করোনাভাইরাসের টিকা ও ওষুধ তৈরিতে বাংলাদেশেও গবেষণা প্রয়োজন
jugantor
করোনাভাইরাসের টিকা ও ওষুধ তৈরিতে বাংলাদেশেও গবেষণা প্রয়োজন

  ড. মো. মিজানুর রহমান  

২০ এপ্রিল ২০২০, ২১:১২:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনাভাইরাস

করোনাভাইরাস মহামারী (কোভিড-১৯) ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী ১ লাখ ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। আর ২.৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে কোটি কোটি মানুষ সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে এবং কয়েক মিলিয়ন এমনকি কোটি মানুষ মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এখনও কার্যকরী কোনো ওষুধ পাওয়া যায়নি যা সম্পূর্ণ নিরাময় করতে পারে, কার্যকর কোনো টিকা ও এখনও চোখে পড়েনি, শোনা যাচ্ছে বছরখানেক বা আরও কিছু সময় পরে হয়তোবা মানুষের ব্যবহার উপযোগী কার্যকরী টিকা আসতে পারে। কিন্তু রোগ নিরাময়ের জন্য সঠিক কোনো ওষুধ আমরা কবে পাব তা এখনও বলা মুশকিল।
করোনাভাইরসের বর্তমান সংকট কীভাবে শেষ হতে চলেছে তা আমরা সত্যিই জানি না। সুতরাং, সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এখন একদিকে যেমন আমাদের বর্তমান সংকট মোকাবেলা করতে হবে তেমনি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে- কিভাবে আগামীর দিনগুলোতে আমরা এর প্রতিকার করব।
আমাদের এই ভাইরাসটিকে ভলোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, প্রচুর গবেষণা করতে হবে, কারণ এটা একটা আরএনএ ভাইরাস হওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে এর মধ্যে নানারকম পরিবর্তন হতে থাকবে। এই পরিবর্তনের কোনো কোনো অংশ ভাইরাসটিকে আরও বেশি সংক্রামক এবং ক্ষতিকর করে তুলতে পারে। এই পরিবর্তনকে আমরা বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলি মিউটেশন।
মিউটেশনের কারণে এটি কখনও কখনও এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এবং লুকিয়ে থাকতে পারে অন্য কোনো জীবের দেহে এবং পরবর্তীকালে আবারও পরিবর্তিত রূপে মানবদেহে সংক্রমণ করতে পারে।
করোনাভাইরাস কিন্তু মোটেই নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই পরিবেশে আছে এবং বিশেষ করে বাঁদুড়জাতীয় প্রাণীর দেহে কয়েকশ ধরনের করোনাভাইরাস আছে।
নতুন এই ভাইরাসটিকে সারস-কোভি-২ নামে নামকরণ করা হয়েছে। ভাইরাসটি জিনগত তথ্য আরএনএ তে বহন করে যা প্রায় ৩০,০০০ বেস দৈর্ঘ্যের।
ভাইরাসের জিনগত তথ্য জানতে হলে পুরো জিনোমের ক্রম বা সিকোয়েন্স জানা খুব প্রয়োজন। একটি জীবের গঠন থেকে শুরু করে জীবদ্দশার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই তার জিনোমে সংরক্ষিত থাকে।
চীন জানুয়ারিতেই প্রথম দেশ হিসেবে সারস-কোভি-২ ভাইরাসটির পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করে এবং অনলাইনে প্রকাশ করে। এরই মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, স্পেন, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশ সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করেছে।
এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও তাদের দেশের আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে সংগ্রহ করা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করেছে।
অতি দ্রুত বাংলাদেশেও ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। শুধু একবার না, কিছুদিন পরপর ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন যেন ভাইরাসটির গতিবিধি, ভাইরাসটির প্রকৃতি এবং মিউটেশনগুলো পর্যালোচনা করা যায়।
করোনাভাইরাসের জিনোম পর্যালোচনা করার মাধ্যমে আমাদের দেশে এর গতি প্রকৃতি সহজেই অনুসরণ করা যাবে। করোনায় দেশের হটস্পটগুলো কিভাবে প্রভাব ফেলছে তা ও বুঝা যাবে। এই দেশের মানুষের দেহে এবং এই দেশের আবহাওয়ায় ভাইরাসটি কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনগুলোও জনস্বাস্থ্যে কিরূপ প্রভাব ফেলছে তা বিস্তারিত জানতে হলে জিনের মিউটেশন ট্রেন্ডগুলো বুঝতে হবে।
পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ দূরবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের ভাইরাসের তুলনামূলক পর্যালোচনা করা জরুরি যেন অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংক্রমণ বা একই সংক্রমণ নতুনভাবে আবর্তিত হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি।
সারা বিশ্বেই বিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এর কার্যকরী টিকা ও ওষুধ আবিষ্কারের জন্য। কেউ কেউ এরই মাঝে টিকার প্রাথমিক ট্রায়ালে আছেন। একটা টিকা তৈরি করে ঠিকমতো ব্যবহার উপযোগী করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। বর্তমান মহামারী বিবেচনায় ত্বরান্বিত গবেষণা ও ট্রায়ালের ফলে হয়তবা এক দেড় বছরের মধ্যেই আমরা একটা কার্যকর টিকা পেয়ে যাব। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে এটা একটা আরএনএ ভাইরাস যা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যার ফলে সব ধরনের টিকা এখানে প্রযোজ্য নয়।
সাধারণভাবে বর্তমানে মূলত চার ধরনের ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি হয় :
১. জীবন্ত কিন্তু দুর্বল টিকা, যার মধ্যে জীবিত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াগুলোর একটি দুর্বল সংস্করণ থাকে যা স্বাস্থ্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে কিন্তু মানবদেহে কোনো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে না।
২. নিষ্ক্রিয় টিকাগুলোতে রোগ প্রতিরোধী জীবাণুর নিষ্ক্রিয় সংস্করণটি ব্যবহার করা হয়।
৩. টক্সয়েড ভ্যাকসিনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ব্যাকটিরিয়ার পরিবর্তে ব্যাকটিরিয়াগুলোর কেবল সেই অংশের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে যা রোগের কারণ হয়। অন্য কথায়, প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়াটি পুরো জীবাণুর পরিবর্তে টক্সিনকে লক্ষ্য করে।
৪. সাব-ইউনিট, রিকম্বিন্যান্ট, পলিস্যাকারাইড এবং কনজুগেট ভ্যাকসিনগুলো জীবাণুর নির্দিষ্ট টুকরা ব্যবহার করে- যেমন এর প্রোটিন, চিনি বা ক্যাপসিড (জীবাণুর চারপাশে একটি আবরণ)। করোনাভাইরাস যেহেতু পরিবর্তনশীল ভাইরাস, সেহেতু নিষ্ক্রিয় বা সাব-ইউনিট ভ্যাকসিন বেশি প্রযোজ্য।
কিন্তু যেহেতু বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিবেশে করোনাভাইরাসটির বারবার মিউটেশন হচ্ছে সেহেতু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাইরাসের ধরন অন্য অঞ্চলের তুলনায় পুরোপুরি ভিন্ন দেশের বা অঞ্চলের জন্য টিকার প্রয়োজন।
আর বর্তমানের ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের টিকার মতোই প্রতিবছর এটাকে নতুন নতুন ভাইরাস স্ট্রেইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।
সারা বছর সারভেইলেন্সের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করে ভাইরাসের নতুন নতুন স্ট্রেইন বা প্রকারগুলো শনাক্ত করতে হবে এবং ডাটাবেজ তৈরি করে সব সময় আপডেট করতে হবে।
এই জন্য একটি নির্দিষ্ট গবেষণাগার স্থাপন করা প্রয়োজন যেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে এবং অতি সংবেদনশীল ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো ন্যূনতম জৈব নিরাপত্তা সম্পন্ন গবেষণাগার (বায়সেফটি লেভেল-৩) থাকবে। যেহেতু বিভিন্ন দেশের বিভিন্নরকম করোনাভাইরাসের আবির্ভাব হতে পারে, সেহেতু করোনাভাইরাসের জন্য কার্যকরী ওষুধ তৈরি করার জন্য ও আমাদের দেশে নিজস্ব গবেষণার প্রয়োজন আছে।
এমতাবস্থায় দেশের প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে করোনাভাইরাসের গবেষণা টিম গঠন করা দরকার।
কারণ পৃথিবীর অনেক দেশের থেকে আমাদের দেশের একটি বড় ফারাক হল এই দেশে অনেক ফার্মাসিউটিক্যালস থাকলেও নতুন নতুন ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কারের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা খুব একটা নেই। তাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় শুধু প্রকৃত গবেষকদের নিয়ে সর্বোচ্চ ২/৩টি গবেষণা দল গঠন করে নিয়মিত গবেষণার সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন।
এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেন ভিআইপি গবেষক বা নাম সর্বস্ব গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত না করে প্রকৃত গবেষকরা যেন কাজ করতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি হেকেপ বা বড় বড় অনুদানগুলো নিয়ে অনেকে ঠিকমতো কোনো গবেষণাই করেননি, আবার কেউ কেউ অত্যাধুনিক গবেষণাগার তৈরি করলেও দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদানমূলক গবেষণা করেছেন খুব কমই।
নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষকদের দায়িত্ব দিতে বলেছি এই কারণেই যে, উন্মুক্তভাবে সবাই যদি কাজ করে তাহলে এলকোহল বাষ্প বা পাতার রসের হাইড্রক্সিল গ্রুপের মতো ওষুধ খুঁজতে খুঁজতে কতকাল যে পার হয়ে যাবে তার কোনো হিসেব থাকবে না। সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করলে সফলতা আসবেই। এইরকম বিশেষ ধরনের গবেষণাগার এবং এই সব গবেষকদের মাধ্যমেই করোনাসহ অন্যান্য অতি সংবেদনশীল রোগজীবাণু নিয়ে দেশে গবেষণা সম্ভব। কারণ এই বাংলাদেশেই এরকম গবেষণায় সক্ষম অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন।
মহামারীর সময় এরকম সম্পূর্ণ নতুন বিশাল গবেষণাগার তৈরি করা অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়।
ভাইরাসের গবেষণার জন্য সবকিছুই এই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে আছে। শুধু নেই পর্যাপ্ত সুবিধাসহ অত্যাধুনিক বায়োসেফটি লেভেল-৩ গবেষণাগার।
সঠিক পরিকল্পনা নিলে যা ২/৩ মাসের মধ্যেই বানানো সম্ভব এই দুর্যোগের দিনেও। শুধু জীবিত ভাইরাস নিয়ে কাজ করা, টিকার কার্যকারিতা দেখা, ভাইরাসের কালচার করা, নতুন ডিজাইন করা বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্যই বায়োসেফটি লেভেল-৩ গবেষণাগার প্রয়োজন।
বাকি কাজগুলো বিদ্যমান অবকাঠামোয় করা সম্ভব। এখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মুলত ২টি কারণে প্রয়োজন:
১. নির্দিষ্ট গবেষণার জন্য ভালো বরাদ্দ ও কাজ করার স্বাধীনতা
২. এই দেশে গবেষণা করায় একটা বড় অসুবিধা হল, গবেষণার কাজে প্রয়োজনীয় উপকরণ বা রিএজেন্ট আমদানি করার সময় এয়ারপোর্ট বা সমুদ্রবন্দরে অতিদ্রুত ছাড়করণ হয় না।

পরিশেষে বলতে পারি আমাদের দেশের বর্তমান এই মহামারী মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একদিকে সঠিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করে আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া, বিদ্যমান সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্নিবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষের জন্য অন্নের ব্যবস্থা করা, অন্যদিকে গবেষণার পথ প্রসারিত করা যেন শিগগিরই টিকা ও ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হয় এবং রোগের সংক্রমণ সঠিকভাবে নির্ণয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।
লেখক: ড. মো. মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাভাইরাসের টিকা ও ওষুধ তৈরিতে বাংলাদেশেও গবেষণা প্রয়োজন

 ড. মো. মিজানুর রহমান 
২০ এপ্রিল ২০২০, ০৯:১২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
করোনাভাইরাস
ফাইল ছবি

করোনাভাইরাস মহামারী (কোভিড-১৯) ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী ১ লাখ ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। আর ২.৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে কোটি কোটি মানুষ সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে এবং কয়েক মিলিয়ন এমনকি কোটি মানুষ মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এখনও কার্যকরী কোনো ওষুধ পাওয়া যায়নি যা সম্পূর্ণ নিরাময় করতে পারে, কার্যকর কোনো টিকা ও এখনও চোখে পড়েনি, শোনা যাচ্ছে বছরখানেক বা আরও কিছু সময় পরে হয়তোবা মানুষের ব্যবহার উপযোগী কার্যকরী টিকা আসতে পারে। কিন্তু রোগ নিরাময়ের জন্য সঠিক কোনো ওষুধ আমরা কবে পাব তা এখনও বলা মুশকিল।
করোনাভাইরসের বর্তমান সংকট কীভাবে শেষ হতে চলেছে তা আমরা সত্যিই জানি না। সুতরাং, সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এখন একদিকে যেমন আমাদের বর্তমান সংকট মোকাবেলা করতে হবে তেমনি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে- কিভাবে আগামীর দিনগুলোতে আমরা এর প্রতিকার করব।
আমাদের এই ভাইরাসটিকে ভলোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, প্রচুর গবেষণা করতে হবে, কারণ এটা একটা আরএনএ ভাইরাস হওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে এর মধ্যে নানারকম পরিবর্তন হতে থাকবে। এই পরিবর্তনের কোনো কোনো অংশ ভাইরাসটিকে আরও বেশি সংক্রামক এবং ক্ষতিকর করে তুলতে পারে। এই পরিবর্তনকে আমরা বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলি মিউটেশন।
মিউটেশনের কারণে এটি কখনও কখনও এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এবং লুকিয়ে থাকতে পারে অন্য কোনো জীবের দেহে এবং পরবর্তীকালে আবারও পরিবর্তিত রূপে মানবদেহে সংক্রমণ করতে পারে।
করোনাভাইরাস কিন্তু মোটেই নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই পরিবেশে আছে এবং বিশেষ করে বাঁদুড়জাতীয় প্রাণীর দেহে কয়েকশ ধরনের করোনাভাইরাস আছে।
নতুন এই ভাইরাসটিকে সারস-কোভি-২ নামে নামকরণ করা হয়েছে। ভাইরাসটি জিনগত তথ্য আরএনএ তে বহন করে যা প্রায় ৩০,০০০ বেস দৈর্ঘ্যের।
ভাইরাসের জিনগত তথ্য জানতে হলে পুরো জিনোমের ক্রম বা সিকোয়েন্স জানা খুব প্রয়োজন। একটি জীবের গঠন থেকে শুরু করে জীবদ্দশার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই তার জিনোমে সংরক্ষিত থাকে।
চীন জানুয়ারিতেই প্রথম দেশ হিসেবে সারস-কোভি-২ ভাইরাসটির পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করে এবং অনলাইনে প্রকাশ করে। এরই মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, স্পেন, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশ সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করেছে।
এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও তাদের দেশের আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে সংগ্রহ করা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করেছে।
অতি দ্রুত বাংলাদেশেও ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। শুধু একবার না, কিছুদিন পরপর ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন যেন ভাইরাসটির গতিবিধি, ভাইরাসটির প্রকৃতি এবং মিউটেশনগুলো পর্যালোচনা করা যায়।
করোনাভাইরাসের জিনোম পর্যালোচনা করার মাধ্যমে আমাদের দেশে এর গতি প্রকৃতি সহজেই অনুসরণ করা যাবে। করোনায় দেশের হটস্পটগুলো কিভাবে প্রভাব ফেলছে তা ও বুঝা যাবে। এই দেশের মানুষের দেহে এবং এই দেশের আবহাওয়ায় ভাইরাসটি কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনগুলোও জনস্বাস্থ্যে কিরূপ প্রভাব ফেলছে তা বিস্তারিত জানতে হলে জিনের মিউটেশন ট্রেন্ডগুলো বুঝতে হবে।
পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ দূরবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের ভাইরাসের তুলনামূলক পর্যালোচনা করা জরুরি যেন অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংক্রমণ বা একই সংক্রমণ নতুনভাবে আবর্তিত হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি।
সারা বিশ্বেই বিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এর কার্যকরী টিকা ও ওষুধ আবিষ্কারের জন্য। কেউ কেউ এরই মাঝে টিকার প্রাথমিক ট্রায়ালে আছেন। একটা টিকা তৈরি করে ঠিকমতো ব্যবহার উপযোগী করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। বর্তমান মহামারী বিবেচনায় ত্বরান্বিত গবেষণা ও ট্রায়ালের ফলে হয়তবা এক দেড় বছরের মধ্যেই আমরা একটা কার্যকর টিকা পেয়ে যাব। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে এটা একটা আরএনএ ভাইরাস যা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যার ফলে সব ধরনের টিকা এখানে প্রযোজ্য নয়।
সাধারণভাবে বর্তমানে মূলত চার ধরনের ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি হয় :
১. জীবন্ত কিন্তু দুর্বল টিকা, যার মধ্যে জীবিত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াগুলোর একটি দুর্বল সংস্করণ থাকে যা স্বাস্থ্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে কিন্তু মানবদেহে কোনো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে না।
২. নিষ্ক্রিয় টিকাগুলোতে রোগ প্রতিরোধী জীবাণুর নিষ্ক্রিয় সংস্করণটি ব্যবহার করা হয়।
৩. টক্সয়েড ভ্যাকসিনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ব্যাকটিরিয়ার পরিবর্তে ব্যাকটিরিয়াগুলোর কেবল সেই অংশের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে যা রোগের কারণ হয়। অন্য কথায়, প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়াটি পুরো জীবাণুর পরিবর্তে টক্সিনকে লক্ষ্য করে।
৪. সাব-ইউনিট, রিকম্বিন্যান্ট, পলিস্যাকারাইড এবং কনজুগেট ভ্যাকসিনগুলো জীবাণুর নির্দিষ্ট টুকরা ব্যবহার করে- যেমন এর প্রোটিন, চিনি বা ক্যাপসিড (জীবাণুর চারপাশে একটি আবরণ)। করোনাভাইরাস যেহেতু পরিবর্তনশীল ভাইরাস, সেহেতু নিষ্ক্রিয় বা সাব-ইউনিট ভ্যাকসিন বেশি প্রযোজ্য।
কিন্তু যেহেতু বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিবেশে করোনাভাইরাসটির বারবার মিউটেশন হচ্ছে সেহেতু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাইরাসের ধরন অন্য অঞ্চলের তুলনায় পুরোপুরি ভিন্ন দেশের বা অঞ্চলের জন্য টিকার প্রয়োজন।
আর বর্তমানের ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের টিকার মতোই প্রতিবছর এটাকে নতুন নতুন ভাইরাস স্ট্রেইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।
সারা বছর সারভেইলেন্সের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করে ভাইরাসের নতুন নতুন স্ট্রেইন বা প্রকারগুলো শনাক্ত করতে হবে এবং ডাটাবেজ তৈরি করে সব সময় আপডেট করতে হবে।
এই জন্য একটি নির্দিষ্ট গবেষণাগার স্থাপন করা প্রয়োজন যেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে এবং অতি সংবেদনশীল ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো ন্যূনতম জৈব নিরাপত্তা সম্পন্ন গবেষণাগার (বায়সেফটি লেভেল-৩) থাকবে। যেহেতু বিভিন্ন দেশের বিভিন্নরকম করোনাভাইরাসের আবির্ভাব হতে পারে, সেহেতু করোনাভাইরাসের জন্য কার্যকরী ওষুধ তৈরি করার জন্য ও আমাদের দেশে নিজস্ব গবেষণার প্রয়োজন আছে।
এমতাবস্থায় দেশের প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে করোনাভাইরাসের গবেষণা টিম গঠন করা দরকার।
কারণ পৃথিবীর অনেক দেশের থেকে আমাদের দেশের একটি বড় ফারাক হল এই দেশে অনেক ফার্মাসিউটিক্যালস থাকলেও নতুন নতুন ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কারের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা খুব একটা নেই। তাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় শুধু প্রকৃত গবেষকদের নিয়ে সর্বোচ্চ ২/৩টি গবেষণা দল গঠন করে নিয়মিত গবেষণার সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন।
এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেন ভিআইপি গবেষক বা নাম সর্বস্ব গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত না করে প্রকৃত গবেষকরা যেন কাজ করতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি হেকেপ বা বড় বড় অনুদানগুলো নিয়ে অনেকে ঠিকমতো কোনো গবেষণাই করেননি, আবার কেউ কেউ অত্যাধুনিক গবেষণাগার তৈরি করলেও দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদানমূলক গবেষণা করেছেন খুব কমই।
নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষকদের দায়িত্ব দিতে বলেছি এই কারণেই যে, উন্মুক্তভাবে সবাই যদি কাজ করে তাহলে এলকোহল বাষ্প বা পাতার রসের হাইড্রক্সিল গ্রুপের মতো ওষুধ খুঁজতে খুঁজতে কতকাল যে পার হয়ে যাবে তার কোনো হিসেব থাকবে না। সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করলে সফলতা আসবেই। এইরকম বিশেষ ধরনের গবেষণাগার এবং এই সব গবেষকদের মাধ্যমেই করোনাসহ অন্যান্য অতি সংবেদনশীল রোগজীবাণু নিয়ে দেশে গবেষণা সম্ভব। কারণ এই বাংলাদেশেই এরকম গবেষণায় সক্ষম অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন।
মহামারীর সময় এরকম সম্পূর্ণ নতুন বিশাল গবেষণাগার তৈরি করা অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়।
ভাইরাসের গবেষণার জন্য সবকিছুই এই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে আছে। শুধু নেই পর্যাপ্ত সুবিধাসহ অত্যাধুনিক বায়োসেফটি লেভেল-৩ গবেষণাগার।
সঠিক পরিকল্পনা নিলে যা ২/৩ মাসের মধ্যেই বানানো সম্ভব এই দুর্যোগের দিনেও। শুধু জীবিত ভাইরাস নিয়ে কাজ করা, টিকার কার্যকারিতা দেখা, ভাইরাসের কালচার করা, নতুন ডিজাইন করা বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্যই বায়োসেফটি লেভেল-৩ গবেষণাগার প্রয়োজন।
বাকি কাজগুলো বিদ্যমান অবকাঠামোয় করা সম্ভব। এখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মুলত ২টি কারণে প্রয়োজন: 
১. নির্দিষ্ট গবেষণার জন্য ভালো বরাদ্দ ও কাজ করার স্বাধীনতা
২. এই দেশে গবেষণা করায় একটা বড় অসুবিধা হল, গবেষণার কাজে প্রয়োজনীয় উপকরণ বা রিএজেন্ট আমদানি করার সময় এয়ারপোর্ট বা সমুদ্রবন্দরে অতিদ্রুত ছাড়করণ হয় না। 

পরিশেষে বলতে পারি আমাদের দেশের বর্তমান এই মহামারী মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একদিকে সঠিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করে আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া, বিদ্যমান সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্নিবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষের জন্য অন্নের ব্যবস্থা করা, অন্যদিকে গবেষণার পথ প্রসারিত করা যেন শিগগিরই টিকা ও ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হয় এবং রোগের সংক্রমণ সঠিকভাবে নির্ণয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।
লেখক: ড. মো. মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

২৪ নভেম্বর, ২০২০