বড়পুকুরিয়ার ঘটনাকে ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে চালানোর চেষ্টা

  একরাম তালুকদার, দিনাজপুর প্রতিনিধি ২৪ জুলাই ২০১৮, ২০:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা গায়েব
বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা গায়েব। ফাইল ছবি

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর খনি কর্তৃপক্ষ এখন এটিকে সিস্টেম লস হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

খনিতে এত দিন থেকে কোনো সিস্টেম লসের বিষয় উল্লেখ করা না হলেও কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ সিস্টেম লসের ঘটনা উল্লেখ করে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ায় চেষ্টায় হতবাক হয়েছে স্থানীয় কয়লা ব্যবসায়ী ও খনি এলাকার মানুষ। তারা এটিকে খনি কর্তৃপক্ষের ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয়রা জানান, খনিতে চুরির বিষয়টি নতুন নয়, এর আগেই থেকেই অনেক চুরির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটিতে।

কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) জোবায়ের হোসেনকে আহ্বায়ক করে গঠিত ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

রোববার কমিটির দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ১০ অক্টোবর বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ২৭ জুন পর্যন্ত কয়লা উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার টন। এর মধ্যে ২০০৬ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে বিক্রি করা হয় ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার টন কয়লা।

এছাড়াও ইটভাটাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয় ৩৩ লাখ ১৯ হাজার টন কয়লা। খনি কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ ব্যবহার করে ১২ হাজার টন। সিস্টেম লস দেখানো হয় ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। যার পরিমাণ উধাও হয়ে যাওয়া কয়লার সমপরিমাণ অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন।

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সদ্য অপসারণ হওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দীন আহমদ জানান, এক লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা সিস্টেম লস।

তিনি দাবি করেন, গত ১১ বছরে এক কোটি ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে, এর মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা সিস্টেম লস।

এই সিস্টেম লস হিসেবে হাবিব উদ্দীন আহমদ উল্লেখ করেন, এই কয়লা বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে, বাতাসে উড়ে গেছে, আগুনে পুড়ে গেছে, জ্বলীয় বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে, কার্বন নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি জানান, এই সিস্টেম লস আগে তারা বুঝতে পারেননি।

স্থানীয় কয়লা ব্যবসায়ী ও খনি এলাকার অধিবাসীরা জানান, খনি কর্তৃপক্ষ গত ২০ জুন পিডিবিকে নিশ্চিত করেন, তাদের কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৮০ হাজার টন কয়লা মজুদ আছে। আর মাত্র ১০ দিনেই ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার পর তারা এটিকে সিস্টেম লস হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছে-এটি হাস্যকর।

কয়লা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান এবং স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জীবন, পরিবেশ ও সম্পদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মশিউর রহমান বুলবুল জানান, কয়লা উধাওসহ খনিতে নানান দুর্নীতির বিষয়টি খনির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের পরিমাণ যাচাই করলেই হদিস পাওয়া যাবে।

এ প্রসঙ্গে তারা খনির সদ্য অপসারিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিবউদ্দীন আহমদ, সদ্য বদলিকৃত মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও কোম্পানি সচিব আবুল কাশেম প্রধানীয়া, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মাসুদুর রহমান হাওলাদারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের পরিমাণ যাচাই করার দাবি জানান। এসব যাচাই করলেই এটি সিস্টেম লস না অন্যকিছু, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে খনি থেকে কয়লা উধাওয়ের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ফুলবাড়ী উপজেলা শাখা। গত সোমবার বিকালে তারা স্থানীয় নিমতলামোড় থেকে এই বিক্ষোভ মিছিল ও পথসভা করেন।

ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও তেলগ্যাস খনিজ সম্পাদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার সাবেক সদস্য সচিব এসএম নুরুজ্জামান বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে চুরি শুরু হয়েছে ২০১০ সাল থেকে। ২০১০ সালে প্রথম সেখান থেকে দুই কোটি টাকার তামা চুরি হয়েছিল, সেই সময় তামা চুরির মূল হোতাদের আড়াল করে, তৃতীয়পক্ষের অধীনে কর্মরত গোলাম মোস্তফা নামে এক শ্রমিককে ফাঁসানো হয়। পরে গোলাম মোস্তফা উচ্চ আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে।

এরপর তামা চুরির ঘটনা আর আলোর মুখ দেখেনি। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েবের ঘটনার পুনারাবৃত্তি মনে করছেন খনি এলাকার সাধারণ মানুষ। আর এমনি করে রাষ্ট্রীর সম্পদ চুরির ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বাংলাদেশ ট্রেড ইয়নিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি)।

এমএম নুরুজ্জামান বলেন, এখানে শুধু কয়লা তামা চুরি হয় না, এর সঙ্গে আছে খনি কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্য। খনিতে ১ টন কয়লার দাম ১৭ হাজার টাকা হলেও বাজারে এর দাম ২০ হাজার টাকা। ১০০ টন কয়লার ডিও মানে দুই লাখ টাকা, এভাবে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হয় কয়লা খনিতে।

এদিকে খনির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, খনির ইয়ার্ড থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লার গড়মিল ঘটনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো. কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গত সোমবার বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে আসেন। তদন্ত শেষে তারা মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরে গেছেন। তবে তাদের তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

জানা গেছে, একটি ফেস থেকে নতুন ফেসে যন্ত্রপাতি স্থানান্তরের জন্য গত ১৬ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পুনরায় কয়লা উত্তোলন শুরু হবে আগস্ট মাসের শেষের দিকে। এই সময়ের মধ্যে পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদ রয়েছে বলে গত ২০ জুন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবিকে নিশ্চিত করে খনি কর্তৃপক্ষ।

গত ২০ জুন খনি কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে নিশ্চিত করে খনির কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৮০ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে। মজুদকৃত এই কয়লা দিয়ে আগস্ট মাস পর্যন্ত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখা যাবে বলে নিশ্চিত করে খনি কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু জুলাই মাসের শুরু থেকেই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে হঠাৎ কয়লার সরবরাহ কমিয়ে দেয় খনি কর্তৃপক্ষ। খনি কর্তৃপক্ষ গত ৪-৫ দিন আগে পিডিবিকে জানিয়ে দেয়, খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ শেষপর্যায়ে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বেশি দিন কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

পরে কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় গত রোববার থেকে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ বন্ধ করে দেয় খনি কর্তৃপক্ষ। ফলে কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।

কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়ায় পেট্রোবাংলা ও খনি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) সন্ধ্যায় পেট্রোবাংলা এক অফিস আদেশে খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপমহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

এছাড়াও ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দফতরে সংযুক্ত করা হয় এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড সিরাজগঞ্জে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়। বড়পুকুরিয়া খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পেট্রোবাংলার পরিচালক আইয়ুব খানকে।

উল্লেখ্য, কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন। গত রোববার রাত ১০টা থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : বড়পুকুরিয়ায় কয়লা গায়েব

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×