করোনাক্রান্তিকালে ভবিষ্যত ভাবনা

  ফারহানা সুলতানা ০৬ জুলাই ২০২০, ২২:৫৭:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

করোনাভাইরাস সময়ে আমাদের চারপাশটা যে ঠিক এর নিকট অতীতের মত থাকছে না তা বোধ করি সবাই বুঝতে শুরু করেছেন। পরের সমাজ, জীবন,সংস্কৃতি কেমন হবে তাও ভাববার সময় এখনই।

ভাবতে গেলে আমাকে একটু আগের দিকে যেতে হবে। অর্থাৎ আমি এই পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে অতীত এবং বর্তমানকে পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতকে দেখার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস করছি।

সমাজ বিজ্ঞানের এক অনন্য শাখা নৃ-বিজ্ঞানবোদ্ধারা সংস্কৃতি পরিলক্ষণের জন্য এই প্রক্রিয়াকেই আদর্শ বলে মনে করেন।

সবার আগে আসা যাক সামাজিকতার কথায়। অতীতের তুলনায় এর সংজ্ঞা এখন বেশ পরিবর্তিত আমাদের কাছে। যেমন ধরা যাক ‘বন্ধুত্ব’, বর্তমানে আমাদের ভার্চুয়াল জগতে বন্ধুর অভাব নেই, যে বন্ধুত্ব সংখ্যায় গণনা করা যায় কিন্তু তার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না।

ধরা যাক, আগে বন্ধুর বাড়ি যাওয়াটা ছিল সামাজিকতার অংশ এবং সেটা বেশ না বলে কয়ে যাওয়া। বন্ধুর বাসায় যাওয়ার আগে অধিকাংশ সময় তাকে জানানোর কথা মাথায়ই থাকত না বা কখনো কখনো তা বললেও সেটাই বরং অপ্রাসঙ্গিক মনে হত। সেটা ছিল আমাদের সময় কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির এই অবাধ যুগে এখন ফোন না করে বন্ধুর বাসায় যাওয়া বা দেখা করাটাই বরং অসামাজিকতা।

বন্ধুর সংজ্ঞাও এখন পরিবর্তিত। এখন বাবা-মামা, ভাই-বোন সবাই আমাদের বন্ধু- অন্তত মেবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর TVC তাই বলে। সে কারণেই 'কাছে থাকুন' বলে, আমরা একই বাসায় থেকেও মোবাইলফোনে কথা বলি৷ প্রযুক্তির কি অবাক ব্যবহার!

কল-লিস্টে পরিবার পরিজন তাই ফ্রেন্ড। বন্ধুর বাড়ি যাওয়া তো এখন বাদই প্রায়। সামাজিকতা এখন রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক।

কোভিড-১৯ এর কারণে এখন সবাই বাসাবন্দি। ফলে এ সময়ে আমরা কিন্তু বুঝতে পারছি কে সেই বিপদের বন্ধু। তাই বলা যায় এর পরবর্তী পরিস্থিতিতে আমরা পেতে পারি আমাদের সত্যিকার অর্থের বন্ধুকে এবং আবারো পরিবর্তিত হতে পারে সামাজিকতার ধরণ। এ যাত্রায় বেঁচে গেলে তাই আর রেস্টুরেন্ট বা রিসোর্টকেন্দ্রিক সামাজিকতা নয়, শুরু হতে পারে পারিবারিক পরিসরে বন্ধুত্ব।

পরিবার প্রথা এবং ধরণেও আসছে পরিবর্তন। পরিবার হচ্ছে পারস্পরিক আদান প্রদানের জায়গা। যেখানে দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা এবং পারস্পারিক শেয়ারিং এর মাধ্যমে বন্ধন গড়ে ওঠে, যেখানে আর্থিকমূল্যায়নই সব নয় বলে বিবেচ্য হবার কথা ছিল। সেটা এখন সমান-সমান এর জায়গা খোঁজে।

তাই সব কিছুর স্থান থাকলেও কমে এসেছে আস্থা এবং ভালোবাসার স্থান। পৃথিবী যুগ যুগ ধরে পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্রগুলোকে একটা স্থির চিত্রে চিত্রায়ন করেছিল। যেমন- শাশ্বত মা হবেন নিজের কথা না ভেবে সবার জন্য সংসারের ঘাণি টেনে যাবার একজন, তার থাকবে না নিজের কথা ভাববার গুরুত্ব, বিয়ের পরে পরিবারও তার কাছে অন্য। পক্ষান্তরে বাবারাও আজীবন নিজের উপার্জনের সবটুকু বিলিয়ে দেবেন পরিবারের অন্য সদস্যদের এবং এই আর্থিক ক্ষমতা বলে উনিই হবেন পরিবারের সব মতামতদাতা। এই যখন ছিল অবস্থা সেখানে বিশ্বায়নের এই যুগে ব্যক্তি যখন তার স্বরূপে বাবা অথবা মা এর ভুমিকা অন্যভাবে পালন করতে শুরু করল- অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতার যুগে এসে পরিবারের সব দিক খেয়াল রেখেও নারী/পুরুষ যখন গতানুগতিক ধারার বাইরে ভাবতে শুরু করলো - তখন কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিতে বাবা/মা সেই আর "ভালো বাবা" বা “ভালো মা” থাকতে পারল না। মা তখন ছোট বাচ্চা রেখেও অফিস করে বা বাবাও আর ছেড়া জুতা পরে না। সমাজ কিন্তু এগুলো এত সহজে মেনে নিতে রাজি নয়।

ভাঙতে শুরু হল পরিবার। ডিভোর্সের হার ও বাড়ছে আনুপাতিক হারে। এখানে প্রয়োজন ছিল পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতার,যার জন্য প্রয়োজন সময়। আজকের নারী/পুরুষ যে মা/বাবার দায়িত্ব পালনের বাইরেও বাইরের কাজ করেন আত্মপরিচয় সংকটের কারণে তাদের সময়টা কোথায় একে অন্যকে বোঝার? আমরা সবাই তাই অসম্ভব ব্যস্ত। বন্ধুকে যেমন সময় দেয়া যাচ্ছিল না। তেমনি দাম্পত্য জীবনেও নয়।

কোভিড-১৯ মহামারী এবং লকডাউন কিন্তু আমাদের সেই সময়টা দিয়েছে। যদিও পরিসংখ্যান বা জরিপ বলছে বিচ্ছেদ ও পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে যাবার কথা। এর উল্টোটাও তো হতে পারত!

লকডাউনে একে অন্যকে দেখছি, দেখছি আমার সঙ্গী আসলেই কত কাজ করছে তাই ফিরে আসতে পারে আস্থা/ভালোবাসা। যেসব মায়েরা শুধু ঘরে থাকেন,তাদেরকেও আমরা দেখছি কত না কাজ করেন।

এই উপলব্দ্ধি ফিরিয়ে আনতে পারে পারস্পরিক আস্থা। এই আস্থার অভাবে পরিবার হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জায়গা। যেখানে বলা হয়ে থাকে "স্বামী আর Sugar Control" এ রাখার কথা।

আগে যেখানে এই ক্ষমতার চর্চা করা হত শুধুমাত্র নারীর ওপর, এই প্রতিযোগিতার যুগেনারী এখন আর পিছিয়ে নেই। ফলাফল কিন্তু সেই একই,ক্ষমতার দ্বন্দ যা কিন্তু সেই আস্থার অন্তরায়, আগে যেখানে নির্ভরশীলতাকে বলা হত অন্তরায় সেখানে বর্তমানে নির্ভরশীলতা কমে আসায় সেই একই কারণে ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবার।

অর্থাৎ ক্ষমতায়ন যদি হয় অন্যের ওপর চর্চা করার জন্য সেটা কিন্তু পিতৃতান্ত্রিকতার স্বরূপ। যা কাম্য নয়। তাই দুর্ভিক্ষের এই অগণিত সময় আমাদের শেখাতে পারে পারস্পরিক আস্থা সহনশীলতাই পরিবার।

পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে প্রভাবিত আজকের আমরা তাই নতুন ধারার পরিবার থেকে ফিরে পেতে পারি আস্থা ভালোবাসা ঘেরা সেখানে।

আমাদের সামাজিকতা, পরিবার, সংস্কৃতির মতো অর্থনীতিরও একই অবস্থা। মানুষ যা চিন্তা করে তাই সে ধারণ করে, তাই বাহ্যিকভাবে চেনা যায় সে কোন সংস্কৃতির।

একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি ওই সমাজের সংস্কৃতি কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে কৃষি ভিত্তিক আমাদের অর্থনীতি। সময় এসেছে আমাদের অর্থনীতি নিজেদের মতো করে গড়ে তুলবার। রেমিটেন্স কমে যাওয়া এখন বাস্তবতা তাই নিজেদের সংস্কৃতিকে পুঁজি করে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া এখন একমাত্র উপায় যা কিনা সঠিক অর্থে উন্নয়ন, বিজ্ঞানের ভাষায় সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।

বিশ্বের এই সংকটকালে আমাদের তাই অন্যের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আমাদের ফ্যাশন এবং গার্মেন্টস শিল্পকে অন্যভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

গার্মেন্টশিল্প অন্য দেশের ক্রয়াদেশের উপর নির্ভরশীল। আমাদের নিজস্ব ফ্যাশন কে পৃথিবীতে এমন ভাবে উপস্থাপন করা যায় যে তারা বাধ্য হবে আমাদের পোশাক কিনতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যেমন তাদের লাইফস্টাইলকে যে কোনো দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে আমাদের কাছে স্মার্টনেস তাই তাদের পোশাক ধারণে।

উদাহরণ হিসেবে আমরা কি পারি না শাড়ি বা লুঙ্গিকে বিশ্বের কাছে সেরকম গ্রহণযোগ্য করে তুলতে? আমাদের আছে ঐতিহ্য,প্রযুক্তি এবং মেধা; এই লকডাউন এ আমরা কিন্তু এরকম ভাবে ভাবতে শুরু করতে পারি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে পৃথিবী কখনও করোনা মুক্ত হবে না। তাই মানব জাতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে যাবে, ইতিহাসও সেই শিক্ষা দেয়। এসময়ে চারিদিকের অস্থিরতা ব্যপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই আমাদের চিন্তা ভাবনার প্রসার আগামীর সমাজ জীবনকে সুন্দর করে তুলতে পারে। আর সেটার শুরু করতে হবে এখনই। বাড়িতে ‘বসে কিছু করার নেই’ বলে সামনের জীবনটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে না থেকে ভাবতে শুরু করি না কেন? এভাবেই নিউ নর্মাল পৃথিবী হতে পারে আমাদের সৎ ও সুন্দর চিন্তার প্রতিফলন।

ফারহানা সুলতানা
লেকচারার, ডিপার্টমেন্ট অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোসিওলজি
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত