শহিদ কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন রোববার 
jugantor
শহিদ কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন রোববার 

  রাজশাহী ব্যুরো  

২৫ জুন ২০২২, ১৭:৪৩:৪০  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কজন ক্ষণজন্মা মানুষ স্বীয় প্রতিভা ও কর্মগুণে খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং বাঙালি জনজীবনে নিজের আসন পাকাপোক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন তাদের মধ্যে জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান (১৯২৩-১৯৭৫) একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। আগামীকাল রোববার তার ৯৯তম জন্মদিন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামানের অবদানের কথা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে। ওই সময় মুজিবনগর সরকার গঠন এবং যুদ্ধ পরিচালনায় তার দক্ষতা ও যোগ্যতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। দীর্ঘ ৩৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনই নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং তিনি সর্বদাই জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন।

এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৯২৩ সালের ২৬ জুন বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার বাগাতিপাড়া থানার মালঞ্চী রেলস্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে মাতুতালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার বাড়ি রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ মহল্লায়। তার দাদা গুলাইয়ের জমিদার হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬) ব্রিটিশ আমলে একজন রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে খ্যাত ছিলেন।

কামারুজ্জামানের বাবা আবদুল হামিদ মিয়া (১৮৮৭-১৯৭৬) ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক। তিনি রাজশাহীতে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ছিলেন।

এএইচএম কামারুজ্জামানও দাদা ও বাবার আদর্শকে সামনে রেখে শৈশবেই অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। বাবা আবদুল হামিদ মিয়া ও মাতা জেবুননেসার ১২ জন ছেলেমেয়ের মধ্যে কামারুজ্জামান ছিলেন প্রথম সন্তান। তার জন্মের সময় দাদা হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার ছিলেন কলকাতায়। তিনি রাজশাহী এসে নাতির আকিকার ব্যবস্থা করেন। নাতির তিনি নামকরণ করেন আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। ডাক নাম দিলেন দাদি ‘হেনা’।

কামারুজ্জামান হেনার বাল্যশিক্ষা শুরু হয় বাড়িতেই পিতৃব্য বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক কবি মুহাম্মদ আব্দুস সামাদের কাছে। তারপর তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তার এক ফুফা। হঠাৎ করেই তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে বদলি হয়ে যান। ফলে কামারুজ্জামান হেনাকেও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান।

কামারুজ্জামান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশের পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৬ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ল’ পাশ করেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪২ সালে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক এবং ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫১ সালে বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া থানার চামরুল গ্রামের জোতদার আশরাফ উদ্দীন তালুকদারের মেয়ে জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন।

১৯৫৬ সালে কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি দুবার মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন।

আইয়ুব খান সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির সমর্থনে ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পুনরায় তিনি রাজশাহী থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে সারা দেশে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে। এমন সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচ সদস্যের দলীয় হাইকমান্ড গঠন করেন। এ হাইকমান্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন কামারুজ্জামান।

১৯৭১ সালের এর ১০ এপ্রিল গঠিত হয় প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার এবং ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তীতে মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

নবগঠিত মুজিবনগর সরকারে কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কামারুজ্জামান ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে তিনি মুক্তাঞ্চল, শরণার্থী শিবির ও সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করতেন। যুদ্ধ শেষ হবার পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও মন্ত্রীবর্গসহ স্বাধীন দেশে ফেরত আসেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে এলে সরকার পুনর্গঠিত হয়। সেই পুনর্গঠিত সরকারে তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কামারুজ্জামান।

১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি রাজশাহীর দুটি সদর গোদাগাড়ি ও তানোর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করলে তিনি বাকশালের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা করে ঘাতকরা। ওই সময় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেফতার ও কারাবন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে কামারুজ্জামানসহ আরও জাতীয় তিন নেতাকে হত্যা করা হয়।

ব্যক্তি জীবনে শহীদ কামারুজ্জামান ছয় সন্তানের জনক। তার সন্তানরা হলেন- ফেরদৌস মমতাজ পলি (১৯৫৩), দিলারা জুম্মা রিয়া (১৯৫৫), রওশন আক্তার রুমি (১৯৫৭), এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (১৯৫৯), এএইচএম এহসানুজ্জামান স্বপন (১৯৬১) ও কবিতা সুলতানা চুমকি (১৯৬৪)।

তার বড় ছেলে অ্যাডভোকেট এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনও বাবার মতোই রাজনীতিতে জড়িত রয়েছেন। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র।

বিভিন্ন কর্মসূচি: জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২৬ জুন রাজশাহী সিটি করপোরেশন আয়োজিত কর্মসূচিতে রয়েছে- সকাল ৯টায় কামারুজ্জামানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে নগর ভবনের মসজিদে পবিত্র কুরআন খতম। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে নগর ভবন চত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে কামারুজ্জামানের মাজার চত্বরে শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে শিশুদের নিয়ে নগর ভবনে কেক কাটা। বাদ জোহর নগর ভবনের মসজিদসহ মহানগরীর সব ওয়ার্ডের মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনা। বেলা ২টায় হজরত শাহ্ মখদুম দরগা মাদ্রাসাছাত্রদের মাঝে খাবার পরিবেশন ও বিশেষ দোয়া। সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কামারুজ্জামানের বর্ণাঢ্য জীবনীর ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের আয়োজনে সকাল ১০টায় কুমারপাড়ায় দলীয় কার্যালয় থেকে র্যা লিসহ শহিদ কামারুজ্জামানের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে। বেলা ১১টায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ। বিকাল ৫টায় সিঅ্যান্ডবি মোড়ে কামারুজ্জামান মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

