করোনায় সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অসহায়ত্ব

  সাগর চৌধুরী, সৌদি আরব ০৩ জুন ২০২০, ১১:৩৬:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

সৌদি প্রবাসী ডা. বতুল রহমান

সৌদি আরবে করোনা আক্রান্ত হয়ে বেশিরভাগ প্রবাসী মৃত্যুবরণ করছেন। কিন্তু কেন? বাংলাদেশি এক চিকিৎসকের লেখায় বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।


সৌদি প্রবাসী ডা. বতুল রহমান বলেছেন, ফোনটা ধরতেই ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে এক প্রবাসী বলে উঠলেন– ডাক্তার আপা বলছেন? হ্যাঁ, বলছি।


ফোনের ওপার থেকে যিনি বলছিলেন, তার কণ্ঠ থেকে কথা বের হচ্ছে না। বুঝলাম শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।


আমি বললাম বলেন, আপনার জন্য কী করতে পারি? তিনি বললেন, আপা আমার করোনা পজিটিভ, বলেই কাঁদতে শুরু করলেন।


আচ্ছা, কাঁদছেন কেন? পজিটিভ হয়েছে তো কী হয়েছে? ভালো হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। কদিন একটু কষ্ট হবে, তার পর সুস্থ হয়ে যাবেন।


করোনায় আক্রান্ত প্রবাসী তখনও কেঁদেই যাচ্ছেন, কথা বলতে পারছেন না। মিনহাজ নামে ওই বাংলাদেশি গত সোমবার রাতে রিপোর্ট পেয়েছেন। রুমমেটরা সবাই তাকে চলে যেতে বলেছেন। এখন তিনি কোথায় যাবেন?


যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তিনি ভাবতেই পারছেন না, পাঁচ বছর ধরে যাদের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেছে, তারাই আজ এত রূঢ় ব্যবহার করছেন!


রুম থেকে বের করে দিচ্ছেন, অনেকক্ষণ কথা বলে তাকে আশ্বস্ত করলাম।


আরেক রোগী এমদাদের দুদিন ধরে জ্বর ও কাশি। তার কোম্পানির লোক জানতে পেরেই রিয়াদ শহর থেকে দূরে একটা জায়গায় আসোলেশনের নামে একটি রুমে রেখে এসেছে। যেখানে খাবার বা পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। এখন কী খাবেন? আর চিকিৎসারই বা কী ব্যবস্থা? কোনো উত্তর নেই। ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে বেচারা।


আবার এমনও কল পেয়েছি- এক রুমে দুজন একইসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অন্যরা ভয়ে তাদের একা ফেলে রুম থেকে চলে গেছেন।


হট নাম্বারে কল করে দুদিন পরও অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে পুলিশকে কল দিয়ে একজনকে হাসপাতালে নিতে পারলেও ভর্তি করার পাঁচ ঘণ্টা পরেই মারা গেলেন। আরেকজন পরের দিন সকালে মারা গেলেন রুমের মধ্যেই, বিনাচিকিৎসায়। কতটা কষ্ট সহ্য করে মারা গেলেন তিনি, কেউ তা জানতেও পারল না।


আ. খালেক নামে এক প্রবাসী কাজে যাওয়ার পথে হঠাৎ করেই তার কাশি বেড়ে যায়। ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিল না। একপর্যায়ে রাস্তার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি।


আসলাম নামে আরেক প্রবাসীর করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। তাকে একটা ভিলায় কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে, যেখানে আরও কয়েকজন করোনা রোগী আছেন।


শুরুতে কোনোই সমস্যা ছিল না। সাত দিন পর তার জ্বর ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যেখানে তাকে রাখা হয়েছে, সেখানে দারোয়ান ছাড়া আর কেউ নেই। খাবার ওখান থেকে দিলেও ডাক্তার ও ওষুধের কোনো ব্যবস্থা নেই। তার শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলেছে।


সৌদি আরবে কাছে থেকে দেখা– এমন মিনহাজ, এমদাদ ও আ. খালেকের মতো অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী বিনাচিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন।


রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এমন করুণ পরিণতির কথা তাদের পরিবারের সদস্যরা জানতে পারছেন না। বিদেশের মাটিতে নিঃস্ব, অসহায় জীবনযাপন করছেন অনেকেই, কাজ না থাকায় বেতন পাচ্ছেন না। এদের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। নেই থাকা-খাওয়ার তেমন বন্দোবস্ত।


অনেক চেষ্টা করেও করোনা টেস্ট করাতে পারছেন না। শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীরা হাসপাতালেও যেতে পারছেন না। প্রাইভেটকারে হাঁচি-কাশি রোগীকে নিচ্ছে না।


হাসপাতালে গেলেও ভর্তি হতে পারছেন না। বিনাচিকিৎসায় অনেকেই মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার আরেকটা কারণ– এদের পুষ্টি ও ইমিউনিটি খুবই কম, আয় করে, না খেয়ে তার প্রায় পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দেন তারা।


অথচ এই রোগীদের সঙ্গে একটু মিষ্টি করে কথা বললে, একটু আশার বাণী শোনালে, একটু সাহস জোগালে তারা অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।


সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে কিছু ডাক্তার এসব রোগীর চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছেন গত দুমাস ধরে। তাতে এরা জানতে পারছেন কী করতে হবে, কী মেনে চলতে হবে।


অনেকেই এখন প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারছেন। সৌদি প্রবাসী ডা. বতুল রহমান বলেন, এসব রোগীর কাছাকাছি আসার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।


এদের সঙ্গে কথা বলে মনের সাহস বাড়িয়ে দিতে, এই ভীতিকর পরিবেশে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ আশার বাণী শোনালে যে কতটা সাহায্য হয়, তা রোগীদের পাশে না এলে কেউ অনুধাবন করতে পারবেন না।


এরা এখন বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে উঠছেন। সুস্থতার খবর পেলে মনটা এক স্বর্গীয় সুখে ভরে ওঠে। হয়তো আরও আগে থেকে এই মিশন চালু করলে ভালো হতো।


বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতসহ দায়িত্বশীলরা এদের সহায়তায় এখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিরূপ পরিস্থিতি আর সীমিত সুযোগের মাঝেও দূতাবাসের এই প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে।


মহামারী করোনা আজ বিশ্বব্যাপী এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। সারা পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ আজ করোনার কাছে অসহায়। এ চিকিৎসকের মতে, এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত