অনলাইনে ‘মিশ্র মডেল’ ও মুখোমুখি শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে
jugantor
সাক্ষাৎকারে আইইউবি ভিসি মিলান পাগন
অনলাইনে ‘মিশ্র মডেল’ ও মুখোমুখি শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট  

২১ জুন ২০২০, ১৬:৫৭:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

অধ্যাপক ড. মিলান পাগন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের(আইইউবি) উপাচার্য। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন চার বছর– প্রথমে আল গুরেইর বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে জায়েদ বিশ্ববিদ্যলয়ে। ব্যবসায় প্রশাসনে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিয়েটভেলের আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অধ্যাপক ড. মিলান পাগন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের(আইইউবি) উপাচার্য। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন চার বছর– প্রথমে আল গুরেইর বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে জায়েদ বিশ্ববিদ্যলয়ে। ব্যবসায় প্রশাসনে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিয়েটভেলের আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপে শিক্ষা উপকরণ ও পদ্ধতিতে প্রভাব নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় ছিলেন তিনি। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আতাউর রহমান রাইহান।

যুগান্তর: বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এখন কোভিড-১৯ মহামারীর নজিরবিহীন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের সহায়তায় আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মিলান পাগন: অবশ্যই, প্রথমে আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে– বাংলাদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছে, এর জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন কিংবা ডিসটান্স লার্নিংয়ের বিষয়টিকে অনুমোদন করা হয়নি। যে কারণে আমরা এতে আগে যুক্ত হতে পারিনি। আমাদের সঠিক অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও ছিল না।

পরিস্থিতির কারণে আমাদের দ্রুত প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন(ইউজিসি) অনলাইনে শিক্ষায় আমাদের উৎসাহিত করেছে। কিন্তু আইইউবিতে আমরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা এমন এক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চেয়েছি, যাতে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত না হন। যাতে অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার আগে আমাদের ফ্যাকাল্টি ও শিক্ষার্থীরা সঠিক অভিজ্ঞতা নিতে পারেন।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত হয়ে পড়েছে। আমরা ঠিক তাদের মতো করে এগোতে চাইনি। তারা মনে করেন, অনলাইন শিক্ষা হচ্ছে উপকরণগুলো ই-মেইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া। কিন্তু আমরা সেভাবে না গিয়ে কোনো রকম ঘাটতি না রেখে পূর্ণ্যোদ্যমে অনলাইন শিক্ষার কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি।

যা আমরা চলতি বছরের স্প্রিং সেমিস্টারেই চালু করতে চাচ্ছি না। ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে এই সেমিস্টার আমরা এর আগের কোর্সগুলোর মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই শেষ করতে চাচ্ছি। কাজেই কোনো ধরনের ঝক্কিতে না গিয়ে কিংবা অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতিতে না জড়িয়ে শিক্ষার্থীরা এবারের সেমিস্টার শেষ করতে পারবেন।

এতে আগামী সেমিস্টার শুরু হওয়ার আগে তারা মোটামুটি মাসখানেক সময় পাচ্ছেন। আর এই সময়টায় আমরা ফ্যাকাল্টি ও শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করতে পারবো। একই সময়ে মাইক্রোসফট, গুগল মিট, গুগল ক্লাসরুমের সহায়তায় আমরা আইইউবির নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবো, আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে এগুলোকে সমন্বয় করে নেব, যাতে শিক্ষার্থীরা এতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। এভাবে বিস্তৃত পরিসরে শিক্ষার্থীদের শেখার ব্যবস্থার আয়োজন করতে যাচ্ছি।

আমরা সপ্তাহখানেকের জন্য ‘মক ট্রায়াল’ বা পরীক্ষামূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করেছি, যাতে ফ্যাকাল্টি এ ধরনের ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, শিক্ষার্থীরাও এখান থেকে অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ পাবেন।

আমি আনন্দের সঙ্গেই বলতে চাচ্ছি যে, এই ধরনের অভিজ্ঞতা খুবই ইতিবাচক। প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর, যেভাবে সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে, তাতে দুপক্ষই খুশি। এছাড়া আগামী সেমিস্টারে যেসব সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেগুলো মিটিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়কেও সুযোগ করে দিচ্ছে।

যুগান্তর: এমন অবস্থার সঙ্গে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিনা?

মিলান পাগন: পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন প্রশ্নের জবাব দেয়া খুবই কঠিন হবে। এমন সংকটে কেউ মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে, তা বলা বেশ কঠিন।

প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে এই অনলাইন শিক্ষা অপরিচিত, তাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছে। অনিচ্ছাও আছে। যদি সামাজিকমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা ফলো করেন, তবে সেখানে অনলাইন শিক্ষার বিরুদ্ধে একটা চাপ দেখতে পাবেন।

কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যদি আপনি সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারেন, তবে তা এ ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত করতে সহায়ক হবে। আমাদের শিক্ষকরা তাদের বিভাগীয় প্রধান ও ডিনদের কাছে যে রিপোর্ট দিয়েছেন, তাতে খুবই ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলা আছে। কাজেই এটা সুন্দরভাবেই করা সম্ভব।

যুগান্তর: সেক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কিনা?

মিলান পাগন: হ্যাঁ, তবে এখানে একটা সীমাবদ্ধতা আছে। অনলাইনে তাদের ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো পরিপূর্ণভাবে করা সম্ভব না। কিছুটা ভার্চ্যুয়াল উপায়, কিছুটা রেকর্ড দিয়ে পরীক্ষামূলক চালানো যেতে পারে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে তা করা সম্ভব না।

আমি বলতে চাই, উন্নত বিশ্ব অনেক আগেই অনলাইন শিক্ষার বিষয়ে প্রচুর উৎসাহ ও প্রচার চালিয়েছে। পাশাপাশি তারা এ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোও ধরতে পেরেছে। কাজেই তারা ‘ব্লেন্ডেড মডেল’ বা মিশ্র মডেলে তার সুরাহা করেছে। অর্থাৎ শিক্ষার বড় অংশটি অনলাইনে হবে, কিন্তু সেখানে মুখোমুখি হওয়ার উপায়ও থাকবে। এটা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আগে-পরে কী ঘটছে কিংবা যে অবস্থার ভেতর দিয়েই তারা আসুক না কেন, যখন তারা চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুতি নেবে, তখন তাদের ‘সরাসরি মুখোমুখি’ হওয়ার পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবেই। চাকরি পেতে হলে তাদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হতে হবে। তখন সবকিছু অনলাইনে হবে; এমনটা না। কাজেই শিক্ষার্থীদের চারটি বছর অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শরীরিকভাবে মুখোমুখি হতে হয়; এমন পরিস্থিতি পাঠিয়ে সব কিছু ঠিকঠাকমতো কাজ করবে এমনটা প্রত্যাশা করতে পারি না।

আর এ কারণেই আমাদের একটি ‘ব্লেন্ড লার্নিং’ বা মিশ্র শেখার কৌশল বের করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে আসছে সেমিস্টারে সবকিছু অনলাইনে শিক্ষা দেয়া হবে।

যুগান্তর: বাড়ি থেকে শিক্ষার্থীরা গোটা পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করবেন?

মিলান পাগন: এখানে বিপুল প্রতিকূলতা রয়েছে। তবে এতে বিশ্ববিদ্যালয়েরও যেমন অনেক কিছু করার আছে, শিক্ষার্থীদের সহায়তায় সরকারি, বেরসকারি এমনকি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও ভূমিকা রাখতে পারে। উদহারণ দিয়ে বলা চলে, আমরা প্রস্তুতি নিয়ে অনলাইন ক্লাস নিতে পারি, সবকিছুর আয়োজনই সম্পন্ন করতে পারি, কিন্তু আমাদের কোনো শিক্ষার্থী যদি সুদূর খাগড়াছড়িতে থাকেন, সেখানে যদি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ না থাকে, তারা যদি ইন্টারনেট সংযোগ না পায়, তাহলে কীভাবে তারা ক্লাস থেকে লাভবান হবে?

কাজেই শিক্ষার্থীদের অনলাইন সংযোগ ও তা থেকে সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবকাঠামোগত ভূমিকা পুরোপুরি পালন করতে হবে।

যখন দেখছেন, মোবাইল যোগাযোগের মূল্য সরকার বাড়িয়ে দিলেও তা শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টাকে খুব একটা খর্ব করতে পারে না। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব শিক্ষার্থী স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাসে যোগ দিচ্ছেন, এতে একটি ক্লাসের জন্য তাদের মাত্র ৫০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

যুগান্তর: ‘নিউ নরমাল’ দুনিয়ায় সফল হওয়ার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার?

মিলান পাগান: এ জন্য সবার সমন্বিত চেষ্টা দরকার। সরাসরি কিংবা মুখোমুখি শিক্ষার চেয়ে অনলাইনের লেখাপড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও এতে কিছু উপকরণ একই রকম থাকলেও আরও বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। কাজেই ফ্যাকাল্টির মানসিকতাকেও এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। এতে হোয়াইট বোর্ড, মার্কার ও পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মতো পুরনো অভ্যাসে অভ্যস্ত ফ্যাকাল্টির সামনে চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি আরও উন্নত করতে হবে। সেই পর্যায়ে যেতে ফ্যাকাল্টিকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করছি।

একই সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্যও চ্যালেঞ্জ আছে। আজকের বিশ্বে শিক্ষা ও জানার পদ্ধতির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ঐতিহ্যগত শিক্ষার উপকরণ থেকে আমরা সরে এসেছি। শিক্ষার্থীরা এখন স্ব-শিক্ষার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানুষ এখন আজীবন শিক্ষার্থী হয়ে উঠছে। কাজেই নতুন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে তারা এমন কিছু দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে, যেটা আগে কখনো ছিল না।

যুগান্তর: শিক্ষার্থীদের সহায়তায় আইইউবি কি পদক্ষেপ নিয়েছে?

মিলান পাগান: এতক্ষণ পর্যন্ত আমি যেসব আলাপ করলাম, তার সবাই অনলাইন শিক্ষার অফার নিয়ে। এখানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিক্ষার্থীরা কি তা বহন করতে পারবে? আমরা জানি যে পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশেই না, সারা বিশ্বে, বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, বহু মানুষ তাদের ব্যবসা চালাতে পারেননি। মানুষের আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচও সস্তা না। শিক্ষার্থীদের মূল্য দিতে হচ্ছে। এতসব কিছুর পরেও শিক্ষার্থীরা তাদের লেখাপড়া অব্যাহত রেখেছেন– তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

তাহলেই তারা অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি থেকে লাভবান হতে পারবেন। সেসব কথা মাথায় রেখেই শিক্ষার্থীদের সহায়তা আমরা বহু পদক্ষেপ নিয়েছি।

প্রথমত, শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক সহায়তা আমরা বাড়িয়ে দিয়েছি। আগের সেমিস্টারের চেয়ে যেটা অনেক বেশি। ছাত্র কল্যাণ তহবিলে নিজেদের পকেট থেকেও অর্থ দিচ্ছি। ফ্যাকাল্টি, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রাস্টি ও সাবেক শিক্ষার্থীরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই কঠিন সময়েও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তারা যাতে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে সবাই এগিয়ে এসেছেন।
যেমন– প্রশাসনিক শর্তসহ নিয়মনীতি আমরা শিথিল করেছি। কিন্তু মানের দিক থেকে কোনো ছাড় দিচ্ছি না, এতে আপসের সুযোগ নেই। উহদারণ স্বরূপ, অতীতে যে কোনো অর্থনৈতিক সহায়তা পেতে শিক্ষার্থীদের টোয়েলভ ক্রেডিট আওয়ার্সের জন্য নিবন্ধন করতে হতো। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে বহু শিক্ষার্থী তাদের ক্লাস ক্রেডিট আওয়ার্স শোধ করতে পারছেন না। কাজেই সেটাকে কমিয়ে আমরা সিক্স ক্রেডিট আওয়ার্সে নিয়ে এসেছি। এখন কেউ সিক্স ক্রেডিট আওয়ার্সের নিবন্ধন করলেই তিনি অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য উপযোগী হবেন।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে একজনকে নাইন ক্রেডিট আওয়ার্সের জন্য তালিকাভুক্ত হতে হতো। বর্তমান সংকটকালে আমরা সেটা কমিয়ে সিক্স ক্রেডিট আওয়ারে নিয়ে এসেছি। আর বিশেষ কারণে একটি কোর্স অর্থাৎ থ্রি ক্রেডিট আওয়ার্সেও আমরা অনুমোদন দিচ্ছি।

কেবল শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতেই এতসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর আগে প্রতিটি সেমিস্টারে আমরা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পুর্নমূল্যায়ন করতাম, কিন্তু বর্তমানে আমরা বলছি, আগের সেমিস্টারে অর্থনৈতিক সহায়তা যে-ই পাক না কেন, বর্তমান সেমিস্টারে স্বাভাবিকভাবেই তিনি তা পেয়ে যাবেন। অর্থাভাবে কেউ যাতে শিক্ষা থেকে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে আমরা নিজেদের ক্ষমতার ভেতর থেকে সবটুকু করছি।

যুগান্তর: বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আপনি কী পরামর্শ দিতে চান?

মিলান পাগন: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে– এই বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের পাশে থাকতে হবে। সন্তানদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা অনলাইন কোর্স থেকে বাদ পড়ে না যান। অর্থাৎ এ মুহূর্তে বাবা-মা যা করতে পারেন, তা হল– সন্তানদের পাশে থাকা ও তাদের উৎসাহিত করা।

যুগান্তর: মহামারী পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি কী হতে পারে?

