বিদ্যুৎহীন চরে পাঁচ কাপ চায়ে রাতভর খেলা!

  শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০১৮, ২২:০২ | অনলাইন সংস্করণ

সোলার বা সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে খেলা দেখানো হচ্ছে চর এলাকায়
সোলার বা সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে খেলা দেখানো হচ্ছে চর এলাকায়। ছবি: যুগান্তর

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতুনি ইউনিয়নের যমুনা নদীর দুর্গম চরের গ্রামগুলোতে চলছে বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা।

চরের হতদরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ দুবেলা পেট ভরে দুমুঠো ভাত খেতে পায় না। ঘরে চাল নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই। চুলায় আগুন জ্বলে না। তারপরেও তারা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে উন্মাদনায় মেতে উঠেছে।

চরের গ্রামগুলোর গাছের সুউচ্চ ডালে ডালে টাঙিয়েছে প্রিয় দলের বিশাল বিশাল পতাকা। সড়ক-দোকার-বাড়িঘর ছাড়াও এ পতাকা ও শোভা পাচ্ছে নৌকা, রিকশা-ভ্যান, টেম্পু, গাড়িতে।

এ ছাড়া রাস্তাঘাট,বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলিতে লাগানো হয়েছে বড় বড় ব্যানার ও ফেসটুন। এসব ব্যানার ও ফেসটুনে ছেয়ে গেছে গোটা চরের গ্রাম প্রান্তর। এর ওপর সেখানে নেই কোনো বিদ্যুৎ সুবিধা। নেই কোনো ভালো রাস্তাঘাট। ক্যাবল নেটওয়ার্ক সেখানে শুধুই অলীক স্বপ্ন।

তারপরেও তারা বিশ্বকাপ উন্মাদনায় পিছিয়ে নেই। সারা দেশের মতো সোনাতুনি ইউনিয়নের চরবাসীর মধ্যেও বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁতশ্রমিক, মাটিকাটা শ্রমিক, গরুর রাখাল, দিনমজুর, কুলি, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নৌকার মাঝিমাল্লা থেকে শুরু করে ছোট বড় সব বয়সের মানুষ এ উন্মাদনায় মেতে উঠেছে।

চরের অধিকাংশ মানুষের গায়ে শোভা পাচ্ছে প্রিয় দলের জার্সি। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে জার্সি কেনার ধুম পড়েছে। ফলে জার্সি বিক্রির দোকানগুলোতে শুরু হয়েছে ব্যাপক বেচাকেনা।

এ যেন এক অন্য রকম আনন্দে ভাসছে চরের হতদরিদ্র শ্রমজীবী মানুষগুলো। সারা দিন তারা মাঠে ময়দানে হাড় ভাঙা খাটুনি শেষে সন্ধ্যায় ছুটে চলে বিভিন্ন বাজারের দিকে। সেখানে চায়ের দোকান কিংবা অন্য কোনো দোকানে গভীর রাত পর্যন্ত বসে অথবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখছে।

এসব খেলা দেখার আসরে সমর্থকদের মধ্যে চলছে হারজিত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ। অনেকে আবার টাকার বিনিময়ে বাজিও ধরছে।

এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওই সব চায়ের দোকানিরা অভিনব কৌশলে বাড়তি আয় করছে।

ধীতপুর গ্রামের আলমাস আলী মণ্ডল, চয়ন ইসলাম, রমজান আলী, শ্রীপুর বাজারের কেজি স্কুলের শিক্ষক আমিরুল ইসলাম,পল্লী চিকিৎসক হায়দার আলী ও ১নং ওয়ার্ড মেম্বার আবদুর রাজ্জাক জানান, শ্রীপুর বাজারে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তাই চায়ের দোকানিরা শ্যালোইঞ্জিন দিয়ে তৈরি ডায়নামা সার্ভিস চালু করেছে। ডায়নামার সাহায্যে তারা গ্রাহকদের খেলা দেখাচ্ছে।

তারা জানান, তেলের টাকার জোগান হিসেবে একজন দর্শককে কমপক্ষে পাঁচ কাপ করে চা খেতে হয়। অথবা নগদ ৫-১০ টাকা করে দিতে হয়। গ্রাহকরাও এর বিনিময়ে বিরতিহীনভাবে রাতভর খেলা দেখার সুযোগ পাচ্ছে।

ছোট চাঁনতারা বাজারেও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। সেখানে সোলার বা সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে খেলা দেখানো হচ্ছে। এ বাজারে পাঁচটি চায়ের দোকান ছাড়াও আবদুল মান্নানের কম্পিউটারের দোকানে চরবাসী ভিড় করে খেলা দেখছে।

এ ব্যাপারে আবদুল হান্নান জানান, তিনি এ বিশ্বকাপ খেলা দেখতে শখের বসে ৪২ ইঞ্চি একটি এলইডি টেলিভিশন কিনেছেন। এ টিভি তার দোকানেই চালানো হয়। এতো বড় টিভি এই বাজারে আর কারো নেই। তাই তার দোকানে দর্শকের ভিড়ও একটু বেশি। এ বাজারে বিদ্যুৎ না থাকায় তিনি সোলার বা সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে দর্শকদের বিশ্বকাপ খেলা দেখাচ্ছেন।

ছোট চাঁনতারা গ্রামের আবদুর রহমান নামের এক কিশোর জানান, সে ব্রাজিলের ভক্ত। ব্রাজিলের একটি গেঞ্জি কিনতে তাকে শহরে যেতে হয়েছে। এ জন্য যমুনা ও করতোয়াসহ তিনটি ছোট বড় নদী পাড় হয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে শহর থেকে গেঞ্জি কিনে এনেছে সে।

একই গ্রামের নওশাদ আলী নামের অপর এক কিশোর জানালেন,সে আর্জেন্টিনার ভক্ত। সে তার গায়ের গেঞ্জি একই ভাবে শাহজাদপুর শহর থেকে কিনেছে।

এ ছাড়া সুমন, সেলিম, নজরুল, শামীম, সোলায়মান জানান, অনেক দূর থেকে খেলা দেখতে তাদের বাজারে পায়ে হেটে আসতে হয়। তারপরেও তারা খেলা দেখতে সন্ধ্যায় বাজারে ছুটে আসেন। রাতভর খেলা দেখা শেষে আবার হেঁটে বাড়ি ফেরেন।

তারা আরো জানান, ৫-৬ মাইল পথ পায়ে হেঁটে তাদের মতো অনেকেই এ বাজারে খেলা দেখতে আসে। এখানে চলাচলের জন্য পায়ে হাঁটা ছাড়া কোনো প্রকার যানবাহন নেই।

শাহজাদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রফেসর আজাদ রহমান জানান, শাহজাদপুরের চর অঞ্চলের হতদরিদ্র, শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত যমুনার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। তারা অত্যন্ত সহজ ও সরল প্রকৃতির বিনোদন প্রিয় মানুষ। ফুটবল খেলা তাদের সেই বিনোদনের চাহিদা পূরণ করে। তাই বিশ্বকাপ ফুটবল তাদের কাছে অমৃত সমান। তাই তারা কষ্ট হলেও দূর-দূরান্ত পথ পাড়ি দিয়ে হলেও এ খেলা দেখতে বাজার ঘাটে ছুটে যান।

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮

 

 

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter