অবস্থা থেকে রক্ষা করতে সরকার ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানসমূহ আরও বেশ কিছু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ পাহাড়ের খাড়া অংশগুলোকে সমান করা, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, বর্ষাকালীন রোগব্যাধি সম্পর্কে সচেতন করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে৷

পায়খানাগুলো বালির বস্তা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, যাতে জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতি না হয়৷ আবার রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থাও করতে পারছে না৷ প্রথমত সামর্থ্যের অভাব এবং দ্বিতীয়ত এটি স্থায়ীভাবে তাদের এখানে থাকার সুযোগ করে দেবে৷ ঢাকার পরিকল্পনা হচ্ছে- এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো৷

নূর মোহাম্মদ নামে আরেক শরণার্থীর খুপড়িঘরের ছাদ এক সাম্প্রতিক ঝড়ে উড়ে গেছে৷ তিনি এটা বাঁচানোর চেষ্টায় কাঠ আর পাথর দিয়ে বাড়ির ছাদ ভারী করেছেন৷ কিন্তু চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় যখন হাওয়া বইবে, তখন এর কার্যকারিতা নিয়ে তার নিজেরই সন্দেহ রয়েছে৷

তিনি বলেন, আমরা রোহিঙ্গারা ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে অপরিচিত নই৷ মিয়ানমারে আমাদের ঘরগুলো এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধক হিসেবে তৈরি করা হয়৷ চারপাশের গাছগুলো একটি শক্ত প্রতিরোধ বা বাধা হিসেবে কাজ করত৷ এখানে সে রকম আটকানোর কিছুই নেই৷

পাহাড়ে উজাড় হয়ে যাওয়া বিস্তৃত বনাঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন৷ তাদের জন্য বাংলাদেশ হাজার হাজার হেক্টর জমি দিয়েছে, কিন্তু সেটা পাহাড়ে এবং রোহিঙ্গারা এখানে আসার আগেও ভূমিধসে বাংলাদেশে প্রাণহানির ঘটনা বিরল নয়৷

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক বলেন, মসজিদ ও কমিউনিটি সেন্টারগুলো দুর্যোগকালীন দেড় লাখ লোককে আশ্রয় দিতে পারবে৷ কিন্তু বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাতের শঙ্কা থাকলে এসব শরণার্থীকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে, যে ব্যবস্থপনা নেই৷

এদিকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছেন৷

রোহিঙ্গা ইমাম ইউসুফ বলেন, ‘সবাই ভয় পাচ্ছে এটি ভেবে যে, কোথায় যাবে। কেননা আমাদের বাড়ি তো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে৷

সেবা সংস্থাগুলো বলছে- বড় ধরনের যে কোনো ঘূর্ণিঝড় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিতে পারে৷ ফলে খাবার ও অন্যান্য সরবরাহ বন্ধ থাকবে৷

যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর সমান বিপুল জনসংখ্যার রোহিঙ্গা গোষ্ঠী সত্যি তখন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে সম্মুখীন হবে৷

অবশ্য সে রকম অবস্থা তৈরি হলে খাদ্যবহনকারী কয়েক হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাকর্মী প্রস্তুত রয়েছে বলে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার জরুরি বিভাগের সমন্বয়ক পিটার গেস্ট জানিয়েছেন৷

কেননা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের কোথাও পালানোর বা যাওয়ার সুযোগ নেই৷ কারণ, বাংলাদেশের নিরাপত্তাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারিতে রয়েছেন তারা৷

নিজেদের অসহাত্বের কথা ৭০ বছের বৃদ্ধ শরণার্থী দিল মোহাম্মদের সুরেই সবচেয়ে করুণভাবে এলো, আল্লাহ সহায়তা না করলে আমরা আর কী বা করতে পারি! সূত্র: ডয়েচে ভেলে

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

 

 

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.