উজানের ঢলে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি, ভেঙে গেছে বাঁধ-সড়ক

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

  নীলফামারী ও ডিমলা প্রতিনিধি

তিস্তা নদীগর্ভে বিলীন স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বালির বাঁধ। ছবি: যুগান্তর

উজানের ঢলের কারণে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরে কমে গেলেও তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সোমবার থেকে পানি বৃদ্ধির ফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে তিস্তাপাড়ের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা।

এদিকে জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চড়খড়িবাড়ি এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বালির বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে বাঁধটির ৪০০ মিটার তিস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এছাড়া একই উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দোহলপাড়া নামক স্থানে তিস্তা নদীর ডান তীরের চার নম্বর স্পারবাঁধের সামনের অ্যাপ্রোচ সড়কের ১০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই স্বেচ্ছাশ্রম বাঁধটি শত শত মানুষের শ্রম দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের বন্যায় এটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। ফলে এবার বন্যার আগেই সংস্কারের জন্য সরকারিভাবে ২০ টন কাবিখা প্রকল্পের চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই চাল বিক্রি করে আট লাখ টাকা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা নামমাত্র কাজ করায় বাঁধটি আজ পানির স্রোতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে।

স্বেচ্ছাশ্রমের এই বালির বাঁধ সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হলে চরখড়িবাড়ি মৌজাটির দুই হাজার পরিবারের বসতভিটা তিস্তা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানায়, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। নদীর পানি ক্ষণে ক্ষণে বাড়তে থাকলে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি, জলঢাকা উপজেলার, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের তিস্তা নদীবেষ্টিত প্রায় ১৫টি চর গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। 

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল আলম চৌধুরী জানান, উজানের ঢল কমে আসায় পরিস্থিতি উন্নতি ঘটছে। তবে সতর্কতায় তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে রাখা হয়েছে।

তিস্তার হঠাৎ উজানের ঢলের কারণে জেলার ডিমলা উপজেলা উপজেলার খালিশাচাপানী ইউনিয়নের ছোটখাতা, বানপাড়া ও বাঁইশপুকুর চর, ছাতুনামা ভেন্ডাবাড়ি ফরেস্টের চর এলাকায় ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহের চরের বসতভিটায় বন্যার পানি পবেশ করেছে। বন্যাকবলিত মানুষজন গবাদিপশু ও আসবাবপত্রসহ তিস্তা নদীর ডান তীর বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। জেলার জলঢাকা উপজেলার ডাইয়াবাড়ি, গোলমুন্ডা, শৈলমারী, কৈমারী ইউনিয়নের চরবেষ্টিত গ্রামগুলোতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে।

একই উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের পূর্বখড়িবাড়ি ও দক্ষিণখড়িবাড়ি মৌজায় পানি প্রবেশ করে। রাতে আকস্মিক নদীতে ঢলের পানি আসায় ওই দুই গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিতে নির্ঘুম রাত কাটায়।

তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক বিপুল চন্দ্র সেন বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে আকস্মিক নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। ক্রমাগত পানি বাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে গ্রামে বসবাসরত ৩০০ পরিবারের মাঝে। এ সময় গ্রামের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাত ১২টার পর থেকে পানি কমতে শুরু করলেও রাত জেগে বাঁধের ক্ষতি হওয়া এলাকা সংস্কারের কাজ করতে হয়েছে গ্রামের মানুষকে।

একই অবস্থা ঝুনাগাছ চাঁপানী ইউনিয়নের পূর্ব ছাতুনামা চরে। সেখানে মঙ্গলবার দেখা যায় নদীর পানি উপচে হু-হু করে প্রবেশ করে ঘরবাড়ি ডুবিয়ে দিচ্ছে। উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর ও পূর্ব ছাতনাই গ্রামের ৫ শতাধিক বসতঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করে।

ঝুনাগাছ চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ছাতুনামার চর, ফরেস্টের চর, সোনাখুলীর চর ও ভেন্ডাবাড়ি চরে দেড় হাজার পরিবারের বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। তিনি জানান দক্ষিণ সোনাখুলী এলাকায় তিস্তা নদীর ডান তীরের প্রধান বাঁধের অদূরে ইউনিয়ন পরিষদের তৈরি করা মাটির বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বাঁধের ওপর দিয়ে তিস্তা নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় দক্ষিণ সোনাখুলী কুঠিপাড়া গ্রামের বসতঘর ও আবাদি জমিগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।  সাড়ে ৩টায় ওই গ্রামের প্রতিটির বাড়ি হাঁটুপানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

খালিশা চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সরকার বলেন, পূর্ব বাইশপুকুর ও ছোটখাতা মৌজার ৫ শতাধিক পরিবারের বসতবাড়িতে রাতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন বলেন তার এলাকার দক্ষিণ খড়িবাড়ি ও পূর্ব খড়িবাড়ি, একতার চর, টাবুর চর মৌজায় তিস্তার পানি প্রবেশ করেছে। ইতিমধ্যে সহস্রাধিক পরিবারের বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।