হাসপাতালে দেশের প্রথম লাইব্রেরি বীরগঞ্জে

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

  আব্দুর রাজ্জাক, বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

হাসপাতালের লাইব্রেরিতে বই পড়ায় মগ্ন সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা। ছবি: যুগান্তর

হাসপাতালে রোগীরা আসেন সেবা নিতে।  অনেক সময় বিভিন্ন কারণে তাদের অলস সময় কাটে।  তাছাড়া রোগী যখন হাসপাতালে নিঃসঙ্গতায় ভুগেন তখন তাদের অবসরকালে বই হতে পারে বিশেষ সঙ্গী।  এমন ধারণায়, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চালু হয়েছে এ লাইব্রেরি।

গত শনিবার (১ সেপ্টেম্বর) ওই লাইব্রেরির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ সেবা বিভাগের যুগ্ন সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এর শুভ উদ্বোধন করেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কক্ষের করিডোরে কাঁচে ঘেরা একটি ঘর।  বেশ সাজানো ঘরের উপরে লেখা আছে লাইব্রেরি। লাইব্রেরিতে রয়েছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং নিরাপদ খাদ্যসহ স্বাস্থ্য বিষয়ক শতাধিক বই।  উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তার বারান্দার করিডোরটি লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহারের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে এমন নজির স্থাপন করেছেন।  হাসপাতালে লাইব্রেরি স্থাপনের মতো সৃজনশীল কার্যক্রম দেশে আর কোথাও নেই।  তাই বলা যায়, দেশের ইতিহাসের  প্রথম এ ধরণের লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাইব্রেরিতে প্রতিদিন পাঠক সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রযুক্তির বিকাশে বিশ্ব যখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য ও প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা দেশের বেশিরভাগ গ্রামে বিস্তৃত্ত হয়েছে।  তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে লাইব্রেরীটি উদ্বোধনের পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপিত লাইব্রেরিতে বাড়ছে পাঠক সংখ্যা। পাশাপাশি লাইব্রেরিটি স্থাপন করে উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বখস উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র লিয়ন ইসলাম বলেন, আমার আম্মু বেশ কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন।  তাকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে এসেছি। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।  করিডোরে লাইব্রেরি দেখতে পেয়ে আম্মুকে নিয়ে বই পড়ে সময় পার করছি।   

নিজপাড়া ইউনিয়নের দামাইক্ষেত্র গ্রামের ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান সিরাজ বুলবুল যুগান্তরকে বলেন, আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।  এখানে লাইব্রেরি থাকায় বই পড়ে সময় পার করছি।  এখানের বইগুলি সব স্বাস্থ্য সেবামূলক লেখা।  অল্প সময়ে বেশ কিছু জানতে পারলাম। বিশেষ করে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে লেখা বইটি পড়ে অনেক তথ্য জানতে পারলাম।

দেবীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান বাবু বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাইব্রেরি স্থাপন নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। আমার জানামতে দেশে সম্ভবত এটি প্রথম। লাইব্রেরির অস্তমিত সম্ভবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে সাহায্যে করবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাইব্রেরিটি। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশা করি।

বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. খয়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা কেন যেন লাইব্রেরিমুখী নয়।  এ কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি থাকলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বর্তমানে পাঠক সংকটে আমাদের লাইব্রেরিগুলি দৈন্যদশায় ভুগছে।  তাই এই সময়ে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাইব্রেরি স্থাপনের উদ্যোগটি প্রশংসার দাবি রাখে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমার সন্তানের বয়স ৬মাস।  তাকে এখন পুষ্টিকর কী খাবার খাওয়াতে হবে তাই নিয়ে ভাবছিলাম। এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলাম। চিকিৎসকের সাথে পরামর্শর এক পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাইব্রেরিটি আমার চোখে পড়ে যায়।  সেখান থেকে একটি শিশু পুষ্টির বই নিয়ে এসেছি। বইটি আমি পড়েছি।  আমার স্ত্রীকে পড়তে দিয়েছি।  বইটি থেকে শিশু স্বাস্থ্য সেবার অনেক তথ্য জানতে পেরেছি।  আমার কাছে মনে হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের লাইব্রেরিটি যেন কোন না কোনোভাবে একজন চিকিৎসকের ভূমিকার রাখেছে।  আমি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

এ প্রশংসনীয় কাজের মূল উদ্যোক্তা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে বলেন, স্বপ্ন সময়ে লাইব্রেরিটিতে পাঠকের বেশ সাড়া পড়েছে। প্রতিদিন রোগী এবং রোগীর সঙ্গে আসার তাদের স্বজন এখানে বসে বই পড়েন।  আমাদের চিকিৎসক হতে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেই যেন উপকৃত হয় এমন চিন্তা থেকে এ লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে।

এখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সমস্যা, শিশুদের নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য, শিশুর স্বাস্থ্য সেবা, বার্ড ফ্লু, বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য তথ্যসহ বাংলায় লেখা স্বাস্থ্য সেবামূলক নানা ধরণের বই রয়েছে যা খুব প্রয়োজনীয়।

কেউ চাইলে অনুমতি সাপেক্ষে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়তে পারেন।  পাঠকের সংখ্যা বাড়লে লাইব্রেরির পরিধি বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে।  লাইব্রেরি থেকে কেউ যদি উপকৃত হয় তবেই সার্থক হবে আমাদের এই ছোট উদ্যোগটি।

দিনাজপুর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. নজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের স্বাস্থ্য সেবায় বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয়েছে।  পরিবর্তন হয়েছে আমাদের চিকিৎসকদের মন-মানসিতার। চিকিৎসকরা এখন এটিকে পেশা নয় সেবা হিসেবে গ্রহণ করেছে।  আর এর উদাহরণ হিসেবে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাইব্রেরি স্থাপনসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম তুলে ধরতে পারি। যেটি ব্যাপক প্রসংশিত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগে আমাদের অনেক বড় ধরণের অর্জন রয়েছে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি আমাদের দেশের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।