যে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি অসহায়, নিধিরাম সর্দার

  কাকন রেজা ২৮ মার্চ ২০২০, ১৯:৪৪:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

জাস্টিন ট্রুডো আর মমতা ব্যানার্জি এ দুটো নাম এই করোনা দুর্যোগে বেঁচে যাওয়া মানুষদের মনে থাকবে আমৃত্যু। এ নাম দুটো দুর্যোগ মোকাবেলায় রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পরিষ্কার ঘোষণা দিলেন, আপনার ঘরে থাকুন, আপনাদের সব দায়িত্ব আমার। ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেয়া থেকে বাড়ি ভাড়া, অন্যান্য সব খরচের দায়িত্ব নিলেন তিনি।

আর পশ্চিমবঙ্গের মতন একটা সমস্যাপীড়িত অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ছয় মাসের খাবারের নিশ্চয়তা দিলেন গরীব মানুষদের। স্টেডিয়ামগুলোকে বানালেন হাসপাতাল। তৈরি রাখলেন পরীক্ষা সরঞ্জাম, অন্যান্য উপকরণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন ঘণ্টা-কাসর বাজিয়ে কোভিড নাইনটিন হঠানোর কাজ করছেন, তখন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানুষের দুর্দশা লাঘবের চেষ্টা করছেন পরম মমতায়।

নিজ হাতে বৃত্ত কেটে সামাজিক দূরত্ব কিভাবে ঠিক রাখতে হয় তা দেখিয়ে দিচ্ছেন। এসব দেখে আমাদের মন শুধু আহা-উহু করে। আফসোস আর বেদনায় বুক কেঁপে উঠে। আমরা ঘরে বসে আছি কোয়ারান্টিনে। অন্তত দু’মাস চলার মতন টাকা-পয়সা আমাদের কারো কারো আছে। অনেকের আছে বছর বছর।

কিন্তু যখন টিভিতে দেখি ছিন্নমূল বাচ্চারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, খাবার নেই। দিনমজুররা বসে আছে কাজ নেই, কাজ না থাকা মানে না খেয়ে থাকা। এদের কী হবে? দেশের সিংহভাগ মানুষই তো এরা। ভাবি আর অস্থির হয়ে উঠি। একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে এমন অসহ্য দৃশ্য। মাথাটা টলে উঠে। চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায়।

একটা ছবিতে দেখলাম একজন দরিদ্র রিকশাচালকের পিঠে লাঠির আঘাত। তাকে রাস্তা থেকে মেরে তাড়ানো হয়েছে। কদিন আগে যুগান্তরেই লিখেছিলাম এমন অবস্থার কথা। বলেছিলাম, ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই কিল মারার গোসাই’ এমন কথা যেন বলতে না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে। সে আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত হোক মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম, তা হয়নি।

সেই ছবির নিচে সামাজিকমাধ্যমে সেই কথাই লেখা হলো, ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই কিল মারার গোসাই’। রাস্তা থেকে পিটিয়ে তাদের বাড়ি পাঠানো যায়, যারা বখে যাওয়া তরুণ, গোঁয়ার্তুমি করে বাইরে রয়েছে। যারা এডভেঞ্চারস, মৃত্যুটাকে এডভেঞ্চার হিসাবে ধরে নিয়েছে। এদের জোর করে বাড়ি পাঠান, প্রয়োজনে পিটান, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যারা পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে রাস্তায় বেড়িয়েছে।

যাদের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষায় আছে সে চাল-ডাল নিয়ে গেলে রাঁধবে। এমন মানুষগুলোর সঙ্গে রূঢ় হওয়া কোনভাবেই মেনে নেবার নয়, উচিতও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বপালন করতে হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা আমরা জানি। তাদের কোনো সুরক্ষা পোশাক নেই, রেইনকোট নিয়েই তারা পালন করছেন কর্তব্য, এটা আমরা দেখছি।

এ নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে আফসোসও দেখছি কারো কারো। সেই আফসোসকারীদের বলি, এটা নিয়ে আফসোস করেন ঠিক আছে, তবে বিপরীতে প্রশ্ন করেছেন কি, কেন নেই? পূর্বের এতো বাগাড়ম্বর, হাতে তিনমাস সময় পাবার পরও কেন এই অপ্রস্তুত অবস্থায়, মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে আমাদের পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীকে, প্রশ্নটা জাগে না মনে? জাগান-রে ভাই, এখন না জাগালে কখন জাগাবেন?

এটা যুদ্ধের চেয়েও বেশি। যুদ্ধে তো শত্রু দৃশ্যমান, আর এ যুদ্ধে শত্রু অদৃশ্য। অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করাটা অনেকটাই অসম্ভব। আর এই অসম্ভবকে যারা সফল করবেন তাদের অবস্থা কী? চিকিৎসকদের কথা বলছি। তাদের তো প্রতিরক্ষা পোশাক নেই। তারা তো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। চিকিৎসক ঝুঁকিতে থাকলে আমাদের কী হবে, আমরা কোথায় যাবো।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী কোয়ারিন্টিনে গেছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কয়েক চিকিৎসক। এভাবে চিকিৎসক, সেবিকারা কোয়ারান্টিনে গেলে, আক্রান্ত হলে আমাদের চিকিৎসা করবে কে? ভেবে দেখেছেন কি কখনো আমরা প্রস্তুত হইনি কেন? দেখেননি, তখন আপনাদের চোখে ছিল রঙের ফানুস!

এখন সাদাকালো মৃত্যু সামনে আসায় চমকে গেছেন। পরিষ্কার বলি দোষটা আপনাদের, এই অসঙ্গতি আপনাদের সৃষ্টি করা। আপনারা প্রশ্ন করতে শিখেননি, হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো শিখেছেন, তাই আজ আমাদের এই অবস্থা।

আজ সারাদেশ পাঁচ হাজার ভেন্টিলেটরও নেই, যে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়া যাবে। যেখানে হাজার হাজার ভেন্টিলেটর থাকা স্বত্বেও ইতালি অবস্থা সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে আমাদের অবস্থার তুলনা কি চলে? চলে না। আমাদের আইসিইউ আছে কয়টা? সংখ্যাটা বলি না, বললে আতঙ্কটা বাড়বে।

যে দেশে হাসপাতালের একটা বালিশের দাম ধরা হয় সাত হাজার, পর্দা সাতাশ হাজার, এমন একটা দেশে ভেন্টিলেটর অন্তত দশলাখ থাকার কথা। যে দেশে একটা অ্যানার্জি সেভার বাল্ব কিনতে দাম ধরা হয় চৌষট্টি হাজার, সেখানে দশ হাজার আইসিইউ না থাকাটা নিশ্চয়ই গর্বের নয়।

যেখানে এক কিলোমিটার রাস্তার ব্যয় ধরা হয় আমেরিকার চেয়ে বেশি, সেখানে জেলার হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলাইজেশন না থাকাটা কি মেনে নেয়ার? এমন অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে, যা কখনোই আপনারা প্রশ্ন হিসাবে হাজির করেননি, ফলে যা হবার তাই হয়েছে। যখন প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তখন আপনি দেখছেন আপনার যুদ্ধে জেতার মূল হাতিরয়ারগুলোই নেই!

যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষা। সেখানে আমাদের করোনা দুর্যোগ তৃতীয় ফেজে প্রবেশের প্রাক্কালেও মাত্র একটা পরীক্ষাগার। কিট নেই, নেই সরঞ্জামও। অতিসম্প্রতি অবশ্য আরও তিনটি পরীক্ষাগার হয়েছে, আরও হবে এমনটাও জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো তিন মাসে কেন এ ব্যবস্থাগুলো করা গেল না। কেন অসম যুদ্ধে মানুষদের নামিয়ে দেয়া হল?

দেখুন, ভালো করে ভেবে দেখুন, যুদ্ধক্ষেত্রে অদৃশ্য শত্রুর সমুখে আপনি কতটা অসহায়; কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক নিধিরাম সর্দার। এমন সর্দারদের ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে আজ সাধারণ মানুষগুলোর। ধিক, আপনাদের মতন প্রশ্নহীন মানুষের সহানুভূতি আর আফসোসের।

পুনশ্চ: এক মহিলা এসিল্যান্ডের ছবি ভাসছে সামাজিকমাধ্যমে। বাবার বয়সীদের কান ধরাচ্ছেন সেই এসিল্যাল্ড। এ নিয়ে অনেকে ছিঃ ছিঃ করছেন। বলি, এখন কেন আপনাদের গায়ে লাগছে! এই কানধরাতন্ত্র তো আপনাদেরই কারো কারো মস্তিষ্কপ্রসূত। এমন কাণ্ডের জন্য আপনাদেরই কেউ কেউ সমান দায়ী।

ডাণ্ডাবাজিকে পালন করেছেন আপনারাই। ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ জ্ঞানে ডান্ডাবাজদেরই বীর ভেবেছেন। অথচ এর বিপরীতে যারা আছেন, তাদের করেছেন নজরআন্দাজ। এমন এসিল্যান্ডের বিপরীত চিত্রও রয়েছে। সামাজিকমাধ্যমেই দেখলাম একজন মহিলা ইউএনও নিজে দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করছেন, তাদের অভয় দিচ্ছেন। রাস্তায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মমতা ব্যানার্জির মতন কাজ করছেন।

আগে হয়তো এমন কর্মকর্তাকেই আপনারা বলেছেন নরম মানুষ। বলেছেন, ‘নরম মানুষ দিয়ে কাজ হবে না’, এমন কথাও! সুতরাং এই কানধরাতন্ত্র আর ডাণ্ডাবাজিতে আপনিও সমান দায়ী। আপনারাই এসবকে উৎসাহ দিয়েছেন। ডাণ্ডা দিয়ে সব থামিয়ে দেয়াকে বাহবা দিয়েছেন।

মানুষের মুখ বন্ধ করতে চেয়েছেন। যার ফলে প্রকৃত প্রয়োজন আপনিও বুঝে উঠতে পারেননি, পারেননি ওই এসিল্যান্ড ম্যাডামেরাও। আজকে তাই সেই আপনারাই ডিজাস্টারের সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। নিধিরাম সর্দার হয়ে উঠেছেন। আর আমরা হয়ে উঠেছি অসহায়।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত