করোনাভাইরাস: ভয়ের মাঝে হাস্যকর আমরা

  রুমানা রাখি, যুক্তরাজ্য থেকে ২৮ মার্চ ২০২০, ০১:৪০:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

প্রতিদিন রাতে ভয়ে আঁতকে উঠছি। অন্ধকার রুমে নিজেকে সব থেকে অসহায় লাগে আজকাল। মনে হয় জীবনের সব থেকে বড় পরীক্ষার সামনে দাড়িয়ে রয়েছি আমি। মনে হয়, এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হয়তো আর কখনো ফিরতে পারবো না নিজ ভূমিতে, নিজ মায়ের কাছে।

আমার মতো এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছে লাখ লাখ প্রবাসী। করোনাভাইরাসে প্রতিদিন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। একইসঙ্গে বাড়ছে আমাদের ভয়। দূর পরবাসে থেকে আমরা যখন চিন্তা করছি দেশের প্রিয়জনদের নিয়ে, ঠিক একই সময়ে দেশের প্রিয়জনরা চিন্তা করছেন আমাদের নিয়ে। এই তো ভালোবাসা, এই তো পরিবার।

গত কয়েকদিন ধরে করোনাভাইরাস নিয়ে বাংলাদেশের কিছু মানুষের অসাবধানতা দেখে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আমরা যখন এখানে দিনের পর দিন ঘরেবন্দি জীবন কাটাচ্ছি, তখন আমাদের দেশের অনেক মানুষের কাছে এ যেন এক ছুটির আমেজ।

কিছু মানুষের এমন অসাবধানতার কারণে দূর পরবাসে থেকে পরিবার নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমাদের। আমরা সবাই জানি অভূতপূর্ব বিপদের মুখে আমরা। এই বিপদের মধ্যে কী চাই আমাদের?‌ চাই সরল নেতৃত্ব।

দেশ ও সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা আমাদের। অনেকে হয়তো, হরেক রকম দাবিও তুলেছেন এরই মধ্যে। সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। সব কিছুর মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে, কীভাবে সতর্কতার পথে থাকা যাবে তার কথা বলেছেন।

শুধু আলাদা তহবিল করেননি, চিকিৎসা পরিকাঠামোর জন্য বরাদ্দ করছেন। পরিকাঠামোর জন্য সরকারি ব্যবস্থাকে জোরদার করার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীকে রাস্তায় নামিয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সহায়তার কথাও বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। ভরসা দিচ্ছেন আমাদের। সতর্ক করে দিচ্ছেন, নিচ্ছেন কঠোর ব্যবস্থা। সরকারের নির্দেশনা মেনে আমরা কতটা সতর্ক থাকছি তা প্রতিদিনকার সংবাদ মাধ্যমগুলো দেখলেই বোঝা যায়।

দেশে ২৬ তারিখ থেকে ১০ দিনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে বন্ধ করা হয়েছে জনসমাগম। কিন্তু এই বন্ধ ঘোষণার কিছু মানুষ মৃত্যুকে উপেক্ষা করেও এমন হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা হয়তো তাদের বোঝার ক্ষমতা নেই।

অবাক লাগে, যখন সব মুহূর্তে শুনতে হয় আমরা হুজুগে বাঙালি। গত কয়েকদিনের সংবাদমাধ্যমগুলোতে চোখ রাখলে বোঝা যায় করোনা সম্পর্কে আমাদেরও সচেতনতা। করোনা আতঙ্কিত হয়ে বিদেশের মানুষ দেশে আসছে, ঢাকার মানুষ ছুটি পাওয়ার আগে তো বটেই, পাওয়ার পরে বহুগুণে রাজধানী ছাড়ছে।

বাসে, ট্রেনে, ফেরিতে, লঞ্চে ও মহাসড়কে সেসব দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে, যা হয় ঈদের ছুটিতে। দৌড়ে, ঝুলে, গাদাগাদি করে মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। জনসমাগম এড়ানোর কথা বলা হলেও কেউ শুনছে না। তারা পরিমরি করে পৌঁছাতে চাইছে নিজ গ্রামে, দেশের বাড়িতে, পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীর কাছে।

দেখে মনে হচ্ছে ছুটি কাটানোর মোক্ষম এক সুযোগ পেয়েছি আমরা। তাই আমাদের জন্যই হুজুগে বাঙালী প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের এমন দৃশ্যের বিপরীত ঘটনা আমি দেখছি লন্ডনে। চলতি সম্পাহে দেশটি প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে লকডাউন ঘোষণা করছেন। কিন্তু লকডাউন ঘোষণার প্রায় ১০ দিন আগে থেকেই এখানকার মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

তাই দেশের মানুষের এমন ছুটাছুটি আমাদের আতঙ্কিতই করছে। অন্যদিকে বিশ্ব এখন করোনার ভয়ে থমকে আছে। আক্রান্ত দেশের মানুষরা তাদের নিজেদের, নিজেদেরকে ঘর বন্দি করছে তখন আমাদের কাছে হোম কোয়ারেন্টিন যেন নতুন নামে আবির্ভাব করছে।

কী হাস্যকর আমরা। কী আজব সব ঘটনা ঘটছে আমাদের দেশে হোম কোয়ারেন্টিন ঘিরে। গত কয়েকদিনের পত্রিকা খুলে যে সংবাদগুলো আমাদের মন খারাপের মাঝেও হাসির যোগান দিয়েছে তার কয়েকটি তুলে না ধরলেই নয়।

হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা ইতালি প্রবাসী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে ভেতরে প্রবেশ করে ছবি তোলায় ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে সাংবাদিক। ধামরাইয়ে কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে ২৮টি সিলিং ফ্যান চুরি। করোনার টিকা বিক্রির অভিযোগে দুই প্রতারক আটক।

মিরপুরে লকডাউন বাড়িটি দেখতে শতশত মানুষের ভিড়। নবীগঞ্জে হোম কোয়ারেন্টিনে প্রবাসীকে একনজর দেখার জন্য পাঁচ শতাধিক মানুষের ঢল আর তা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে পুলিশ। রাজবাড়িতে করোনা নিয়ে তর্কের জেরে সংঘর্ষ, নিহত এক।

বরিশালের এক হাসপাতাল থেকে দৌড়ে পালানোর সময় করোনার রোগীকে পিছন হতে ধাওয়া করেন চার যুবক, ধরে কাঁধে করে নিয়ে আবার ভর্তি করিয়ে দেন হাসপাতালে। আর চার যুবকের এমন বীরত্ব দেখে ওই চার যুবককে কাঁধে করে এলাকায় আনন্দ মিছিল করেছে দুই-আড়াইশ মানুষ!

আতঙ্কের মাঝে এসব তামাশা আমাদের উদ্বিগ্ন করলেও মনের অজান্তে অনেকই হাসছি। এই তো বাঙালী। যারা কিছুতেই ভয় পায় না। তবে এই ধরনের সাহস যে আমাদের আরও বিপদে ফেলবে তা হয়তো অবুঝ মানুষরা বুঝতে পারছেন না।

অবুঝরা যখন দেশের অন্য মানুষদের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন ঠিক তখন এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে একযোগে কাজ করছেন বাংলার অনেক সচেতন মানুষ। অনেকে স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টিনে চলে গিয়েছেন। এরই মধ্যে তরুণেরা নেমে পড়েছে তাদের সহযোগিতা নিয়ে।

বিজ্ঞানীরা এগিয়ে আসছেন করোনা পরীক্ষার যন্ত্রের উদ্ভাবন নিয়ে। ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় সাবান-স্যানিটাইজার বিলি করছে, বুয়েট সমাজ ডাক্তারদের জন্য পিপিই বানাচ্ছে। রানা প্লাজার উদ্ধারের কায়দায় যার যা কিছু আছে তা নিয়ে দাঁড়ানোর লক্ষণ ফুটে উঠছে এই পরিস্থিতিতে।

তাছাড়া এই বিচ্ছিন্নতার কালে বেশকিছু খবর আমাদের আশাবাদী করে। ব্যক্তিগতভাবে অনেকে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বেশ কয়েকজন বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন। সর্বোপরি সচেতন ও অসচেতনতার ভিড়ে করোনার দুর্যোগে দিশাহীন মানুষ যা ভালো মনে করেছে, তাই করছে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত