করোনা পরীক্ষায় এত নেগেটিভ রেজাল্টের কারণ কী?

  ড. মোহাম্মদ শাহনূর হোসাইন ৩১ মার্চ ২০২০, ১১:৪৬:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

ডায়াগনস্টিক সায়েন্সে ফলস নেগেটিভ ও ফলস পজিটিভ রেজাল্ট বলে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিদ্যমান। আপনার শরীরে কোনো রোগ জীবাণু বা রোগের উপস্থিতি বিদ্যমান; কিন্তু সেটি নির্ণয় না করতে পারা হচ্ছে ফলস নেগেটিভ, আর আপনার শরীরে কোনো রোগ জীবাণু বা রোগের উপস্থিতি নেই; কিন্তু সেটির উপস্থিতি দেখানো হচ্ছে ফলস পজিটিভ। তার বাইরে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে– সেন্সিটিভিটি ও স্পেসিফিসিটি।

সেন্সিটিভিটির মাধ্যমে মূলত কত কম পরিমাণ রোগের উপাদান পজিটিভ রেজাল্ট প্রদর্শন করবে তা বোঝায়, আর আপনি কত সঠিকভাবে রোগটি নির্ণয় করবেন সেটি হচ্ছে স্পেসিফিসিটি। এসব নির্ণায়ক বিবেচনায় নিলে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি যাচাইয়ে আরটি-পিসিআর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি।

তার বাইরে এন্টিজেন-এন্টিবডিভিত্তিক যে পদ্বতিগুলো আছে, সেগুলো প্রচুর ভুল রেজাল্ট তৈরি করে; বিধায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে সেগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে না (যেমন গণস্বাস্থ্যের প্রস্তাবিত পদ্বতি; তবে করোনাভাইরাস বাংলাদেশে কী পরিমাণ বিস্তার লাভ করেছিল, কিছু দিন পর সেটি জানতে সহায়তা করবে)।

আপনি যদি সব ধাপ সঠিকভাবে সম্পাদন করেন, তবে আরটি-পিসিআর প্রক্রিয়ায় আপনি সঠিকভাবে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করতে পারবেন।

প্রাথমিক উপসর্গ নিয়ে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয়ে প্রতি তিনটি টেস্টের বিপরীতে একটি পজিটিভ রেজাল্ট পাচ্ছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। অন্যদিকে পুরো আমেরিকায় প্রতি পাঁচটি টেস্টের বিপরীতে একটি পজিটিভ রেজাল্ট আসছে।

করোনা আক্রান্ত অন্যান্য দেশেও একই পরিসংখ্যান। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কী দেখছি!!!!! এখন পর্যন্ত আইইডিসিআর টেস্ট করেছে প্রায় ১২০০ জন সন্দেহজনক রোগীর নমুনা, আর পজিটিভ রেজাল্ট পেয়েছে কেবল ৪৯টি। প্রতি ২৪ জনে কেবল একটি।

করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা থেকে এখন দেখছি তার উপস্থিতি নির্ণয় পর্যন্ত চলছে লুকোচুরি। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে– তারা সঠিকভাবে টেস্টটি সম্পাদন করছে কিনা।

নিউইয়র্কে প্রতি তিনজনের মধ্যে ১টি, পুরো আমেরিকায় ৫ জনে ১টি, আর বাংলাদেশে প্রতি ২৪ জনে ১টি পজিটিভ টেস্ট!!!!!!!! নিশ্চয় প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা এবং দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত।

নিন্দুকেরা অবশ্য লুকোচুরির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসবে!!!!! আমি সেদিকে না গিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে তা তুলে ধরব। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বা ল্যাবরেটরিতে যারা করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করতে চান তাদের কাজে লাগবে।

১. যেহেতু টেস্টের শুরুতেই আপনাকে ভাইরাসের আরএনএ আলাদা করতে হবে এবং আরএনএগুলো খুবই সংবেদনশীল। সুতরাং আপনাকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে, যেন আরএনএ নষ্ট না হয়ে যায়। মনে রাখবেন আরএএএসই এনজাইমের উপস্থিতি সর্বত্র। ক্ষণিকের ভুলে ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে।

২. কন্ট্রোল, কন্ট্রোল ও কন্ট্রোল। প্রথমত আপনাকে এক্সট্রাকশন কন্ট্রোল হিসেবে করোনাভাইরাসের আরএনএ আপনার নমুনার সঙ্গে সমান্তরাল রেখে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার আরএনএ আলাদাকরণ পদ্বতি সঠিকভাবে হয়েছে।

বাংলাদেশে কিটের সঙ্গে ‘করোনাভাইরাসের আরএনএ’ দেবে কিনা আমি নিশ্চিত নই। আপনার দেয়া ভাইরাসের আরএনএ যদি আলাদা করতে না পারেন, তা হলে ধরে নেবেন আপনার নমুনার আরএনএও আলাদা হয়নি। ফলে ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে বাধ্য। আমার ধারণা, বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে।

৩. পজিটিভ কন্ট্রোল হিসেবে করোনাভাইরাসের ডিএনএবাহী প্লাসমিড নিন। এটি কিটের সঙ্গে থাকতে পারে। করোনাভাইরাসের ডিএনএবাহী প্লাসমিড পিসিআর সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, সেটি বলে দেবে।

৪. রিভার্স ট্রান্সক্রিপটাস এনজাইম সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, সেটি জানার জন্য হিউম্যানের কোনো অত্যাবশকীয় জিনের (gyrase অথবা RNA polymerase) একটি কন্ট্রোল রাখুন।

৫. কমপক্ষে দুটি নেগেটিভ কন্ট্রোল রাখুন। নেগেটিভ এক্সট্রাকশন কন্ট্রোল অবশ্যই রাখবেন।

৬. নিম্নমানের টেস্ট কিটে ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। চাইনিজ কিট ব্যবহার না করাই ভালো।

৭. টেস্ট রিএজেন্ট বারবার ফ্রিজ থেকে বের করবেন না। বারবার ফ্রিজ-থো টেস্ট কিটের কার্যকারিতা বিনষ্ট করে। ফলস নেগেটিভ রেজাল্টের সেটিও একটি কারণ।

৮. টেস্ট করার সময় আরএনএ নিয়ে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে এমন মাইক্রোবায়োলোজিস্ট, মলিকিউলির বায়োলজিস্ট, বায়োটেকনোলজিস্ট কিংবা বায়োকেমিস্টও সুপারভাইজার হিসেবে রাখুন।

৯. নিজেরা প্রিমার ডিজাইন করলে এন প্রোটিনের জিনকে টার্গেট করুন। অন্যান্য জিনে মিউটেশনের হার খুব বেশি।

১০. প্রতিটি নমুনার একসঙ্গে কমপক্ষে দুটি পরীক্ষা (duplicate) করুন ।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোস্ট ডক্টরাল স্কলার
ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত