নামিদামি স্কুলে পড়লেই কি শিশুরা মেধাবী হয়?

  ডা. সাঈদ এনাম ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ২৩:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

বাবা-মায়ের সঙ্গে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধা তালিকায় তৃতীয় সজীব চন্দ্র রায়। ছবি: যুগান্তর
বাবা-মায়ের সঙ্গে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধা তালিকায় তৃতীয় সজীব চন্দ্র রায়। ছবি: যুগান্তর

ছোট শহরের সকাল বেলার রাস্তা একেবারেই ফাঁকা থাকে। ভোরের ঘুম জাগানিয়া পক্ষীকূল তখন তার দায়িত্ব শেষ করে কেবল একটু বিশ্রামে যায়। শুধুই চোখে পড়ে দু’পাশে সারি বেঁধে স্কুলগামী ছেলে আর মেয়ে।

ছেলেদের সাদা শার্ট নীল প্যান্ট আর মেয়েদের নীল জামা, সাদা স্কার্ফ। মফস্বলে মেয়েরা মাথায় স্কার্ফ পড়ে বের হয়। দলে দলে দু’পাশে মাথা নিচু করে হেঁটে চলে তারা। মনে হয় যেনো দুপাশে দুটো নীল রঙের রেলগাড়ি। তাদের হাতে মোবাইল নেই, নেই সেফুদা বা ব্লু হোয়েল গেম। এসব তারা শোনেওনি কখনো।

সবুজের সাথেই তাদের বসবাস আর বেড়ে ওঠা। এ দৃশ্য বড় বড় শহরে দেখা যায় না। সেখানে প্রতিটি ছেলেমেয়ের হাত ধরে থাকেন অভিভাবক নয়তো কাজের বুয়া। স্কুল গেটেও একই অবস্থা। শতশত অভিভাবক অযথা বসে পান চিবুচ্ছে বা গালগপ্পে মেতে আছে। আহা! সময়ের এমন অপচয় পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।

এই দুই রকমের বিপরীত পরিবেশে বেড়ে উঠা শিশুদের মানসিক বিকাশেও থেকে যায় বিশাল ফারাক। শহরের ছেলেরা মেয়েরা অতিমাত্রায় বাস্তববাদী আর আত্মকেন্দ্রিক সে তুলনায় গ্রামের ছেলে মেয়েরা কিছুটা সহজ সরল, পরোপকারী। এর সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যা ও আছে। একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, অনিরাপদ পরিবেশে বড় হওয়া আর নিরাপদ, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন পরিবেশে বড় হওয়া শিশুর মানসিক বিকাশে ফারাক থাকাটাই স্বাভাবিক।

অভিভাবকদের একটা ধারণা হলো-নামিদামি স্কুলে ছেলেমেয়ে পড়লে বোধহয় তারা ভবিষ্যতে নামীদামী কিছু একটা হয়ে যাবে। তাই তারা লাখ লাখ টাকা ডোনেশন আর মাসিক বেতন দিয়ে কষ্ট করে বড় বড় শহরে থেকে অমানবিক পরিশ্রম করেন আর শিশুদের পড়ানোর চেষ্টা করেন। আসলে এ ধারনাটি কি ঠিক?

এ একটি বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন আমাদের কাছে। সাইকিয়াট্রিস্ট হিসাবে আমি বলবো এটা পুরোপুরি ঠিক নয় বলা যায় ভ্রান্ত ধারণা, অলীক বিশ্বাস। এ পর্যন্ত দেশে কিংবা বিদেশে যারা কিংবদন্তী হয়েছেন বা আছেন তাদের শিশুকালকে দেখুন আর যারা নানা চাঞ্চল্যকর, কুৎসিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে তাদের শিশুকাল দেখুন। ইয়াবা সেবনকারী ঐশী কিংবা হলি আর্টিজানের নিব্রাস ইসলামের দিকে তাকান। বিষয়টি স্পষ্ট দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

লাখ টাকার স্কুল কলেজে পড়ানো মানেই সন্তান সন্তান লাখ টাকা দামের কিছু হয়ে যাবে তা নয়। একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুরা শিখে, মেধাবী হয়ে উঠে তার পরিবার থেকে, মা বাবার আচার ব্যবহার থেকে। স্কুল থেকে নয়। দিনের বেশিরভাগ সময়তো সে মা বাবার সান্যিধ্যেই থাকে। সুতরাং সে সেই মা বাবার অভ্যাসই রপ্ত করবে, এটাই স্বাভাবিক।

লাখলাখ টাকা খরচ করে স্কুলে পড়ালেই যে কী হনুরে হয়ে যাবে সেটা মোটেই ঠিক নয়। এটা ব্যবসায়ীদের প্রচারণামাত্র। বড় জোড় ও সব ব্যবসায়ীক স্কুল কলেজ আপনার সন্তানকে বাইরে যাবার একটা কাগজ ধরিয়ে দেবে। ছেলে বাইরে চলে যাবে আর আপনি যাবেন ওল্ড হোমে।

একটা উদাহরণ দেই, দেখুন দেশের সরকারি ভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি এগুলোতে কারা চান্স পাচ্ছে। কারা মেধা তালিকায় প্রথম দ্বিতীয় হচ্ছে। কারা দেশ কে এগিয়ে নিচ্ছে?

এইতো দুদিন আগে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেলো। জানেন সেখানে মেধাতালিকায় কারা স্থান করেছে? সারা বাংলাদেশে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে ছেলেটিকে আপনি চেনেন? চেনেননি? একজন কাঠুরিয়ার ছেলে। তার মা-ও দিনমজুর। এমন হতদরিদ্র পরিবারে ছেলেই এশিয়ার সেরা চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবে।

ভবিষ্যৎ চিকিৎসা সেবা তার হাত দিয়েই প্রস্ফুটিত হবে-এ আমার বিশ্বাস। আচ্ছা ভেবে দেখুনতো সে কি লাখ টাকা ডোনেশন আর লাখ টাকা বেতনের স্কুলে পড়েছিল?

অবশ্যই না। এরকম মেধাবী ছেলেমেয়েদের উদাহরণ অনেক।

আমি যখন ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হই তখন আমার মতো অনেকে ছিলো মফস্বল স্কুল কলেজ থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে যাওয়া। আমাদের ছিল না কোচিং, ছিল না প্রতি সাবজেক্টে প্রাইভেট টিউটর। যা ছিল সেটা হলো স্কুলের আদর্শ শিক্ষক। তারা বলতেন তোমাদের মাছ ধরে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়ার পরিবর্তে মাছ ধরাটা শিখিয়ে দেই। আর অভিভাবকরা দিতেন সময়।

তবে একটি মুল কথা মেধা সবার সমান, সবাইকে সমান মেধা দিয়ে আল্লাহ তায়লা এ দুনিয়াতে পাঠান। একে বিকশিত করার দায়িত্ব পিতামাতা আর শিক্ষকের। লাখ টাকার ডোনেশনের স্কুলে মেধার বিকাশ হয় না। শিশুদের মেধা বিকশিত হয় গুণী পরিবার আর গুণী শিক্ষক এই দুই অভিভাবকের সান্যিধ্যে থেকে।

আগামী ১৮-১৯ অক্টোবর আমি যাচ্ছি জাপানে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে। কী নোট স্পিকার হিসেবে একটি সেশন থাকবে আমার। সারা পৃথিবী থেকে সাইকিয়াট্রিস্টরা জড়ো হবেন এ সম্মেলনে। সেজন্যে সবার দোয়া চাই।

লেখক: ডা. সাঈদ এনাম, ডিএমসি,কে-৫২, সাইকিয়াট্রিস্ট, উপজেলা স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা, সিলেট। মেম্বার ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

আরও পড়ুন

কাঠুরিয়া বাবার ছেলে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় তৃতীয়

ঘটনাপ্রবাহ : ডা. সাঈদ এনামের লেখা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×