‘দিন শেষে আমরা তো একই সাগরের ঢেউ’
jugantor
‘দিন শেষে আমরা তো একই সাগরের ঢেউ’

  এ টি এম নিজাম  

২৬ মার্চ ২০২০, ২২:০৭:৩১  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনাভাইরাস আক্রান্তদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য মহামারীর মুখে এবার চীন ও জাপান মানবিক বিশ্বের ভিন্ন রকম বার্তা দিল। যখন করোনাভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে পৃথিবী। বিনা প্রতিষেধকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে হাজার হাজার মানব সন্তান। তখন সহমর্মিতা আর সহযোগিতার হাত বাড়াতে গিয়ে চীন ও জাপান অন্য দেশের পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টিভঙ্গি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে ওঠেছে।

করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে করোনার ভয়াবহ থাবায় ক্ষত-বিক্ষত ইতালিতে ভুক্তভোগী চীনের মাস্ক এবং চীনের উহানে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ও আটকে পড়া মানুষের জন্য সাহায্য পাঠিয়েছে জাপান।

ইতালিতে মেডিকেল মাস্ক পাঠাচ্ছে চীন। সেই মাস্কের বাক্সের ওপর লিখা হয়েছে রোমান একটা কবিতার চরণ, ‘দিন শেষে আমরা তো একই সাগরের ঢেউ’।

আর চীনের উহানে জাপানের পাঠানো সাহায্যের ওইসব বাক্সের ওপর চীনা ভাষায় লিখা- ‘নদী আর সাগরের দিক থেকে আমরা হয়তো আলাদা, কিন্তু একই আকাশ, সূর্য আর চাঁদের আলোর নিচে আমাদের বসবাস’।

সংগৃহীত বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হলেও সময়ই যে এখন মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ ও মানুষের চেতনায় এ আদর্শ ধারণার জন্ম দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বাতাসে এখন গুপ্তঘাতক করোনাভাইরাসের ছড়াছড়ি। এ মরণব্যাধি পৃথিবীর দেশে দেশে ছোবল হানছে। প্রতিদিনই গাণিতিক হারে বাড়ছে এ রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এ রোগের ভয়াবহতায় কেঁপে উঠছে পৃথিবী।

এমন পরিস্থিতির বিস্তৃতি ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হিড়িক পড়েছে লকডাউন, সেনাবাহিনী নামানো এবং কারফিউ ও জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার। দিশেহারা হয়ে ওঠেছে পৃথিবীর মানবকুল। মানুষের মধ্যে এখন একটাই আতঙ্ক, ভাবনা ও আলোচনার বিষয়- আর তা হচ্ছে করোনাভাইরাস।

এ খবরটিই পৃথিবীর সব সম্প্রচার মাধ্যমের কাঁচামালের স্থান দখল করে মুহূর্তে মুহূর্তে লিড ও ব্রেকিং নিউজ হয়ে সামনে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে দেশ-দেশান্তরের আকুতি, আহাজারি, হাহাকার ও আর্তনাদের আওয়াজ মানুষের হৃদয় জুড়ে ঠাঁই নিয়েছে।

দেশ-জাতি, ধর্ম-বর্ণ ও ভৌগোলিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে দুনিয়ার সব মানুষ মানুষ্যবোধ ও মানবতা বোধের জিকির তুলে সহায়তা-সহমর্মিতা প্রত্যাশা করছে। আর এ তাড়না থেকে ক্রমশ জেগে উঠছে মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার চিরন্তন স্বপ্ন।

ইতিমধ্যেই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো করোনার ভয়াল থাবা পড়েছে। বিশেষ করে চীন, ইতালি, স্পেন, ইরান, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জনপদ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চীন ইতিমধ্যেই এ পরিস্থিতি অনেকটা সামলে নিয়েছে।

যে মানুষ, যে দেশ এতদিন মানুষ মারার জন্য অস্ত্র বানিয়েছে, পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার করেছে- সেই মানুষ যে আজ কতো অসহায় অবস্থার চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অস্ত্র-বোমা আবিষ্কার ও বাণিজ্যের পাশাপাশি পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটা দেশের বাজেট ব্যয়ের শীর্ষ স্থান দখল করে আছে সামরিক খাত। আগ্রাসন, আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্র বাণিজ্যের ফাঁদ পেতে ভয়াবহ ও বীভৎস মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি পৃথিবী।

সভ্যতার মুখোশে ঢাকা মোড়ল দেশগুলোর উন্মত্ততাও আজ স্তব্ধ। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা কাটিয়ে ওঠার পরও মানবিক বিশ্বের সাক্ষাৎ মেলেনি। এখনও বোমা-বারুদের গন্ধ পৃথিবীর বাতাস ভারি করে রেখেছে। সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে লাখ কোটি বিলিয়ন ডলার।

এতদিন মানুষের রক্ত স্রোতে বাণিজ্যের ডিঙি ভাসিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে মানুষ। কিন্তু, রোগ-ব্যাধির মহামারী মোকাবেলায় এতোটা মনোযোগী হয়নি কখনও। এ খাতের বরাদ্দ বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। তা না হলে হয়তো এতদিনে মানুষ করোনাভাইরাস, ক্যান্সারসহ অন্যান্য মরণব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কার করে নিজেদের বেঘোরে প্রাণ হারানোর পথ রুদ্ধ করার সুযোগ পেত।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে পৃথিবীতে সামরিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ পায় ১.৬৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

যুগে যুগে মানবতাবাদী মানুষ, কবি ও সাহিত্যিকগণ লেখনীর মাধ্যমে এসব ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু এসব শুধু নীতিবাক্য হয়েই থেকে গেছে। এর আগেও পৃথিবী দেখেছে মহামারী আকারে এ রকম অনেক রোগ প্রাদুর্ভাব ও ভয়াবহতা। ইতিহাসই এসবের নীরব সাক্ষী।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে এথেন্স পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের সময় একটি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে বর্তমান লিবিয়া, ইথিওপিয়া ও মিসর হয়ে গ্রীসের রাজধানী এথেন্স পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ রোগে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়।

৫৪১ খ্রিস্টাব্দে জাস্টিনিয়ান প্ল্যাগ রোগ মিশরে প্রথমে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ফিলিস্তিন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল মৃত্যুকূপে পরিণত করে। এ সময় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ রোগটির বাহক ছিল ইঁদুর।

একাদশ শতাব্দীতে ব্যাকটেরিয়াজনিত কুষ্ঠ রোগ ইউরোপে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত এ রোগটিও ছিল প্রাণঘাতী রোগ। এ রোগেও মারা যায় সংখ্যাতিত মানুষ।

১৩৫০ সালে "দ্য ব্ল্যাক ডেথ" নামের একটি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে এশিয়া, পশ্চিমা বিশ্বসহ পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মারা যায়। তখন আক্রান্ত এলাকাগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা এ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে যে রাস্তাঘাটে পড়েছিল থাকতো মানুষের লাশ। এসব লাশ পচে গললেও দুঃসহ সংকট সৃষ্টি করে। এই মহামারীর কারণে তখন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের যুদ্ধ থেমে যায়।

দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন নামের রোগ ১৬৬৫ সালে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে লন্ডনের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়। এ রোগের উৎস ছিল কুকুর ও বিড়াল।

১৮১৭ সালে প্রথম কলেরা রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে রাশিয়ায়। এ রোগ সেখানে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দুষিত পানির মাধ্যমে এ রোগ পড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে ভারতবর্ষে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্পেন,আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায় ছড়িয়ে মহামারী আকারে ধারণ করে। তখন সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ মারা যায়।

পরবর্তীতে আরও দেড়শ বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় কলেরা মহামারী আকারে দেখা দেয়।

১৮৫৫ সালে চীন থেকে তৃতীয় প্লেগ মহামারী দেখা দিয়ে ভারতবর্ষে ও হংকংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের মহামারীতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ মারা যায়। ভারতবর্ষে তখন এ রোগ সবচেয়ে প্রাণঘাতী মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

১৮৮৯ সালে রাশিয়ান "ফ্লু" নামে একটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। "ফ্লু" র মাধ্যমে সৃষ্ট প্রথম মহামারী ছবি এটি। সাইবেরিয়া ও কাজাখিস্তান থেকে এ রোগের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীতে মহামারী আকারে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সমুদ্র পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এ রোগ। ১৮৯০ সালের শেষ পর্যন্ত এ রোগে ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯১৮ সালে চীন থেকে স্প্যানিশ ফ্লু নামে রোগের উৎপত্তি হয়। পরবর্তীতে এ রোগ চীনের শ্রমিকদের মাধ্যমে কানাডা হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত স্পেনের মাদ্রিদ ও উত্তর আমেরিকায় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯৫৭ সালে এশিয়ান "ফ্লু" রোগ হংকং থেকে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী ছয় মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকহারে বিস্তার ঘটে। সেবার ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যুর পর প্রকোপ কমে গিয়ে ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে দ্বিতীয় বারের মতো প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং তখন এ রোগে ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে এ রোগের মহামারী ঠেকানো সম্ভব হয়।

১৯৮১ সালে এইচআইভি বা এইডস রোগ প্রথমবারের মতো শনাক্ত হওয়ার পর এ যাবৎকাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯২০ সালের দিকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে এ রোগটির উদ্ভব হয়।

১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশে গুটি বসন্ত মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ও প্রায় আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

বারবার এতোসব প্রাকৃতিক রোগের মহামারীর ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী শক্তির মদমত্ততা দেখেছে পৃথিবীর মানুষ। এরপরও মানুষ মানুষ মারার অস্ত্র ও বোমা আবিষ্কারে যে অর্থ আর মেধা-মননের অপচয় করেছে, সে তুলনায় এসব রোগের মহামারী থেকে নিজেদের রক্ষায় প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক আবিষ্কারে দৃশ্যত খুব কমই মনোযোগী হয়েছে।

এবার করোনাভাইরাস আতঙ্ক বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে বিশ্বব্যাপী সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। পৃথিবীর কোনো প্রান্তের মানুষ নিজেকে নিরাপদ ভাবার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবী এতটা-ই বিপদসংকুল হয়ে ওঠেছে যে, বিজ্ঞান মনষ্ক দেশ এবং মানুষও অদৃষ্টবাদী হয়ে আকাশকে (সৃষ্টিকর্তাকে) শেষ ভরসাস্থল হিসেবে মানছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় মৃত্যুপুরী ইতালির প্রধানমন্ত্রীর আবেগঘন অশ্রুঝরা বক্তব্য এবং দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে ফ্রান্সের মসজিদে- লোকালয়ে এক সঙ্গে আজানের ধ্বনি শুনেছে পৃথিবী।

সব কিছু ছাপিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্তের আকুতিতে বেজে ওঠেছে রক্ত মাংসের গড়া মানুষ পরিচয়ের এবং একই রকম হাসি-কান্না ও দুঃখ-বেদনার যোগসূত্রের রাগ ভৈরবী। আর মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার বার্তা ও আওয়াজ।

আর কালক্ষেপণ নয়। জোরদার হোক মানবিক বিশ্ব বাস্তবায়নের তাগিদ। এবার বরাদ্দ বাড়ুক স্বাস্থ্য সেবা খাতে। অস্ত্র-বোমার পরিবর্তে এ ধরনের প্রাণঘাতী রোগব্যাধি থেকে মানবকুল রক্ষায় প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিশ্বজনীন গবেষণা সফলে সর্বশক্তি নিয়োগ হোক।

জেগে ওঠো, জাগিয়ে দাও। জাগাও মানবতা, বাঁচাও প্রাণ।

এ টি এম নিজাম

সাংবাদিক,

[email protected]

‘দিন শেষে আমরা তো একই সাগরের ঢেউ’

 এ টি এম নিজাম 
২৬ মার্চ ২০২০, ১০:০৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
করোনাভাইরাস আক্রান্তদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি
করোনাভাইরাস আক্রান্তদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য মহামারীর মুখে এবার চীন ও  জাপান মানবিক বিশ্বের ভিন্ন রকম বার্তা দিল। যখন করোনাভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে পৃথিবী। বিনা প্রতিষেধকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে হাজার হাজার মানব সন্তান। তখন সহমর্মিতা আর সহযোগিতার হাত বাড়াতে গিয়ে চীন ও জাপান অন্য দেশের পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টিভঙ্গি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে ওঠেছে। 

করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে করোনার ভয়াবহ থাবায় ক্ষত-বিক্ষত ইতালিতে ভুক্তভোগী চীনের মাস্ক এবং চীনের উহানে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ও আটকে পড়া মানুষের জন্য সাহায্য পাঠিয়েছে জাপান।

ইতালিতে মেডিকেল মাস্ক পাঠাচ্ছে চীন। সেই মাস্কের বাক্সের ওপর লিখা হয়েছে রোমান একটা কবিতার চরণ, ‘দিন শেষে আমরা তো একই সাগরের ঢেউ’। 

আর চীনের উহানে জাপানের পাঠানো সাহায্যের ওইসব বাক্সের ওপর চীনা ভাষায় লিখা- ‘নদী আর সাগরের দিক থেকে আমরা হয়তো আলাদা, কিন্তু একই আকাশ, সূর্য আর চাঁদের আলোর নিচে আমাদের বসবাস’। 

সংগৃহীত বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হলেও সময়ই যে এখন মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ ও মানুষের চেতনায় এ আদর্শ ধারণার জন্ম দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।        

বাতাসে এখন গুপ্তঘাতক করোনাভাইরাসের ছড়াছড়ি। এ মরণব্যাধি পৃথিবীর দেশে দেশে ছোবল হানছে। প্রতিদিনই গাণিতিক হারে বাড়ছে এ রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এ রোগের ভয়াবহতায় কেঁপে উঠছে পৃথিবী।

এমন পরিস্থিতির বিস্তৃতি ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হিড়িক পড়েছে লকডাউন, সেনাবাহিনী নামানো এবং কারফিউ ও  জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার। দিশেহারা হয়ে ওঠেছে পৃথিবীর মানবকুল। মানুষের মধ্যে এখন একটাই আতঙ্ক, ভাবনা ও আলোচনার বিষয়- আর তা হচ্ছে করোনাভাইরাস। 

এ খবরটিই পৃথিবীর সব সম্প্রচার মাধ্যমের কাঁচামালের স্থান দখল করে মুহূর্তে মুহূর্তে লিড ও ব্রেকিং নিউজ হয়ে সামনে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে দেশ-দেশান্তরের আকুতি, আহাজারি, হাহাকার ও আর্তনাদের আওয়াজ  মানুষের হৃদয় জুড়ে ঠাঁই নিয়েছে।

দেশ-জাতি, ধর্ম-বর্ণ ও ভৌগোলিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে দুনিয়ার সব মানুষ মানুষ্যবোধ ও মানবতা বোধের জিকির তুলে সহায়তা-সহমর্মিতা প্রত্যাশা করছে। আর এ তাড়না থেকে  ক্রমশ জেগে উঠছে মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার চিরন্তন স্বপ্ন।    

ইতিমধ্যেই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো করোনার ভয়াল থাবা পড়েছে। বিশেষ করে চীন, ইতালি, স্পেন, ইরান, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জনপদ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চীন ইতিমধ্যেই এ পরিস্থিতি অনেকটা সামলে নিয়েছে।

যে মানুষ, যে দেশ এতদিন মানুষ মারার জন্য অস্ত্র বানিয়েছে, পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার করেছে- সেই মানুষ যে আজ কতো অসহায় অবস্থার চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

অস্ত্র-বোমা আবিষ্কার ও বাণিজ্যের পাশাপাশি পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটা দেশের বাজেট ব্যয়ের শীর্ষ স্থান দখল করে আছে সামরিক খাত। আগ্রাসন, আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্র  বাণিজ্যের ফাঁদ পেতে ভয়াবহ ও বীভৎস মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি পৃথিবী।  

সভ্যতার মুখোশে ঢাকা মোড়ল দেশগুলোর উন্মত্ততাও আজ স্তব্ধ।  প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা কাটিয়ে ওঠার পরও মানবিক বিশ্বের সাক্ষাৎ মেলেনি। এখনও বোমা-বারুদের গন্ধ পৃথিবীর বাতাস ভারি করে রেখেছে। সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে লাখ কোটি বিলিয়ন ডলার।

এতদিন মানুষের রক্ত স্রোতে বাণিজ্যের ডিঙি ভাসিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে মানুষ। কিন্তু, রোগ-ব্যাধির মহামারী মোকাবেলায় এতোটা মনোযোগী হয়নি কখনও। এ খাতের বরাদ্দ বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। তা না হলে হয়তো এতদিনে মানুষ করোনাভাইরাস, ক্যান্সারসহ অন্যান্য মরণব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কার করে নিজেদের বেঘোরে প্রাণ হারানোর পথ রুদ্ধ করার সুযোগ পেত।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে পৃথিবীতে সামরিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ পায় ১.৬৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

যুগে যুগে মানবতাবাদী মানুষ, কবি ও সাহিত্যিকগণ লেখনীর মাধ্যমে এসব ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু এসব শুধু  নীতিবাক্য হয়েই থেকে গেছে। এর আগেও পৃথিবী দেখেছে মহামারী আকারে এ রকম অনেক রোগ প্রাদুর্ভাব ও ভয়াবহতা। ইতিহাসই এসবের নীরব সাক্ষী।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে এথেন্স পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের সময় একটি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে বর্তমান লিবিয়া, ইথিওপিয়া ও মিসর হয়ে গ্রীসের রাজধানী এথেন্স পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ রোগে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়। 

৫৪১ খ্রিস্টাব্দে জাস্টিনিয়ান প্ল্যাগ রোগ মিশরে প্রথমে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ফিলিস্তিন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল মৃত্যুকূপে পরিণত করে। এ সময় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ রোগটির বাহক ছিল ইঁদুর।

একাদশ শতাব্দীতে ব্যাকটেরিয়াজনিত কুষ্ঠ রোগ ইউরোপে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত এ রোগটিও ছিল প্রাণঘাতী রোগ। এ রোগেও মারা যায় সংখ্যাতিত মানুষ। 

১৩৫০ সালে "দ্য ব্ল্যাক ডেথ" নামের একটি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে এশিয়া, পশ্চিমা বিশ্বসহ পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মারা যায়। তখন আক্রান্ত এলাকাগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা এ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে যে রাস্তাঘাটে পড়েছিল থাকতো মানুষের লাশ। এসব লাশ পচে গললেও দুঃসহ সংকট সৃষ্টি করে। এই মহামারীর কারণে তখন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের যুদ্ধ থেমে যায়। 

দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন নামের রোগ ১৬৬৫ সালে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে লন্ডনের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়। এ রোগের উৎস ছিল কুকুর ও বিড়াল। 

১৮১৭ সালে প্রথম কলেরা রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে রাশিয়ায়। এ রোগ সেখানে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দুষিত পানির মাধ্যমে এ রোগ পড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে ভারতবর্ষে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্পেন,আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায় ছড়িয়ে মহামারী আকারে ধারণ করে। তখন সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ মারা যায়।

পরবর্তীতে আরও দেড়শ বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় কলেরা মহামারী আকারে দেখা দেয়। 

১৮৫৫ সালে চীন থেকে  তৃতীয় প্লেগ মহামারী দেখা দিয়ে ভারতবর্ষে ও হংকংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের মহামারীতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ মারা যায়। ভারতবর্ষে তখন এ রোগ সবচেয়ে প্রাণঘাতী মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছিল। 

১৮৮৯ সালে রাশিয়ান "ফ্লু" নামে একটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। "ফ্লু" র মাধ্যমে সৃষ্ট প্রথম মহামারী ছবি এটি। সাইবেরিয়া ও কাজাখিস্তান থেকে এ রোগের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তীতে মহামারী আকারে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সমুদ্র পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা ও  আফ্রিকা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এ রোগ। ১৮৯০ সালের শেষ পর্যন্ত এ রোগে ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। 

১৯১৮ সালে চীন থেকে স্প্যানিশ ফ্লু নামে রোগের উৎপত্তি হয়। পরবর্তীতে এ রোগ চীনের শ্রমিকদের মাধ্যমে কানাডা হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত স্পেনের মাদ্রিদ ও উত্তর আমেরিকায় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। 

১৯৫৭ সালে এশিয়ান "ফ্লু" রোগ হংকং থেকে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী ছয় মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকহারে বিস্তার ঘটে। সেবার ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যুর পর প্রকোপ কমে গিয়ে ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে দ্বিতীয় বারের মতো প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং তখন এ রোগে ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে এ রোগের  মহামারী ঠেকানো সম্ভব হয়।

১৯৮১ সালে এইচআইভি বা এইডস রোগ প্রথমবারের মতো শনাক্ত হওয়ার পর এ যাবৎকাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯২০ সালের দিকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে এ রোগটির উদ্ভব হয়।              

১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশে গুটি বসন্ত মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ও প্রায় আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। 

বারবার এতোসব প্রাকৃতিক রোগের মহামারীর ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী শক্তির মদমত্ততা দেখেছে পৃথিবীর মানুষ। এরপরও মানুষ মানুষ মারার অস্ত্র ও বোমা আবিষ্কারে যে অর্থ আর মেধা-মননের অপচয় করেছে, সে তুলনায় এসব রোগের মহামারী থেকে নিজেদের রক্ষায় প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক আবিষ্কারে দৃশ্যত খুব কমই মনোযোগী হয়েছে।                 

এবার করোনাভাইরাস আতঙ্ক বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে বিশ্বব্যাপী সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। পৃথিবীর কোনো প্রান্তের মানুষ নিজেকে নিরাপদ ভাবার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবী এতটা-ই বিপদসংকুল হয়ে ওঠেছে যে, বিজ্ঞান মনষ্ক দেশ এবং  মানুষও অদৃষ্টবাদী হয়ে আকাশকে (সৃষ্টিকর্তাকে) শেষ ভরসাস্থল হিসেবে মানছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় মৃত্যুপুরী ইতালির প্রধানমন্ত্রীর আবেগঘন অশ্রুঝরা বক্তব্য এবং দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে ফ্রান্সের মসজিদে- লোকালয়ে এক সঙ্গে আজানের ধ্বনি শুনেছে পৃথিবী।

সব কিছু ছাপিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্তের আকুতিতে বেজে ওঠেছে রক্ত মাংসের গড়া মানুষ পরিচয়ের এবং একই রকম হাসি-কান্না ও দুঃখ-বেদনার যোগসূত্রের রাগ ভৈরবী। আর মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার বার্তা ও আওয়াজ।

আর কালক্ষেপণ নয়। জোরদার হোক মানবিক বিশ্ব বাস্তবায়নের তাগিদ। এবার বরাদ্দ বাড়ুক স্বাস্থ্য সেবা খাতে। অস্ত্র-বোমার পরিবর্তে এ ধরনের প্রাণঘাতী রোগব্যাধি থেকে মানবকুল রক্ষায় প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিশ্বজনীন গবেষণা সফলে সর্বশক্তি নিয়োগ হোক।

জেগে ওঠো, জাগিয়ে দাও। জাগাও মানবতা, বাঁচাও প্রাণ।       

এ টি এম নিজাম

সাংবাদিক, 

[email protected]

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস