হে প্রভু! বরকতময় এই শবে বরাতে ‘করোনা’ থেকে আপনার করুণা চাই
jugantor
হে প্রভু! বরকতময় এই শবে বরাতে ‘করোনা’ থেকে আপনার করুণা চাই

  হাফেজ আরমান হোসেন  

০৯ এপ্রিল ২০২০, ২০:২৮:২০  |  অনলাইন সংস্করণ

হে প্রভু! বরকতময় এই শবেবরাতে ‘করোনা’ থেকে আপনার করুণা চাই
ছবি: সংগৃহীত

এই পৃথিবীতে একমাত্র ইসলামই এমন জীবনব্যবস্থা যেখানে সব কিছুই সুনির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট।  এখানে কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি অথবা ছাড়াছাড়ির সুযোগ নেই। নেই কোনো মনগড়া ইবাদত বন্দেগী। 

কারণ, ইসলাম সুনির্দিষ্ট মূলনীতির ভিত্তিতে চলে। মানবজীবনের প্রতিটি বিষয়ে ইসলাম পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। একজন মুসলমানকে তার জীবন চলার পথে কোনো নিয়মনীতিই অন্য কোনো জাতি বা তাদের ধর্মগ্রন্থ  থেকে ধার করতে হয় না। 

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছেন। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, আজ তোমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।‌‌‌ (সুরা মায়েদা: আয়াত-৩)

আমরা বর্তমানে এমনই এক সময় পার করছি, যখন সারা পৃথিবীর সব কিছুই প্রায় অচল! টিভির পর্দা খুললেই দেখা যায়, পৃথিবীতে চলছে লাশের মিছিল।  হাট-বাজার, কল-কারখানা, পরিবহনসহ পুরো জনজীবনেই বিরাজ করছে একটাই আতঙ্ক, যার কারণ আমাদের সকলেরই জানা, নাম তার ‘করোনা’। 

অদৃশ্য এই ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে অদ্যবধি  প্রায় অর্ধ লক্ষাধিকেরও বেশি মানুষ চলে গেছে মৃত্যুপুরীতে! যার পরিপেক্ষিতে পুরো পৃথিবী আজ (গৃহবন্দি) লকডাউন। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের সামনে এসে হাজির হল পবিত্র শাবান মাস, আর এই পবিত্র মাসের আরো স্পেশালিটি হলো শবে বরাত। 

এই শবে বরাত নিয়ে আমাদের সমাজে যেমন বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়, তেমনিভাবে উদাসীনতারও কমতি নেই। আমাদের জানতে হবে, ইসলাম সর্বদা ভারসাম্যপূর্ণ এবং সকল বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে থাকে। 

বলাবাহুল্য যে, এই রাতের কথা যদিও পবিত্র কুরআনে সরাসরি কোন কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু এই রাতের বিষয়ে হাদিস শরিফে অনেক আলোচনা রয়েছে। তবে অনেক আলেম সূরা দুখানের তিন এবং চার নং আয়াতকে এই রাতের দলিল হিসেবে উত্থাপন করে থাকেন। 

তবে অধিকাংশ মুফাসসির (তাফসীরকারক) বলেছেন, সূরা দুখানের তিন এবং চার নং আয়াত দ্বারা লাইলাতুল ক্বদরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

 

হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে শবে বরাত

হাদিস শরিফে ‘শবে বরাত’ বলতে যে পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা হল ‘নিসফ শাবান’ বা ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান’ তথা শাবান মাসের মধ্য রজনী। 

একটি হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলছেন, আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তার সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। (ইবনু মাজাহ: ১/৪৪৫; মুসনাদে আহমদ  ২/১৭৬) 
একাধিক সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা পালন করতেন। 

শাবান মাসের রোজা ছিল তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।  এমাসের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এবং কখনো কখনো প্রায় পুরো শাবান মাসই তিনি নফল রোজা পালন করতেন।  

এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ মাসে রাব্বুল আলামীনের কাছে মানুষের কর্ম (আমল) উঠানো হয়। আর আমি ভালবাসি যে, রোজা অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক।  (নাসাঈ: ৪/২০১) 

অপর হাদিসে হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি রাসূল (সা.) কে খুঁজে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাকে জান্নাতুলবাকিতে পেলাম। তখন রাসূল (সা.) আমাকে বললেন, তুমি কি মনে কর, আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন? 

আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীর নিকট গিয়েছেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাত্রিতে নিকটবর্তী আসমানে আসেন  এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশী লোকদের ক্ষমা করেন।  (মুসনাদে আহমাদ:৬/২৩৮;তিরমিযি:২/১২১) 

আরেক হাদিসে হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাত্রিতে প্রথম আকাশে আগমণ করেন, অতঃপর মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যতীত, সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ: ১/৪৫৫)


আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার

শবে বরাত উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও পীরদের খানকায় এবং দোকানপাটে আলোকসজ্জা করা হয়, বেলুন ফুটানো হয় ও আতশবাজি করা হয়। সেই সঙ্গে হালুয়া রুটি, খিচুড়ি ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করা হয়। এগুলো ভুল রেওয়াজ, যা পরিহার করা আবশ্যক। 

আলোকসজ্জা বা আতশবাজিতে অপচয়ের পাশাপাশি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণও রয়েছে। 

আর হালুয়া-রুটি বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য বানানো, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণ করা, খিচুড়ি রান্না করা এবং গরীব অসহায়দের মাঝে বন্টন করা সাধারণ অবস্থায় জায়েজ ও ভালো কাজ হলেও এটাকে এ রাতের বিশেষ আমল মনে করা এবং এসবের পিছনে পড়ে এ রাতের মূল কাজ তওবা-ইস্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হওয়া শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

এসব কাজ নিতান্তই কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত।  আমাদের জানা দরকার, এই রাতগুলো কোন আনন্দ উৎসবের রাত নয়, ইবাদত-বন্দেগী ও তওবা- ইস্তেগফারের রাত। 

হাদিস শরিফে এই রাতের ইবাদতের ব্যাপারে নির্ধারিত কোন নির্দেশনা নেই, অমুক সূরা অতবার করে অত রাকাত  সালাত আদায় করলে অত সাওয়াব এগুলো বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।  তবে মুমিন বান্দা তার গুনাহ মাফের উদ্দেশ্যে নিজের সুবিধামত যে কোন সূরা দিয়ে যে কয় রাকাত নফল সালাত আদায় করতে পারে, এতে ধরাবাঁধা নেই। 

এছাড়াও উপরের উল্লেখিত হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী জানতে আমরা পারলাম, এই শাবান মাসে রাসূল (সা.) অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন, তাই আমাদেরও উচিৎ যথাসাধ্য অনুযায়ী এই মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। সেই সঙ্গে এসব আমগুলো করা যেতে পারে। 

• এশা এবং ফজরের সালাত আদায় করা। (এটি প্রতি রাতেই করতে হবে)
• বেশি বেশি ইস্তেগফার করা।
• নফল সালাত আদায় করা।

• কুরআন অধ্যয়ন করা।
• একে অপরের জন্য দোয়া করা।
• কবর জিয়ারত করা।

বিশেষ করে, বর্তমান সময়ের বিশ্বব্যাপী যে, মহামারী তথা করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণের জন্য দোয়া করা। এ মহামারি থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে । 

আমাদের কর্তব্য হল সকল গুনাহ ও অপরাধ হতে বিরত থেকে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা। সেই সঙ্গে হাদিসের নির্দেশিত নিম্নের দুয়াগুলো সর্বদা পাঠ করা। 

হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) কিছু দোয়া-কালাম শিখিয়ে গেছেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊজবিকা মিনাল বারসি ওল জনূনে ওল জূযা-মি ওমিন সাইয়্যে-ইল আসক্বম। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট  শ্বেতরোগ, উম্মাদনা, কুষ্ঠরোগ সহ যাবতীয় মহামারী থেকে আশ্রয় চাই। (আবু দাউদ; ১৫৫৪; নাসায়ী: ৫৪৯৩) 

অন্য জায়গায় আরো বলেছেন‌, হযরত ওসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, কোন ব্যক্তি যখন প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা তিনবার করে এই দোয়াটি পাঠ করবে (আল্লাহর রহমতে) অনিষ্টতা ঐ ব্যক্তির কোন ক্ষতি করতে পারবে না। 

দোয়াটি হল: বিছ্মিল্লাহিল্লাজী লা-ইয়া ধুররুহু মা’য়াছমিহী শাইউন ফিল আরদি ওলা ফিছছামা-ই ওহুয়াছছামি উল আলীম। (ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৯) 

পবিত্র কুরআনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এই বিপদ মুসিবত এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরীক্ষা করে থাকেন (সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭)।

আবার কখনও বিপদের মাধ্যমে গুনাহ ক্ষমা করে থাকেন (সূরা শুরা: ৩০)।

 

বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায়

হযরত হুজাইফা (রা.) সুত্রে বর্ণিত।  তিনি বলেন, রাসূল (সা.) কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে সালাত আদায় করতেন। (আবু দাউদ: ১৩১৯) সুতরাং বিপদ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যাক্তির উচিৎ নামাজে মনযোগী হওয়া। 

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, আর তা আল্লাহভীরু ব্যাক্তিরা ছাড়া অন্য সকলের কাছে নিশ্চিতভাবেই কঠিন। (সূরা বাকারাহ :৪৫)

পরিশেষে বলব, বরকতপূর্ণ এই মাসে আমাদের সবার উচিত যথাসাধ্য সিয়াম পালন করা, সেই সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা এবং যাবতীয় অন্যায় কাজ কর্ম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। 

কারণ মানুষের মাঝে যখন অন্যায় অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন মহান আল্লাহ তায়ালা নানা ধরনের রোগ বালাই দিয়ে থাকেন, এমন সব রোগ বালাই যেগুলা আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় ছিল না। 

রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়ে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি দেখা দেয় যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না। (ইবনু মাজাহ: ২/১৩৩২)

আর এগুলো দেয়ার কারণ হল যাতে মানুষ সৎ পথে ফিরে আসে।  এই মর্মে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে এবং স্থলে বিপদাপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তিনি মানুষের কর্মের শাস্তি দিয়ে থাকেন, যাতে তারা (মানুষ) ফিরে আসে। (সুরা রূম: আয়াত-৪১)

 

লেখক: শিক্ষার্থী, বিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষ (তাফসির বিভাগ) দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা।

ইমেইল: [email protected]

 

হে প্রভু! বরকতময় এই শবে বরাতে ‘করোনা’ থেকে আপনার করুণা চাই

 হাফেজ আরমান হোসেন 
০৯ এপ্রিল ২০২০, ০৮:২৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
হে প্রভু! বরকতময় এই শবেবরাতে ‘করোনা’ থেকে আপনার করুণা চাই
ছবি: সংগৃহীত

এই পৃথিবীতে একমাত্র ইসলামই এমন জীবনব্যবস্থা যেখানে সব কিছুই সুনির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট। এখানে কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি অথবা ছাড়াছাড়ির সুযোগ নেই। নেই কোনো মনগড়া ইবাদত বন্দেগী।

কারণ, ইসলাম সুনির্দিষ্ট মূলনীতির ভিত্তিতে চলে। মানবজীবনের প্রতিটি বিষয়ে ইসলাম পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। একজন মুসলমানকে তার জীবন চলার পথে কোনো নিয়মনীতিই অন্য কোনো জাতি বা তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে ধার করতে হয় না।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, আজ তোমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।‌‌‌ (সুরা মায়েদা: আয়াত-৩)

আমরা বর্তমানে এমনই এক সময় পার করছি, যখন সারা পৃথিবীর সব কিছুই প্রায় অচল! টিভির পর্দা খুললেই দেখা যায়, পৃথিবীতে চলছে লাশের মিছিল। হাট-বাজার, কল-কারখানা, পরিবহনসহ পুরো জনজীবনেই বিরাজ করছে একটাই আতঙ্ক, যার কারণ আমাদের সকলেরই জানা, নাম তার ‘করোনা’।

অদৃশ্য এই ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে অদ্যবধি প্রায় অর্ধ লক্ষাধিকেরও বেশি মানুষ চলে গেছে মৃত্যুপুরীতে! যার পরিপেক্ষিতে পুরো পৃথিবী আজ (গৃহবন্দি) লকডাউন। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের সামনে এসে হাজির হল পবিত্র শাবান মাস, আর এই পবিত্র মাসের আরো স্পেশালিটি হলো শবে বরাত।

এই শবে বরাত নিয়ে আমাদের সমাজে যেমন বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়, তেমনিভাবে উদাসীনতারও কমতি নেই। আমাদের জানতে হবে, ইসলাম সর্বদা ভারসাম্যপূর্ণ এবং সকল বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

বলাবাহুল্য যে, এই রাতের কথা যদিও পবিত্র কুরআনে সরাসরি কোন কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু এই রাতের বিষয়ে হাদিস শরিফে অনেক আলোচনা রয়েছে। তবে অনেক আলেম সূরা দুখানের তিন এবং চার নং আয়াতকে এই রাতের দলিল হিসেবে উত্থাপন করে থাকেন।

তবে অধিকাংশ মুফাসসির (তাফসীরকারক) বলেছেন, সূরা দুখানের তিন এবং চার নং আয়াত দ্বারা লাইলাতুল ক্বদরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে শবে বরাত

হাদিস শরিফে ‘শবে বরাত’ বলতে যে পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা হল ‘নিসফ শাবান’ বা ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান’ তথা শাবান মাসের মধ্য রজনী।

একটি হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলছেন, আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তার সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। (ইবনু মাজাহ: ১/৪৪৫; মুসনাদে আহমদ ২/১৭৬)
একাধিক সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা পালন করতেন।

শাবান মাসের রোজা ছিল তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এমাসের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এবং কখনো কখনো প্রায় পুরো শাবান মাসই তিনি নফল রোজা পালন করতেন।

এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ মাসে রাব্বুল আলামীনের কাছে মানুষের কর্ম (আমল) উঠানো হয়। আর আমি ভালবাসি যে, রোজা অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক। (নাসাঈ: ৪/২০১)

অপর হাদিসে হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি রাসূল (সা.) কে খুঁজে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাকে জান্নাতুলবাকিতে পেলাম। তখন রাসূল (সা.) আমাকে বললেন, তুমি কি মনে কর, আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন?

আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীর নিকট গিয়েছেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাত্রিতে নিকটবর্তী আসমানে আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশী লোকদের ক্ষমা করেন। (মুসনাদে আহমাদ:৬/২৩৮;তিরমিযি:২/১২১)

আরেক হাদিসে হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাত্রিতে প্রথম আকাশে আগমণ করেন, অতঃপর মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যতীত, সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ: ১/৪৫৫)


আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার

শবে বরাত উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও পীরদের খানকায় এবং দোকানপাটে আলোকসজ্জা করা হয়, বেলুন ফুটানো হয় ও আতশবাজি করা হয়। সেই সঙ্গে হালুয়া রুটি, খিচুড়ি ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করা হয়। এগুলো ভুল রেওয়াজ, যা পরিহার করা আবশ্যক।

আলোকসজ্জা বা আতশবাজিতে অপচয়ের পাশাপাশি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণও রয়েছে।

আর হালুয়া-রুটি বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য বানানো, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণ করা, খিচুড়ি রান্না করা এবং গরীব অসহায়দের মাঝে বন্টন করা সাধারণ অবস্থায় জায়েজ ও ভালো কাজ হলেও এটাকে এ রাতের বিশেষ আমল মনে করা এবং এসবের পিছনে পড়ে এ রাতের মূল কাজ তওবা-ইস্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হওয়া শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এসব কাজ নিতান্তই কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত। আমাদের জানা দরকার, এই রাতগুলো কোন আনন্দ উৎসবের রাত নয়, ইবাদত-বন্দেগী ও তওবা- ইস্তেগফারের রাত।

হাদিস শরিফে এই রাতের ইবাদতের ব্যাপারে নির্ধারিত কোন নির্দেশনা নেই, অমুক সূরা অতবার করে অত রাকাত সালাত আদায় করলে অত সাওয়াব এগুলো বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তবে মুমিন বান্দা তার গুনাহ মাফের উদ্দেশ্যে নিজের সুবিধামত যে কোন সূরা দিয়ে যে কয় রাকাত নফল সালাত আদায় করতে পারে, এতে ধরাবাঁধা নেই।

এছাড়াও উপরের উল্লেখিত হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী জানতে আমরা পারলাম, এই শাবান মাসে রাসূল (সা.) অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন, তাই আমাদেরও উচিৎ যথাসাধ্য অনুযায়ী এই মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। সেই সঙ্গে এসব আমগুলো করা যেতে পারে।

• এশা এবং ফজরের সালাত আদায় করা। (এটি প্রতি রাতেই করতে হবে)
• বেশি বেশি ইস্তেগফার করা।
• নফল সালাত আদায় করা।

• কুরআন অধ্যয়ন করা।
• একে অপরের জন্য দোয়া করা।
• কবর জিয়ারত করা।

বিশেষ করে, বর্তমান সময়ের বিশ্বব্যাপী যে, মহামারী তথা করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণের জন্য দোয়া করা। এ মহামারি থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে ।

আমাদের কর্তব্য হল সকল গুনাহ ও অপরাধ হতে বিরত থেকে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা। সেই সঙ্গে হাদিসের নির্দেশিত নিম্নের দুয়াগুলো সর্বদা পাঠ করা।

হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) কিছু দোয়া-কালাম শিখিয়ে গেছেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊজবিকা মিনাল বারসি ওল জনূনে ওল জূযা-মি ওমিন সাইয়্যে-ইল আসক্বম। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট শ্বেতরোগ, উম্মাদনা, কুষ্ঠরোগ সহ যাবতীয় মহামারী থেকে আশ্রয় চাই। (আবু দাউদ; ১৫৫৪; নাসায়ী: ৫৪৯৩)

অন্য জায়গায় আরো বলেছেন‌, হযরত ওসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, কোন ব্যক্তি যখন প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা তিনবার করে এই দোয়াটি পাঠ করবে (আল্লাহর রহমতে) অনিষ্টতা ঐ ব্যক্তির কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

দোয়াটি হল: বিছ্মিল্লাহিল্লাজী লা-ইয়া ধুররুহু মা’য়াছমিহী শাইউন ফিল আরদি ওলা ফিছছামা-ই ওহুয়াছছামি উল আলীম। (ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৯)

পবিত্র কুরআনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এই বিপদ মুসিবত এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরীক্ষা করে থাকেন (সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭)।

আবার কখনও বিপদের মাধ্যমে গুনাহ ক্ষমা করে থাকেন (সূরা শুরা: ৩০)।

বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায়

হযরত হুজাইফা (রা.) সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে সালাত আদায় করতেন। (আবু দাউদ: ১৩১৯) সুতরাং বিপদ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যাক্তির উচিৎ নামাজে মনযোগী হওয়া।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, আর তা আল্লাহভীরু ব্যাক্তিরা ছাড়া অন্য সকলের কাছে নিশ্চিতভাবেই কঠিন। (সূরা বাকারাহ :৪৫)

পরিশেষে বলব, বরকতপূর্ণ এই মাসে আমাদের সবার উচিত যথাসাধ্য সিয়াম পালন করা, সেই সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা এবং যাবতীয় অন্যায় কাজ কর্ম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।

কারণ মানুষের মাঝে যখন অন্যায় অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন মহান আল্লাহ তায়ালা নানা ধরনের রোগ বালাই দিয়ে থাকেন, এমন সব রোগ বালাই যেগুলা আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় ছিল না।

রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়ে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি দেখা দেয় যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না। (ইবনু মাজাহ: ২/১৩৩২)

আর এগুলো দেয়ার কারণ হল যাতে মানুষ সৎ পথে ফিরে আসে। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে এবং স্থলে বিপদাপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তিনি মানুষের কর্মের শাস্তি দিয়ে থাকেন, যাতে তারা (মানুষ) ফিরে আসে। (সুরা রূম: আয়াত-৪১)

লেখক: শিক্ষার্থী, বিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষ (তাফসির বিভাগ) দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা।

ইমেইল: [email protected]

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস