নড়াইলে চুরির অপবাদ দিয়ে কিশোরকে বাঁশকলে ঝুলিয়ে নির্যাতন

  নড়াইল প্রতিনিধি ০৬ আগস্ট ২০১৮, ২০:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

নড়াইল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নির্যাতনে আহত তাহের
নড়াইল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নির্যাতনে আহত তাহের। ছবি: যুগান্তর

নড়াইলে চুরির অপবাদ দিয়ে তাহের (১৭) নামের এক হতদরিদ্র কিশোরকে বাঁশকলে ঝুলিয়ে এবং ঘরের ঢাবার সঙ্গে বেঁধে লোহার পরিমাপক দিয়ে হাতের তালু ও আঙুলে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ইউপি সদস্য ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে।

নির্যাতনে গুরুতর আহত ওই কিশোর বর্তমানে নড়াইল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নির্যাতিত কিশোরের বাবা ওয়াজেদ মোল্যা নড়াইল সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

তবে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নির্যাতনকারীরা উল্টো নির্যাতনের শিকার ওই কিশোর ও তার পরিবারের সদস্যদের আসামি করে থানায় চুরির মামলা দায়ের করেছেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়,নির্যাতিত তাহের সদর উপজেলার তুলরামপুর ইউনিয়নের পেড়লি গ্রামের হতদরিদ্র ওয়াজেদ মোল্যার ছেলে। ওয়াজেদ বিভিন্ন গ্রামে শ্রম বিক্রি করে সংসার চালায়। মাতা পারভীন বেগম ঢাকার একটি বাসায় ঘর-গৃহস্থালির কাজ করেন। তাদের দুই ছেলে তাহের (১৭) ও লিমন (১১)। শিশু লিমন একই গ্রামের প্রভাবশালী মৃত আকরাম সরদারের ছেলে নাহিদ সরদারের (২৯) বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে।

২৮ জুলাই সকালের দিকে হঠাৎ করেই নাহিদ সরদার ও তার মা শিউলি বেগম তাদের বাড়িতে দুই ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন,কানের দুল এবং নগদ ১০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে বলে প্রচার করে। এ ঘটনায় প্রথমে নাহিদ সরদার লিমনকে চোর সন্দেহ করেন। লিমন অস্বীকার করলে তখন তাকে মারধর করেন তিনি।

এরপর প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে বলেন,‘তোর ভাই তাহের ও চাচাতো ভাই হুমায়ুন এ চুরির সঙ্গে জড়িত। তাই তাদের নাম বল।’ তখন নির্যাতনের ভয়ে তাহের ও হুমায়ুনের নাম জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি করিয়ে নেয় নাহিদ।

ওইদিন সন্ধ্যার দিকে তুলরামপুর ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন ও প্রভাবশালী নাহিদ সরদার ও তাদের লোকজন তাহেরকে স্বর্ণ ও টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে মারধর শুরু করেন এবং একপর্যায়ে নাহিদের পাট রাখার পরিত্যক্ত ঘরে তাহেরকে বাঁশকলে ঝুলিয়ে মারধর করে। এছাড়া লোহার তৈরি পরিমাপক এবং পেরেক দিয়ে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে নির্যাতন করে।

একের পর এক মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের পর ওইদিন রাতে সদর থানার পুলিশের নিকট সোপর্দ করে নাহিদ। এরপর নাহিদের নির্দেশে থানাহাজতের মধ্যে একটি কক্ষে পুলিশ হেফাজতে কোমরের নিচ থেকে পা পর্যন্ত রুল দিয়ে বেধড়ক পেটানোর অভিযোগ অভিযোগ করেছে নির্যাতিত পরিবার। তবে চুরির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পরের দিন ২৯ জুলাই সন্ধ্যার দিকে তাহেরকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

এরপরে নির্যাতনের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে গত ২ আগস্ট রহস্যজনক কারণে চুরির অপরাধে ওই কিশোর ও তার বাবা ওয়াজেদ মোল্যা, ভাই শিশু লিমন হোসেন ও চাচাতো ভাই হুমায়ুনের বিরুদ্ধে আবার চুরির মামলা নিয়েছে পুলিশ।

অপরদিকে নির্যাতিত তাহেরের বাবা ওয়াজেদ মোল্যা বাদী হয়ে একই দিনে ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন ও প্রভাবশালী নাহিদ সরদারের নাম উল্লেখসহ মোট ১০ জনকে আসামি করে সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

পেড়লি গ্রামের সাইদুর রহমান জানান, নির্যাতনের শিকার তাহের দুই দিন অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে পড়ে ছিল। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে এভাবে মারধর করা হয়েছে। ঘটনার সময় তার মা ও বাবা বাড়িতে ছিল না। নির্যাতনে তাহেরের অবস্থা খারাপ হওয়ায় গত ১ আগস্ট নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন,‘নির্যাতনের বিষয়টি গ্রামের প্রায় সব মানুষ জানেন। তবে নির্যাতনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

অভিযুক্ত তুলারামপুর ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন যুগান্তরকে জানান, ইউপি চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ এ বিষয়টি আমাকে বলার পর নাহিদের বাড়িতে যাই। তাহেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেয়। পরে আমি সেখান থেকে চলে আসি। তাহেরকে কারা মারধর করেছে আমি তা বলতে পারব না।

অপর অভিযুক্ত নাহিদ সরদার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাহের ও লিমন দুই ভাই স্বর্ণ ও টাকা চুরির সঙ্গে জড়িত। তারা পুলিশের কাছে স্বীকারও করেছে। ওদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছি। তাহের,তার পরিবার এবং গ্রামের কিছু লোক শত্রুতামূলকভাবে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে।

এ প্রসঙ্গে নড়াইল সদর থানার ওসি মো. অনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে জানান, নির্যাতন ও চুরির উভয় ঘটনায় থানায় একই দিনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। থানাহাজতে তাহেরকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter