অদৃশ্য ভাইরাসটি মানবদেহে কীভাবে আক্রমণ করে

  ডা. মো. নাজমুল করিম মানিক ৩০ মে ২০২০, ২১:৩২:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

জীবনে এই প্রথম এরকম নিস্প্রাণ নিরানন্দ ঈদ পার হল। অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীকে থমকে দিয়েছে। দেশ-বিদেশের সব ধরনের সামাজিক রীতিনীতি বদলে দিয়েছে। এখন আমরা আত্মীয়-স্বজন পরিচিতজনকে নিমন্ত্রণ করি না। দেখলেই আঁতকে উঠি। মনে হয় অচ্ছুত কেউ আমাকে ছুয়ে ফেলেছে।

কি জানি এক জানা ভয় প্রতিমুহূর্তে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কবে এই অমানিশা দূর হবে তা অজানা। প্রতিমুহূর্তে হাত ধোয়ার তাগিদ। নাকে মুখে মাস্ক ছাড়া নির্ভয়ে বের হতে পারব না ঘরের বাইরে। আহা জীবন।

কিন্তু কেন, কিভাবে এটি শুরু হল। কেমন করে এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে কুড়ে কুড়ে খায়। চোখের সামনে দেখা মানুষটি কেমন করে টলে পড়ে মরে যায়।

করোনা আক্রান্ত চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের একজন সাংবাদিক তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সবার কাছে দোয়া চান। এমনকি তিনি যদি মরে যান তার সন্তানটিকে যেন সবাই দেখে রাখেন সেই আকুতি জানান। এর দুই ঘণ্টা পর সেই সাংবাদিক মারা গেলেন। দেশে ও দেশের বাইরে এখনো এমন ঘটনা দেখা যায়। একজন চিকিৎসক হিসেবেই নয়, মানুষ হিসেবেও আমার মনকে বিষণ্ন করে তোলে এসব করুণ মৃত্যৃ।

এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ করোনায় (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ। বাংলাদেশেও এ পর্যন্ত প্রায় তেতাল্লিশ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন প্রায় ৬০০ জন। প্রতিনিয়ত আক্রান্ত ও মৃত্যর হার বেড়েই চলেছে। এ এক অদৃশ্য শত্রু। যা দেখা যায় না। অনুভব করা যায় না। ভাবাও যায় না কখন কে টার্গেটে পড়েন। অথচ নীরবে প্রলয় ঘটিয়ে সারা বিশ্বের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এ মহামারীর শেষ কোথায়? এর পরিণতিই বা কি? একমাত্র ভবিতব্য জানে।

করোনা একটি ভাইরাস যা আরএনএ ভাইরাস হিসাবে পরিচিত। ষাটের দশকে এটি আবিস্কৃত হয়। এ ভাইরাসটি একটি আরএনএ প্রোটিন যার বহিরাবরণ দু’স্তর বিশিষ্ট চর্বির আবরণ দিয়ে আবৃত। বাইরের আবরণটি কাঁটাযুক্ত যা অনেকটা মুকুটের মতো। এ জন্য এ ভাইরাসটির নাম করোনা ভাইরাস হয়েছে।

ভাইরাসটি অতি ক্ষুদ্র। যা শুধু ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা যায়। আয়তন মাত্র ১১২ থেকে ১২০ মাইক্রন। অথচ কি বিস্ময়। প্রাণহীন এই অনুজীবটি মানব দেহে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কোষের সংস্পর্শে এসে ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী সক্রিয় ভাইরাসে পরিণত হয়। ভাইরাসটির ভিতরে আরএনএ তে (রাইবো নিউক্লিয়িক এসিড) কিছু জিন থাকে যা ক্ষণে ক্ষণে রূপান্তর ঘটিয়ে মারাত্মক প্রাণঘাতী রূপে বিবর্তিত হচ্ছে।

২০১৯ সালের শেষদিকে চীনের উহানে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। এ ভাইরাসটি আগের সব ভাইরাস থেকে আকৃতি ও প্রকৃতিতে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির, একেবারেই নতুন। এ জন্য এ ভাইরাসটির নাম দেয়া হয়েছে নভেল করোনা ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (কোভিড-১৯) নামকরণ করেছে। এটা আগের সার্স ও মার্স গোত্রের ভাইরাস সেজন্য একে সার্স কোভিড-২ও বলা হয়।

করোনাভাইরাস দ্রুত সংক্রামিত হলেও সার্স বা মার্সের মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী নয়। এ ভাইরাসটির একটি বৈশিষ্ট হল- এটা শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগে সংক্রমণ করতে পারে আবার শ্বাসযন্ত্রের নিম্নভাগ ফুসফুস ও এর এলভিওলাইকে সংক্রমিত করে। উপরিভাগে সংক্রমণ হলে হালকা কাশি, হাঁচি বা মৃদু জ্বর থাকতে পারে। আবার শ্বাসযন্ত্রের নিম্নভাগে সংক্রমণ হলে মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তখন জ্বর, কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ডায়রিয়া, শরীর ব্যথা থাকতে পারে। অন্যান্য অঙ্গ যেমন হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হতে পারে।

কিভাবে আক্রমণ করে: ভাইরাসটির মুকুটের মতো অংশে এস প্রোটিন থাকে, যা শ্বাসযন্ত্রের সে সব কোষকে আক্রান্ত করে যেখানে এসিই-২ (এনজিও টেনসিন কনভার্টিং এনজাইম ২) থাকবে। কাঁটাযুক্ত আবরণের এস প্রোটিন আক্রান্ত কোষের এসিই-২ এর সঙ্গে লেগে যায়। এরপর মুকুটের কাঁটাগুলো খসে যায়। ফলে ভাইরাসটির আরএনএ সক্রিয় হয়। দ্রুত বংশ বিস্তার করে এবং এসিই-২ আবরণযুক্ত নতুন নতুন কোষকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত কোষের এন্ডোসোমের ভিতর আস্তানা গড়ে। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত বংশ বিস্তার করতে থাকে।

তাই ফুসফুস ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ যেখানে এসিই-২ এনজাইম থাকে সেগুলোকেও আক্রান্ত করে। ফুসফুসের এলভিওলাই ধংস করে। খসে পড়া কাঁটাগুলোও ধংসাবশেষ ও রক্ত দিয়ে ফুসফুসের ফাঁপা কোষগুলো পূর্ণ হয়ে অকার্যকর হতে থাকে। ফলে শ্বাসকষ্ট হতে থাকে, কাশি হতে থাকে, রক্ত জমাট বাঁধে। অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। এ সময় আইসিইউর সহায়তা প্রয়োজন হয় নতুবা আক্রান্ত মানুষ মারা যায়। ফুসফুস ছাড়া হৃদযন্ত্রও আক্রান্ত হতে পারে।

ফুসফুসের কোষ আক্রান্ত হওয়ার পর মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে থাকে, ফলে এন্টিবডি তৈরি হয়। এটাকে ইমিউন রেসপন্স বা প্রতিরোধী সক্রিয়তা বলে। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমিউন রেসপন্সটা অস্বাভাবিক। মানব শরীরে তৈরি এন্টিবডি করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে। কিন্তু নির্দিষ্ট ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে না। ফলে অস্বাভাবিকভাবে এন্টিবডিগুলো দ্বিগবিদিক ছোটাছুটি করে অস্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রক্তনালির দেয়ালের ছিদ্রগুলো প্রসারিত হয় রক্তরস রক্তনালি থেকে বের হয়ে আসে। এই অস্বাভাবিক ইমিউন সক্রিয়তাকে সাইটোকাইন স্টর্ম বলে। এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার ফলে জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য উপসর্গগুলো তীব্র হয়।

যেভাবে এলো নভেল করোনা: ২০১৯ এর শেষ দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে বন্যপ্রানীর বাজারে সম্ভবত বাদুর থেকে মানব শরীরে এই ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়। মতান্তরে ভাইরোলজি ইন্সটিটিউট থেকে দুর্ঘটনাক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাসটি মানব শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। এরপর বিদ্যুতগতিতে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে অদৃশ্য ভাইরাসটি। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। আক্রান্ত মানুষ পরিণত হচ্ছে অচ্ছুত প্রাণিতে। যখনই কেউ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে তখন থেকে আক্রান্ত মানুষটি পরিবার, সমাজ- সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তবে ভয়ের কথা যখন বেশিরভাগ অাক্রান্ত মানুষ উপসর্গহীন থাকছেন। এরা নিজের অজান্তেই অন্যকে আক্রান্ত করছেন।

কিভাবে ছড়ায়: যেভাবেই মানব শরীরে এসে থাকুক এখন একমাত্র মানুষ থেকেই রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কফ হতে অন্য মানুষের নাক, মুখ ও চোখ দিয়ে সংক্রমিত হয়। সার্স কোভ-২ বাতাসে ৩ (তিন) ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে। এছাড়াও প্লাস্টিকের উপর ৭২ ঘণ্টা, স্টিলের উপর ৪৮ ঘণ্টা, কার্ডবোডের উপর ২৪ ঘণ্টা, তামার উপর ৪ ঘণ্টা থাকতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়: স্বাস্থ্য সচেতনতাই পারে রোগটি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে। যেহেতু নাক, মুখ এবং চোখ দিয়ে ভাইরাসটি মানব দেহে প্রবেশ করে, এ জন্য নাকে মুখে মাস্ক, হাত বারবার সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে পরিস্কার করা, হাত না ধুয়ে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ না করলে এই রোগটির সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। রোগটি প্রতিরোধে সারা বিশ্ব সামাজিক দূরত্ব এবং লকডাউনকে মূল ভরসা হিসাবে গ্রহণ করেছে। হাত না মেলানো, উন্মুক্ত স্থানে হাঁচি, কাশি বা কফ থুথু না ফেলা। কোলাকুলি না করা, ভিড় বা জনসমগম এড়িয়ে চলা- এসবই করোনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে নিস্ফল প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব তেমন সফল হ নি। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র দেশে এর চেয়ে বেশি সম্ভব নয়। তারপরও বাংলাদেশে তূলনামূলকভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক কম।

চিকিৎসা: করোনা রোগের নির্দিষ্ট্ কোনো চিকিৎসা অদ্যাবধি আবিষ্কার হয়নি। তবে এজিথ্রোমাইসিন ও হাইড্রক্সিক্লোরকুইন চিকিৎসা অনেকটাই কার্যকর। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ক্লোরকুইন অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া ইভারমেকোটিন ও ডক্সিসাইক্লিন দিয়ে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া গেছে। কিছু এন্টিভাইরাল র‌্যামডেসিভির, লোপিনাভির, রিটনাভির প্রভৃতি ওষধও কোভিড-১৯ চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। যদিও ফল আশানুরূপ নয়। তবে যতদিন কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাক্সিন তৈরি না হচ্ছে, ততদিন এই অদৃশ্য শত্রুর আতঙ্ক নিয়েই আমাদের পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে।

যত বেশি রোগ নির্ণয় হবে তত রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, মাস্ক ও স্যানিটাইজার নিয়ে আরও কতদিন আমাদের চলতে হবে একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই তা বলতে পারে। সবাই সচেতন হোন। সুস্থ থাকুন, সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। এ মহামারী নির্মূল হোক- সৃষ্টিকর্তার কাছে এ প্রত্যাশা সবার।

লেখক: ডা. মো. নাজমুল করিম মানিক
অতিরিক্ত পরিচালক (হাসপাতাল)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত