Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ‘সোনার হরিণ’

রোগীর মৃত্যু হলেই মেলে আরেকজনের সুযোগ

সারা দেশে কতটা সচল সেই তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে

Icon

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রোগীর মৃত্যু হলেই মেলে আরেকজনের সুযোগ

সংগৃহীত ছবি

দেড় মাস সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন প্রবাসী আলী মিজানুর রহমান (৪৫)। এ সময় চিকিৎসকরা তার ফুসফুস ও মূত্রনালিসহ শরীরে তিনটি অস্ত্রোপচার করেন। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে না পারায় বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে নামতেই স্বজনরা তার পেট ও মূত্রনালিতে দুটি ক্যাথেটার ব্যাগ পরানো দেখতে পান। শোয়া থেকে বসার মতো শক্তি ছিল না তার। চিকিৎসকের দেওয়া ‘মেডিকেল কেস সামারি’তে লিখে দেওয়া হয়েছে আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) সাপোর্ট প্রয়োজন। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউ সংবলিত অ্যাম্বুলেন্সে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে আইসিইউ ফাঁকা নেই। ঢাকা মেডিকেল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করলে সেখানেও খালি নেই বলে জানানো হয়। পরে স্বজনরা তাকে বেসরকারি ধানমন্ডি জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করেন।

আলী মিজানুর রহমানের স্ত্রী মরিয়ম বেগম যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী প্রবাসে ১৬ বছর অল্প বেতনে শ্রমিকের কাজ করেছেন। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। এখন অসুস্থ হয়ে ফিরে সরকারি হাসপাতালে একটি আইসিইউ পাননি। যেখানেই গেছি সবার একই কথা-দরখাস্ত জমা দেন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন কেউ সুস্থ হলে বা মারা গেলে তবেই আপনার রোগীর সিরিয়াল মিলতে পারে। অর্থাৎ এক রোগীর মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতে হবে আরেক মুমূর্ষু রোগীকে। তাই নিরুপায় হয়ে বেসরকারিতে ভর্তি করিয়েছি। এখানে চিকিৎসার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেস্থেশিয়া, আইসিইউ অ্যান্ড পেইন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রেহান উদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, ৮৫০ শয্যার হাসপাতালে মাত্র ২০টা আইসিইউ। সপ্তাহ দুয়েক আগে ১০টি এইচডিইউ (হাই-ডিপেনডেন্সি ইউনিট) চালু করা হয়েছে।

আইসিইউর জন্য দৈনিক গড়ে ২৫টি আবেদন জমা পড়ে। গড়ে দুজনকে ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয়। তিনি জানান, হাসপাতালের ১৩টা ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) দিনে গড়ে সাতটি অস্ত্রোপচার হয়। আইসিইউতে ভর্তির ক্ষেত্রে হাসপাতালের রোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা জানান, পুরোনো ভবনে ৩২টি জেনারেল আইসিইউ, ১৮টি এইচডিইউ ও ১০টা গাইনি আইসিইউ রয়েছে। দৈনিক গড়ে ৩ থেকে ৭ জন সিট পান। এছাড়া ভবন-২-তে ১৪টি মেডিসিন আইসিইউ এবং ডিএমসি বার্ন ইউনিটে ১০ বেডের ক্রিটিক্যাল আইসিইউ ও ১০টি বার্ন আইসিইউর সবগুলোই সারা বছর রোগীতে পূর্ণ থাকে। ঢামেকে আইসিইউ শয্যা পেতে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টা আবেদন জমা পড়ে।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, সেখানে শুধু ভর্তি রোগীদের জন্য ৭টা আইসিইউ আছে। ফলে বাইরের রোগীদের কোনো সেবা দেওয়া হয় না।

সরকার করোনা মহামারিকালে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপারডনেস প্রকল্পের অধীনে মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশেই সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শয্যার আইসিইউ চালু করে। আরও পাঁচটি শয্যা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনা হয়। দুজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, একজন ক্রিটিক্যাল কেয়ার এক্সপার্ট ও সাতজন কনসালটেন্ট পদায়ন করে। বর্তমানে ইউনিটটি পরিচালনায় দশজনের মধ্যে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের একজন ছাড়া কোনো চিকিৎসক নেই। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সব আইসিইউ শয্যা অকেজো। 

হাসপাতালটির সুপারিনডেনটেন্ট (তত্ত্বাবধায়ক) ডা. আরিফুল বাসার যুগান্তরকে বলেন, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির অর্গানোগ্রামের জনবল দিয়ে এখনো চলছে। আইসিইউর জনবল চাওয়া হয়েছে। চিকিৎসক পদায়ন করলে ফের ইউনিটটি চালু করা সম্ভব।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. আনিসুর রহমান বলেন, হাসপাতালটিতে ৪৩টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৩৬টি সচল। বাকি সাতটা জনবলের অভাবে বন্ধ। এর বাইরে ১৬টা এইচডিইউ ও কিছুসংখ্যক এনআইসিইউ আছে। আইসিইউ পেতে প্রতিদিনই বেশকিছু আবেদন জমা পড়ে। 

এদিকে সারা দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে স্থাপিত মোট কতটি আইসিইউ রয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখাসংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, আইসিইউ ও এইচডিইউর তথ্য অধিদপ্তরের কোভিড বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়। এই সংখ্যাকেই মোট শয্যা ধরা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ১ হাজার ১৮৩টি আইসিইউ ও ৬৯৫টি এইচডিইউ শয্যার সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ৮০০টি আইসিইউ ও ৫৫১টি এইচডিইউ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর ১৫টি সরকারি হাসপাতালে ৩৬৭টি আইসিইউ ও ৪১২টি এইচডিইউ শয্যা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩টি হাসপাতালে ১৩০টি আইসিইউ ও ২৭টি এইচডিইউ শয্যা আছে। যার মধ্যে চট্টগ্রামের চারটি হাসপাতালে ৩৩টি আইসিইউ ও ১৬টি এইচডিইউ রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগের মোট ৫টি হাসপাতালে ২২টি আইসিইউ ও ১২টি এইচডিইউ শয্যা আছে। রাজশাহী বিভাগের ১০টি হাসপাতালে ৩৮টি আইসিইউ ও ১৫টি এইচডিইউ আছে। রংপুর বিভাগের ১১টি হাসপাতালের মধ্যে রংপুর ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে ৮টি, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬টিসহ ২৪টি আইসিইউ রয়েছে। তবে এইচডিইউ নেই এ বিভাগে। খুলনা বিভাগের ১০টি হাসপাতালে ৮৬টি আইসিইউ ও ৭৯টি এইচডিইউ আছে। বরিশাল বিভাগে ৭টি হাসপাতালে ৪১টি এবং সিলেট বিভাগের ৭টি হাসপাতালে ২২টি আইসিইউ রয়েছে। এই দুই বিভাগের সরকারি হাসপাতালে কোনো এইচডিইউ শয্যা নেই।

সারা দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের মহানগরীতে অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর তথ্য দিতে পেরেছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর ৩২টি হাসপাতালে ৩৬১টি আইসিইউ ও ১০৮টি এইচডিইউ, চট্টগ্রাম মহানগরীর ৬টি হাসপাতালে ৩১টি আইসিইউ রয়েছে। রংপুর মহানগরীতে মাত্র দুটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০টি আইসিইউর তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

আইসিইউ সংকটের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতার কারণে আইসিইউ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ের বেসিক ম্যানপাওয়ার ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ’ তৈরি হয়নি। অ্যানেস্থেসিওলজিস্টরাই এটি পরিচালনা করছেন। এটি থাকার কথা ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞদের হাতে। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে গেলে দেখা যায়, সার্জারি ব্রাঞ্চ আছে ৮ থেকে ১০টা। অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগ মাত্র একটা। অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের এতই সংকট যে তারা আইসিইউ চালানোর অবস্থায় নেই, অস্ত্রোপচারের সাপোর্ট দিতেই সময় যায়। এটির তাৎক্ষণিক সমাধানও নেই। তবে আশা করছি আগামীতে অ্যানেস্থেসিয়া বিষয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থী পড়তে আসবে। এজন্য অ্যানেস্থেসিওলজিসহ ৮টি বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদের বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। তখন জনবল সংকট দূর হবে। 

সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে একজন রোগীর দৈনিক গড়ে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার ওষুধপথ্য লাগে। অন্যদিকে বেসরকারিতে আইসিইউ খরচ রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদানের ওপর নির্ভর করে। বারডেমের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা জানান, সেখানে চিকিৎসাধীন একজন রোগীর শুধু আইসিইউ শয্যাবাবদ দৈনিক ভাড়া ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় ভেন্টিলেশন সাপোর্ট, অক্সিজেন সাপোর্ট, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জাম লাগলে সেগুলোর খরচ পৃথকভাবে ধরা হয়। সবমিলে হাসপাতালটিতে ভর্তি একজন আইসিইউর রোগীর চিকিৎসায় দৈনিক ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, সরকারি হাসপাতালেও ব্যয় বেশি। কিন্তু এখানে সরকার ভর্তুকি দেয়। তাই রোগীর ওপর খরচের চাপ কম থাকে। ফলে আইসিইউর চাহিদা বেশি। শয্যা সংকট দূর করতে আইসিইউ অবকাঠামো বাড়ানো হবে। তবে বেসরকারিতে রোগীদের সব সেবা কিনে নিতে হয়। তারপরও বলব, বেসরকারিতে অযৌক্তিক বিল ধরা হয়। এক্ষেত্রে হাসপাতাল মালিকদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম