গিনেস বুকের রেকর্ডে বাংলাদেশি সাঁতারু! [ভিডিও]

  এমএ হাকাম হীরা ও তোফাজ্জল হোসেন ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২২:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

সাঁতার শেষে উঠে আসছেন সাঁতারু বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য
সাঁতার শেষে উঠে আসছেন সাঁতারু বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। ছবি: যুগান্তর

দূরপাল্লার সাঁতারে বিশ্বরেকর্ড গড়ার স্বপ্ন পূরণ হলো নেত্রকোনা মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যর (৬৭)। তিনি বুধবার রাত ৮টায় নেত্রকোনার মদন উপজেলার দেওয়ান বাজার ঘাট পর্যন্ত ১৮৫ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে এ রেকর্ড গড়লেন।

তবে তিনি শারিরীকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাকে পাড়ে উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে হযরত সুমাইয়া (রা:) হেলথ কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাক্তার ফজলুল বারী ইভান জানান, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা ও না ঘুমানোর কারণে শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি । তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।

আমেরিকার সাঁতারু ডায়ানা নাঈদের ২০১৩ সালে কিউবা টু ফ্লোরিডার ১৭৭ কিলোমিটার দূরপাল্লার সাঁতারের বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ব্রিজ থেকে সাঁতার শুরু করেন। ভোগাই, কংস নদী ও মগড়া নদী হয়ে টানা ৬১ ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর বুধবার রাত ৮টায় নেত্রকোণার মদনের মগড়া নদীর দেওয়ান বাজার ঘাটে পৌঁছান।

এ খবরে দুপুর থেকেই হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু মগড়া নদীর বিভিন্ন ঘাটে ও অপেক্ষা করতে থাকে। রাতে তাকে দেখেই উল্লাসে ফেটে পড়ে তারা।

সাতাঁরুর ভাগ্নে বিমান বৈশ্য জানান, সোমবার সকাল ৭টা ১০ মিনিটে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদীর ওপর নির্মিত সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার শুরু করেন ৬৭ বছর বয়সী এ সাঁতারু।

এর আগে সেখানে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এ সাঁতার কার্যক্রম উদ্বোধন করেন নালিতাবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান। এ সময় নালিতাবাড়ী পৌরসভার মেয়র আবু বক্কর সিদ্দিক, নেত্রকোণা জেলার মদন পৌরসভার সাবেক মেয়র মোদাচ্ছের হোসেন শফিক, নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হোসেন মাস্টার, বাঘবেড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সবুর, নেত্রকোনার মদন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল কুদ্দস, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মদন শাখার সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আজহারুল ইসলাম হিরু, মদন নাগরিক কমিটি এবং নালিতাবাড়ী প্রেস ক্লাব নেতৃবন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ভোগাই নদীর দুই পাড়ে শত শত দর্শনার্থী হাত নেড়ে ক্ষিতিন্দ্রকে স্বাগত জানায়। এ সময় তার নাম ধরে চিৎকার করে তাকে উৎসাহিত করতে থাকে । মদন উপজেলা নাগরিক কমিটি ও নালিতাবাড়ী পৌরসভা এ সাঁতার অনুষ্ঠানে ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যকে সার্বিক সহায়তা করেছেন।

সাতাঁরু ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এক নারী সাঁতারু ১৭৭ কিলোমিটারের রেকর্ড ভঙ্গ করতে আমার এ সাঁতারে নামা।

২০১৭ সালে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ৬ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত ১৪৬ কিলোমিটার নদীপথে সাঁতার কেটেছিলেন ক্ষিতীন্দ্র। এবার আরও ৩৯ কিলোমিটার পথ বাড়িয়ে ১৮৫ কিলোমিটার নদীপথে সাঁতার কেটে সফল হয়েছেন এ মুক্তিযোদ্ধা।

ক্ষিতীন্দ্র বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের এএনএস কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি পাস করেন। সাঁতার কেটে এ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে চারটি পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯৭০ সালে সিলেটের ধুপাদিঘি পুকুরে অরণ্য কুমার নন্দীর বিরামহীন ৩০ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনী দেখে ক্ষিতীন্দ্র উদ্বুদ্ধ হন। পরে একই বছর মদনের জাহাঙ্গীরপুর উন্নয়ন কেন্দ্রের পুকুরে তিনি ১৫ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে আলোচিত হন। এটিই তার প্রথম সাঁতার প্রদর্শনী।

১৯৭২ সালে সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশন পুকুরে ৩৪ ঘণ্টা, সুনামগঞ্জের সরকারি হাইস্কুলের পুকুরে ৪৩ ঘণ্টা, ১৯৭৩ সালে ছাতক হাইস্কুলের পুকুরে ৬০ ঘণ্টা, সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে ৮২ ঘণ্টা এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুরে ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট বিরামহীন সাঁতার প্রদর্শন করে জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করেন। জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করায় ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭৬ সালে তিনি জগন্নাথ হলের পুকুরে ১০৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার প্রদর্শন করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জগন্নাথ হলের পুকুরের পাড়ে একটি স্মারক ফলক নির্মাণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিং পুল, নেত্রকোনা পৌরসভার পুকুরে তাঁর একাধিক সাঁতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

সাঁতার প্রদর্শনী ও রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণভবনে তাকে রূপার নৌকা উপহার দেন। একই বছর ডাকসু তাকে বিশেষ সম্মানসূচক স্বর্ণপদক দেয়।

দীর্ঘ চার বছরের প্রস্তুতিতে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়ার অদম্য মানসিকতা নিয়ে এই সাঁতার কাটেন। মদন নাগরিক কমিটি ও নালিতাবাড়ী পৌরসভা যৌথভাবে এ আয়োজন করে।

মদন নাগরিক কমিটির সভাপতি ও সাবেক পৌরমেয়র দেওয়ান মোদাচ্ছের হোসেন শফিক বলেন, ‘গুগল ম্যাপ ডেটায় দূরত্ব নির্ণয় করে এবং ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্রের বয়স বিবেচনা করে এই সাঁতার বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে গণ্য হবে। গিনেস বুকে রেকর্ড করতে সার্বক্ষণিক সাঁতারের ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। তিনি কিছুটা দুর্বল হলেও, সফলভাবেই মদন পৌঁছেছেন।

মদন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়ালীউল হাসান বলেন, প্রখ্যাত সাঁতারু বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য ১৮৫ কিলোমিটার সাঁতার প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। গিনেজ বুকে নাম লেখাবেন বলে তিনি আশা করছেন।

তিনি বলেন, ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদী থেকে সাঁতার শুরু করে নেত্রকোণা জেলার কংশ ও মগড়া নদী হয়ে মদন উপজেলার দেওয়ান বাজার ঘাট পর্যন্ত ১৮৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছেছেন।

ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য আমাদের দেশের গর্ব, তাকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। গিনেস বুকে নাম লেখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

 

 

জেলার খবর
অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.