মিলান পাগন: কী ঘটতে যাচ্ছে–বৈশ্বিক মহামারী শুরু হওয়ার আগে তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। যে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তা হল– করোনাভাইরাস ধীর গতিতে হলেও বিস্তার লাভ করছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের জন্য যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই যোগ্য ও দক্ষ হতে হবে।

কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত হওয়া বলতে এখানে তাদের চাকরির বাজারের উপযোগী দক্ষতা, অন্তর্দৃষ্টি, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কাজেই এই সময়টাকে অভিজ্ঞতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচুর অনলাইন ক্লাস আছে। অনলাইন কোর্স সরবরাহের ক্ষেত্রে যাদের সুনাম আছে, আইইউবি তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আইইউবির প্রতিটি শিক্ষার্থী সেসব কোর্সের জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন—এবং সেটা বিনামূল্যে। নিজের জন্য আপনি যত বিনিয়োগ করবেন, আপনার অভিজ্ঞতা তত বাড়বে এবং তত বেশি আপনি কর্মক্ষেত্রের যোগ্য হয়ে উঠবেন।

যুগান্তর: মহামারীর কারণে চাকরির বাজার মন্থর হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নিজেদের ঘাটতিগুলো পূরণে শিক্ষার্থীরা কী করতে পারেন?

মিলান পাগন: সংকটমুহূর্তে চীনাদের দুটি শব্দের কথাই আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি। তা হল– প্রথমে সমস্যা, পরবর্তীতে সুযোগ। প্রতিটি সংকটের মধ্যেই সুযোগ নিহিত থাকে। মহামারীর দরুন কোনো কোনো চাকরি যদি ‘নাই’ হয়েও যায়, তবে বিপরীতে সেখানে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ঐতিহ্যগত কিছু কর্মসংস্থান হারিয়ে গেলেও নতুন উদ্যোক্তা বাড়ছে, আত্মকর্মসংস্থান বাড়ছে। কাজেই প্রতিটি সংকট কিছু সার্ভিস ও পণ্যের সুযোগ চাহিদা তৈরি করছে।

শিক্ষার্থীদের এখন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে ও উদ্ভাবনী হতে হবে। এই সংকটের ভেতরেও তাদের সুযোগ খুঁজে বের করতে হবে।

যুগান্তর: মহামারী কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার দুশ্চিন্তা কাজ করছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে কোন জিনিসটি তাদের সহায়ক হতে পারে?

মিলান পাগন: হ্যাঁ, এটা অবশ্যই আমাদের কাজ। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, কোনো সেশন জট হচ্ছে না, কোনো সেমিস্টার মিস হচ্ছে না কিংবা অন্যান্য সমস্যাগুলোও থাকছে না। মিটিংয়ে আমরা অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার নিয়ে আলাপ করেছি। মহামারীর যে কোনো ক্ষতি আমরা পুষিয়ে নিতে পারবো। সামার ও অটামের সেমিস্টারগুলো আমরা শেষ করতে পারবো। পরবর্তী স্প্রিং সেমিস্টার সঠিক সময়েই শুরু করতে পারবো। কোনো সময় নষ্ট হবে না, স্নাতক শেষ করতে কোনো শিক্ষার্থীকেই বিলম্বের ভেতরে পড়তে হবে না। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।

যুগান্তর: এই সংকট কাটিয়ে উঠতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?

মিলান পাগন: শিক্ষার্থীরা যাতে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেন; সরকারের উচিত সেই অবকাঠামো তৈরি করা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে আমি একমত, যাতে বলা হয়েছে– বাংলাদেশ এখন অনলাইন শিক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত না। কিন্তু এটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো সমস্যা না, কারণ লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা বিপুল পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা মূলত অবকাঠামোর বিষয়।

যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন সামনে আছে, তখন সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যারয়ের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত না। বাংলাদেশে শতাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আমার মূল্যায়ন হচ্ছে– তাদের মধ্যে কেবল ১০ থেকে ১৫টির মানের হবে। বাকিরা নিজেদের উঁচু মানের বলে দাবি করতে আত্মবিশ্বাসী হবে না। কিন্তু যখন নিয়মনীতির বিষয়টি চলে আসে, সরকার তখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একই নীতি প্রয়োগ করে। কিন্তু এ বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার যে গুণ ও মানে আমরা সবাই আলাদা। নিয়মনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সেই ভিন্নতা থাকা উচিত। এতে নিজেদের কাজটি আমরা ভালোভাবে করতে পারবো।

যুগান্তর: আপনাকে ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারে আইইউবি ভিসি মিলান পাগন

অনলাইনে ‘মিশ্র মডেল’ ও মুখোমুখি শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে

 যুগান্তর রিপোর্ট 
২১ জুন ২০২০, ০৪:৫৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
অধ্যাপক ড. মিলান পাগন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের(আইইউবি) উপাচার্য। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন চার বছর– প্রথমে আল গুরেইর বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে জায়েদ বিশ্ববিদ্যলয়ে। ব্যবসায় প্রশাসনে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিয়েটভেলের আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
ফাইল ছবি

অধ্যাপক ড. মিলান পাগন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের(আইইউবি) উপাচার্য। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন চার বছর– প্রথমে আল গুরেইর বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে জায়েদ বিশ্ববিদ্যলয়ে। ব্যবসায় প্রশাসনে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিয়েটভেলের আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপে শিক্ষা উপকরণ ও পদ্ধতিতে প্রভাব নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় ছিলেন তিনি। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আতাউর রহমান রাইহান।

যুগান্তর: বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এখন কোভিড-১৯ মহামারীর নজিরবিহীন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের সহায়তায় আপনাদের পরিকল্পনা কি?

মিলান পাগন: অবশ্যই, প্রথমে আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে– বাংলাদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছে, এর জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন কিংবা ডিসটান্স লার্নিংয়ের বিষয়টিকে অনুমোদন করা হয়নি। যে কারণে আমরা এতে আগে যুক্ত হতে পারিনি। আমাদের সঠিক অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও ছিল না।

পরিস্থিতির কারণে আমাদের দ্রুত প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন(ইউজিসি) অনলাইনে শিক্ষায় আমাদের উৎসাহিত করেছে। কিন্তু আইইউবিতে আমরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা এমন এক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চেয়েছি, যাতে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত না হন। যাতে অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার আগে আমাদের ফ্যাকাল্টি ও শিক্ষার্থীরা সঠিক অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। 

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত হয়ে পড়েছে। আমরা ঠিক তাদের মতো করে এগোতে চাইনি। তারা মনে করেন, অনলাইন শিক্ষা হচ্ছে উপকরণগুলো ই-মেইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া। কিন্তু আমরা সেভাবে না গিয়ে কোনো রকম ঘাটতি না রেখে পূর্ণ্যোদ্যমে অনলাইন শিক্ষার কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি।

যা আমরা চলতি বছরের স্প্রিং সেমিস্টারেই চালু করতে চাচ্ছি না। ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে এই সেমিস্টার আমরা এর আগের কোর্সগুলোর মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই শেষ করতে চাচ্ছি। কাজেই কোনো ধরনের ঝক্কিতে না গিয়ে কিংবা অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতিতে না জড়িয়ে শিক্ষার্থীরা এবারের সেমিস্টার শেষ করতে পারবেন।

এতে আগামী সেমিস্টার শুরু হওয়ার আগে তারা মোটামুটি মাসখানেক সময় পাচ্ছেন। আর এই সময়টায় আমরা ফ্যাকাল্টি ও শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করতে পারবো। একই সময়ে মাইক্রোসফট, গুগল মিট, গুগল ক্লাসরুমের সহায়তায় আমরা আইইউবির নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবো, আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে এগুলোকে সমন্বয় করে নেব, যাতে শিক্ষার্থীরা এতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। এভাবে বিস্তৃত পরিসরে শিক্ষার্থীদের শেখার ব্যবস্থার আয়োজন করতে যাচ্ছি।

আমরা সপ্তাহখানেকের জন্য ‘মক ট্রায়াল’ বা পরীক্ষামূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করেছি, যাতে ফ্যাকাল্টি এ ধরনের ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, শিক্ষার্থীরাও এখান থেকে অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ পাবেন।

আমি আনন্দের সঙ্গেই বলতে চাচ্ছি যে, এই ধরনের অভিজ্ঞতা খুবই ইতিবাচক। প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর, যেভাবে সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে, তাতে দুপক্ষই খুশি। এছাড়া আগামী সেমিস্টারে যেসব সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেগুলো মিটিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়কেও সুযোগ করে দিচ্ছে।

যুগান্তর: এমন অবস্থার সঙ্গে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিনা? 

মিলান পাগন: পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন প্রশ্নের জবাব দেয়া খুবই কঠিন হবে। এমন সংকটে কেউ মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে, তা বলা বেশ কঠিন।

প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে এই অনলাইন শিক্ষা অপরিচিত, তাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছে। অনিচ্ছাও আছে। যদি সামাজিকমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা ফলো করেন, তবে সেখানে অনলাইন শিক্ষার বিরুদ্ধে একটা চাপ দেখতে পাবেন।

কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যদি আপনি সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারেন, তবে তা এ ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত করতে সহায়ক হবে। আমাদের শিক্ষকরা তাদের বিভাগীয় প্রধান ও ডিনদের কাছে যে রিপোর্ট দিয়েছেন, তাতে খুবই ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলা আছে। কাজেই এটা সুন্দরভাবেই করা সম্ভব।

যুগান্তর: সেক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কিনা?

মিলান পাগন: হ্যাঁ, তবে এখানে একটা সীমাবদ্ধতা আছে। অনলাইনে তাদের ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো পরিপূর্ণভাবে করা সম্ভব না। কিছুটা ভার্চ্যুয়াল উপায়, কিছুটা রেকর্ড দিয়ে পরীক্ষামূলক চালানো যেতে পারে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে তা করা সম্ভব না।

আমি বলতে চাই, উন্নত বিশ্ব অনেক আগেই অনলাইন শিক্ষার বিষয়ে প্রচুর উৎসাহ ও প্রচার চালিয়েছে। পাশাপাশি তারা এ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোও ধরতে পেরেছে। কাজেই তারা ‘ব্লেন্ডেড মডেল’ বা মিশ্র মডেলে তার সুরাহা করেছে। অর্থাৎ শিক্ষার বড় অংশটি অনলাইনে হবে, কিন্তু সেখানে মুখোমুখি হওয়ার উপায়ও থাকবে। এটা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আগে-পরে কী ঘটছে কিংবা যে অবস্থার ভেতর দিয়েই তারা আসুক না কেন, যখন তারা চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুতি নেবে, তখন তাদের ‘সরাসরি মুখোমুখি’ হওয়ার পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবেই। চাকরি পেতে হলে তাদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হতে হবে। তখন সবকিছু অনলাইনে হবে; এমনটা না। কাজেই শিক্ষার্থীদের চারটি বছর অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শরীরিকভাবে মুখোমুখি হতে হয়; এমন পরিস্থিতি পাঠিয়ে সব কিছু ঠিকঠাকমতো কাজ করবে এমনটা প্রত্যাশা করতে পারি না।

আর এ কারণেই আমাদের একটি ‘ব্লেন্ড লার্নিং’ বা মিশ্র শেখার কৌশল বের করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে আসছে সেমিস্টারে সবকিছু অনলাইনে শিক্ষা দেয়া হবে।

যুগান্তর: বাড়ি থেকে শিক্ষার্থীরা গোটা পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করবেন?

মিলান পাগন: এখানে বিপুল প্রতিকূলতা রয়েছে। তবে এতে বিশ্ববিদ্যালয়েরও যেমন অনেক কিছু করার আছে, শিক্ষার্থীদের সহায়তায় সরকারি, বেরসকারি এমনকি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও ভূমিকা রাখতে পারে। উদহারণ দিয়ে বলা চলে, আমরা প্রস্তুতি নিয়ে অনলাইন ক্লাস নিতে পারি, সবকিছুর আয়োজনই সম্পন্ন করতে পারি, কিন্তু আমাদের কোনো শিক্ষার্থী যদি সুদূর খাগড়াছড়িতে থাকেন, সেখানে যদি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ না থাকে, তারা যদি ইন্টারনেট সংযোগ না পায়, তাহলে কীভাবে তারা ক্লাস থেকে লাভবান হবে?

কাজেই শিক্ষার্থীদের অনলাইন সংযোগ ও তা থেকে সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবকাঠামোগত ভূমিকা পুরোপুরি পালন করতে হবে। 

যখন দেখছেন, মোবাইল যোগাযোগের মূল্য সরকার বাড়িয়ে দিলেও তা শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টাকে খুব একটা খর্ব করতে পারে না। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব শিক্ষার্থী স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাসে যোগ দিচ্ছেন, এতে একটি ক্লাসের জন্য তাদের মাত্র ৫০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

যুগান্তর: ‘নিউ নরমাল’ দুনিয়ায় সফল হওয়ার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার?

মিলান পাগান: এ জন্য সবার সমন্বিত চেষ্টা দরকার। সরাসরি কিংবা মুখোমুখি শিক্ষার চেয়ে অনলাইনের লেখাপড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও এতে কিছু উপকরণ একই রকম থাকলেও আরও বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। কাজেই ফ্যাকাল্টির মানসিকতাকেও এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। এতে হোয়াইট বোর্ড, মার্কার ও পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মতো পুরনো অভ্যাসে অভ্যস্ত ফ্যাকাল্টির সামনে চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি আরও উন্নত করতে হবে। সেই পর্যায়ে যেতে ফ্যাকাল্টিকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করছি।

একই সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্যও চ্যালেঞ্জ আছে। আজকের বিশ্বে শিক্ষা ও জানার পদ্ধতির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ঐতিহ্যগত শিক্ষার উপকরণ থেকে আমরা সরে এসেছি। শিক্ষার্থীরা এখন স্ব-শিক্ষার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানুষ এখন আজীবন শিক্ষার্থী হয়ে উঠছে। কাজেই নতুন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে তারা এমন কিছু দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে, যেটা আগে কখনো ছিল না।

যুগান্তর: শিক্ষার্থীদের সহায়তায় আইইউবি কি পদক্ষেপ নিয়েছে?

মিলান পাগান: এতক্ষণ পর্যন্ত আমি যেসব আলাপ করলাম, তার সবাই অনলাইন শিক্ষার অফার নিয়ে। এখানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিক্ষার্থীরা কি তা বহন করতে পারবে? আমরা জানি যে পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশেই না, সারা বিশ্বে, বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, বহু মানুষ তাদের ব্যবসা চালাতে পারেননি। মানুষের আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচও সস্তা না। শিক্ষার্থীদের মূল্য দিতে হচ্ছে। এতসব কিছুর পরেও শিক্ষার্থীরা তাদের লেখাপড়া অব্যাহত রেখেছেন– তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। 

তাহলেই তারা অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি থেকে লাভবান হতে পারবেন। সেসব কথা মাথায় রেখেই শিক্ষার্থীদের সহায়তা আমরা বহু পদক্ষেপ নিয়েছি। 

প্রথমত, শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক সহায়তা আমরা বাড়িয়ে দিয়েছি। আগের সেমিস্টারের চেয়ে যেটা অনেক বেশি। ছাত্র কল্যাণ তহবিলে নিজেদের পকেট থেকেও অর্থ দিচ্ছি। ফ্যাকাল্টি, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রাস্টি ও সাবেক শিক্ষার্থীরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই কঠিন সময়েও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তারা যাতে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে সবাই এগিয়ে এসেছেন।
যেমন– প্রশাসনিক শর্তসহ নিয়মনীতি আমরা শিথিল করেছি। কিন্তু মানের দিক থেকে কোনো ছাড় দিচ্ছি না, এতে আপসের সুযোগ নেই। উহদারণ স্বরূপ, অতীতে যে কোনো অর্থনৈতিক সহায়তা পেতে শিক্ষার্থীদের টোয়েলভ ক্রেডিট আওয়ার্সের জন্য নিবন্ধন করতে হতো। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে বহু শিক্ষার্থী তাদের ক্লাস ক্রেডিট আওয়ার্স শোধ করতে পারছেন না। কাজেই সেটাকে কমিয়ে আমরা সিক্স ক্রেডিট আওয়ার্সে নিয়ে এসেছি। এখন কেউ সিক্স ক্রেডিট আওয়ার্সের নিবন্ধন করলেই তিনি অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য উপযোগী হবেন।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে একজনকে নাইন ক্রেডিট আওয়ার্সের জন্য তালিকাভুক্ত হতে হতো। বর্তমান সংকটকালে আমরা সেটা কমিয়ে সিক্স ক্রেডিট আওয়ারে নিয়ে এসেছি। আর বিশেষ কারণে একটি কোর্স অর্থাৎ থ্রি ক্রেডিট আওয়ার্সেও আমরা অনুমোদন দিচ্ছি।

কেবল শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতেই এতসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর আগে প্রতিটি সেমিস্টারে আমরা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পুর্নমূল্যায়ন করতাম, কিন্তু বর্তমানে আমরা বলছি, আগের সেমিস্টারে অর্থনৈতিক সহায়তা যে-ই পাক না কেন, বর্তমান সেমিস্টারে স্বাভাবিকভাবেই তিনি তা পেয়ে যাবেন। অর্থাভাবে কেউ যাতে শিক্ষা থেকে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে আমরা নিজেদের ক্ষমতার ভেতর থেকে সবটুকু করছি।

যুগান্তর: বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আপনি কী পরামর্শ দিতে চান?

মিলান পাগন: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে– এই বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের পাশে থাকতে হবে। সন্তানদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা অনলাইন কোর্স থেকে বাদ পড়ে না যান। অর্থাৎ এ মুহূর্তে বাবা-মা যা করতে পারেন, তা হল– সন্তানদের পাশে থাকা ও তাদের উৎসাহিত করা।

যুগান্তর: মহামারী পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি কী হতে পারে?

মিলান পাগন: কী ঘটতে যাচ্ছে–বৈশ্বিক মহামারী শুরু হওয়ার আগে তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। যে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তা হল– করোনাভাইরাস ধীর গতিতে হলেও বিস্তার লাভ করছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের জন্য যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই যোগ্য ও দক্ষ হতে হবে।

কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত হওয়া বলতে এখানে তাদের চাকরির বাজারের উপযোগী দক্ষতা, অন্তর্দৃষ্টি, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কাজেই এই সময়টাকে অভিজ্ঞতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচুর অনলাইন ক্লাস আছে। অনলাইন কোর্স সরবরাহের ক্ষেত্রে যাদের সুনাম আছে, আইইউবি তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আইইউবির প্রতিটি শিক্ষার্থী সেসব কোর্সের জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন—এবং সেটা বিনামূল্যে। নিজের জন্য আপনি যত বিনিয়োগ করবেন, আপনার অভিজ্ঞতা তত বাড়বে এবং তত বেশি আপনি কর্মক্ষেত্রের যোগ্য হয়ে উঠবেন।

যুগান্তর: মহামারীর কারণে চাকরির বাজার মন্থর হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নিজেদের ঘাটতিগুলো পূরণে শিক্ষার্থীরা কী করতে পারেন?

মিলান পাগন: সংকটমুহূর্তে চীনাদের দুটি শব্দের কথাই আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি। তা হল– প্রথমে সমস্যা, পরবর্তীতে সুযোগ। প্রতিটি সংকটের মধ্যেই সুযোগ নিহিত থাকে। মহামারীর দরুন কোনো কোনো চাকরি যদি ‘নাই’ হয়েও যায়, তবে বিপরীতে সেখানে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ঐতিহ্যগত কিছু কর্মসংস্থান হারিয়ে গেলেও নতুন উদ্যোক্তা বাড়ছে, আত্মকর্মসংস্থান বাড়ছে। কাজেই প্রতিটি সংকট কিছু সার্ভিস ও পণ্যের সুযোগ চাহিদা তৈরি করছে।

শিক্ষার্থীদের এখন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে ও উদ্ভাবনী হতে হবে। এই সংকটের ভেতরেও তাদের সুযোগ খুঁজে বের করতে হবে।

যুগান্তর: মহামারী কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার দুশ্চিন্তা কাজ করছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে কোন জিনিসটি তাদের সহায়ক হতে পারে?

মিলান পাগন: হ্যাঁ, এটা অবশ্যই আমাদের কাজ। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, কোনো সেশন জট হচ্ছে না, কোনো সেমিস্টার মিস হচ্ছে না কিংবা অন্যান্য সমস্যাগুলোও থাকছে না। মিটিংয়ে আমরা অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার নিয়ে আলাপ করেছি। মহামারীর যে কোনো ক্ষতি আমরা পুষিয়ে নিতে পারবো। সামার ও অটামের সেমিস্টারগুলো আমরা শেষ করতে পারবো। পরবর্তী স্প্রিং সেমিস্টার সঠিক সময়েই শুরু করতে পারবো। কোনো সময় নষ্ট হবে না, স্নাতক শেষ করতে কোনো শিক্ষার্থীকেই বিলম্বের ভেতরে পড়তে হবে না। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।

যুগান্তর: এই সংকট কাটিয়ে উঠতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?

মিলান পাগন: শিক্ষার্থীরা যাতে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেন; সরকারের উচিত সেই অবকাঠামো তৈরি করা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে আমি একমত, যাতে বলা হয়েছে– বাংলাদেশ এখন অনলাইন শিক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত না। কিন্তু এটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো সমস্যা না, কারণ লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা বিপুল পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা মূলত অবকাঠামোর বিষয়।

যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন সামনে আছে, তখন সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যারয়ের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত না। বাংলাদেশে শতাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আমার মূল্যায়ন হচ্ছে– তাদের মধ্যে কেবল ১০ থেকে ১৫টির মানের হবে। বাকিরা নিজেদের উঁচু মানের বলে দাবি করতে আত্মবিশ্বাসী হবে না। কিন্তু যখন নিয়মনীতির বিষয়টি চলে আসে, সরকার তখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একই নীতি প্রয়োগ করে। কিন্তু এ বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার যে গুণ ও মানে আমরা সবাই আলাদা। নিয়মনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সেই ভিন্নতা থাকা উচিত। এতে নিজেদের কাজটি আমরা ভালোভাবে করতে পারবো। 

যুগান্তর: আপনাকে ধন্যবাদ।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

২৬ নভেম্বর, ২০২১