‘করোনায় দিছিল ঘরে আটকাইয়া, এহোন বানে দিছে রাস্তায় উঠাইয়া’
jugantor
‘করোনায় দিছিল ঘরে আটকাইয়া, এহোন বানে দিছে রাস্তায় উঠাইয়া’

  চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) প্রতিনিধি  

২৮ জুলাই ২০২০, ২২:৩২:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

‘করোনার ডরে গত তিন মাস বাইরে কাজ-কাম করতে পারি নাই। ঘরের মধ্যে আটকা ছিলাম। ধার-দেনা করে ও সরকারি রিলিফ খেয়ে কোনোরকম পুলাপান লইয়া বাঁইচ্যা ছিলাম। তারপরও কোনো কোনো সময় মনে ডর লইয়্যা অন্যের বাড়িতে পলাইয়্যা কাজ কইরা কিছু আয় করতাম। সাতদিন ধইরা এলাকার সবার বাড়িঘর বন্যার পানিতে ভাইস্যা গেছে। আমার ঘরের মধ্যে বকফুডি পানি হওয়ার কারণে বাড়ির সব্বারে নিয়া বেড়িবাঁধে উঠছি। বছরটা বালা-মছিবতের মধ্যে খুব কষ্টে যাচ্ছে। করোনায় দিছিল ঘরে আটকাইয়া, এহোন আবার বানে দিছে রাস্তায় উঠাইয়া।’

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের বেপারী ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রিত বন্যাদুর্গত আ. লতিফ বেপারীর ছেলে সরোয়ার বেপারী (৬০) মঙ্গলবার দুপুরে এ বছর বন্যার্ত পরিবারের কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে এ সব কথা বলেন।

তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী চরহরিরামপুর ইউনিয়নে তার আদি বসতি ছিল। পদ্মা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব বিলীন হওয়ার পর গত কয়েক বছর ধরে বেপারী ডাঙ্গী গ্রামের ফসলী মাঠের মধ্যে এক টুকরো জমিতে বাড়ি করে দিন মজুরের কাজ করেন তিনি। সাতদিন আগে বন্যার পানি থাকার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়িবাঁধ সড়কে উঠেছে।

সরোয়ার বেপারী জানান, বাঁশের খুঁটি ও পলিথিন কাগজের চাল দিয়ে আশ্রয়ন গড়েছে। পলিথিন কাগজের আশ্রয়নের মধ্যে ঘুমানোর চৌকি পাতা রয়েছে। আশ্রয়ন ঘেঁষে রাস্তার ধার দিয়ে গরু ছাগল রাখার জায়গা করা হয়েছে। তার সংসারে তিনটি শিশু ছেলে, স্ত্রী, বৃদ্ধ মাতা, ২টি গরু ও ৭/৮টি ছাগল রয়েছে। এ সব কিছু নিয়েই বন্যার্তরা উক্ত বেড়িবাঁধ সড়কের ওপর ঝড়-বৃষ্টি, বান তুফান উপেক্ষা করে দিন কাটাচ্ছে।

একই গ্রামের আরেক গৃহিণী জলিল কাজীর স্ত্রী চম্পা বেগম (৪৫) বলেন, আমার স্বামী খুব বৃদ্ধ এবং কাজ করতে পারে না। তাই অর্থাভাবে বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রয়নও গড়তে পারিনি। বন্যায় বাড়িতে থাকতে না পেরে শুধু গরু-ছাগল রাস্তায় রেখে পরিবারের সবাই পার্শ্ববর্তী ইছাহাক মাস্টারের বাড়ির একটি পরিত্যক্ত ঘরে বসবাস করছি।

গাজীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ড মেম্বার আ. রউফ জানান, পদ্মা নদীর পার এলাকা ঘেঁষে বেড়িবাঁধগুলোর মধ্যে বেপারী ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ, চরহোসেনপুর গ্রাম মধু ফকিরের ডাঙ্গী গ্রাম ও জয়দেব সরকারের ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধে গত এক সপ্তাহে অন্তত ৯০টি বানভাসি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে প্রতি এলটে মেম্বারদের খুব অল্প সংখ্যক পরিবারের বরাদ্দ দেয়া হয়। ফলে সবাইকে ত্রাণ দেয়া সম্ভব হয় না।

ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ইয়াকুব আলী বলেন, বেড়িবাঁধে আশ্রিত দুর্গত পরিবারের জন্য এখনও সুনির্দিষ্টভাবে ত্রাণসামগ্রী প্রদান করার সুযোগ হয়নি।

তিনি আরও জানান, মঙ্গলবার জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মো. আবদুস সোবাহান সরেজমিন ইউনিয়নের বিভিন্ন পানিবন্দি পরিবার পরিদর্শন করে ১০৫ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন সুলতানা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে যে সব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয় তার মধ্যে বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রিত পরিবারের প্রতি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের বেশি গুরুত্ব দেয়ার শর্ত রয়েছে।

উপজেলাজুড়ে বন্যা প্রতিরোধক মোট ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সড়ক রয়েছে। উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়ন ছাড়াও চরহরিরামপুর ইউনিয়নের ইন্তাজ মোল্যার ডাঙ্গী গ্রাম ও আরজখাঁর ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধে এবং সদর ইউনিয়নের টিলারচর গ্রাম, এমপি ডাঙ্গী, ফাজেলখাঁর ডাঙ্গী বালিয়া ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ সড়কে বন্যাদুর্গত শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বলেও জানা যায়।

‘করোনায় দিছিল ঘরে আটকাইয়া, এহোন বানে দিছে রাস্তায় উঠাইয়া’

 চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) প্রতিনিধি 
২৮ জুলাই ২০২০, ১০:৩২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

‘করোনার ডরে গত তিন মাস বাইরে কাজ-কাম করতে পারি নাই। ঘরের মধ্যে আটকা ছিলাম। ধার-দেনা করে ও সরকারি রিলিফ খেয়ে কোনোরকম পুলাপান লইয়া বাঁইচ্যা ছিলাম। তারপরও কোনো কোনো সময় মনে ডর লইয়্যা অন্যের বাড়িতে পলাইয়্যা কাজ কইরা কিছু আয় করতাম। সাতদিন ধইরা এলাকার সবার বাড়িঘর বন্যার পানিতে ভাইস্যা গেছে। আমার ঘরের মধ্যে বকফুডি পানি হওয়ার কারণে বাড়ির সব্বারে নিয়া বেড়িবাঁধে উঠছি। বছরটা বালা-মছিবতের মধ্যে খুব কষ্টে যাচ্ছে। করোনায় দিছিল ঘরে আটকাইয়া, এহোন আবার বানে দিছে রাস্তায় উঠাইয়া।’

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের বেপারী ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রিত বন্যাদুর্গত আ. লতিফ বেপারীর ছেলে সরোয়ার বেপারী (৬০) মঙ্গলবার দুপুরে এ বছর বন্যার্ত পরিবারের কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে এ সব কথা বলেন।

তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী চরহরিরামপুর ইউনিয়নে তার আদি বসতি ছিল। পদ্মা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব বিলীন হওয়ার পর গত কয়েক বছর ধরে বেপারী ডাঙ্গী গ্রামের ফসলী মাঠের মধ্যে এক টুকরো জমিতে বাড়ি করে দিন মজুরের কাজ করেন তিনি। সাতদিন আগে বন্যার পানি থাকার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়িবাঁধ সড়কে উঠেছে।

সরোয়ার বেপারী জানান, বাঁশের খুঁটি ও পলিথিন কাগজের চাল দিয়ে আশ্রয়ন গড়েছে। পলিথিন কাগজের আশ্রয়নের মধ্যে ঘুমানোর চৌকি পাতা রয়েছে। আশ্রয়ন ঘেঁষে রাস্তার ধার দিয়ে গরু ছাগল রাখার জায়গা করা হয়েছে। তার সংসারে তিনটি শিশু ছেলে, স্ত্রী, বৃদ্ধ মাতা, ২টি গরু ও ৭/৮টি ছাগল রয়েছে। এ সব কিছু নিয়েই বন্যার্তরা উক্ত বেড়িবাঁধ সড়কের ওপর ঝড়-বৃষ্টি, বান তুফান উপেক্ষা করে দিন কাটাচ্ছে।

একই গ্রামের আরেক গৃহিণী জলিল কাজীর স্ত্রী চম্পা বেগম (৪৫) বলেন, আমার স্বামী খুব বৃদ্ধ এবং কাজ করতে পারে না। তাই অর্থাভাবে বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রয়নও গড়তে পারিনি। বন্যায় বাড়িতে থাকতে না পেরে শুধু গরু-ছাগল রাস্তায় রেখে পরিবারের সবাই পার্শ্ববর্তী ইছাহাক মাস্টারের বাড়ির একটি পরিত্যক্ত ঘরে বসবাস করছি।

গাজীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ড মেম্বার আ. রউফ জানান, পদ্মা নদীর পার এলাকা ঘেঁষে বেড়িবাঁধগুলোর মধ্যে বেপারী ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ, চরহোসেনপুর গ্রাম মধু ফকিরের ডাঙ্গী গ্রাম ও জয়দেব সরকারের ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধে গত এক সপ্তাহে অন্তত ৯০টি বানভাসি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে প্রতি এলটে মেম্বারদের খুব অল্প সংখ্যক পরিবারের বরাদ্দ দেয়া হয়। ফলে সবাইকে ত্রাণ দেয়া সম্ভব হয় না।

ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ইয়াকুব আলী বলেন, বেড়িবাঁধে আশ্রিত দুর্গত পরিবারের জন্য এখনও সুনির্দিষ্টভাবে ত্রাণসামগ্রী প্রদান করার সুযোগ হয়নি।

তিনি আরও জানান, মঙ্গলবার জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মো. আবদুস সোবাহান সরেজমিন ইউনিয়নের বিভিন্ন পানিবন্দি পরিবার পরিদর্শন করে ১০৫ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন সুলতানা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে যে সব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয় তার মধ্যে বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রিত পরিবারের প্রতি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের বেশি গুরুত্ব দেয়ার শর্ত রয়েছে।

উপজেলাজুড়ে বন্যা প্রতিরোধক মোট ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সড়ক রয়েছে। উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়ন ছাড়াও চরহরিরামপুর ইউনিয়নের ইন্তাজ মোল্যার ডাঙ্গী গ্রাম ও আরজখাঁর ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধে এবং সদর ইউনিয়নের টিলারচর গ্রাম, এমপি ডাঙ্গী, ফাজেলখাঁর ডাঙ্গী বালিয়া ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ সড়কে বন্যাদুর্গত শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বলেও জানা যায়।

 

ঘটনাপ্রবাহ : বন্যা ২০২০