উন্নয়ন ইস্যুতেই লিটনের ভূমিধস জয়, ৫ কারণে ধরাশায়ী বুলবুল

  রাজশাহী ব্যুরো ০১ আগস্ট ২০১৮, ১১:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

উন্নয়ন ইস্যুতেই লিটনের ভূমিধস জয়, ৫ কারণে ধরাশায়ী বুলবুল
ছবি- যুগান্তর

ব্যাপক দলীয় কোন্দল, ব্যক্তি ইমেজের মারাত্মক ঘাটতি ও জামায়াতের নিষ্ক্রিয়তা ছাড়াও পুলিশি ও প্রশাসনিক প্রতিকূলতাসহ পাঁচ কারণে বিএনপি-জামায়াতের অন্যতম ঘাঁটি রাজশাহীতে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েও বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

বুলবুলের পরাজয়ের পেছনে এসব কারণই দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি নির্বাচনে দলীয় মেয়রপ্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল তার পরাজয়ের জন্য শুধু পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের বৈরী তৎপরতা ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপকেই বড় কারণ মনে করছেন।

অন্যদিকে উজ্জ্বল ব্যক্তি ইমেজ, বহুমাত্রিক নিরবচ্ছিন্ন গণসংযোগ ও নিবিড় প্রচার চালিয়ে ভোটারদের মন জয় করা ছাড়াও রাজশাহীর উন্নয়ন ইস্যু এবং প্রশাসনিক আনুকূল্যকে ভর করে আশাতীত জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি সোমবারের নির্বাচনে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৪ ভোট পেয়েছেন, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বুলবুলের চেয়ে ৮৮ হাজার বেশি।

এদিকে লিটন তথা আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের এই ভূমিধস জয় রাজশাহীতে নির্বাচনের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করলেও দলটির নেতাকর্মীরা এটিকে অপ্রত্যাশিত নয় বলে মনে করছেন।

বেসরকারি ফল ঘোষণার পর সোমবার গভীর রাতে লিটন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাজশাহীতে নৌকার এই বিজয় ঐতিহাসিক ও বিভিন্ন কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, রাজশাহীর উন্নয়নকেই এবার বেছে নিয়েছেন নগরীর মানুষ, যার অঙ্গীকার তিনি গণসংযোগ আর প্রচারের প্রতিটি পদক্ষেপেই তুলে ধরেছেন। ‘চলো আবার বদলে দেই রাজশাহী’- এ স্লোগান লুফে নিয়েছেন রাজশাহী সব শ্রেণির মানুষ।

দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুলবুলের এই বড় পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণটি হল- রাজশাহীতে দলের তীব্র আন্তঃকোন্দল। রাজশাহীতে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা রাসিকের সাবেক মেয়র ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু সমর্থকদের পুরোপুরি মাইনাস করে গত জানুয়ারিতে কেন্দ্র থেকে গঠন করেন রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি।

এ দুটি কমিটিতে একচেটিয়াভাবে স্থান পান বুলবুল সমর্থকরা। দুটি কমিটি নিয়ে মাসাধিককাল রাজশাহীতে ক্ষোভ-বিক্ষোভ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা অতিবিতর্কিত ও দল বিচ্ছিন্ন নেতাদের বাদ দেয়ার দাবি জানিয়ে জেলা এবং মহানগর বিএনপি কার্যালয়ে তালাও ঝুলিয়ে দেন। বিতর্কিতদের দিয়ে কমিটি করার জন্য রাজশাহী বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকেই দায়ী করে আসছেন।

তবে দলীয় নেতাকর্মীদের এ অভিযোগকে অস্বীকার করে বুলবুলের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু বলেন, দলের নেতাকর্মীদের ঠিকমতো মাঠে নামতে দেয়নি পুলিশ। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি হয়েছে, যা রাজশাহীর মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন।

রাজশাহী মহানগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করে যুগান্তরকে বলেন, গণবিচ্ছিন্ন নেতাদের দিয়ে বিএনপি দুটি কমিটি করে রাজশাহীতে বিএনপির কিংবদন্তি নেতা মিজানুর রহমান মিনুকে একহাত দেখাতে চেয়েছিলেন বুলবুল। এ কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীরা বুলবুলের ওপর ভীষণভাবে নাখোশ ছিলেন।

এবারের সিটি নির্বাচনে মিনু শুরু থেকেই বুলবুলের পক্ষে মাঠে নামলেও মিনু সমর্থক অধিকাংশ নেতাকর্মী ছিলেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। অনেকে রাগ-ক্ষোভে ভোটও দিতে যাননি কেন্দ্রে। বুলবুলের পরাজয়ের এটি বড় একটি কারণ বলে তারা মনে করেন।

দ্বিতীয় কারণ হল- ২০১৩ সালের জুনে মেয়র হওয়ার পর বুলবুল নিজেকে দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। দলের ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের সিটি ভবনে ঢুকতেও দিতেন না বুলবুল। অন্যদিকে বহু কাজ তিনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে করিয়েছেন, যাতে নিজ দলের ঠিকাদাররা গত ৫ বছরই সিটি ভবনে অবাঞ্ছিত হয়ে থেকেছেন।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাও প্রতিদ্বন্দ্বী লিটনের পক্ষে পরোক্ষভাবে কাজও করেছেন।

অন্যদিকে তৃতীয় কারণটি হল- গত ৫ বছরে বুলবুল নগরীর কোনো উন্নয়নই করতে পারেননি। আত্মপক্ষ সমর্থন করে বুলবুলের ভাষ্য হল- ক্ষমতাসীন দল তাকে ঠিকমতো মেয়রের চেয়ারেই বসতে দেয়নি। কিন্তু তার এই অজুহাত মানতে পারেননি রাজশাহীর সাধারণ ভোটাররা।

এ প্রসঙ্গে সামাজিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, নগরীতে ৫ বছরে কোনো উন্নয়নই বাস্তবে হয়নি। এ জন্য সাধারণ মানুষ বুলবুলের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতাকেই দায়ী করে থাকেন। এ কারণে তরুণ ও নতুন প্রজন্মের ভোটার ছাড়াও সাধারণ ভোটাররা বুলবুলের দিক থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেন। আবার তাকে ভোট দিলে বুলবুল কিছুই করতে পারবেন না- এ ধারণা নগরীতে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। বুলবুলের পরাজয়ের এটিও একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে চতুর্থ কারণ হল- নিজের দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ছাড়াও বিএনপির অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুলবুলের পক্ষে মাঠে নামেননি। ২০১৩ সালের জুনের সিটি নির্বাচনে বুলবুল এক লাখ ৪৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন এবং এটিও মনে করা হয়, ওই নির্বাচনে জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরাই বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন। এবার রাজশাহীতে জামায়াতের রিজার্ভ প্রায় ৪০ হাজার ভোটের বড় অংশই এবার ভোটকেন্দ্রে যাননি বলে বিভিন্ন দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কারণ- বিশেষ করে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার কারণেও বিএনপির নেতাকর্মীরা বুলবুলের পক্ষে মাঠে নামতে পারেননি বলে মনে করেন দলের শীর্ষ নেতারা।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও রাসিকের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের মারমুখী ও আগ্রাসী ভূমিকার কারণে ওয়ার্ডগুলোতে ধানের শীষের প্রচার ঠিকমতো করা যায়নি। ওয়ার্ডক্যাম্পও নেতাকর্মীরা বসতে পারেননি।

এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি পুলিশ গিয়ে দলের সক্রিয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছে। এমনকি নির্বাচনের দিন ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি, আবার কোথাও থাকতে দেয়া হয়নি। এ কারণে ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোতে বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থকদের কাউকেও দেখা যায়নি। ভয়ে অনেকেই ভোট দিতে কেন্দ্রেও যাননি বলে দাবি মিনুর।

পরাজয়ের এই পাঁচটি কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, দলের নেতাকর্মীরা পুলিশের ভয়ে আমার সঙ্গে আসতে পারেননি।

উন্নয়নে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি ৬০ মাসের মেয়াদের মেয়র পদে মাত্র ২৬ মাস বসতে পেরেছিলাম। আমাকে কাজ করতে দেয়া হয়নি।

দলীয় কোন্দল প্রসঙ্গে বুলবুল বলেন, বড় দলে প্রতিযোগিতা রয়েছে। রাজশাহীতেও তাই হয়েছে। তার বড় এই পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে তিনি ভোট জালিয়াতি ও কারচুপি ছাড়াও পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক বৈরী আচরণকেই দায়ী করেন।

এদিকে রাজশাহীতে নৌকা প্রতীক নিয়ে এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৪ ভোট পাওয়াকে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বিরল ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তারা বলেন, বুলবুলের উন্নয়ন ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা নগরবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।

অন্যদিকে লিটনের অতীত উন্নয়ন ও আগামী উন্নয়নের স্বপ্নকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন ভোটাররা। ফলে দলমত ও শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে লিটনকে নৌকা প্রতীকে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া লিটনের নিবিড় ও নিরবচ্ছিন্ন গণসংযোগ এবং প্রচার রাজশাহীর ভোটারদের মন জয় করতে সহায়ক হয়েছে। এর বাইরে উন্নয়নের সঙ্গে লিটনের ব্যক্তি ইমেজ সমর্থক হওয়ায় রাজশাহীতে বিপুল জনরায় পেয়েছেন বলে মনে করেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে ও পরে রাজশাহীতে নৌকা প্রতীকে এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৪ ভোট পাওয়া নতুন একটি মাইলফলকও হয়ে গেল।

নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পেছনে মূলত কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে লিটন যুগান্তরকে বলেন, রাজশাহীর মানুষ উন্নয়নকে বেছে নিয়েছেন। বুলবুলের ৫ বছরের ব্যর্থতার কারণে রাজশাহীর মানুষ তার প্রতি আস্থা রেখে যে বিপুল রায় দিয়েছেন, এটিকে তিনি উন্নয়নের জয় ও রাজশাহীর সাধারণ মানুষের জয় হিসেবে দেখছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সিটি মেয়র পদে এবার দিয়ে তিনবার মুখোমুখি হয়েছেন আওয়ামী লীগের এএইএচ খায়রুজ্জামান লিটন ও বিএনপির মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

২০০৮ সালের আগস্টের নির্বাচনে লিটন ৯৮ হাজার ৩৬০ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বুলবুল পেয়েছিলেন ৭৪ হাজার ৫৫০ ভোট। একইভাবে ২০১৩ সালের জুনের নির্বাচনে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন।

ওই নির্বাচনে লিটন পেয়েছিলেন ৮৩ হাজার ৭২৬ ভোট। এবারের নির্বাচনে লিটন পেয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৪ ভোট এবং বুলবুলের ভোট কমে হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯৪টি। তিনবার এই দুই প্রার্থী মুখোমুখি হয়ে দুবার লিটন ও একবার মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হন।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.