জমে উঠেছে বাণিজ্য মেলা, যমুনার নতুন এসির চাহিদা বেশি

 এ হাই মিলন, রূপগঞ্জ থেকে 
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

২০২১ সালেও ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আয়োজিত হতো। তবে পূর্বাচলে স্থায়ী ভেন্যু তৈরি হওয়ায় ২০২২ সাল থেকে এ বাণিজ্য মেলা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত হচ্ছে। এবার চলছে ২৮তম আসরের পূর্বাচলে ৩য় আসর।

সচেতন দর্শনার্থী, মেলা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, শেরেবাংলা নগর থেকে বেশি জমজমাট হচ্ছে পূর্বাচলের আসর।

সূত্রমতে, পূর্বাচল ৪ নম্বর সেক্টরে ২০ একর জমির ওপর স্থায়ী বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর নির্মাণ কাজ শেষ করে। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৭৭৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে চীন সরকারের অনুদান ৫২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সরকার ২৩১ কোটি ও ইপিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। এ প্রদর্শনী কেন্দ্রের মোট ফ্লোর স্পেস ৩৩ হাজার বর্গমিটার। ভবনের মোট ফ্লোর স্পেস ২৪ হাজার ৩৭০ বর্গমিটার। এক্সিবিশন হলের মোট আয়তন ১৫ হাজার ৪১৮ বর্গমিটার। দোতলা পার্কিং ভবনে ৭ হাজার ৯১২ বর্গমিটার জায়গায় ৫০০ গাড়ি রাখা যায়। এছাড়া প্রদর্শনী ভবনের সামনে খোলা জায়গায় আরও এক হাজার গাড়ি পার্ক করা যায়। প্রদর্শনী হলে ৮০০টি স্টল বুথ রয়েছে। প্রতিটি বুথের আয়তন ৯.৬৭ বর্গমিটার। যেখানে প্রথমবারের মতো গত ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ২৬তম আসর বসে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আসিফ আহমেদ বলেন, দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম হলেও মেলাটি বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছে পণ্য ক্রয়ের অন্যতম জনপ্রিয় মেলায় পরিণত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তখন থেকেই প্রতি বছর এ মেলা অনুষ্ঠিত হতো। ওই বছর থেকে প্রতিবারই ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে শিল্প পণ্য ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে এ মেলা।

যমুনা ইলেকট্রিক অ্যান্ড অটোমোবাইলসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রাকিব আহমেদ বলেন, গৃহিণীদের যমুনার হোম এপ্লায়েন্সের প্রতি আগ্রহ বেশি। তাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

যমুনার এই কর্মকর্তা বলেন, যমুনার নতুন এসি মিস্টার স্মার্ট ও মিস্টার ডক্টরের চাহিদা বেশি। এগুলো ইনভার্টার ও ডুয়েল ইনভার্টারের নতুন এসি। হোম ডেলিভারি দিতে আমাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে আগত ব্যাংকার সালমা ইসলাম বলেন, এক কথায় বলা যায়- আমি যমুনার পরিবার। আমি গত সপ্তাহেও যমুনার ব্লেন্ডার, আয়রন ও গরম পানির জগ কিনেছি। আর এসেছি নতুন একটা এসি কেনার জন্য। জানতে পারলাম নতুন মডেলের এসি এসেছে মিস্টার ডক্টর; ছাড়ে দামেও সস্তা; হোম ডেলিভারি ফ্রি- এই কারণে আমি একটা দেড় টন এসি কিনে নিলাম।

দাউদপুর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চেয়ে পূর্বাচলে মেলার আসরে লোক সমাগম বেশি হয়; যা আমাদের গর্বের বিষয়। তবে মেলা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় দেশের সাধারণ ক্রেতাদের কাছে। যারা কিনা গৃহস্থালির জিনিসপত্র কিনতে মেলায় ভিড় করেন বেশি। 

রূপগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এটলাস গ্রুপের ম্যানেজার আতিকুল ইসলাম বলেন, ২০০১ সাল থেকে নিয়মিতই মেলায় স্টল পাই। ফলে দুটি ভেন্যুর তফাৎ বুঝতে পারছি। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ, দরকারি অনেক কিছু এক জায়গায় পাওয়া যায়। তাছাড়া বিভিন্ন সময় ডিসকাউন্ট পাওয়া যায় বাণিজ্য মেলায়। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির লোকজনের মেলবন্ধনে ঘটে এখানে। 

খাদুন হাজী আয়েতালী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, দেশীয় সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বাণিজ্য মেলা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর দিন দিন মেলায় স্টল ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। আগে থেকে ঘোষণা থাকায় দেশীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি অনেক দেশ ও ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারাও আসত বিভিন্ন পণ্য নিয়ে।

কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের মহাসচিব লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকার শেরেবাংলা নগরে রাজধানীর লোকজনের উপস্থিতিতে কিছুটা জমজমাট ছিল। পরে ২০২২ সালে থেকে এ বাণিজ্য মেলা রাজধানীর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত হচ্ছে। এখানে দৃষ্টিনন্দন ভবন, পূর্বাচলের সৌন্দর্যসহ নানা দৃশ্য উপভোগ করতে পারছেন আগতরা। তাছাড়া সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও যাতায়াতের পরিবেশ ভালো থাকায় জমজমাট হচ্ছে মেলার আসরগুলো। 

মেলায় গত ২৫ বছর ধরে স্টল পাচ্ছেন পাট কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠান। কথা হয় প্রবীণ কর্মী মশিউর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এক সময় দেশে সোনালি আঁশের কদর ছিল। মিল কারখানা বেশিরভাগ পাটকেন্দ্রিক ছিল। ফলে শেরেবাংলা নগরে প্রচুর চাহিদা থাকত এসব পণ্যের। তবে আধুনিকতার সাথে তাল মেলাতে পারায় পূর্বাচলের আসরগুলোতেও বেশ সাড়া পাচ্ছে। 

বিশ্বে বাণিজ্য মেলার আয়োজনের ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, মধ্যযুগীয় ইউরোপে শ্যাম্পেন মেলা বা স্কেন মার্কেটের মতো বাণিজ্য মেলার ঐতিহ্য অনুসরণ করে। এই যুগে, পণ্য ও নৈপুণ্য নির্মাতারা বাণিজ্য মেলার জন্য, পণ্য বিক্রি এবং প্রদর্শনের জন্য শহরগুলোতে যেতেন। এ বাজারগুলো বার্ষিক বা বছরের বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে, সাধারণত ভৌগোলিকভাবে বিশেষভাবে অনুকূল অবস্থানে এবং জনসাধারণের ভিড় থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য একটি ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে একত্রে অনুষ্ঠিত হতো। বসন্ত ও শরৎকালে মেলার ঐতিহ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় শিল্প প্রদর্শনীগুলো শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত গতিশীলতাকে প্রতিফলিত করে আরও সাধারণ হয়ে ওঠে।

এদিকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা হলো বাংলাদেশে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, জাপান, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠান মেলায় নিজেদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন করে আসছে।

দেশি ও বিদেশি পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন, রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারীরা একদিকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান, নকশা, প্যাকেজিং ইত্যাদি প্রদর্শন ও বিপণন করতে পারে, অন্যদিকে পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ লাভ করে।

এ মেলা প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। যদিও এ বছর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ২১ জানুয়ারি শুরু হয় ২৮তম আসর; যা চলবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতি বছরের মতো এ বছর রপ্তানি আদেশ প্রাপ্তির টার্গেট ৫শ কোটি টাকার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন