করোনা প্রতিরোধে লেবু

  শওকত আরা সাঈদা (লোপা) ০২ জুন ২০২০, ১৭:৪১:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ছবি

সারা বিশ্বে এখন কঠিন সময় চলছে। করোনা মহামারীর এ দুর্যোগে মানুষ দিশেহারা। এ রোগটির এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তাই এ মুহূর্তে আমরা যে অবস্থায় আছি, সেভাবেই সচেতন থেকে চলতে হবে। পাশাপাশি সুস্থও থাকতে হবে।

সুস্থ থাকার জন্য আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে কোনোভাবেই বের হওয়া উচিত নয়।

অনেকেই এ সময় বাড়তি সতর্কতা হিসেবে বিভিন্ন ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই; যা কোনোভাবেই ঠিক নয়।

এ সময় আমাদের সচেতনতার পাশাপাশি নজর দিতে হবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে। কিন্তু এ প্রতিরোধ ক্ষমতা এক বা দুইদিনে তৈরি হয় না। এজন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস খুবই প্রয়োজন।

প্রতিদিনের খাবার তালিকায় ভিটামিন ‘সি’ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। এজন্য খুব বেশি দামি খাবার খেতে হবে না। আমাদের মৌসুমি রঙিন ফল ও শাকসবজি থেকেই তা পাওয়া সম্ভব।

করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বা আক্রান্ত হয়ে গেলেও সেই রোগের উপশমে ভিটামিন ‘সি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনেক দেশেই করোনা আক্রান্ত রোগীকে বিভিন্ন ডোজে ভিটামিন ‘সি’ দিয়ে অনেক উপকার পাওয়া গেছে।

আর আমাদের দেশে এ ভিটামিন ‘সি’-এর সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস হচ্ছে লেবু। লেবু খুব সহজেই এবং সব মৌসুমেই পাওয়া যায়। তাই প্রতিদিন খাবারের তালিকায় অবশ্যই লেবু রাখবেন। প্রতিদিন মাঝারি আকারের ২টি লেবু প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনো ব্যক্তি খেতে পারেন।

এটি নিয়মিত খেলে ভিটামিন ‘সি’ দৈনিক চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। লেবুর অনেক জাত রয়েছে। যেমনÑ কাগজী লেবু, এলাচি লেবু, শরবতী লেবু, জামির লেবু ইত্যাদি। লেবুর গুণাগুণের সঙ্গে এর খোসাও প্রচুর উপকারী উপাদান। লেবুর রসের চেয়ে ৫-১০ গুণ বেশি ভিটামিন আছে লেবুর খোসায়ও।

পুষ্টি মূল্য

লেবু ভিটামিন বি সি কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন, রিবোফ্লোবিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, আয়রন, পটাশিয়াম এবং ফসফরাস সমৃদ্ধ । এতে কোনো সম্পৃক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল নেই। এটি শরীরের পুষ্টি ঘাটতি পূরণ করতে সাহায্য করে।

১০০ গ্রাম লেবুর রসের পুষ্টি মূল্যশক্তি ৫৬ কিলোক্যালরি, কার্বোহাইড্রেট ১০.২ গ্রাম, প্রোটিন ০.৮ গ্রাম, খাদ্যআঁশ ১.৩ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৬৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪৫.৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ৮ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন ই ০.৮০ মিলিগ্রাম, ফোলেট ১১ মাইক্রোগ্রাম, নায়াসিন ১৫ মাইক্রোগ্রাম, প্যানথোটিক এসিড ০.১৯০ মাইক্রোগ্রাম, পাইরিডক্সিন ০.০৪০ মাইক্রো গ্রাম, আয়রন ০.৩ মিলিগ্রাম, জিংক ০.০৭ মিলিগ্রাম।

এবার এ লেবুর উপকারিতাগুলো জেনে নেই

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

লেবুর উচ্চ ভিটামিন যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে যে কোনো ভাইরাসজনিত ইনফেকশন যেমনÑ ঠাণ্ডা, সর্দি, জ্বর দমনে লেবু খুব কার্যকরী, ইউরিন ইনফেকশন কমাতেও লেবুর গুরুত্ব রয়েছে।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা আদা মিশ্রিত লেবু পানি খেয়ে অনেক উপকার পেয়েছেন। ব্যাকটেরিয়াল এবং ফাঙ্গাল ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমায় লেবু। এটি শরীরকে বিভিন্ন রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে, এছাড়া মুখের অরুচি দূর করতেও সাহায্য করে।
ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

লেবুতে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের সমারোহ যা শরীরকে বিভিন্ন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। নিয়মিত লেবু খাদ্য তালিকায় রেখে আমরা ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি।

এছাড়া লেবুর খোসায় উপস্থিত স্যালভেসট্রল কিউ ৪০ ও লিমোনেন নামে দুটি যৌগ ক্যান্সার সেলের ধ্বংসে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই নিয়মিত লেবুর খোসা খেলে শরীরের ভেতরে ক্যান্সার সেলের জš§ নেয়া সম্ভাবনা কমবে।

হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে

যারা খাবারে যথেষ্ট পটাশিয়াম গ্রহণ করে না, তাদের নানা রকম হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। লেবুর রসে যথেষ্ট পরিমাণ পটাশিয়াম রয়েছে যা হৃদরোগ কমাতে সাহায্য করে।

এতে থাকা ভিটামিন দেহের হরমোন সক্রিয় রাখে ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া লেবুর খোসায় থাকা পলিফেনল দেহের খারাপ কোলেস্টরলের মাত্রা কমায়। অন্যদিকে লেবুর পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

তাই তো যাদের কোলেস্টেরল, উচ্চরক্তচাপ এবং হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে তাদের খাবার তালিকায় খোসাসহ লেবু রাখতে হবে।

পাকস্থলিকে সুস্থতায়

যারা পেটের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য লেবু বেশ ভালো কাজ করে। ডায়রিয়া, বদহজম, কোষ্টকাঠিন্যের অস্বস্তি কমাতে, শুরুতে এক গ্লাস লেবু+লবণ পানি খেতে পারেন। লেবুর সঙ্গে এক চা চামচ মধুও দেয়া যেতে পারে।

ফুসফুসের সুস্থতায়

লেবু ফুসফুসের যত্ন নেয় এবং শরীর থেকে বিষাক্তদ্রব্য বের করে দেয়, লেবু শরীরের চর্বি এবং লিপিডের মাত্রা কম রাখে। এছাড়া লিভারের ক্ষতিকর টক্সিক উপাদান দূর করতে সাহায্য করে।
ওজন কমাতে সাহায্য করে

নিয়মিত পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে খেলে ধীরে ধীরে ওজন কমাতে সাহায্য করবে। এছাড়া লেবুর খোসায় ‘পেকটিন’ নামক একটি উপাদান প্রচুর মাত্রায় থাকায় ওজন কমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

কারণ এ উপাদানটি শরীরে উপস্থিত অতিরিক্ত চর্বিকে ঝরিয়ে ফেলতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। সকালে খালি পেটে লেবু পানি সঙ্গে সামান্য লবণ আপনার চর্বি কমিয়ে দেবে শরীরের ক্ষতিকর বিষাক্তদ্রব্য বের করে আকর্ষণীয় করে তুলবে। শরীরের মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে।

হাড় মজবুত করে

প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন সি এবং ক্যালসিয়াম থাকায় লেবুর খোসা খেলে ধীরে ধীরে হাড়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ইনফ্লেমেটরি পলিআর্থ্রাইটিস, অস্টিওপরোসিস এবং রিউমাটয়েড আথ্রাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমে।
মুখ গহ্বরে রোগ ও দুর্গন্ধ কমায়

মাড়ির ব্যথা, দাঁতের সমস্যা মুখের দুর্গন্ধ দূর করে লেবুর পানি। এছাড়া ভিটামিন সি’র ঘাটতি হলে মুখ গহ্বর সংক্রান্ত বিভিন্ন রোগ হতে পারে তাই তো নিয়মিত লেবুর খোসা খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

কারণ এতে থাকা ভিটামিন সি এবং সাইট্রিক অ্যাসিড মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, ইনফেকশনসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ কমাতে সাহায্য করে।

ত্বক ও নখের যত্নে লেবু

প্রাকৃতিক পরিষ্কার হিসেবে লেবুর জুড়ি নেই, এটি ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে, মধুর সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে ব্যবহার করলে ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। এটি ত্বকের সংকোচন সৃষ্টিকারী পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ রাখে।

চামড়ার অতিরিক্ত তেল অপসারণ করে। লেবুর রস প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দূর করে। ব্রণ সারিয়ে তোলে, ত্বকের রং উজ্জ্বল করে। লেবু ব্যবহারে ত্বকে বয়সের ছাপ ও বলিরেখা কমায়।

একটুকরা লেবু দিয়ে নখ পলিশ করলে নখ তার বিবর্ণতা থেকে উজ্জ্বল রং ফিরে পায়। লেবুর পানিতে পা, হাত, ডুবিয়ে রাখলেও উপকার পাওয়া যায়।

মানসিক চাপ কমায়

লেবুর খোসায় থাকা সাইট্রাস বায়ো-ফ্লেভোনয়েড শরীরের ভেতরে যাওয়ার পর অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমতে শুরু করে। ফলে মন, মস্তিষ্ক ও শরীর একদম চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

তো যখনই দেখবেন শরীর আর চলছে না, তখন অল্প করে লেবু পানি ও কিছুটা খোসা খেলে উপকার পাবেন দ্রুত।

গর্ভাবস্থার উপকারী

গর্ভবতী নারীদের সুস্থতায় লেবু বেশ উপকারী। এটা শুধু গর্ভবতীর নারীর শরীরই ভালো রাখে না বরং গর্ভের শিশুর অনেক বেশি উপকার করে। লেবুর ভিটামিন সি ও পটাশিয়াম শিশুর হাড়, মস্তিষ্ক ও দেহের কোষ গঠনে সহায়তা করে।

তবে সবার এরকম থাকে না, তাই যাদের অ্যাসিডিটি না হয় তারা অবশ্যই খাবার তালিকায় নিয়মিত লেবু রাখবেন।

লেখক: শওকত আরা সাঈদা (লোপা), ডায়েটিশিয়ান অ্যান্ড ইনচার্জ, পারসোনা হেল্থ

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত