টানা বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, নেই ঈদ আনন্দ

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৮, ০৮:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

  অনলাইন ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিশাল এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। প্রতিদিনই ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে।

এতে রোহিঙ্গাদের মাঝে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ মাটি হয়ে গেছে। টানা বর্ষণে পানি জমে যাওয়ায় অনেকে না খেয়েই রোজা পালন করেছেন। পাহাড় ধসের আশঙ্কায় তাদেরকে অন্যত্র সড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। ঈদের আর একদিন বাকি থাকলেও তাদের চোখেমুখে শংকা। ঈদের আনন্দ তাদের স্পর্শ করছে না।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যরত দাতা সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে প্লাবিত হয়ে এবং ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় তিন হাজার ঘরবাড়ি। এখানে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। স্যানিটেশন ব্যবস্থা অচল হয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

ঘরের দেয়াল এবং গাছ চাপা পড়ে এই পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে শতাধিক। শনিবার থেকে জেলায় ভারি বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম-এর ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার শিরিন আকতার জানিয়েছেন, গত ছয় দিনে বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রায় তিন হাজার ২০০ ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এই সময়ে পাহাড় ধসে বিধ্বস্ত হয়েছে ২৪৩টি ঘর।

শিরিন আকতার জানান, টানা ভারি বর্ষণে ৩১ হাজার রোহিঙ্গা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। গত ছয় দিনের বর্ষণে বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইওএম-এর সাইড ব্যবস্থাপনা প্রকৌশলী জাহাঙ্গির আলম বলেছেন, অব্যাহত ভারি বর্ষণের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রায় সব ক্যাম্পে যাতায়াতের রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে পয়ঃনিষ্কাশন নালা ও লেট্রিনগুলো ব্যাবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, কুতুপালং থেকে বালুখালীর ময়নার ঘোনা পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। কয়েকটি ক্যাম্পে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পাহাড় ধসের মতো আরও বড় দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছোসেবকরা জরুরি উদ্ধারকারী সরঞ্জাম ও উপকরণ বিতরণ করেছে।

তিনি বলেন, কুতুপালং ক্যাম্পের পশ্চিমে নতুন ১৮৬ একর ভূমিতে প্রায় সাত হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে এখানে সরিয়ে আনা হয়েছে।

কুতুপালং ক্যাম্পের মাঝি আবু ছিদ্দিক বলেন, সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে কুতুপালং ক্যাম্পে। টানা বর্ষণে এই ক্যাম্পের পাঁচ শতাধিক ঘর ভেসে গেছে। এই পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে অন্য রোহিঙ্গাদের ঘরে।

তিনি জানান, এই ক্যাম্পের অধিকাংশ ঘর পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ অনেক পরিবারকে এখনও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়নি।

জীবনের ঝুঁকির মধ্যে এসব পরিবারের মাঝে ঈদের আনন্দ নেই বলে জানান তিনি।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মী সোহেল ইসলাম জানান, ভারী বৃষ্টির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিছু এলাকা বর্তমানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে কুতুপালং ৫ ও ৬ বালুখালী ১ এবং ২ ক্যাম্পে অধিকাংশ এলাকা। ঢলের পানির সঙ্গে ময়লা ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা একাকার হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এতো বেশি সংখ্যক লোকজনকে ব্যবস্থাপনা দেয়া সত্যিই কঠিন কাজ। টানা বর্ষণ হলে সাময়িক কিছু দুর্ভোগে তাদের কষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবেলা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে ক্যাম্পে ছোট খাটো ভূমি ধসের ঘটনা ঘটছে। বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। তবে এখনো পর্যন্ত বড় ধরণের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে। সূত্র: বাসস