শহিদ কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন রোববার 

 রাজশাহী ব্যুরো 
২৫ জুন ২০২২, ০৫:৪৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কজন ক্ষণজন্মা মানুষ স্বীয় প্রতিভা ও কর্মগুণে খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং বাঙালি জনজীবনে নিজের আসন পাকাপোক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন তাদের মধ্যে জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান (১৯২৩-১৯৭৫) একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। আগামীকাল রোববার তার ৯৯তম জন্মদিন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামানের অবদানের কথা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে। ওই সময় মুজিবনগর সরকার গঠন এবং যুদ্ধ পরিচালনায় তার দক্ষতা ও যোগ্যতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। দীর্ঘ ৩৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনই নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং তিনি সর্বদাই জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন।

এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৯২৩ সালের ২৬ জুন বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার বাগাতিপাড়া থানার মালঞ্চী রেলস্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে মাতুতালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার বাড়ি রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ মহল্লায়। তার দাদা গুলাইয়ের জমিদার হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬) ব্রিটিশ আমলে একজন রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। 

কামারুজ্জামানের বাবা আবদুল হামিদ মিয়া (১৮৮৭-১৯৭৬) ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক। তিনি রাজশাহীতে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ছিলেন। 

এএইচএম কামারুজ্জামানও দাদা ও বাবার আদর্শকে সামনে রেখে শৈশবেই অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। বাবা আবদুল হামিদ মিয়া ও মাতা জেবুননেসার ১২ জন ছেলেমেয়ের মধ্যে কামারুজ্জামান ছিলেন প্রথম সন্তান। তার জন্মের সময় দাদা হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার ছিলেন কলকাতায়। তিনি রাজশাহী এসে নাতির আকিকার ব্যবস্থা করেন। নাতির তিনি নামকরণ করেন আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। ডাক নাম দিলেন দাদি ‘হেনা’। 

কামারুজ্জামান হেনার বাল্যশিক্ষা শুরু হয় বাড়িতেই পিতৃব্য বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক কবি মুহাম্মদ আব্দুস সামাদের কাছে। তারপর তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তার এক ফুফা। হঠাৎ করেই তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে বদলি হয়ে যান। ফলে কামারুজ্জামান হেনাকেও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান। 

কামারুজ্জামান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশের পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। 

১৯৫৬ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ল’ পাশ করেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪২ সালে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক এবং ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫১ সালে বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া থানার চামরুল গ্রামের জোতদার আশরাফ উদ্দীন তালুকদারের মেয়ে জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন।

১৯৫৬ সালে কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি দুবার মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন। 

আইয়ুব খান সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির সমর্থনে ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পুনরায় তিনি রাজশাহী থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে সারা দেশে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে। এমন সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচ সদস্যের দলীয় হাইকমান্ড গঠন করেন। এ হাইকমান্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন কামারুজ্জামান।

১৯৭১ সালের এর ১০ এপ্রিল গঠিত হয় প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার এবং ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তীতে মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

নবগঠিত মুজিবনগর সরকারে কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কামারুজ্জামান ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে তিনি মুক্তাঞ্চল, শরণার্থী শিবির ও সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করতেন। যুদ্ধ শেষ হবার পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও মন্ত্রীবর্গসহ স্বাধীন দেশে ফেরত আসেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে এলে সরকার পুনর্গঠিত হয়। সেই পুনর্গঠিত সরকারে তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কামারুজ্জামান। 

১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি রাজশাহীর দুটি সদর গোদাগাড়ি ও তানোর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করলে তিনি বাকশালের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা করে ঘাতকরা। ওই সময় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেফতার ও কারাবন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে কামারুজ্জামানসহ আরও জাতীয় তিন নেতাকে হত্যা করা হয়।

ব্যক্তি জীবনে শহীদ কামারুজ্জামান ছয় সন্তানের জনক। তার সন্তানরা হলেন- ফেরদৌস মমতাজ পলি (১৯৫৩), দিলারা জুম্মা রিয়া (১৯৫৫), রওশন আক্তার রুমি (১৯৫৭), এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (১৯৫৯), এএইচএম এহসানুজ্জামান স্বপন (১৯৬১) ও কবিতা সুলতানা চুমকি (১৯৬৪)। 

তার বড় ছেলে অ্যাডভোকেট এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনও বাবার মতোই রাজনীতিতে জড়িত রয়েছেন। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র। 

বিভিন্ন কর্মসূচি: জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামানের ৯৯তম জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২৬ জুন রাজশাহী সিটি করপোরেশন আয়োজিত কর্মসূচিতে রয়েছে- সকাল ৯টায় কামারুজ্জামানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে নগর ভবনের মসজিদে পবিত্র কুরআন খতম। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে নগর ভবন চত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে কামারুজ্জামানের মাজার চত্বরে শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে শিশুদের নিয়ে নগর ভবনে কেক কাটা। বাদ জোহর নগর ভবনের মসজিদসহ মহানগরীর সব ওয়ার্ডের মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনা। বেলা ২টায় হজরত শাহ্ মখদুম দরগা মাদ্রাসাছাত্রদের মাঝে খাবার পরিবেশন ও বিশেষ দোয়া। সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কামারুজ্জামানের বর্ণাঢ্য জীবনীর ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন। 

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের আয়োজনে সকাল ১০টায় কুমারপাড়ায় দলীয় কার্যালয় থেকে র্যা লিসহ শহিদ কামারুজ্জামানের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে। বেলা ১১টায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ। বিকাল ৫টায় সিঅ্যান্ডবি মোড়ে কামারুজ্জামান মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন